বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ভারতের ২০১৬ সালের নোটবন্দি: মোদির আকস্মিক সিদ্ধান্তে অর্থনীতিতে কী ঘটেছিল?

ভারতের ২০১৬ সালের নোটবন্দি: মোদির আকস্মিক সিদ্ধান্তে অর্থনীতিতে কী ঘটেছিল?
এক ঘোষণায় বদলে গেল নগদ লেনদেন

২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জাতির উদ্দেশে ভাষণে ঘোষণা করেন, প্রচলিত পুরোনো ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট আর সাধারণ লেনদেনে বৈধ থাকবে না। সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয় সেই রাত থেকেই। যাঁর কাছে এই নোট ছিল, তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংকে জমা দিতে বা নিয়ম অনুযায়ী বদলে নিতে পারতেন। কিন্তু পরদিন সকালে দোকানে কিছু কেনা, শ্রমিককে মজুরি দেওয়া কিংবা যাতায়াতের ভাড়া মেটানোর জন্য সবার হাতে উপযুক্ত ছোট নোট ছিল না। একটি ঘোষণায় কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন লেনদেন বদলে যায়।

এই সিদ্ধান্তকে সাধারণভাবে ‘নোটবন্দি’ বলা হয়। অর্থনীতির ভাষায় এর অর্থ নির্দিষ্ট নোটের বৈধ মুদ্রা হিসেবে মর্যাদা প্রত্যাহার করা। ২০১৬ সালের ক্ষেত্রে সব ভারতীয় টাকা বাতিল হয়নি, ব্যাংকের হিসাবের জমাও মুছে যায়নি। বাতিল করা হয়েছিল তখন প্রচলিত নির্দিষ্ট ধারার ৫০০ ও ১০০০ টাকার কাগুজে নোট। এগুলো নগদ অর্থের মোট মূল্যের প্রায় ছিয়াশি শতাংশ ছিল। তাই মানুষকে পুরোনো নোট ব্যাংকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও লেনদেনের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য নগদের বড় অংশ বাজার থেকে সরে যায়।

সরকার ঘোষণার পক্ষে একাধিক উদ্দেশ্য তুলে ধরে। এর মধ্যে ছিল গোপন বা করের আওতার বাইরে রাখা অর্থ শনাক্ত করা, জাল নোটের ব্যবহার কমানো এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডে নগদের জোগান বাধাগ্রস্ত করা। পরবর্তী আলোচনায় ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে থাকা অর্থকে হিসাবের মধ্যে আনা ও ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর লক্ষ্যও গুরুত্ব পায়। সমর্থকদের যুক্তি ছিল, যাঁরা বিপুল পরিমাণ অবৈধ নগদ জমিয়ে রেখেছেন, তাঁরা ব্যাংকে জমা দিতে গেলে টাকার উৎস সম্পর্কে প্রশ্নের মুখে পড়বেন। আর জমা না দিলে নোটগুলোর মূল্য হারাবেন।

এই যুক্তির একটি সীমা শুরু থেকেই ছিল। অঘোষিত সম্পদ সব সময় নগদ নোটের আকারে রাখা হয় না। জমি, বাড়ি, সোনা, ব্যবসার হিসাব অথবা অন্য সম্পদেও তা থাকতে পারে। আবার ব্যাংকে পুরোনো নোট জমা পড়লেই সেই অর্থ বৈধ উপার্জনের ছিল—এমন প্রমাণ হয় না। জমার তথ্য ব্যবহার করে কর কর্তৃপক্ষ সন্দেহজনক লেনদেন পরীক্ষা করতে পারে, কিন্তু তার জন্য আলাদা তদন্ত প্রয়োজন। নোটবন্দির ফল বিচার করতে তাই কত নোট ফেরত এসেছে এবং তার মধ্যে কত অঘোষিত আয় শনাক্ত হয়েছে—এই দুটি প্রশ্ন আলাদা রাখতে হয়।

