পদার্থ ও প্রতিপদার্থের সংঘর্ষে কী ঘটে? বিনাশ ও শক্তির বিজ্ঞান
পদার্থ ও প্রতিপদার্থের মিলনে জন্ম নেয় বিকিরণ ও নতুন কণা।
প্রতিপদার্থ কী এবং সাধারণ পদার্থের সঙ্গে তার পার্থক্য কোথায়?
আপনার শরীর, ঘরের বাতাস কিংবা দূরের নক্ষত্র—সবই সাধারণ পদার্থ দিয়ে তৈরি। এই পদার্থের পরিচিত উপাদান ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন। এসব কণার প্রতিকণাও রয়েছে। প্রতিকণা দিয়ে গঠিত পদার্থকেই বলা হয় প্রতিপদার্থ।
ইলেকট্রনের প্রতিকণার নাম পজিট্রন। দুটির ভর সমান, কিন্তু ইলেকট্রনের বৈদ্যুতিক আধান ঋণাত্মক এবং পজিট্রনের আধান ধনাত্মক। একইভাবে প্রোটনের প্রতিকণা প্রতিপ্রোটনের আধান ঋণাত্মক। একটি প্রতিপ্রোটনের চারপাশে পজিট্রন আবদ্ধ থাকলে তৈরি হয় প্রতিহাইড্রোজেন পরমাণু।
বিপরীত আধানই অবশ্য সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। নিউট্রন ও প্রতিনিউট্রন উভয়ই বৈদ্যুতিকভাবে নিরপেক্ষ, কিন্তু তাদের অভ্যন্তরীণ কণা ও অন্যান্য কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য রয়েছে। আবার প্রতিপদার্থের ভর ঋণাত্মক নয়; প্রতিকণার ভর সংশ্লিষ্ট সাধারণ কণার মতোই ধনাত্মক।
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় বোঝা দরকার। যেকোনো সাধারণ কণার সঙ্গে যেকোনো প্রতিকণার দেখা হলেই দুটো সরাসরি নিশ্চিহ্ন হয় না। ইলেকট্রন ও পজিট্রন পরস্পরের প্রতিকণা; প্রোটন ও পজিট্রন তা নয়। কোন কণাগুলো মিলছে এবং কী ধরনের মিথস্ক্রিয়া ঘটছে, তার ওপর ফলাফল নির্ভর করে।
সংস্পর্শে এলে বিনাশ হয়, কিন্তু কিছুই শূন্যে হারায় না
পদার্থ ও প্রতিপদার্থের উপযুক্ত কণা পরস্পরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে নিজেদের আগের পরিচয় হারাতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় কণা–প্রতিকণার বিনাশ। নাম শুনে মনে হতে পারে, মহাবিশ্ব থেকে কিছু একেবারে উধাও হয়ে গেল। বাস্তবে শক্তি, ভরবেগ ও বৈদ্যুতিক আধানের সংরক্ষণনীতি বজায় থাকে।
কম গতিশক্তিসম্পন্ন একটি ইলেকট্রন ও পজিট্রনের বিনাশে সাধারণত দুটি গামা ফোটন তৈরি হয়। ফোটন হলো তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের শক্তিবাহী কণা। গামা ফোটনের শক্তি দৃশ্যমান আলোর ফোটনের তুলনায় অনেক বেশি।
কণা দুটি সম্মিলিতভাবে স্থির অবস্থায় থাকলে এই দুই ফোটন বিপরীত দিকে ছুটে যায়। এতে মোট ভরবেগের ভারসাম্য বজায় থাকে। প্রতিটি ফোটনের শক্তি প্রায় পাঁচশ এগারো কিলোইলেকট্রনভোল্ট। শুরুর কণাগুলোর গতিশক্তি থাকলে সেটিও চূড়ান্ত শক্তির হিসাবে যুক্ত হয়।
সব বিনাশে শুধু আলো তৈরি হয় না। প্রোটন ও প্রতিপ্রোটনের বিনাশে সাধারণত পাইয়নসহ বিভিন্ন কণা তৈরি হয়। এসবের কিছু পরে অন্য কণা ও বিকিরণে রূপান্তরিত হয়। তাই “পদার্থ ও প্রতিপদার্থ মিলে কেবল বিশুদ্ধ শক্তি হয়”—এই জনপ্রিয় ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ। শক্তি কোনো আলাদা পদার্থ নয়; উৎপন্ন কণা ও বিকিরণ সেই শক্তি বহন করে।
এত অল্প ভর থেকে এত বেশি শক্তি আসে কীভাবে?
