বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

টেলিস্কোপ কীভাবে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের বস্তু দেখে? আলোর যাত্রা ও প্রযুক্তির বিজ্ঞান

টেলিস্কোপ কীভাবে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের বস্তু দেখে? আলোর যাত্রা ও প্রযুক্তির বিজ্ঞান
দূরের ছায়াপথের আলো সংগ্রহ করে টেলিস্কোপ আমাদের মহাবিশ্বের অতীত দেখায়।

টেলিস্কোপ দূরে যায় না, দূরের আলো গ্রহণ করে

কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের ছায়াপথ দেখার কথা শুনলে মনে হতে পারে, টেলিস্কোপ যেন বিশাল দূরত্ব পেরিয়ে বস্তুটিকে কাছে টেনে আনে। বাস্তবে যন্ত্রটি নিজের অবস্থানেই থাকে। দূরের বস্তু থেকে বহু আগে নির্গত যে আলো এখন এখানে পৌঁছেছে, সেটি সংগ্রহ করেই পর্যবেক্ষণ তৈরি হয়।

খালি চোখেও আমরা দূরের নক্ষত্র দেখি, কারণ তাদের আলো আমাদের চোখে আসে। টেলিস্কোপ একই নীতিতে কাজ করে, তবে মানুষের চোখের তুলনায় অনেক বেশি আলো সংগ্রহ করতে পারে। সংবেদনশীল শনাক্তকারী দিয়ে এমন ক্ষীণ সংকেতও মাপে, যা চোখে বোঝা সম্ভব নয়।

আলোকবর্ষ সময় নয়, দূরত্ব

আলো এক বছরে যত দূর যায়, সেটিই এক আলোকবর্ষ—প্রায় নয় লক্ষ ছেচল্লিশ হাজার কোটি কিলোমিটার। শব্দটিতে বছর থাকলেও এটি দূরত্বের একক।

দূরের বস্তু দেখতে হলে তার আলো এখানে পৌঁছাতে হবে এবং শনাক্ত করার মতো যথেষ্ট সংকেত থাকতে হবে। শুধু দূরত্ব নয়, বস্তুটির উজ্জ্বলতা, পর্যবেক্ষণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং যন্ত্রের ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই তুলনামূলক দূরের উজ্জ্বল ছায়াপথ কখনো কাছের অত্যন্ত ম্লান বস্তুর চেয়ে সহজে শনাক্ত হতে পারে।

বড় আয়না কেন শুধু বড় করে দেখানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

টেলিস্কোপ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হলো, তার প্রধান কাজ সবকিছু বড় করে দেখানো। কিন্তু দূরের ছায়াপথ পর্যবেক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো আলো সংগ্রহের ক্ষমতা। দুর্বল সংকেত সংগ্রহ না হলে সেটিকে বড় করে দেখিয়েও নতুন তথ্য পাওয়া যাবে না।

বড় আয়না বেশি এলাকা থেকে আসা আলো একত্র করে। বৃষ্টির সময় বড় পাত্রে ছোট পাত্রের চেয়ে বেশি পানি জমার সঙ্গে এর তুলনা করা যায়। একই পরিস্থিতিতে গোল আয়নার ব্যাস দ্বিগুণ হলে তার ক্ষেত্রফল প্রায় চার গুণ হয়।

দূরের ছায়াপথের ক্ষীণ সংকেত

আলো ছড়িয়ে পড়ায় দূরের উৎস থেকে আমাদের কাছে কম আলো আসে। ছায়াপথে বিপুলসংখ্যক নক্ষত্র থাকলেও দূরত্বের কারণে সেটি ছবিতে ক্ষীণ দাগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

জেমস ওয়েবের প্রধান আয়নার বিস্তার প্রায় সাড়ে ছয় মিটার। একাধিক খণ্ড নির্ভুলভাবে একত্রে কাজ করে আলো সংগ্রহ করে। শুধু আকার বড় হলেই হয় না; আয়নার বিন্যাস, শনাক্তকারীর সংবেদনশীলতা এবং যন্ত্রের নিজস্ব অবাঞ্ছিত সংকেতও নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

বড় আয়না একই তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সূক্ষ্ম বিবরণ পৃথক করতেও সাহায্য করে। তবে আলো শনাক্ত করা এবং দুটি কাছাকাছি বস্তু আলাদা করে দেখা পৃথক সক্ষমতা।

দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ করলে অদৃশ্য বস্তু ফুটে ওঠে কীভাবে?

