বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ব্রেক্সিট গণভোট ২০১৬: ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রশ্নে বিভক্ত যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

  • August 12, 2026
ব্রেক্সিট গণভোট ২০১৬: ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রশ্নে বিভক্ত যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
ব্রেক্সিট গণভোট ২০১৬

২০১৬ সালের ২৩ জুন যুক্তরাজ্যের মানুষ এমন একটি সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়েছিল, যার প্রভাব শুধু তাদের দেশের রাজনীতি বা অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে ছিল অত্যন্ত সরল—যুক্তরাজ্য কি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য থাকবে, নাকি এই জোট থেকে বেরিয়ে যাবে? কিন্তু ব্যালটপত্রের সেই ছোট প্রশ্নটির পেছনে জমা হয়েছিল কয়েক দশকের রাজনৈতিক অসন্তোষ, সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিতর্ক, অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ, অর্থনৈতিক স্বার্থ, জাতীয় পরিচয়ের সংকট এবং ব্রিটেনের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বিধা। শেষ পর্যন্ত ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে এবং ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ থাকার পক্ষে ভোট দেন। ব্যবধান খুব বড় ছিল না, কিন্তু এর রাজনৈতিক অভিঘাত ছিল বিপুল।

ব্রেক্সিটকে বুঝতে হলে ২০১৬ সালের প্রচারণার অনেক আগে ফিরে যেতে হয়। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইউরোপীয় একীকরণের সম্পর্ক শুরু থেকেই কিছুটা অস্বস্তিকর ছিল। দেশটি ১৯৭৩ সালে তৎকালীন ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ে যোগ দেয় এবং ১৯৭৫ সালের গণভোটে অধিকাংশ ভোটার সদস্যপদ বজায় রাখার পক্ষে মত দেন। কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকে ইউরোপীয় সহযোগিতা আরও গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ রাজনীতির একটি অংশের মধ্যে আশঙ্কা বাড়তে থাকে যে, দেশের আইন, সীমান্ত ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

যুক্তরাজ্য অবশ্য ইউরোপীয় একীকরণের সব প্রকল্পে পুরোপুরি অংশ নেয়নি। দেশটি ইউরো মুদ্রা গ্রহণ করেনি এবং সীমান্তমুক্ত শেঙ্গেন ব্যবস্থারও সদস্য হয়নি। তারপরও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন, অভিন্ন বাজার, শ্রমিকদের অবাধ চলাচল এবং বিভিন্ন যৌথ নীতির কারণে ব্রাসেলসের সঙ্গে লন্ডনের সম্পর্ক নিয়মিত রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে রক্ষণশীল রাজনীতির একটি শক্তিশালী অংশ ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্রিটিশ সংসদের সার্বভৌম ক্ষমতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখতে শুরু করে।

এই অসন্তোষকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাজ্য স্বাধীনতা দল। দলটির মূল বক্তব্য ছিল, যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে নিজের সীমান্ত, আইন ও অভিবাসন নীতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য সদস্যরাষ্ট্র থেকে যুক্তরাজ্যে মানুষের অবাধ চলাচল বিশেষভাবে বিতর্কিত হয়ে ওঠে। পূর্ব ইউরোপের নতুন সদস্যরাষ্ট্রগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজের জন্য যুক্তরাজ্যে আসার পর এই প্রশ্নটি আরও দৃশ্যমান রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের রক্ষণশীল দলের ভেতরেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে গভীর মতবিরোধ ছিল। দলের একটি অংশ সদস্যপদ বজায় রাখতে চাইলেও অন্য অংশ দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছেদের দাবি জানাচ্ছিল। একই সময়ে ইউরোপবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ফলে ক্যামেরনের ওপর চাপ বাড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, রক্ষণশীল দল ক্ষমতায় ফিরলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্তরাজ্যের সদস্যপদ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে রক্ষণশীল দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথ খুলে যায়। ক্যামেরন প্রথমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সদস্যপদের কিছু শর্ত পুনরায় আলোচনার চেষ্টা করেন। তিনি মনে করেছিলেন, কিছু বিশেষ সুবিধা ও সংস্কার আদায় করে তিনি ব্রিটিশ ভোটারদের বোঝাতে পারবেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে থেকেই যুক্তরাজ্যের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু সেই সমঝোতা ইউরোপবিরোধীদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