ঘোষণার পর ব্যাংক ও নগদ টাকা তোলার যন্ত্রের সামনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। মানুষ পুরোনো নোট জমা দিতে, নতুন নোট নিতে এবং দৈনন্দিন খরচ চালানোর মতো টাকা তুলতে অপেক্ষা করেন। প্রথম দিকে টাকা বদলানো ও উত্তোলনের সীমা নির্ধারণ করা হয়; পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়ম কয়েকবার বদলায়। এতে সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে কোন দিনে কী করা যাবে, তা বুঝে ওঠাও কঠিন হয়েছিল। পর্যাপ্ত নতুন নোট ছাপানো, দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো এবং টাকা তোলার যন্ত্রগুলো নতুন নোটের উপযোগী করা—সব কাজ একসঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

নতুন ৫০০ টাকার নোটের পাশাপাশি ২০০০ টাকার নোট চালু করা হয়। বড় নোট হাতে পেলেও অনেকের সমস্যা সঙ্গে সঙ্গে মেটেনি। একজন দোকানির কাছে খুচরা না থাকলে ছোট অঙ্কের কেনাকাটায় ২০০০ টাকার নোট ব্যবহার করা কঠিন। ফলে নগদসংকটের মানে শুধু মোট কত টাকা ছাপানো হয়েছে, তা নয়; মানুষের হাতে কোন মূল্যমানের নোট আছে এবং দোকানে ভাঙতি পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। শহরের ব্যাংকের পাশে দাঁড়ানো একজন গ্রাহক এবং দূর গ্রামের বাজারের একজন ক্রেতা সংকটটি একইভাবে অনুভব করেননি।

ভারতের বহু ক্ষুদ্র ব্যবসা তখন নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীল ছিল। পাড়ার দোকান, সবজিবিক্রেতা, নির্মাণকাজের ঠিকাদার কিংবা ছোট পরিবহন ব্যবসায় প্রতিদিন হাতে হাতে টাকা দেওয়া ও নেওয়া হতো। বিক্রি কমে গেলে দোকানি পরদিনের মাল কিনতে পারতেন না; ঠিকাদার শ্রমিকের মজুরি দিতে না পারলে কাজ থেমে যেত। বড় প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ও হিসাব বিভাগ থাকলেও ছোট ব্যবসায়ীর হাতে নগদের বিকল্প সীমিত ছিল। নোটবন্দির তাৎক্ষণিক চাপ তাই ব্যবসার আকার ও আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার অনুযায়ী ভিন্ন ছিল।

দিনমজুর ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য সমস্যা আরও সরাসরি ছিল। তাঁদের অনেকের মজুরি প্রতিদিন বা সপ্তাহ শেষে নগদে দেওয়া হতো। নিয়োগকর্তা বৈধ ছোট নোট জোগাড় করতে না পারলে মজুরি দিতে দেরি হতো, কখনো কাজও কমে যেত। কোনো শ্রমিকের নিজের ব্যাংক হিসাব না থাকলে পুরোনো নোট জমা দেওয়া কিংবা নতুন টাকা পাওয়ার পথ আরও জটিল হতো। ব্যাংকে হিসাব থাকলেও কাজের সময় ছেড়ে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়ানো মানে সেদিনের আয় হারানোর ঝুঁকি। তাই নোট বদলের সুযোগ কাগজে সবার জন্য থাকলেও তার ব্যবহারিক খরচ সবার জন্য সমান ছিল না।

