অতিরিক্ত সফট ড্রিংক পান করলে শরীরে কী ঘটে? চিনি, দাঁত ও যকৃতের ক্ষতি
মিষ্টি চুমুকের আড়ালে শরীরের ওপর বাড়তি চাপ।
গরমের দুপুরে, ভারী খাবারের পরে কিংবা আড্ডায় ঠান্ডা কোমল পানীয় পান করা অনেকের নিয়মিত অভ্যাস। কিন্তু তৃষ্ণা মেটানোর সঙ্গে শরীরে কতটা চিনি ঢুকছে, তা প্রায়ই খেয়াল করা হয় না। এখানে মূল আলোচনা চিনি মেশানো কোমল পানীয় নিয়ে। চিনিমুক্ত পানীয় এবং চিনি ছাড়া সাধারণ বুদ্বুদযুক্ত পানির প্রভাব এক নয়।
প্রচলিত কোমল পানীয়ে সাধারণত পানি, চিনি বা মিষ্টিকারক, দ্রবীভূত কার্বন ডাই-অক্সাইড, অম্লজাতীয় উপাদান, স্বাদ ও রং থাকে। কিছু পানীয়ে ক্যাফেইনও যোগ করা হয়। শরীরের ওপর প্রভাব বোঝার জন্য এই উপাদানগুলো আলাদা করে দেখা জরুরি। চিনি বাড়তি শক্তি সরবরাহ করে, অম্ল দাঁতের ক্ষতি করতে পারে এবং ক্যাফেইন ঘুম ও স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
বোতলের আকারের চেয়ে চিনির হিসাব গুরুত্বপূর্ণ
ধরা যাক, কোনো পানীয়ের প্রতি ১০০ মিলিলিটারে ১০ গ্রাম চিনি রয়েছে। তাহলে ২৫০ মিলিলিটারে ২৫ গ্রাম এবং আধা লিটারে ৫০ গ্রাম চিনি পাওয়া যাবে। আধা লিটারের সেই পানীয় শুধু চিনি থেকেই প্রায় ২০০ কিলোক্যালরি শক্তি দেবে। তবে সব পণ্যের পরিমাণ এক নয়; মোড়কের পুষ্টিতথ্য দেখেই হিসাব করতে হবে।
অতিরিক্ত বলতে সবার জন্য একই সংখ্যক বোতল বোঝায় না। পানীয়ের পরিমাণ, পানের ঘনত্ব, সারাদিনের অন্য খাবার এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্য মিলিয়ে ঝুঁকি নির্ধারিত হয়। মাঝেমধ্যে অল্প পান করার তুলনায় প্রতিদিন বড় বোতল শেষ করা অনেক বেশি উদ্বেগের।
রক্তের শর্করা ও ওজন কেন বাড়তে পারে?
মিষ্টি কোমল পানীয়ে সাধারণত আঁশ থাকে না এবং চিবিয়ে খাওয়ারও প্রয়োজন হয় না। ফলে অল্প সময়ে অনেক চিনি গ্রহণ করা সহজ। অন্ত্র থেকে শর্করা শোষিত হলে রক্তের গ্লুকোজ বাড়ে। অগ্ন্যাশয় তখন ইনসুলিন নিঃসরণ করে, যা গ্লুকোজকে কোষে ব্যবহার ও সংরক্ষণ করতে সাহায্য করে।
সুস্থ শরীর এই প্রক্রিয়া সামলাতে পারে। তবে ডায়াবেটিস বা রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা থাকলে একই পানীয়ের পর শর্করা বেশি বেড়ে যেতে পারে। আবার সবার ক্ষেত্রে পান করার পর অবধারিতভাবে শর্করা হঠাৎ নিচে নেমে যায়—এমন ধারণাও ঠিক নয়।
তরল শক্তি সহজে হিসাবের বাইরে থেকে যায়
একটি মিষ্টি পানীয় খাওয়ার পর মানুষ পরের খাবারে সমপরিমাণ শক্তি কমিয়ে খায় না। ফলে স্বাভাবিক ভাত, নাশতা ও রাতের খাবারের সঙ্গে পানীয়ের শক্তিও যোগ হয়। এই বাড়তি গ্রহণ দীর্ঘদিন চললে ওজন বাড়তে পারে, বিশেষ করে শরীরচর্চা কম হলে।
নিয়মিত চিনি মেশানো পানীয় পানের সঙ্গে দ্বিতীয় ধরনের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া যায়। ওজন বৃদ্ধি ও পেটের ভেতরে চর্বি জমা ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমাতে পারে। তবে একটি পানীয়ই ডায়াবেটিসের একমাত্র কারণ নয়; বংশগত বৈশিষ্ট্য, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, ঘুম ও চলাফেরাও গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে ওজন স্বাভাবিক থাকলেই প্রতিদিন প্রচুর কোমল পানীয় নিরাপদ—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। দাঁতের ক্ষতি কিংবা খাদ্যের পুষ্টিমান কমে যাওয়ার মতো সমস্যা ওজন না বাড়লেও ঘটতে পারে।
যকৃত ও বিপাকের ওপর কী প্রভাব পড়ে?