এরপর দেশ কার্যত দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষের প্রচারণা, যার প্রধান রাজনৈতিক মুখ ছিলেন ডেভিড ক্যামেরন। অন্যদিকে ত্যাগের পক্ষে প্রচারণায় সামনে চলে আসেন বরিস জনসন, মাইকেল গোভ এবং নাইজেল ফারাজের মতো নেতারা। বিশেষ করে বরিস জনসনের অবস্থান ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। লন্ডনের সাবেক মেয়র হিসেবে তিনি জনপ্রিয় ও পরিচিত মুখ ছিলেন এবং রক্ষণশীল দলের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবেও তাঁকে দেখা হতো। তাঁর ত্যাগপন্থী শিবিরে যোগ দেওয়া প্রচারণার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে।

থাকার পক্ষের মূল যুক্তি ছিল অর্থনীতি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিন্ন বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার ব্রিটিশ ব্যবসা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করলে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে, বিদেশি বিনিয়োগ কমতে পারে এবং আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে লন্ডনের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের প্রচারণার কেন্দ্রে ছিল বিচ্ছেদের অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার সতর্কবার্তা।

ত্যাগের পক্ষের যুক্তি ছিল ভিন্ন। তাদের প্রচারণায় সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দগুলোর একটি ছিল “নিয়ন্ত্রণ”। তাদের বক্তব্য ছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য থাকার কারণে যুক্তরাজ্য নিজের সীমান্ত, অভিবাসন, আইন এবং অর্থনৈতিক নীতির ওপর সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তাদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে পাঠানো অর্থ দেশের স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো এবং অন্যান্য জাতীয় খাতে ব্যবহার করা সম্ভব।

অভিবাসন প্রশ্নটি প্রচারণার সবচেয়ে আবেগপূর্ণ এবং বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে ওঠে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবাধ চলাচলের নীতির কারণে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর নাগরিকেরা যুক্তরাজ্যে এসে কাজ ও বসবাস করতে পারতেন। ত্যাগপন্থীদের একটি বড় অংশ যুক্তি দেয় যে দ্রুত অভিবাসনের ফলে আবাসন, বিদ্যালয়, চিকিৎসাসেবা ও স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং কম মজুরির শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। অন্যদিকে থাকার পক্ষের মানুষরা যুক্তি দেন যে অভিবাসীরা ব্রিটিশ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন, কর দিচ্ছেন এবং স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, কৃষি ও আতিথেয়তাসহ বহু খাতে শ্রমের ঘাটতি পূরণ করছেন।

এই বিতর্কের আরেকটি স্তর ছিল জাতীয় সার্বভৌমত্ব। ত্যাগপন্থীরা বারবার প্রশ্ন তুলেছিলেন—ব্রিটিশ জনগণের নির্বাচিত সংসদই কি দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান হবে, নাকি ইউরোপীয় কাঠামোর সিদ্ধান্তের অধীন থাকতে হবে? এই বক্তব্য বিশেষভাবে সেই ভোটারদের আকৃষ্ট করে, যারা মনে করতেন বিশ্বায়ন ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কারণে জাতীয় সরকারের ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

তবে ব্রেক্সিটের বিভাজন শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল ভৌগোলিক, প্রজন্মগত এবং সামাজিক বিভাজনও। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের অধিকাংশ এলাকায় ত্যাগের পক্ষে শক্তিশালী সমর্থন দেখা যায়। বিপরীতে স্কটল্যান্ডের সব স্থানীয় গণনা এলাকায় থাকার পক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডেও সামগ্রিকভাবে থাকার পক্ষ এগিয়ে ছিল। লন্ডনও দৃঢ়ভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ভোট দেয়।

বয়সভিত্তিক বিভাজনও ছিল লক্ষণীয়। তরুণ ভোটারদের মধ্যে থাকার পক্ষে সমর্থন তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল, আর বয়স্কদের মধ্যে ত্যাগের পক্ষে সমর্থন বেশি দেখা যায়। উচ্চশিক্ষিত ও বড় শহরে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে সমর্থন শক্তিশালী ছিল। বিপরীতে শিল্পহ্রাসে ক্ষতিগ্রস্ত বহু শহর, ছোট নগর ও তুলনামূলকভাবে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকায় ত্যাগের পক্ষে ভোট বেশি পড়ে।

এই ব্যবধান ব্রেক্সিটকে শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ নিয়ে ভোট হিসেবে না দেখে ব্রিটিশ সমাজের গভীরে জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখার সুযোগ দেয়। শিল্পকারখানা হারানো অঞ্চল, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা, লন্ডনকেন্দ্রিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিশ্বাস—এসব বিষয় অনেক ভোটারের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছিল। কারও কাছে ব্রেক্সিট ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ভোট; আবার কারও কাছে এটি ছিল ব্রিটিশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

প্রচারণার ভাষাও ক্রমে তীব্র হয়ে ওঠে। উভয় পক্ষই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শক্তিশালী দাবি ও সতর্কবার্তা দিতে থাকে। থাকার পক্ষকে সমালোচকেরা অতিরিক্ত ভয় দেখানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। অন্যদিকে ত্যাগপন্থীদের কিছু বহুল প্রচারিত দাবির যথার্থতা নিয়েও বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্তরাজ্যের আর্থিক অবদান এবং সেই অর্থ জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহার করার সম্ভাবনা নিয়ে প্রচারণার একটি বহুল আলোচিত বার্তা পরবর্তী সময়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।

গণভোটের প্রচারণার শেষ পর্যায়ে একটি মর্মান্তিক ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দেয়। ২০১৬ সালের ১৬ জুন লেবার পার্টির সংসদ সদস্য জো কক্সকে হত্যা করা হয়। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। তাঁর হত্যার পর সাময়িকভাবে গণভোটের প্রচারণা স্থগিত করা হয়। ঘটনাটি রাজনৈতিক ভাষা, ঘৃণা এবং সমাজের ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

অবশেষে ২৩ জুন ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭২ দশমিক ২ শতাংশ, যা যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফলাফল আসতে শুরু করলে প্রথমদিকে অনেকে ধারণা করেছিলেন থাকার পক্ষ হয়তো জয়ী হবে। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকা থেকে ত্যাগের পক্ষে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভোট আসতে থাকে। ফলাফলের প্রবণতা স্পষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায়, রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বড় পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে।

চূড়ান্ত ফলাফলে প্রায় এক কোটি চুয়াত্তর লাখ মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে এবং প্রায় এক কোটি ষোল লাখ মানুষ থাকার পক্ষে ভোট দেন। ব্যবধান ছিল প্রায় বারো লাখের কিছু বেশি ভোট। শতাংশের হিসাবে পার্থক্য মাত্র কয়েক দফা হলেও সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অর্থে ফলাফল ছিল নির্ধারক—যুক্তরাজ্যের ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছে।

ফলাফল ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজনৈতিক ভূমিকম্প শুরু হয়। ডেভিড ক্যামেরন ঘোষণা করেন যে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন। তিনি নিজে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন দেশকে বিচ্ছেদের পথে নেতৃত্ব দেওয়া তাঁর পক্ষে যথাযথ হবে না। তাঁর পদত্যাগের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায় যে গণভোট শুধু ইউরোপীয় সম্পর্কই নয়, ব্রিটিশ সরকারের নেতৃত্বকেও বদলে দিয়েছে।

স্কটল্যান্ডে ফলাফল নতুন সাংবিধানিক প্রশ্ন সৃষ্টি করে। স্কটিশ ভোটারদের বড় সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক ফলাফলের কারণে তাদেরও বিচ্ছেদের পথে যেতে হচ্ছিল। ফলে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন গণভোটের সম্ভাবনা আবার আলোচনায় আসে। উত্তর আয়ারল্যান্ডেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছেদের ফলে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে সীমান্তের ভবিষ্যৎ একটি জটিল রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়।

ব্রেক্সিটের পর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি ছিল—ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করা বাস্তবে কীভাবে সম্ভব হবে? গণভোট জনগণের রাজনৈতিক নির্দেশনা দিয়েছিল, কিন্তু বিচ্ছেদের বিস্তারিত পদ্ধতি নির্ধারণ করেনি। অভিন্ন বাজারে প্রবেশাধিকার থাকবে কি না, শুল্কব্যবস্থা কী হবে, ইউরোপীয় নাগরিকদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে, ব্রিটিশ নাগরিকদের ইউরোপে অবস্থান কী হবে এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড সীমান্ত কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর ছিল না।

ক্যামেরনের পর থেরেসা মে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন এবং ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাঁর সরকারের ওপর পড়ে। ২০১৭ সালের মার্চে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তির ৫০ নম্বর অনুচ্ছেদ কার্যকর করে বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করে। কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছরে ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে ব্রিটিশ সংসদে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়, তা দেশটির আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় অধ্যায় হয়ে ওঠে।

থেরেসা মে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি বিচ্ছেদ চুক্তি তৈরি করলেও তা বারবার সংসদে প্রত্যাখ্যাত হয়। বিশেষ করে উত্তর আয়ারল্যান্ড সীমান্তের ব্যবস্থা নিয়ে প্রবল আপত্তি দেখা দেয়। একদিকে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক ও শুল্ক কাঠামো থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছিল, অন্যদিকে আয়ারল্যান্ড দ্বীপে কঠোর সীমান্ত ফিরিয়ে আনা শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছিল। এই দ্বন্দ্ব ব্রেক্সিট আলোচনার অন্যতম কঠিন সমস্যায় পরিণত হয়।