গ্রামীণ এলাকায় কৃষকদেরও মৌসুমি চাহিদার সঙ্গে নগদসংকট সামলাতে হয়। বীজ, সার, পরিবহন বা শ্রমের খরচ নির্দিষ্ট সময়ে মেটাতে হয়; ফসল বিক্রির টাকাও অনেক জায়গায় নগদে আসত। উপযুক্ত নোটের অভাবে লেনদেন পিছিয়ে গেলে পচনশীল পণ্য বিক্রেতা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। অবশ্য প্রতিটি জেলা ও প্রতিটি ফসলের অভিজ্ঞতা এক ছিল না। কোথাও ব্যাংক শাখা কাছে ছিল, কোথাও স্থানীয়ভাবে বাকিতে বেচাকেনা চলেছে। কিন্তু নগদের প্রবাহ হঠাৎ কমে যাওয়া কৃষি সরবরাহের বহু পরিচিত পদ্ধতিতে বাধা সৃষ্টি করেছিল।

মানুষ সংকট সামলাতে নানা উপায় খুঁজেছেন। পরিচিত দোকানে বাকিতে কেনা, ছোট নোট জমিয়ে রাখা, ব্যাংক হিসাবে টাকা স্থানান্তর কিংবা মুঠোফোনে মূল্য পরিশোধের ব্যবহার বেড়েছে। কিছু ব্যবসায়ী প্রথমবারের মতো ডিজিটাল মূল্য গ্রহণের ব্যবস্থা করেন। তবে মুঠোফোন, ইন্টারনেট সংযোগ, ব্যাংক হিসাব এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস ছাড়া সবাই একই গতিতে এই পরিবর্তনে অংশ নিতে পারেননি। ডিজিটাল লেনদেন বেড়েছে—এই পর্যবেক্ষণ থেকে নগদসংকটের কষ্টও সবার জন্য কমে গিয়েছিল বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

ভারতে মুঠোফোনভিত্তিক তাৎক্ষণিক মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা ২০১৬ সালেই চালু হয়েছিল; পরের বছরগুলোতে তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ে। নোটবন্দি মানুষ ও ব্যবসাকে নগদের বিকল্প খুঁজতে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু পরবর্তী ডিজিটাল অগ্রগতির পুরো কৃতিত্ব একমাত্র এই সিদ্ধান্তকে দেওয়া ঠিক নয়। ব্যাংক হিসাবের বিস্তার, সস্তা ইন্টারনেট, মুঠোফোনের ব্যবহার, মূল্য পরিশোধের অবকাঠামো এবং পরের বছরগুলোর নানা উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কোনো প্রযুক্তি আগে থেকেই প্রস্তুত থাকলে নগদসংকট তার ব্যবহার বাড়াতে পারে; দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে প্রযুক্তিটি সহজ, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য হওয়ার ওপর।

পুরোনো নোট কতটা ব্যাংকে ফিরে এসেছিল, তা নোটবন্দির মূল্যায়নে কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে ওঠে। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের পরবর্তী হিসাবে বাতিল হওয়া নোটের মূল্যের প্রায় ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যাংক ব্যবস্থায় জমা পড়েছিল। এর অর্থ, বিপুল পরিমাণ নগদ নোট অকার্যকর হয়ে রাষ্ট্রের কাছে থেকে গেছে—এমন প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তবে এই সংখ্যাটি একা দিয়ে সব লক্ষ্য সফল বা ব্যর্থ হয়েছে বলা যায় না। জমা হওয়া অর্থের উৎস পরীক্ষা করা সম্ভব ছিল, আবার অবৈধ আয়ের বড় অংশ আদৌ নগদে রাখা হতো কি না, সেটিও পৃথক প্রশ্ন।

জাল নোট ঠেকানোর লক্ষ্যেও ফলাফলকে সময়ের সঙ্গে বিচার করতে হয়। পুরোনো নোট অকার্যকর হলে সে নোটের জাল সংস্করণও লেনদেনে ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু নতুন নোট চালু হওয়ার পরে অপরাধীরা জালিয়াতির চেষ্টা একেবারে বন্ধ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। জাল নোট শনাক্তকরণ, ব্যাংকের নজরদারি এবং আইন প্রয়োগের ধারাবাহিক ব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে অবৈধ কর্মকাণ্ডে নগদের জোগান সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়া এবং সেই কর্মকাণ্ড স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া দুটি ভিন্ন ফল।

