সেলিউসিড রাজবংশ: আলেকজান্ডারের উত্তরসূরিদের বিশাল সাম্রাজ্য কেন ভেঙেছিল?
সিরিজ: রাজবংশের উত্থান-পতন: ক্ষমতা, গৌরব ও পতনের ইতিহাস
ব্যাবিলন থেকে সিরিয়া—সেলিউসিড সাম্রাজ্যের বিস্তার ও ভাঙনের ইতিহাস।
আলেকজান্ডার খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সালে মারা যাওয়ার সময় একটি সুবিশাল সাম্রাজ্য রেখে যান, কিন্তু কার্যকর উত্তরাধিকারব্যবস্থা রেখে যেতে পারেননি। তাঁর সেনাপতিরা প্রথমে রাজপরিবারের নামে ক্ষমতা পরিচালনা করলেও শিগগিরই নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু করেন। সেই সংঘর্ষ থেকে জন্ম নেওয়া বৃহত্তম রাজ্যগুলোর একটি ছিল সেলিউসিড সাম্রাজ্য। সর্বোচ্চ বিস্তারের সময় এর কর্তৃত্ব ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চল থেকে ইরান ও মধ্য এশিয়ার অংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। অথচ শেষপর্যন্ত এটি সিরিয়ার ছোট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। সাম্রাজ্যটি এক যুদ্ধে ভেঙে পড়েনি; প্রায় আড়াই শতাব্দী ধরে অঞ্চল হারানো, পুনর্দখল ও গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠাতা প্রথম সেলিউকাস ছিলেন আলেকজান্ডারের সেনাপতিদের একজন। খ্রিস্টপূর্ব ৩২১ সালের ক্ষমতা পুনর্বণ্টনে তিনি ব্যাবিলনিয়ার শাসনভার পান। পরে প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্টিগোনাসের চাপে সরে যেতে হলেও খ্রিস্টপূর্ব ৩১২ সালে ব্যাবিলনে ফিরে আসেন। এই প্রত্যাবর্তন সেলিউসিড কালগণনার ভিত্তি হয়ে ওঠে। পরবর্তী যুদ্ধে তিনি ইরান ও পূর্বাঞ্চলে কর্তৃত্ব বিস্তার করেন এবং খ্রিস্টপূর্ব ৩০৫ সালের দিকে রাজোপাধি গ্রহণ করেন। তাঁর উত্থান দেখায়, আলেকজান্ডারের উত্তরাধিকার শুধু সেনাবাহিনী ভাগ করে নেওয়ার বিষয় ছিল না; স্থানীয় প্রশাসন, সম্পদ ও সামরিক আনুগত্য নতুন করে সংগঠিত করতে হয়েছিল।
পূর্বদিকে সেলিউকাসের মুখোমুখি হন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০৫–৩০৩ সালের সংঘর্ষের পর সমঝোতায় সেলিউকাস উত্তর-পশ্চিম দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড ছেড়ে দেন এবং পাঁচশ যুদ্ধহস্তী পান বলে প্রাচীন বিবরণে উল্লেখ আছে। সীমান্তের সুনির্দিষ্ট রেখা নিয়ে আলোচনা থাকলেও এই চুক্তি পূর্বাঞ্চলে স্থিতি আনে। খ্রিস্টপূর্ব ৩০১ সালের ইপসাসের যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর বিজয়ে তাঁর হস্তীবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এক প্রান্তে ভূখণ্ড ছেড়ে অন্য প্রান্তে শক্তি কেন্দ্রীভূত করা ছিল বাস্তববাদী সাম্রাজ্যিক সিদ্ধান্ত, নিছক পরাজয়ের স্বীকারোক্তি নয়।
সেলিউকাস ও তাঁর উত্তরসূরিরা নগর প্রতিষ্ঠা এবং পুনর্গঠনের মাধ্যমে শাসনের ভিত্তি শক্ত করেন। টাইগ্রিসতীরের সেলিউকিয়া এবং সিরিয়ার আন্তিয়ক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। গ্রিক-মাকেদোনীয় বসতি, নগরপ্রতিষ্ঠান ও সামরিক উপনিবেশ রাজশক্তিকে সহায়তা করত। তবে সাম্রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ গ্রিক ছিলেন না। ব্যাবিলনীয় মন্দির, ইরানি অভিজাত পরিবার এবং স্থানীয় প্রশাসনিক ঐতিহ্যও টিকে ছিল। গ্রিক ভাষা রাজদরবার ও নগরজীবনে গুরুত্বপূর্ণ হলেও অন্যান্য ভাষা বিলুপ্ত হয়নি। সেলিউসিড শাসন ছিল বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন সমঝোতার ওপর দাঁড়ানো এক বহুজাতিক রাজতন্ত্র।