অনেক মিষ্টি কোমল পানীয়ে ব্যবহৃত চিনিতে গ্লুকোজের পাশাপাশি ফ্রুক্টোজ থাকে। সাধারণ খাবার চিনিও ভেঙে এই দুই ধরনের শর্করা তৈরি করে। ফ্রুক্টোজের বিপাকে যকৃত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বেশি পরিমাণে মিষ্টি পানীয় এবং মোট চাহিদার অতিরিক্ত শক্তি গ্রহণ যকৃতে চর্বি জমার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যখন একই ব্যক্তির পেটের মেদ, ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়া বা রক্তে চর্বির সমস্যা রয়েছে। যকৃতে চর্বি জমার রোগ শুরুতে প্রায়ই স্পষ্ট উপসর্গ সৃষ্টি করে না। তাই ব্যথা নেই বলে যকৃত সম্পূর্ণ সুস্থ ধরে নেওয়া যায় না।
গোটা ফল আর মিষ্টি পানীয় এক নয়
ফলে ফ্রুক্টোজ থাকলেও গোটা ফলের সঙ্গে আঁশ, পানি ও অন্যান্য পুষ্টি পাওয়া যায়। ফল চিবিয়ে খেতে হয় এবং তুলনামূলকভাবে তৃপ্তিও আসে। তাই ফ্রুক্টোজের কথা শুনে ফল বাদ দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। মূল সমস্যা হলো সহজে বেশি পরিমাণে গ্রহণযোগ্য মিষ্টি পানীয় এবং সামগ্রিক শক্তির অতিরিক্ততা।
অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের অভ্যাস রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়ার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে। পেটের মেদ, অস্বাভাবিক রক্তের চর্বি ও শর্করা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা একসঙ্গে থাকলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন জরুরি হয়। তবে কোমল পানীয় খেলেই অবধারিতভাবে যকৃত বা হৃদ্যন্ত্র নষ্ট হবে—এমন বক্তব্য বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়।
দাঁতের ক্ষয়, পেট ফাঁপা ও ঘুমের সমস্যা
কোমল পানীয় দাঁতের ক্ষতি করতে পারে দুটি আলাদা পথে। মুখের জীবাণু চিনি ব্যবহার করে অম্ল তৈরি করে, যা দাঁতে গর্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে সাহায্য করে। অন্যদিকে পানীয়ের নিজস্ব অম্ল দাঁতের শক্ত বাইরের আবরণ ক্ষয় করতে পারে। চিনিমুক্ত পানীয়েও অম্ল থাকলে এই দ্বিতীয় ঝুঁকি থাকে।
একবারে পান করার চেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অল্প অল্প চুমুক দেওয়া দাঁতের জন্য বিশেষ সমস্যাজনক। এতে দাঁত বারবার অম্লের সংস্পর্শে আসে এবং মুখের লালা পরিবেশ স্বাভাবিক করার পর্যাপ্ত বিরতি পায় না। ক্ষয় বাড়লে ঠান্ডা বা গরমে শিরশির, সংবেদনশীলতা ও দাঁতের চেহারায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
অম্লযুক্ত পানীয়ের পরে সাধারণ পানি দিয়ে মুখ কুলি করা ভালো। সঙ্গে সঙ্গে জোরে দাঁত ঘষে পরিষ্কার না করে কিছু সময় বিরতি দিন। নিয়মিত ফ্লোরাইডযুক্ত মাজন ব্যবহার এবং দাঁতে শিরশির বা ব্যথা হলে চিকিৎসা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
পানীয়ের দ্রবীভূত গ্যাস থেকে ঢেকুর ও পেট ফাঁপার অনুভূতি হতে পারে। কারও বুকজ্বালাও বাড়তে পারে, যদিও সবার ক্ষেত্রে একই প্রতিক্রিয়া হয় না। খাবারের পরে ঢেকুর ওঠা মানেই পানীয়টি হজম ভালো করেছে—এমন নয়।
ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় বেশি খেলে সংবেদনশীল ব্যক্তির অস্থিরতা, বুক ধড়ফড় বা ঘুমের সমস্যা হতে পারে। বিকেল ও রাতে পান করলে প্রভাব বেশি টের পাওয়া সম্ভব। চা, কফি এবং অন্য পানীয়ের ক্যাফেইনও মোট হিসাবের মধ্যে পড়ে।
চিনিমুক্ত পানীয় কতটা বিকল্প এবং অভ্যাস কমাবেন কীভাবে?