এর উত্তর রয়েছে ভর ও শক্তির সম্পর্কের মধ্যে। সহজ ভাষায় সম্পর্কটি হলো:
শক্তি = ভর × আলোর বেগের বর্গ।
আলোর বেগ অত্যন্ত বেশি হওয়ায় সামান্য ভরের সমতুল্য শক্তিও বিশাল। তবে হিসাব করার সময় শুধু প্রতিপদার্থের ভর ধরলে ভুল হবে। যে সাধারণ পদার্থ তার সঙ্গে বিনাশ হচ্ছে, সেটির ভরও যোগ করতে হবে।
ধরা যাক, এক মিলিগ্রাম প্রতিপদার্থ সমপরিমাণ সাধারণ পদার্থের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিনাশ হলো। মোট ভর দাঁড়াবে দুই মিলিগ্রাম। এই ভরের সমতুল্য শক্তি প্রায় আঠারো হাজার কোটি জুল।
এটি একটি আদর্শ তাত্ত্বিক হিসাব। পরীক্ষাগারে এত পরিমাণ প্রতিপদার্থ সহজে তৈরি বা জমিয়ে রাখা যায়—এমন অর্থ এতে নেই। আবার উৎপন্ন সমস্ত শক্তি বিদ্যুৎ বা অন্য ব্যবহারযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর করা যাবে, সেটিও ধরে নেওয়া যায় না।
বিক্রিয়ার ধরন অনুযায়ী কিছু শক্তি অত্যন্ত ভেদক্ষম বিকিরণ বা নিউট্রিনোর মতো কণায় চলে যেতে পারে। এসব শক্তি ধরে ব্যবহার করা কঠিন। উৎপন্ন নতুন কণাগুলোর নিজস্ব ভরও থাকতে পারে।
এটি সীমাহীনভাবে ছড়িয়ে পড়া কোনো জাদুকরি প্রক্রিয়াও নয়। যতটুকু প্রতিপদার্থ আছে, ততটুকুর উপযুক্ত সাধারণ পদার্থই বিনাশে অংশ নিতে পারে। প্রতিপদার্থ ফুরিয়ে গেলে আশপাশের সাধারণ পদার্থের মধ্যে সেই বিনাশ চলতে থাকে না।
প্রতিপদার্থ রাখা এত কঠিন কেন?
একটি সাধারণ বোতলে প্রতিপদার্থ রাখা যাবে না। বোতলের দেয়াল সাধারণ পদার্থ দিয়ে তৈরি; প্রতিপদার্থ সেখানে পৌঁছালে বিনাশের সুযোগ তৈরি হবে। বাতাসের অণুর সঙ্গেও একই সমস্যা হতে পারে।
তাই পরীক্ষাগারে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার শূন্যতা তৈরি করা হয়। এতে অবশিষ্ট গ্যাসের কণার সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের সম্ভাবনা কমে। আধানযুক্ত প্রতিকণাকে বৈদ্যুতিক ও চৌম্বক ক্ষেত্রের সাহায্যে নির্দিষ্ট অঞ্চলে আটকে রাখা যায়।
নিরপেক্ষ প্রতিপরমাণু আটকানো আরও জটিল। প্রতিহাইড্রোজেনের মোট বৈদ্যুতিক আধান নেই। ফলে আধানযুক্ত কণার মতো একই উপায়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বিশেষ চৌম্বকীয় ফাঁদ এবং খুব কম গতিশক্তির প্রতিপরমাণু প্রয়োজন হয়।
প্রতিপদার্থ মানেই এমন কোনো বস্তু নয়, যা নিজে নিজেই মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়। পর্যাপ্ত বিচ্ছিন্নতা ও উপযুক্ত পরিবেশে স্থিতিশীল প্রতিকণা ধরে রেখে পরীক্ষা করা সম্ভব। সমস্যা হলো সাধারণ পদার্থের সংস্পর্শ ঠেকানো এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা সচল রাখা।
উৎপাদনও অত্যন্ত কঠিন। উচ্চশক্তির কণা সংঘর্ষে প্রতিকণা তৈরি হলেও সেগুলো সংগ্রহ, ধীর করা এবং আটকে রাখার প্রতিটি ধাপেই বড় প্রযুক্তিগত বাধা রয়েছে। গবেষণাগারের সাফল্য তাই অতি ক্ষুদ্র পরিমাণ কণা নিয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণের সাফল্য।
চিকিৎসায় এই বিনাশের বাস্তব ব্যবহার রয়েছে