এই বৈচিত্র্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল দূরত্বের সমস্যা। সিরিয়ায় যুদ্ধরত রাজা একই সময়ে ব্যাক্ট্রিয়ার পরিস্থিতি সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন না। গভর্নর, স্থানীয় রাজা ও সামরিক নেতাদের ওপর নির্ভরতা অপরিহার্য ছিল। রাজা শক্তিশালী থাকলে তাঁরা আনুগত্য বজায় রাখতেন; উত্তরাধিকারসংকট বা দূরবর্তী যুদ্ধে সুযোগ পেলে স্বাধীনতা বাড়াতেন। সাম্রাজ্যের কোনো একটি অংশের বিদ্রোহ দমন করতে গেলে অন্য প্রান্তে প্রতিদ্বন্দ্বী সুবিধা পেতে পারত। তবে শুধু বিশাল আয়তনকে পতনের কারণ বলা যথেষ্ট নয়—যোগাযোগ, রাজস্ব এবং নেতৃত্ব কার্যকর থাকলে এই ভূখণ্ড বহু দশক সফলভাবে পরিচালিত হয়েছিল।
পশ্চিমে মিশরের টলেমীয় রাজবংশের সঙ্গে সিরিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলত। ধারাবাহিক সিরীয় যুদ্ধ সামরিক ব্যয় বাড়ায় এবং রাজাকে পশ্চিম সীমান্তে ব্যস্ত রাখে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি পূর্বাঞ্চলে বড় পরিবর্তন ঘটে। ব্যাক্ট্রিয়ায় ডায়োডোটাসের নেতৃত্বে স্বাধীন গ্রিক রাজ্য গড়ে ওঠে। পার্থিয়ায়ও সেলিউসিড কর্তৃত্ব দুর্বল হয় এবং আরসাসীয় শক্তির উত্থান ঘটে। এসব পরিবর্তন একই মুহূর্তে সম্পূর্ণ হয়নি, কিন্তু পূর্বাঞ্চলের সম্পদ ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারানোর দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।
তৃতীয় অ্যান্টিওকাস এই ক্ষয় ঠেকিয়ে সাম্রাজ্য পুনর্গঠনের উল্লেখযোগ্য চেষ্টা করেন। খ্রিস্টপূর্ব ২২৩ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি বিদ্রোহ ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলা করেন। তাঁর দীর্ঘ পূর্ব অভিযান পার্থিয়া ও ব্যাক্ট্রিয়ার শাসকদের কাছ থেকে আনুগত্য বা সমঝোতা আদায় করে। তবে তা সর্বত্র পুরোনো প্রত্যক্ষ শাসন ফিরিয়ে আনার সমান ছিল না। পরে খ্রিস্টপূর্ব ২০০ সালের পানিয়নের যুদ্ধে টলেমীয়দের পরাজিত করে দক্ষিণ সিরিয়া ও যিহূদিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সাফল্য প্রমাণ করে, সেলিউসিড পতন অবধারিত বা একমুখী ছিল না; দক্ষ নেতৃত্বে সাম্রাজ্য আবার শক্তি ফিরে পেতে পারত।
কিন্তু এজিয়ান অঞ্চলে সম্প্রসারণ তাঁকে রোমের মুখোমুখি দাঁড় করায়। খ্রিস্টপূর্ব ১৯১ সালে থার্মোপিলাই এবং ১৯০ সালে ম্যাগনেশিয়ার যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন। খ্রিস্টপূর্ব ১৮৮ সালের আপামেয়ার চুক্তিতে টরাস পর্বতমালার পশ্চিম ও উত্তরের আনাতোলীয় ভূখণ্ড ছাড়তে হয়। বিপুল ক্ষতিপূরণ, নৌবাহিনীর ওপর বিধিনিষেধ এবং যুদ্ধহস্তী হস্তান্তরের শর্তও আরোপিত হয়। এতে রাজবংশ ধ্বংস হয়নি, কিন্তু পশ্চিমের আয়, মর্যাদা ও সামরিক স্বাধীনতা বড় আঘাত পায়। পরবর্তী রাজাদের অর্থসংগ্রহ ও পররাষ্ট্রনীতিতে এই পরাজয়ের প্রভাব দীর্ঘদিন ছিল।
চতুর্থ অ্যান্টিওকাসের সময় মিশরে সামরিক সাফল্য এলেও রোমান হস্তক্ষেপে তাঁকে সরে আসতে হয়। যিহূদিয়ায় একই সময়ে স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ধর্মীয় উত্তেজনা এবং রাজকীয় হস্তক্ষেপ মারাত্মক সংকট তৈরি করে। ইহুদি ধর্মাচরণের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও জেরুজালেমের মন্দিরসংক্রান্ত পদক্ষেপ মাকাবীয় বিদ্রোহের পটভূমি হয়। ঘটনাটিকে গোটা সাম্রাজ্যে একই ধরনের বাধ্যতামূলক গ্রিক সংস্কৃতি চাপানোর সরল নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। কিন্তু স্থানীয় বিরোধে অসংযত রাজকীয় হস্তক্ষেপ কীভাবে দীর্ঘ প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে, এই সংঘর্ষ তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
