স্বাস্থ্যকর ওজন কীভাবে নির্ধারণ করবেন? বিএমআই কতটা নির্ভরযোগ্য?
স্বাস্থ্যকর ওজন শুধু বিএমআইয়ের একটি সংখ্যা নয়
স্বাস্থ্যকর ওজন বলতে এমন কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বোঝায় না, যা একই উচ্চতার প্রত্যেক মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। একজন মানুষের ওজন তার উচ্চতা, বয়স, শরীরের গঠন, পেশির পরিমাণ, শরীরে চর্বির পরিমাণ ও বণ্টন এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করতে হয়। তাই শুধু ওজন মাপার যন্ত্রে দেখা সংখ্যার ভিত্তিতে কাউকে স্বাস্থ্যকর বা অস্বাস্থ্যকর ওজনের মানুষ বলা যথেষ্ট নয়।
উদাহরণ হিসেবে একই উচ্চতার দুজন মানুষের ওজন ৭৫ কিলোগ্রাম হতে পারে। প্রথম ব্যক্তির শরীরে পেশির পরিমাণ বেশি এবং কোমরের চারপাশে চর্বি কম। দ্বিতীয় ব্যক্তির পেশি তুলনামূলক কম কিন্তু পেটের ভেতর ও কোমরের চারপাশে চর্বি বেশি। ওজন সমান হলেও তাঁদের বিপাকীয় ও হৃদ্রোগজনিত ঝুঁকি এক নাও হতে পারে।
এ কারণেই স্বাস্থ্যকর ওজন নির্ধারণের সময় কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা ভালো—
- উচ্চতার তুলনায় শরীরের ওজন
- কোমরের পরিধি
- পেট ও কোমরের আশপাশে চর্বির পরিমাণ
- শরীরে পেশি ও চর্বির অনুপাত
- রক্তচাপ, রক্তের শর্করা ও রক্তের চর্বির অবস্থা
- দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা ও শারীরিক সক্ষমতা
- বয়স ও ব্যক্তির শারীরিক গঠন
অর্থাৎ স্বাস্থ্যকর ওজন আসলে একটি পরিসর এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যাবস্থার অংশ—কেবল একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়।
বিএমআই কী এবং কীভাবে হিসাব করা হয়?
বিএমআই বা দেহভর সূচক হলো উচ্চতার তুলনায় একজন মানুষের ওজন কতটা, তা বোঝানোর একটি সহজ হিসাব। এটি বের করতে কিলোগ্রামে শরীরের ওজনকে মিটারে উচ্চতার বর্গ দিয়ে ভাগ করা হয়।
হিসাবটি হলো:
বিএমআই = ওজন ÷ (উচ্চতা × উচ্চতা)
ধরা যাক, একজন মানুষের ওজন ৭০ কিলোগ্রাম এবং উচ্চতা ১.৭০ মিটার। তাঁর বিএমআই হবে—
৭০ ÷ (১.৭০ × ১.৭০) = প্রায় ২৪.২
প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে প্রচলিত আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাসে সাধারণত ১৮.৫-এর কম বিএমআইকে কম ওজন, ১৮.৫ থেকে ২৪.৯-কে স্বাভাবিক পরিসর, ২৫ থেকে ২৯.৯-কে অতিরিক্ত ওজন এবং ৩০ বা তার বেশি হলে স্থূলতার পরিসর হিসেবে ধরা হয়।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। বিএমআই মূলত একটি প্রাথমিক যাচাইয়ের পদ্ধতি; এটি নিজে কোনো রোগনির্ণয় নয়।
এ ছাড়া দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একই বিএমআইতেও পেটের ভেতরের চর্বি এবং বিপাকীয় রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। এ কারণে দক্ষিণ এশীয় মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নের সময় শুধু প্রচলিত বিএমআই সীমার ওপর নির্ভর না করে কোমরের পরিধি, রক্তচাপ, রক্তের শর্করা এবং অন্যান্য ঝুঁকিও বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের স্বাস্থ্যকর ওজনের একটি আনুমানিক পরিসর কীভাবে বের করবেন?