সামগ্রিক অর্থনীতিতে নোটবন্দি ঠিক কতটা ক্ষতি বা লাভ করেছে, তার নির্ভুল হিসাব কঠিন। নগদসংকটের সময় উৎপাদন, বিক্রি ও কর্মসংস্থানে বাধা পড়েছিল—বিশেষ করে নগদনির্ভর অনানুষ্ঠানিক খাতে। কিন্তু ওই খাতের প্রতিদিনের কার্যক্রম সরকারি জাতীয় উৎপাদনের হিসাবে সব সময় সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না। আবার একই সময়ে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করা অন্য পরিবর্তনও ছিল। কোনো বছরের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করেই তার পুরো পরিবর্তন নোটবন্দির কারণে হয়েছে বলা যায় না। গবেষকেরা তাই অঞ্চল, ব্যবসার ধরন ও নগদের ওপর নির্ভরতার পার্থক্য বিবেচনা করে প্রভাব বোঝার চেষ্টা করেন।

নীতিটির সমর্থকেরা বলেন, ব্যাংকে বড় অঙ্কের জমা নতুন করে যাচাই করার সুযোগ তৈরি করেছে এবং অর্থনীতিতে হিসাবভিত্তিক লেনদেনের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। সমালোচকেরা বলেন, প্রায় সব নোট ফিরে আসার পরও সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সারি, কাজের ক্ষতি ও অনিশ্চয়তা বহন করতে হয়েছে। উভয় বক্তব্য বিচার করার জন্য লক্ষ্যগুলো আলাদা করা দরকার। কর ফাঁকি শনাক্ত করা, জাল নোট কমানো, ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো এবং স্বল্পমেয়াদি উৎপাদন বজায় রাখা—প্রতিটির ফল মাপার পদ্ধতি ভিন্ন। একটি ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি থাকলেও অন্য ক্ষেত্রের খরচ মুছে যায় না।

এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনি প্রশ্নও ওঠে। ২০২৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক নোটবন্দির সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিকে আইনগতভাবে বহাল রাখেন; একজন বিচারক ভিন্নমত দেন। আদালতের এই রায় অর্থনীতিতে সিদ্ধান্তটি কতটা কার্যকর ছিল, তার পূর্ণ মূল্যায়ন নয়। কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত আইনসম্মত হতে পারে, অথচ তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফল নিয়ে তীব্র বিতর্ক থাকতে পারে। ২০১৬ সালের নোটবন্দি নিয়ে আলোচনা আজও মূলত সেই ফল এবং তার বিনিময়ে মানুষকে যে ব্যয় বহন করতে হয়েছে, তা ঘিরেই চলে।

নোটবন্দির অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অর্থ শুধু ব্যাংকের হিসাবে থাকা একটি সংখ্যা নয়। দোকানে কেনাকাটা, সময়মতো মজুরি, চিকিৎসার খরচ এবং গ্রামের বাজারে ফসল বিক্রির জন্য মানুষের হাতে ব্যবহারযোগ্য টাকা দরকার। একটি দেশের বেশির ভাগ প্রচলিত নগদের বৈধতা এক রাতে বদলে দিলে নতুন নোটের সরবরাহ, ব্যাংকের সক্ষমতা এবং নাগরিকদের বিকল্প মূল্য পরিশোধের সুযোগ সমানভাবে জরুরি হয়ে ওঠে। ভারতের ২০১৬ সালের সিদ্ধান্ত কিছু লেনদেনকে ব্যাংক ও ডিজিটাল ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছিল; একই সঙ্গে নগদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের দুর্বল অবস্থান প্রকাশ করে। এই দুই বাস্তবতা একসঙ্গে দেখলেই আকস্মিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনটির পূর্ণ মানবিক ও আর্থিক চিত্র বোঝা যায়।


আপনার পছন্দ হতে পারে