মানুষের চোখ অল্প সময়ের আলো ব্যবহার করে দৃশ্য বোঝে। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক শনাক্তকারী অনেক বেশি সময় ধরে আলোর সংকেত জমা করতে পারে। খুব ক্ষীণ উৎস থেকে প্রতি মুহূর্তে সামান্য আলো এলেও দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে মোট সংকেত বাড়ে।

এ কারণেই মহাকাশের গভীর দৃশ্য তৈরি করতে বহু আলাদা পর্যবেক্ষণ একত্র করা হয়। একটি মুহূর্তের সাধারণ ছবি আর দীর্ঘ সময়ের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এক নয়।

সংকেতকে গোলমাল থেকে আলাদা করা

শনাক্তকারীর নিজস্ব বৈদ্যুতিক ওঠানামা, পটভূমির আলো এবং মহাজাগতিক কণার প্রভাব ছবিতে অবাঞ্ছিত চিহ্ন তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞানীরা পরিমাপ ও সংশোধনের মাধ্যমে এগুলো চিহ্নিত করেন।

জেমস ওয়েবের প্রথম প্রকাশিত গভীর ক্ষেত্রের ছবিতে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে মোট সাড়ে বারো ঘণ্টার তথ্য ব্যবহৃত হয়েছিল। এতে আকাশের ক্ষুদ্র অংশে হাজারো ছায়াপথ ফুটে ওঠে।

দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ মানে সব বিবরণ সীমাহীনভাবে পরিষ্কার হবে না। যন্ত্রের বিভেদনক্ষমতা, পটভূমি এবং পদ্ধতিগত ত্রুটির সীমা থাকে। তবে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষীণ উৎস শনাক্ত করার সম্ভাবনা বাড়ে।

প্রকাশিত রঙিন ছবিতে মানুষের অদৃশ্য তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে দৃশ্যমান রঙে প্রকাশ করা হয়। এটি পর্যবেক্ষণের তথ্য উপস্থাপন করে; দৃশ্যটি মানুষের চোখে ঠিক ওই রঙে দেখা যেত—এমন নয়।

অবলোহিত আলো কেন প্রাচীন ছায়াপথ দেখার চাবিকাঠি?

মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে। দূরের ছায়াপথের আলো দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের দিকে আসার পথে মহাশূন্যের প্রসারণের কারণে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাড়ে। এই ঘটনাকে মহাজাগতিক লালসরণ বলা হয়।

প্রাচীন নক্ষত্র থেকে নির্গত অতিবেগুনি বা দৃশ্যমান আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অবলোহিত অঞ্চলে চলে যেতে পারে। তাই শুধু দৃশ্যমান আলো ধরার যন্ত্রে অনেক প্রাচীন ছায়াপথের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত ধরা পড়বে না।

যে আলো আসে, সেই আলো ধরতে হয়

জেমস ওয়েবকে মূলত অবলোহিত পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর আয়না ও যন্ত্র সেই তরঙ্গদৈর্ঘ্যে কার্যকর। অবলোহিত পর্যবেক্ষণ কিছু ধুলোময় অঞ্চলের ভেতরের উৎস দেখতেও সহায়তা করে।

কিন্তু উষ্ণ বস্তু নিজেরাও অবলোহিত বিকিরণ করে। টেলিস্কোপ বেশি গরম থাকলে তার নিজের বিকিরণ দূরের ক্ষীণ সংকেতের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। তাই তাপ নিয়ন্ত্রণ ও সূর্যঢাল গুরুত্বপূর্ণ।

মহাকাশে অবস্থানের আরেক সুবিধা হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাধা ও অস্থিরতা এড়ানো। তবে পৃথিবীর বড় টেলিস্কোপও উপযুক্ত প্রযুক্তি ও পর্যবেক্ষণস্থল ব্যবহার করে অসাধারণ কাজ করে। সব পর্যবেক্ষণে মহাকাশযন্ত্রই শ্রেষ্ঠ—এমন নয়।