শেষ পর্যন্ত থেরেসা মে পদত্যাগ করেন এবং বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি নতুন রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচন এবং সংশোধিত চুক্তির মাধ্যমে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেন। ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ ত্যাগ করে। এরপর একটি অন্তর্বর্তী সময় চলে এবং ২০২০ সালের শেষ নাগাদ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্ক কার্যকর হওয়ার পথ তৈরি হয়।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করলেই ব্রেক্সিট বিতর্ক শেষ হয়ে যায়নি। বরং গণভোটের আগে যেসব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল—অর্থনীতি, বাণিজ্য, অভিবাসন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক পরিচয় এবং যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ—সেগুলো নতুন রূপে ফিরে আসে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নতুন শুল্ক ও প্রশাসনিক নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। ইউরোপের সঙ্গে শ্রমবাজারের সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়। উত্তর আয়ারল্যান্ডের বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দেয়।

ব্রেক্সিটের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কও অব্যাহত রয়েছে। সমর্থকেরা যুক্তি দেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে যুক্তরাজ্য স্বাধীনভাবে বাণিজ্যচুক্তি করতে, অভিবাসন নীতি নির্ধারণ করতে এবং নিজস্ব নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। সমালোচকেরা বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশাল অভিন্ন বাজারের সঙ্গে আগের মতো বাধাহীন সম্পর্ক না থাকায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ব্রেক্সিটের সাফল্য বা ব্যর্থতা মূল্যায়ন অনেকাংশে নির্ভর করে কোন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মানদণ্ড ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।

২০১৬ সালের গণভোট আধুনিক গণতন্ত্র সম্পর্কে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। অত্যন্ত জটিল সাংবিধানিক ও অর্থনৈতিক বিষয়কে কি একটি দ্বিমুখী গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত? ভোটাররা ত্যাগের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, কিন্তু ঠিক কোন ধরনের ব্রেক্সিট তাঁরা চেয়েছিলেন তা ব্যালটপত্রে নির্ধারিত ছিল না। কেউ সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ চেয়েছিলেন, কেউ ইউরোপীয় বাজারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে রাজনৈতিক স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, আবার কেউ মূলত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। একই “ত্যাগ” ভোটের মধ্যে তাই ভিন্ন ভিন্ন প্রত্যাশা লুকিয়ে ছিল।

আরও গভীরভাবে দেখলে ব্রেক্সিট ছিল পরিচয়ের প্রশ্ন। একজন মানুষ নিজেকে কতটা ব্রিটিশ, ইংরেজ, স্কটিশ, ওয়েলশ, উত্তর আইরিশ বা ইউরোপীয় মনে করেন—এই পরিচয়ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্বায়নের সুবিধাভোগী মহানগর এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর অভিজ্ঞতার পার্থক্যও ভোটে প্রতিফলিত হয়। ফলে ব্রেক্সিটকে শুধু একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর সামাজিক তাৎপর্যের বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০১৬ সালের ২৩ জুন যুক্তরাজ্য শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি; দেশটি নিজের পরিচয়, সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে একটি গভীর জাতীয় বিতর্কের রায় দিয়েছিল। কিন্তু সেই রায় বিভাজন দূর করেনি। বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছিল একই দেশের নাগরিকেরা নিজেদের ভবিষ্যৎকে কত ভিন্নভাবে কল্পনা করতে পারেন।

ব্রেক্সিট গণভোট তাই আধুনিক ব্রিটিশ ইতিহাসের একটি সন্ধিক্ষণ। একদিকে এটি ছিল গণতান্ত্রিক ভোটের মাধ্যমে নেওয়া একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত; অন্যদিকে এটি উন্মোচন করেছিল অঞ্চল, প্রজন্ম, শিক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থান ও জাতীয় পরিচয়ের গভীর ব্যবধান। বহু বছর ধরে চলা রাজনৈতিক সংঘাতের পর যুক্তরাজ্য শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়েছে, কিন্তু “ব্রেক্সিট” শব্দটির পেছনে যে বিভক্ত জাতির গল্প রয়েছে, সেটি ২০১৬ সালের একটি ভোটের ফলাফলের চেয়ে অনেক বড়। সেই গণভোট প্রমাণ করেছে যে একটি ব্যালট কখনো কখনো শুধু সরকার বা নীতি বদলায় না—এটি একটি দেশের নিজের সম্পর্কে ধারণাকেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।