বিশ্বজুড়ে দাসপ্রথা নিষিদ্ধকরণ: ১৯২৬ সালের কনভেনশন, জাতিসংঘ ও আইনগত বিলুপ্তি
সিরিজ: দাসপ্রথা বিলুপ্তির ইতিহাস
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে বাস্তব মুক্তির দীর্ঘ পথ
মানুষের ওপর মালিকানা অস্বীকার করার পরও স্বাধীন শ্রম, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার সংগ্রাম চলছিল—আফ্রিকা ও এশিয়ার ইতিহাস আমাদের সেই বাস্তবতার সামনে এনেছে। বিংশ শতাব্দীতে এই সমস্যাটি নতুনভাবে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে আসে। কোনো দেশে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হলেও সীমান্তের ওপারে মানুষ বিক্রি হতে পারতেন; আবার মালিকানার নাম বদলে ঋণ, বংশানুক্রমিক অধীনতা বা বাধ্যতামূলক শ্রমের মধ্যে বন্দিত্ব টিকে থাকত। ফলে শুধু পৃথক দেশের ঘোষণা যথেষ্ট ছিল না। প্রয়োজন হয়েছিল দাসত্বের একটি সাধারণ সংজ্ঞা, রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক দায়িত্ব এবং আইন কার্যকর করার ব্যবস্থা।
আন্তর্জাতিক উদ্যোগ অবশ্য শূন্য থেকে শুরু হয়নি। উনিশ শতকের দাসবাণিজ্যবিরোধী চুক্তি, নৌঅভিযান ও বিলোপ আন্দোলন সহযোগিতার কিছু ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু চুক্তিগুলোর আওতা সীমিত ছিল এবং প্রয়োগ নির্ভর করত শক্তিশালী রাষ্ট্রের স্বার্থের ওপর। ঔপনিবেশিক শাসকেরা দাসবাণিজ্যের বিরোধিতা করেও নিজেদের অধীন মানুষের ওপর জোরপূর্বক শ্রম চাপাতে পারতেন। এই দ্বন্দ্ব প্রশ্ন তুলেছিল: মানুষকে কেনাবেচা বন্ধ করাই কি যথেষ্ট, যদি রাষ্ট্র বা নিয়োগকর্তা অন্য উপায়ে তাঁর শ্রম ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত জাতিপুঞ্জের কাঠামোতে বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পায়। অনুসন্ধান, বিশেষজ্ঞ আলোচনা ও রাষ্ট্রগুলোর তথ্য বিনিময়ের মধ্য দিয়ে একটি বিস্তৃত চুক্তির প্রস্তুতি এগোয়। ১৯২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জেনেভায় দাসপ্রথা কনভেনশন স্বাক্ষরিত হয়। এটি জাতিসংঘের চুক্তি ছিল না; জাতিসংঘ তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জাতিপুঞ্জের উদ্যোগে তৈরি এই দলিল দাসবাণিজ্য দমন এবং দাসপ্রথার সম্পূর্ণ অবসানের জন্য অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ করে। জাতীয় বিলোপের ইতিহাস এখানে একটি স্থায়ী আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর দিকে অগ্রসর হয়।
কনভেনশনের সবচেয়ে স্থায়ী অবদান ছিল দাসত্বের সংজ্ঞা। এর মর্ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির ওপর মালিকানার অধিকারের সঙ্গে যুক্ত সব বা কিছু ক্ষমতা প্রয়োগ করা হলে সেই অবস্থা দাসত্ব। অর্থাৎ প্রশ্ন শুধু কাউকে বাজারে বিক্রি করা হয়েছে কি না, সেটি নয়; তাঁর ওপর কী ধরনের ক্ষমতা চালানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দাসত্ব বোঝার কেন্দ্রে এল মানুষের ওপর মালিকানাসদৃশ নিয়ন্ত্রণ। দাসবাণিজ্যের সংজ্ঞাতেও বন্দি করা, কেনা, বিক্রি, বিনিময় এবং পরিবহনের মতো একাধিক কাজ অন্তর্ভুক্ত হয়।
তবে ১৯২৬ সালের চুক্তি স্বাক্ষরের দিনেই বিশ্বজুড়ে দাসত্ব অবৈধ হয়ে যায়নি। চুক্তির বাধ্যবাধকতা গ্রহণকারী রাষ্ট্রকে নিজ ভূখণ্ড ও অধীন এলাকায় ব্যবস্থা নিতে হতো। দাসত্ব বিলোপের ক্ষেত্রে ধীরে এবং যত দ্রুত সম্ভব অগ্রসর হওয়ার ভাষা ছিল। বাধ্যতামূলক শ্রমের ক্ষেত্রেও কিছু অন্তর্বর্তী সুযোগ রাখা হয়েছিল। তাই দলিলটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ঔপনিবেশিক ক্ষমতার সঙ্গে আপসের চিহ্ন বহন করত। আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি, দেশের অভ্যন্তরীণ আইন এবং বাস্তব প্রশাসনিক আচরণের মধ্যে ব্যবধান থেকে যায়।
দাসত্বের পাশাপাশি জোরপূর্বক শ্রম মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ১৯৩০ সালের বাধ্যতামূলক শ্রম কনভেনশন শাস্তির হুমকিতে আদায় করা এবং স্বেচ্ছায় গ্রহণ না করা কাজের বিরুদ্ধে মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করে। এখানেও মূল ব্যবস্থায় অন্তর্বর্তী বিধান ও নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম ছিল। পরে ১৯৫৭ সালের কনভেনশন রাজনৈতিক দমন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শ্রম সংগঠিত করা, শ্রমশৃঙ্খলা, ধর্মঘটের শাস্তি এবং বৈষম্যের হাতিয়ার হিসেবে বাধ্যতামূলক শ্রম ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিশেষ নিষেধাজ্ঞা আনে। শ্রমের স্বাধীনতা এভাবে স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক উদ্বেগ হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ রাষ্ট্র পরিচালিত বন্দিত্ব ও জোরপূর্বক শ্রমের ভয়াবহতা নতুন মাত্রায় প্রকাশ করে। যুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ মানুষের মর্যাদা ও অধিকারকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে আনার উদ্যোগ নেয়। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর গৃহীত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার চতুর্থ অনুচ্ছেদ দাসত্ব ও দাসবাণিজ্যকে সব রূপে নিষিদ্ধ করার নীতি ঘোষণা করে। এখানে স্বাধীনতাকে কোনো শাসকের অনুগ্রহ হিসেবে দেখা হয়নি। প্রত্যেক মানুষের অধিকার হিসেবে তা স্বীকৃতি পায়। তবে ঘোষণাটি নিজে কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি ছিল না; এর নীতিকে বাধ্যতামূলক দায়িত্বে রূপ দেওয়ার কাজ চলতে থাকে।
জাতিসংঘকে পুরোনো চুক্তির প্রশাসনিক ধারাবাহিকতাও রক্ষা করতে হয়। জাতিপুঞ্জ বিলুপ্ত হওয়ায় ১৯২৬ সালের দলিলে উল্লিখিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আর কার্যকর ছিল না। ১৯৫৩ সালের সংশোধনী প্রটোকল সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব জাতিসংঘের কাঠামোয় নিয়ে আসে। তথ্য ও আইনসংক্রান্ত যোগাযোগ গ্রহণের মতো কাজে জাতিসংঘের মহাসচিবের ভূমিকা স্থাপিত হয়। এটি নতুন করে দাসত্বের সংজ্ঞা তৈরির পরিবর্তে আগের ব্যবস্থাকে নতুন প্রতিষ্ঠানের অধীনে সচল রাখার পদক্ষেপ ছিল। পাশাপাশি অনুসন্ধানে স্পষ্ট হচ্ছিল, শুধু প্রচলিত দাসমালিকানা নিয়ে কাজ করলে বহু ধরনের বন্দিত্ব বাদ পড়বে।
সেই ঘাটতি মোকাবিলায় ১৯৫৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দাসপ্রথা, দাসবাণিজ্য এবং দাসত্বসদৃশ প্রতিষ্ঠান ও প্রথা বিলোপের সম্পূরক কনভেনশন গৃহীত হয়। এর লক্ষ্য ছিল ১৯২৬ সালের দলিলকে বিস্তৃত করা। ঋণদাসত্ব, ভূমিদাসত্ব, নারীর স্বাধীন সম্মতি অস্বীকার করে তাঁকে হস্তান্তরের নির্দিষ্ট বিবাহপ্রথা এবং শোষণের উদ্দেশ্যে শিশু হস্তান্তরের মতো ব্যবস্থা এতে গুরুত্ব পায়। প্রতিটি সমস্যাকে একই নামে চিহ্নিত না করেও তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব তৈরি করা সম্ভব হলো। বিলোপের আলোচনা দৃশ্যমান শিকল থেকে সামাজিক সম্পর্কের গভীরে প্রবেশ করল।
ঋণদাসত্বের উদাহরণে এই পরিবর্তন সহজে বোঝা যায়। একজন মানুষ ঋণের বিনিময়ে নিজের বা পরিবারের শ্রম বন্ধক রাখতে পারেন। কিন্তু শ্রমের মূল্য ঋণ কমাতে ব্যবহার না হলে, অথবা কাজের সময় ও প্রকৃতি নির্ধারিত না থাকলে মুক্তির পথ অনির্দিষ্ট হয়ে যায়। একইভাবে জমির সঙ্গে আবদ্ধ মানুষ ইচ্ছেমতো নিজের অবস্থা বদলাতে না পারলে তাঁর স্বাধীনতা সীমিত থাকে। কাগজে কাউকে স্বাধীন বলা এবং বাস্তবে অধীনতা থেকে বেরিয়ে আসতে দেওয়া আলাদা বিষয়। সম্পূরক কনভেনশন এই ফাঁকগুলো মোকাবিলার ভাষা দেয়।
এরপর ১৯৬৬ সালে গৃহীত নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির অষ্টম অনুচ্ছেদ দাসত্ব, দাসবাণিজ্য ও দাসসুলভ অধীনতার নিষেধাজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত করে। বাধ্যতামূলক শ্রমের বিরুদ্ধেও বিধান রাখা হয়, যদিও নির্দিষ্ট ধরনের বৈধ কারাশ্রম, সামরিক সেবা ও জরুরি দায়িত্বের মতো ব্যতিক্রম আছে। ফলে সব বাধ্যতামূলক কাজকে দাসত্ব বলা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ ছিল পৃথক সমস্যাগুলোর আইনি বৈশিষ্ট্য ধরে সুরক্ষা তৈরি করা। মানবাধিকারের ঘোষণায় প্রকাশিত নীতি এভাবে চুক্তির পক্ষভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সুস্পষ্ট দায়িত্বের অংশ হয়।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড শক্তিশালী হলেও জাতীয় বিলোপের সময়সূচি এক ছিল না। সৌদি আরবে ১৯৬২ সালে এবং ওমানে ১৯৭০ সালে দাসপ্রথা বিলোপের সিদ্ধান্ত আসে। এসব পরিবর্তনের পেছনে আন্তর্জাতিক চাপের পাশাপাশি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনও কাজ করেছিল। তাই কোনো একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিকে সব দেশের মুক্তির সরাসরি কারণ বলা যায় না। চুক্তি দাবি তোলার ভিত্তি দিতে পারে, কিন্তু সেই দাবি বাস্তবায়নে জাতীয় আইন, প্রশাসন ও ক্ষমতার সম্পর্ক বদলাতে হয়।
মরিতানিয়ার ঘটনা বিলোপের ধাপগুলোর পার্থক্য বিশেষভাবে স্পষ্ট করে। দেশটি ১৯৮১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দাসত্ব বিলোপ করে; কিন্তু দাসত্বচর্চাকে নির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে শাস্তিযোগ্য করার আইন আসে ২০০৭ সালে। প্রথমটি বিংশ শতাব্দীর আইনগত বিলোপের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, দ্বিতীয়টি পরবর্তী সময়ের অপরাধদমনমূলক পদক্ষেপ। মালিকানার বৈধতা প্রত্যাহার, অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ এবং ভুক্তভোগীকে বাস্তবে মুক্ত করা একই কাজ নয়। আদালতে পৌঁছানোর সুযোগ, পরিচয়পত্র, জীবিকা ও অভিযোগকারীর নিরাপত্তা ছাড়া নিষেধাজ্ঞা দুর্বল থেকে যেতে পারে।
বিংশ শতাব্দীর অর্জন তাই গভীর: মানুষকে বৈধ সম্পত্তি হিসেবে দেখার ধারণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হারায়। কিন্তু কোনো চুক্তি স্বাক্ষর, সংসদীয় আইন বা সরকারি ঘোষণাকে বাস্তব দাসত্বের সর্বশেষ দিন বলা যায় না। আইন কার্যকর হয় যখন নির্যাতিত মানুষ বেরিয়ে আসতে পারেন, অপরাধী জবাবদিহির মুখে পড়েন এবং মুক্তির পর আবার অধীনতায় ফিরতে হয় না। প্রাচীন দাসবাজার থেকে জাতিসংঘের সম্মেলনকক্ষ পর্যন্ত এই দীর্ঘ ইতিহাসের কেন্দ্রে শেষ পর্যন্ত একই দাবি—কোনো মানুষের জীবন, শরীর ও ভবিষ্যৎ অন্যের মালিকানাধীন হতে পারে না।
ব্ল্যাক ডেথের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: শ্রমিকসংকট, কৃষকবিদ্রোহ ও সামন্ততন্ত্র
ব্ল্যাক ডেথে আতঙ্ক ও ধর্মীয় নিপীড়ন: ইহুদি গণহত্যা ও ফ্ল্যাজেল্যান্ট আন্দোলন
মধ্যযুগে ব্ল্যাক ডেথের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ: প্লেগ ডাক্তার থেকে কোয়ারেন্টাইন
নব্য-ব্যাবিলনীয় রাজবংশ: নেবুচাদনেজারের গৌরব ও সাম্রাজ্যের পতন
অ্যাসিরীয় রাজবংশ: দুর্ধর্ষ সামরিক সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতনের কারণ
ঝৌ রাজবংশ: চীনের দীর্ঘতম রাজবংশ ও ক্ষমতার নতুন ধারণার ইতিহাস