দূরের বস্তু দেখা মানে অতীত দেখা, কিন্তু দূরত্বের হিসাব জটিল

সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে প্রায় আট মিনিট লাগে। তাই আমরা সূর্যকে কিছুক্ষণ আগের অবস্থায় দেখি। একইভাবে দূরের ছায়াপথের আলো আমাদের তার বহু আগের চেহারা দেখায়।

অ্যান্ড্রোমিডা প্রায় পঁচিশ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। তার আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে প্রায় পঁচিশ লক্ষ বছর লাগে। আরও দূরের ছায়াপথ দেখে মহাবিশ্বের অনেক প্রাচীন সময় সম্পর্কে জানা যায়।

বর্তমান দূরত্ব ও আলোর যাত্রাসময় আলাদা

কাছাকাছি মহাজাগতিক দূরত্বে আলোকবর্ষ ও যাত্রাসময়ের সম্পর্ক সহজ মনে হয়। কিন্তু অত্যন্ত দূরের ছায়াপথের ক্ষেত্রে মহাবিশ্বের প্রসারণ ধরতে হয়।

কোনো ছায়াপথের আলো যদি প্রায় তেরোশ কোটি বছর ধরে যাত্রা করে থাকে, তার বর্তমান দূরত্বকে সরাসরি তেরোশ কোটি আলোকবর্ষ বলা সব সময় সঠিক নয়। আলো আসার সময় মহাশূন্য প্রসারিত হয়েছে, ফলে বর্তমান বিচ্ছেদ আরও বড় হতে পারে।

দূরত্ব নির্ধারণে বিজ্ঞানীরা লালসরণ, আলোর বর্ণালি এবং মহাবিশ্বের প্রসারণের মডেল ব্যবহার করেন। ছবিতে একটি বস্তু বেশি লাল দেখালেই তার দূরত্ব নিশ্চিত হয় না; ধুলা বা অন্য কারণও রঙ বদলাতে পারে।

এই কারণে সম্ভাব্য অত্যন্ত দূরের ছায়াপথ শনাক্ত করা এবং বিস্তারিত বর্ণালি দিয়ে তার পরিচয় নিশ্চিত করা পৃথক ধাপ।

মহাকর্ষের সাহায্য ও টেলিস্কোপের দেখার সীমা

বিশাল ছায়াপথগুচ্ছের ভর আশপাশের স্থান-কালের গঠন বদলে পেছনের উৎসের আলোর পথ বাঁকাতে পারে। এই মহাকর্ষীয় আলোকবাঁকন দূরের ছায়াপথকে উজ্জ্বল বা বড় করে দেখাতে পারে।

তবে ছবিটি বিকৃতও হয়। একটি ছায়াপথ লম্বা বক্রচাপ হিসেবে কিংবা একাধিক স্থানে দেখা দিতে পারে। তাই বিজ্ঞানীদের সামনের ভরের প্রভাব হিসাব করে পেছনের উৎসের বৈশিষ্ট্য বুঝতে হয়।

কোটি আলোকবর্ষ দূরে কী কী দেখা যায়?

দূরের ছায়াপথ শনাক্ত করতে পারা মানেই তার প্রতিটি নক্ষত্র, গ্রহ বা গ্রহের পৃষ্ঠ দেখা সম্ভব নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্মিলিত আলো থেকে ছায়াপথের গঠন ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষ মহাকর্ষীয় বর্ধনে কখনো পৃথক উজ্জ্বল নক্ষত্রও শনাক্ত হয়, কিন্তু সেটি সাধারণ ক্ষমতা নয়।

টেলিস্কোপ এমন তথ্য উদ্ধার করতে পারে না, যার আলো আমাদের কাছে আসেনি। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণও যন্ত্রের সব সীমা দূর করে না।

দূরবর্তী মহাবিশ্ব দেখার শক্তি আসে কয়েকটি ব্যবস্থার সমন্বয়ে: বড় আয়না, সংবেদনশীল শনাক্তকারী, উপযুক্ত তরঙ্গদৈর্ঘ্য, দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ এবং সতর্ক বিশ্লেষণ। এভাবেই এখানে পৌঁছানো ক্ষীণ আলো মহাবিশ্বের প্রাচীন ইতিহাসের তথ্য হয়ে ওঠে।