আরও ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে রাজপরিবারের গৃহযুদ্ধ। একাধিক শাখার দাবিদার, অপ্রাপ্তবয়স্ক রাজা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দরবারি গোষ্ঠী ক্ষমতার জন্য লড়তে থাকে। বিদেশি শক্তিগুলো সুবিধাজনক দাবিদারকে সমর্থন করে নিজেদের প্রভাব বাড়ায়। সেনাবাহিনী ও রাজস্ব তখন বাইরের শত্রুর পরিবর্তে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। এই সুযোগে পার্থিয়ার প্রথম মিথ্রিদাতেস ইরান ও মেসোপটেমিয়ায় কর্তৃত্ব বিস্তার করেন। খ্রিস্টপূর্ব ১৪১ সালের মধ্যে ব্যাবিলনিয়া পার্থীয় নিয়ন্ত্রণে আসে। উর্বর ভূমি, নগর ও বাণিজ্যকেন্দ্র হারানো সেলিউসিডদের পুনরুদ্ধারের সামর্থ্য গুরুতরভাবে কমিয়ে দেয়।
দ্বিতীয় দিমিত্রিয়াস পূর্বাঞ্চল ফেরত পাওয়ার অভিযানে খ্রিস্টপূর্ব ১৩৯/১৩৮ সালে পার্থীয়দের হাতে বন্দি হন। পরে সপ্তম অ্যান্টিওকাস কিছু সাফল্য পেলেও খ্রিস্টপূর্ব ১২৯ সালে পরাজিত ও নিহত হন। এরপর ইরান ও মেসোপটেমিয়ায় সেলিউসিড শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যায়। অবশিষ্ট সিরীয় রাজ্যে গৃহযুদ্ধ চলতে থাকে; নগর ও স্থানীয় শাসকদের স্বাধীনতা বাড়ে। আর্মেনিয়ার দ্বিতীয় তিগ্রানেসও সিরিয়ার বড় অংশ অধিকার করেন। ভূখণ্ড হারানো রাজকোষ দুর্বল করছিল, আর দুর্বল রাজকোষ হারানো ভূখণ্ড পুনর্দখল আরও কঠিন করে তুলছিল।
শেষপর্যন্ত খ্রিস্টপূর্ব ৬৪ সালে রোমান সেনাপতি পম্পেই অবশিষ্ট সেলিউসিড রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে সিরিয়াকে রোমান প্রদেশে পরিণত করেন। এই সমাপ্তির পেছনে কোনো একক জাতিগত বিরোধ বা দুর্বল রাজা যথেষ্ট ব্যাখ্যা নয়। রোমের সামরিক চাপ, পার্থীয় সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা এবং ধারাবাহিক রাজবংশীয় যুদ্ধ পরস্পরকে শক্তিশালী করেছিল। সেলিউসিডরা বহুদিন বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ড পরিচালনা করতে পেরেছিল; সংকট তৈরি হয় যখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সেই সম্পর্কগুলো আর ধরে রাখতে পারেনি। তাদের রাজত্ব শেষ হলেও প্রতিষ্ঠিত নগর, গ্রিক ও স্থানীয় সংস্কৃতির বিনিময় এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যায়।
বিশ্বজুড়ে দাসপ্রথা নিষিদ্ধকরণ: ১৯২৬ সালের কনভেনশন, জাতিসংঘ ও আইনগত বিলুপ্তি
আফ্রিকা ও এশিয়ায় দাসপ্রথার বিলুপ্তি: আরব বাণিজ্য, ভারত মহাসাগর ও ঔপনিবেশিক শাসন
লাতিন আমেরিকায় দাসপ্রথার বিলুপ্তি: কিউবার মুক্তি ও ব্রাজিলের ১৮৮৮ সালের আইন
ব্ল্যাক ডেথের সমাপ্তি ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব: প্লেগের প্রত্যাবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের বিকাশ
ব্ল্যাক ডেথের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: শ্রমিকসংকট, কৃষকবিদ্রোহ ও সামন্ততন্ত্র
ব্ল্যাক ডেথে আতঙ্ক ও ধর্মীয় নিপীড়ন: ইহুদি গণহত্যা ও ফ্ল্যাজেল্যান্ট আন্দোলন