প্রচলিত ১৮.৫ থেকে ২৪.৯ বিএমআই ধরে উচ্চতার জন্য একটি আনুমানিক ওজনের পরিসর হিসাব করা যায়।
যেমন, উচ্চতা ১.৭০ মিটার হলে—
নিম্নসীমা = ১৮.৫ × ১.৭০ × ১.৭০ = প্রায় ৫৩.৫ কিলোগ্রাম
ঊর্ধ্বসীমা = ২৪.৯ × ১.৭০ × ১.৭০ = প্রায় ৭২ কিলোগ্রাম
অর্থাৎ এই উচ্চতার একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রচলিত বিএমআই অনুযায়ী ওজনের পরিসর আনুমানিক ৫৩.৫ থেকে ৭২ কিলোগ্রাম। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এই সীমার মধ্যে থাকা প্রত্যেক মানুষ সমানভাবে সুস্থ অথবা এর সামান্য বাইরে গেলেই অসুস্থ।
বিএমআই কতটা নির্ভরযোগ্য এবং কোথায় এর সীমাবদ্ধতা?
বিএমআই জনপ্রিয় হওয়ার প্রধান কারণ এটি অত্যন্ত সহজ। মাত্র দুটি তথ্য—উচ্চতা ও ওজন—থেকেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি সংখ্যা পাওয়া যায়। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার প্রবণতা পর্যবেক্ষণ এবং ব্যক্তির প্রাথমিক স্বাস্থ্যঝুঁকি যাচাইয়ে এটি বেশ কার্যকর।
কিন্তু একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির শরীর বিশ্লেষণ করতে গেলে এর গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
পেশি আর চর্বির পার্থক্য করতে পারে না
বিএমআইয়ের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এটি শরীরের ওজন কোথা থেকে এসেছে তা বলতে পারে না। পেশি, হাড়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, পানি ও চর্বি—সবকিছু মিলিয়েই শরীরের মোট ওজন।
একজন পেশিবহুল খেলোয়াড়ের ওজন বেশি হওয়ার কারণে তাঁর বিএমআই ২৫ বা এমনকি ৩০-এর কাছাকাছি হতে পারে। কিন্তু তাঁর শরীরে অতিরিক্ত চর্বি নাও থাকতে পারে। বিএমআই তাঁকে অতিরিক্ত ওজনের শ্রেণিতে ফেললেও সেটি তাঁর প্রকৃত শারীরিক অবস্থার পূর্ণ চিত্র দেবে না।
চর্বি কোথায় জমেছে তা বলে না
শরীরের সব চর্বির স্বাস্থ্যগত প্রভাব এক নয়। বিশেষ করে পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর চারপাশে জমা চর্বি বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
দুজন মানুষের বিএমআই ২৪ হতে পারে, কিন্তু একজনের কোমর সরু এবং অন্যজনের পেটের চারপাশে উল্লেখযোগ্য চর্বি থাকতে পারে। শুধু বিএমআই দেখলে এই পার্থক্য ধরা পড়বে না।
বয়সের সঙ্গে শরীরের পরিবর্তন ধরতে পারে না
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশির পরিমাণ কমতে এবং শরীরে চর্বির অনুপাত বাড়তে পারে। ফলে একজন বয়স্ক মানুষের বিএমআই স্বাভাবিক সীমায় থাকলেও তাঁর পেশি উল্লেখযোগ্যভাবে কম এবং চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
শিশু ও গর্ভাবস্থায় একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়
শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের নির্দিষ্ট বিএমআই সীমা সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। তাদের বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী বৃদ্ধি বিবেচনা করতে হয়। একইভাবে গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই শরীরের ওজন পরিবর্তিত হয়, তাই সাধারণ প্রাপ্তবয়স্কদের বিএমআই ব্যাখ্যা সেখানে যথেষ্ট নয়।
বিএমআইয়ের সঙ্গে কোমরের মাপ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কোমরের পরিধি শরীরের কেন্দ্রীয় অংশে জমা চর্বি সম্পর্কে একটি সহজ ধারণা দিতে পারে। বিশেষ করে পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমলে হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, দ্বিতীয় ধরনের ডায়াবেটিস এবং বিভিন্ন বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কোমর মাপার সময় সাধারণভাবে পাঁজরের নিচের অংশ এবং নিতম্বের ওপরের অংশের মাঝামাঝি স্থানে ফিতা রেখে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস ছাড়ার পর পরিমাপ নেওয়া হয়। ফিতা শরীরের চারপাশে সমান্তরাল থাকবে এবং ত্বকে চাপ দিয়ে বসানো উচিত নয়।
কোমরের মাপ ব্যাখ্যা করার সীমা জনগোষ্ঠী ও ব্যবহৃত স্বাস্থ্যনির্দেশিকা অনুযায়ী কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। দক্ষিণ এশীয়দের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম কোমরের পরিধিতেও বিপাকীয় ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই কোনো একটি সংখ্যা সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না করে ব্যক্তির সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনা করা উচিত।
আরেকটি সহজ ধারণা হলো কোমর ও উচ্চতার অনুপাত। ব্যবহারিকভাবে অনেক ক্ষেত্রে কোমরের পরিধি নিজের উচ্চতার অর্ধেকের নিচে রাখাকে একটি সহজ স্বাস্থ্যসংকেত হিসেবে দেখা হয়। তবে এটিও চূড়ান্ত রোগনির্ণয়ের পদ্ধতি নয়।
তাহলে নিজের স্বাস্থ্যকর ওজন কীভাবে নির্ধারণ করবেন?
সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো কোনো একটি সংখ্যাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না ধরে কয়েকটি সূচক একসঙ্গে দেখা।
প্রথমে নিজের বিএমআই হিসাব করুন। এটি আপনাকে উচ্চতার তুলনায় ওজন সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা দেবে। এরপর কোমরের পরিধি মাপুন। বিশেষ করে বিএমআই স্বাভাবিক হলেও কোমরের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি থাকলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
এরপর শরীরের গঠন বিবেচনা করুন। নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করেন বা খেলাধুলার কারণে পেশি বেশি হলে শুধু বিএমআই আপনার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর হতে পারে। বিপরীতভাবে বিএমআই স্বাভাবিক হলেও পেশি খুব কম এবং পেটের চর্বি বেশি হলে শুধু “স্বাভাবিক বিএমআই” দেখে নিশ্চিন্ত হওয়া ঠিক নয়।
রক্তচাপ, রক্তের শর্করা, রক্তের চর্বি, ঘুম, শারীরিক সক্রিয়তা, খাদ্যাভ্যাস এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওজন নিয়ন্ত্রণের মূল উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা অর্জন করা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে রোগের ঝুঁকি কমানো এবং সুস্থ শরীর বজায় রাখা।
ওজনও একদিনের পরিমাপ দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। শরীরে পানি, খাবার, লবণ গ্রহণ এবং অন্যান্য স্বাভাবিক কারণে দৈনিক ওজন কিছুটা ওঠানামা করতে পারে। তাই একই ধরনের পরিস্থিতিতে নিয়মিত পরিমাপ করে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের প্রবণতা দেখা বেশি অর্থবহ।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, বিএমআই একটি কার্যকর সূচনাবিন্দু, কিন্তু স্বাস্থ্যকর ওজনের চূড়ান্ত সংজ্ঞা নয়। বিএমআইয়ের সঙ্গে কোমরের পরিধি, শরীরের গঠন, বিপাকীয় স্বাস্থ্য, বয়স এবং জীবনযাত্রা মিলিয়ে দেখলেই একজন মানুষের ওজন সম্পর্কে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ধারণা পাওয়া যায়। হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে ওজন বাড়া বা কমা, দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে শুধু বিএমআইয়ের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের মূল্যায়ন নেওয়াই উপযুক্ত।
দ্রুত খাওয়ার অভ্যাস কীভাবে ওজন বাড়াতে পারে? ক্ষুধা, হরমোন ও অতিরিক্ত খাওয়ার বিজ্ঞান
খালি পেটে পানি পান নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো কতটা সত্য? বিজ্ঞান কী বলে
কোলেস্টেরল কী? ভালো ও খারাপ কোলেস্টেরলের পার্থক্য, ঝুঁকি ও নিয়ন্ত্রণের উপায়
ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার বন্ধ করা কেন জরুরি? ঘুম, মস্তিষ্ক ও শরীরের ওপর প্রভাব
নিয়মিত যোগব্যায়াম শরীর ও মনের কী কী উপকার করে?
পিরিয়ডের সময় পেটব্যথা কেন হয়? কারণ, স্বস্তির উপায় ও কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন