শেনজেন ভিসা কী? একটি ভিসায় ইউরোপের কোন ২৯টি দেশে যাওয়া যায়?
একটি শেনজেন ভিসায় ২৯টি দেশে ভ্রমণের সুযোগ।
শেনজেন ভিসা হলো শেনজেন এলাকার দেশগুলোতে স্বল্প সময়ের জন্য ভ্রমণের অনুমতি। পর্যটন, পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা এবং সংক্ষিপ্ত ব্যবসায়িক সফরের মতো উদ্দেশ্যে এই ভিসা ব্যবহার করা হয়। সাধারণ শেনজেন ভিসা সাধারণত পুরো শেনজেন এলাকায় কার্যকর থাকে। ফলে একটি দেশের দেওয়া ভিসা নিয়ে, ভিসায় উল্লেখিত শর্ত মেনে, অন্য শেনজেন দেশেও যাওয়া যায়।
শেনজেন এলাকা আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক জিনিস নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশ শেনজেন এলাকার বাইরে রয়েছে। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়, এমন চারটি দেশ শেনজেন এলাকার অন্তর্ভুক্ত। এই পার্থক্য না জানার কারণে অনেক ভ্রমণকারী মনে করেন, শেনজেন ভিসা পেলেই ইউরোপের সব দেশে যাওয়া যাবে। বাস্তবে কোন দেশে যাওয়া যাবে, তা নির্ভর করে দেশটি শেনজেন এলাকার সদস্য কি না এবং ভিসাটির নিজস্ব শর্তের ওপর।
বর্তমানে শেনজেন এলাকায় ২৯টি দেশ রয়েছে। বুলগেরিয়া ও রোমানিয়া ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পূর্ণভাবে এই এলাকার অংশ হয়েছে। তাই পুরোনো তালিকায় দেশ দুটির অবস্থান দেখে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা ঠিক হবে না।
একটি শেনজেন ভিসায় কোন ২৯টি দেশে যাওয়া যায়?
শেনজেন এলাকার ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৫টি দেশ হলো:
অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, চেকিয়া, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, হাঙ্গেরি, ইতালি, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, স্পেন ও সুইডেন।
এর বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়, কিন্তু শেনজেনভুক্ত চারটি দেশ হলো আইসল্যান্ড, লিশটেনস্টাইন, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড।
উদাহরণ হিসেবে, আপনি যদি ফ্রান্স ও ইতালিতে যাওয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি সাধারণ শেনজেন ভিসা পান, তবে ভিসার মেয়াদ ও অনুমোদিত থাকার সময়ের মধ্যে স্পেন বা সুইজারল্যান্ডও ভ্রমণ করতে পারবেন। প্রতিটি শেনজেন দেশের জন্য আলাদা স্বল্পমেয়াদি ভিসা নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে ভিসার গায়ে যদি নির্দিষ্ট দেশের জন্য সীমিত কার্যকারিতার শর্ত লেখা থাকে, সে ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়মটি প্রযোজ্য হবে না। তাই ভিসা হাতে পাওয়ার পর সেটির কার্যকর এলাকা অবশ্যই দেখে নিতে হবে।
ইউরোপের কোন দেশগুলো শেনজেন ভিসার আওতায় নেই?
যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড ও সাইপ্রাস শেনজেন এলাকার সদস্য নয়। লন্ডন ভ্রমণের জন্য যুক্তরাজ্যের নিজস্ব প্রবেশবিধি মানতে হবে। আয়ারল্যান্ডও নিজস্ব ভিসা ও সীমান্তনীতি অনুসরণ করে। সাইপ্রাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হলেও এখনো শেনজেন এলাকার পূর্ণ সদস্য নয়; সেখানে প্রবেশের শর্ত আলাদাভাবে যাচাই করতে হয়। কোনো কোনো ভ্রমণকারীর ক্ষেত্রে বৈধ শেনজেন ভিসা থাকার ভিত্তিতে সাইপ্রাসে প্রবেশের বিশেষ সুবিধা থাকতে পারে, কিন্তু সেটিকে শেনজেন দেশের মতো স্বয়ংক্রিয় অধিকার ধরে নেওয়া যাবে না।
একইভাবে আলবেনিয়া, সার্বিয়া, মন্টেনেগ্রো, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা কিংবা তুরস্ক ইউরোপে অবস্থিত বা ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হলেও শেনজেন এলাকার অংশ নয়। এসব দেশের নিজস্ব প্রবেশবিধি আছে। কোনো দেশ নির্দিষ্ট ধরনের বৈধ শেনজেন ভিসাধারীকে প্রবেশের সুবিধা দিলেও সেই সুবিধার শর্ত দেশভেদে বদলে যেতে পারে। তাই শেনজেন দেশের বাইরে যাওয়ার আগে গন্তব্য দেশের নিয়ম যাচাই করা জরুরি।
ফ্রান্স বা নেদারল্যান্ডসের মতো সদস্যদেশের নাম দেখে তাদের সব দূরবর্তী দ্বীপ বা অঞ্চলকেও শেনজেন এলাকার অংশ মনে করা উচিত নয়। মূল ইউরোপীয় ভূখণ্ডের বাইরে কোনো অঞ্চলে গেলে সেখানকার আলাদা নিয়ম থাকতে পারে।
কত দিন থাকা যায় এবং কয়বার প্রবেশ করা যায়?
স্বল্পমেয়াদি শেনজেন ভ্রমণের সাধারণ সীমা হলো যেকোনো চলমান ১৮০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯০ দিন। এটি প্রতিটি দেশের জন্য আলাদা ৯০ দিন নয়; সব শেনজেন দেশে কাটানো দিন একসঙ্গে গণনা করা হয়। যেমন, ফ্রান্সে ২০ দিন, ইতালিতে ১৫ দিন এবং জার্মানিতে ১০ দিন থাকলে মোট ৪৫ দিন ব্যবহার হয়েছে।
ভিসার মেয়াদ এবং থাকার অনুমোদিত দিনের সংখ্যা একই বিষয় নয়। ভিসাটি কয়েক মাস কার্যকর থাকতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে থাকার অনুমতি কম দিনেরও হতে পারে। আবার ভিসা ৯০ দিন পর্যন্ত থাকার সুযোগ দিলেও আগের শেনজেন সফরে ব্যবহৃত দিনগুলো ১৮০ দিনের হিসাবের মধ্যে পড়তে পারে। তাই ভিসার কার্যকারিতার তারিখ ও থাকার অনুমোদিত সময় দুটোই পরীক্ষা করা দরকার।
একবার প্রবেশের ভিসা নিয়ে শেনজেন এলাকায় ঢুকে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে যাতায়াত করা যায়। কিন্তু পুরো এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে গেলে একই ভিসা দিয়ে সাধারণত আবার ঢোকা যায় না। যেমন, ফ্রান্স থেকে ইতালি যাওয়া শেনজেন এলাকার ভেতরের যাত্রা; কিন্তু ইতালি থেকে যুক্তরাজ্যে গিয়ে পুনরায় ফ্রান্সে ফিরতে চাইলে নতুন করে শেনজেন এলাকায় প্রবেশ করতে হবে। এমন পরিকল্পনায় একাধিকবার প্রবেশের অনুমতি আছে কি না, তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
শেনজেন দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সীমান্তে সাধারণত নিয়মিত সীমান্ত পরীক্ষা থাকে না। তবু দেশগুলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সাময়িক পরীক্ষা চালু করতে পারে। তাই দেশ থেকে দেশে যাওয়ার সময় পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় ভ্রমণনথি সঙ্গে রাখা উচিত।
একাধিক দেশ ভ্রমণের ভিসার আবেদন কোথায় করবেন?
দুই বা তার বেশি শেনজেন দেশে গেলে আবেদন করতে হবে প্রধান গন্তব্য দেশের সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা আবেদন গ্রহণকারী ব্যবস্থার মাধ্যমে। স্বল্পমেয়াদি পর্যটন সফরে সাধারণভাবে যে দেশে সবচেয়ে বেশি দিন থাকবেন, সেটিই প্রধান গন্তব্য। যেমন, ফ্রান্সে পাঁচ দিন ও ইতালিতে আট দিন থাকার পরিকল্পনা থাকলে ইতালির জন্য আবেদন করবেন। সব দেশে সমান সময় থাকলে প্রথম যে শেনজেন দেশে যাবেন, সেই দেশের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়।
শুধু কোনো দেশে প্রথম উড়োজাহাজ নামবে বলে সেখানেই আবেদন করতে হবে—এমন নিয়ম নেই। আবার যে দেশের ভিসার সময় পাওয়া সহজ মনে হচ্ছে, প্রকৃত সফর অন্য দেশে হলেও সেখানে আবেদন করাও ঠিক নয়। আবেদনপত্র, থাকার বুকিং, যাতায়াতের পরিকল্পনা ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যের মধ্যে মিল থাকা দরকার।
ভ্রমণের আগে ভিসায় লেখা কার্যকর থাকার তারিখ, অনুমোদিত দিন, প্রবেশের সংখ্যা ও কার্যকর এলাকা মিলিয়ে দেখুন। ভিসা পাওয়া মানেই সীমান্তে প্রবেশের নিশ্চয়তা নয়; সেখানে সফরের উদ্দেশ্য, থাকার ব্যবস্থা, খরচ চালানোর সামর্থ্য ও ফেরার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে একটি সাধারণ শেনজেন ভিসায় ২৯টি সদস্যদেশের মধ্যে ভ্রমণ অনেক সহজ হয়।
ভারত মালয়েশিয়া ভিসা, মালয়েশিয়া ভিসামুক্ত ভ্রমণ, ভারতীয় পর্যটক, ২০২৬ ভিসা নিয়ম
আমেরিকার ভিসা ইন্টারভিউতে কীভাবে উত্তর দেবেন? যেসব ভুল এড়ানো জরুরি
বাংলাদেশিদের জন্য নেপাল ভ্রমণে ভিসার নিয়ম: আগমনী ভিসা, বিনামূল্যের সুবিধা ও প্রবেশের শর্ত
বাংলাদেশ থেকে নিউজিল্যান্ড ট্যুরিস্ট ভিসা: আবেদন প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আর্থিক প্রস্তুতি
যুক্তরাজ্যের ভিজিটর ভিসা প্রত্যাখ্যান হওয়ার কারণ: পুনরায় আবেদন করার আগে কী করবেন?
বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের ওমরাহ ভিসা: আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া