চিনিযুক্ত পানীয়ের বদলে চিনিমুক্ত পানীয় নিলে সেই পানীয় থেকে চিনি ও শক্তি গ্রহণ কমতে পারে। তবে সেটিকে যত খুশি পান করার অনুমতি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। অম্লতা ও ক্যাফেইনের সমস্যা থাকতে পারে, আর শুধু পানীয় বদলালেই দীর্ঘমেয়াদি ওজন নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হয় না।
দৈনিক মুক্ত চিনি মোট খাদ্যশক্তির দশ শতাংশের নিচে রাখা এবং সম্ভব হলে পাঁচ শতাংশের নিচে নামানো উপকারী। দৈনিক দুই হাজার কিলোক্যালরি গ্রহণকারী ব্যক্তির জন্য এই হিসাব যথাক্রমে প্রায় ৫০ ও ২৫ গ্রাম। এটি শুধু কোমল পানীয়ের চিনি নয়; মিষ্টি, চায়ের চিনি, মধু, শরবত ও ফলের রসের চিনিও হিসাবের অংশ।
অভ্যাস কমানোর শুরু হতে পারে তিন দিন কী পরিমাণ পান করছেন তা লিখে রাখার মাধ্যমে। এরপর বড় বোতলের বদলে ছোট পরিমাণ নিন, প্রতিদিনের বদলে পানের দিন কমান এবং খাবারের পাশে সাধারণ পানি রাখুন। ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ের অভ্যাস থাকলে ধীরে কমালে মাথাব্যথা বা ক্লান্তি তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
বিকল্প হিসেবে সাধারণ পানি, চিনি ছাড়া চা কিংবা চিনি না মেশানো পানীয় বেছে নিন। লেবুর পানিতে চিনি যোগ করলে সেটিও মিষ্টি পানীয় হয়ে যায়। ফলের রসের বদলে গোটা ফল বেশি উপযোগী। শিশুদের জন্য পানি ও বয়সোপযোগী পুষ্টিকর খাবারকে অগ্রাধিকার দিন।
অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অস্বাভাবিক ওজন পরিবর্তন কিংবা দীর্ঘস্থায়ী দাঁতের সংবেদনশীলতা হলে পরীক্ষা করানো দরকার। দৈনন্দিন তৃষ্ণা মেটানোর প্রধান পানীয় হিসেবে সাধারণ পানিকে বেছে নেওয়াই এই অভ্যাস বদলানোর সবচেয়ে কার্যকর শুরু।
অ্যাসিডিটি ও বুকজ্বালা কমাতে খাদ্যাভ্যাসে কী পরিবর্তন আনবেন?
প্রতিদিন স্ট্রেচিং করলে শরীরে কী পরিবর্তন হয়? উপকারিতা ও সঠিক পদ্ধতি
পেয়ারা কেন পুষ্টিগুণে এত সমৃদ্ধ? ভিটামিন, আঁশ ও উপকারিতার বিজ্ঞান
ঘুমের অভাব কীভাবে ক্ষুধা বাড়ায় এবং ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে?
নারীদের হাড় দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বেশি কেন? হাড় ক্ষয়ের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধ
গর্ভাবস্থায় কফি পান করা কতটা নিরাপদ? ক্যাফেইনের নিরাপদ মাত্রা ও শিশুর ঝুঁকি