প্রতিপদার্থ শুধু কল্পবিজ্ঞানের মহাকাশযানের জ্বালানি নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পজিট্রন নিঃসরণভিত্তিক দেহচিত্রায়ণে কণা–প্রতিকণার বিনাশ ব্যবহার করা হয়।
এই পরীক্ষায় রোগীকে অল্প পরিমাণ বিশেষ তেজস্ক্রিয় অনুসন্ধানী পদার্থ দেওয়া হয়। তার কিছু পরমাণুর ক্ষয় থেকে পজিট্রন বের হয়। শরীরের ভেতরে সেই পজিট্রন শক্তি হারিয়ে কাছাকাছি কোনো ইলেকট্রনের সঙ্গে বিনাশে অংশ নিতে পারে।
এর ফলে উৎপন্ন দুটি গামা ফোটন প্রায় বিপরীত দিকে চলে যায়। রোগীর চারপাশে থাকা শনাক্তকারী যন্ত্র কাছাকাছি সময়ে আসা এই ফোটনজোড়া শনাক্ত করে। বহু ঘটনার তথ্য একত্র করে অনুসন্ধানী পদার্থটি শরীরের কোথায় জমেছে, তার চিত্র তৈরি করা হয়।
এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট টিস্যুর বিপাকীয় কার্যকলাপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ব্যবহৃত অনুসন্ধানী পদার্থ অনুযায়ী ক্যানসার, হৃদ্যন্ত্র কিংবা মস্তিষ্কের কার্যক্রম মূল্যায়নে পরীক্ষা কাজে আসে।
এখানে শরীরে বড় কোনো প্রতিপদার্থের বস্তু প্রবেশ করানো হয় না। নিয়ন্ত্রিত তেজস্ক্রিয় ক্ষয় থেকে অতি ক্ষুদ্র পর্যায়ে উৎপন্ন পজিট্রনের বিনাশকে তথ্য সংগ্রহের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ভবিষ্যতের জ্বালানি এবং মহাবিশ্বের অমীমাংসিত প্রশ্ন
প্রতিপদার্থের শক্তিঘনত্ব আকর্ষণীয় হলেও বর্তমানে এটি ব্যবহারিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি নয়। প্রতিপদার্থ তৈরি করতে যে শক্তি ব্যয় হয়, বিনাশ থেকে তার চেয়ে বেশি শক্তি ফেরত পাওয়া যায় না। বাস্তব উৎপাদন ও সংরক্ষণে বিপুল অপচয়ও ঘটে।
তাই কৃত্রিমভাবে তৈরি প্রতিপদার্থকে শক্তির প্রাথমিক উৎস ভাবার চেয়ে শক্তি সঞ্চয়ের সম্ভাব্য মাধ্যম হিসেবে বিচার করা বেশি যুক্তিসংগত। সেখানেও উৎপাদন খরচ, সংরক্ষণ এবং উচ্চশক্তির বিকিরণকে কাজে লাগানোর বাধা রয়ে গেছে।
অন্যদিকে, মহাবিশ্বে পদার্থের আধিক্য একটি গভীর ধাঁধা। আদি মহাবিশ্বে কণা ও প্রতিকণার সৃষ্টি ও বিনাশ ঘটলেও আজ আমাদের চারপাশে সাধারণ পদার্থই প্রাধান্য পায়। এই অসমতা ঠিক কীভাবে তৈরি হলো, তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
পদার্থ–প্রতিপদার্থের বিনাশ তাই শুধু শক্তি নিঃসরণের ঘটনা নয়। এটি দেখায়, পরিচিত কণা হারিয়ে গেলেও প্রকৃতির সংরক্ষণনীতি অক্ষুণ্ণ থাকে। আগের কণাগুলোর পরিবর্তে তৈরি হয় বিকিরণ ও নতুন কণা—আর তাদের মধ্যেই বহমান থাকে মোট শক্তির হিসাব।
টেলিস্কোপ কীভাবে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের বস্তু দেখে? আলোর যাত্রা ও প্রযুক্তির বিজ্ঞান
নিউরাল নেটওয়ার্ক কীভাবে শেখে? মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে মিল ও পার্থক্য
রোবট কি ব্যথা অনুভব করতে পারবে? কৃত্রিম স্পর্শ ও ইলেকট্রনিক ত্বকের বিজ্ঞান
ব্লুটুথ কীভাবে কাজ করে? তার ছাড়া দুটি যন্ত্রে তথ্য পাঠানোর বিজ্ঞান
কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট কী? আইনস্টাইনের ‘ভৌতিক’ আপত্তি ও বিজ্ঞানের উত্তর
ডেটা সেন্টারের ভেতরে কী থাকে? ইন্টারনেটের অদৃশ্য অবকাঠামোর পরিচয়