বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সালার দে উয়ুনি বর্ষায় আয়না হয় কেন? বলিভিয়ার লবণের মরুভূমির বিজ্ঞান

সালার দে উয়ুনি বর্ষায় আয়না হয় কেন? বলিভিয়ার লবণের মরুভূমির বিজ্ঞান
যেখানে বর্ষায় আকাশ নেমে আসে লবণের বুকে

বলিভিয়ার সালার দে উয়ুনিতে বর্ষার পর দাঁড়ালে প্রথমে নিজের চোখকেই অবিশ্বাস হতে পারে। পায়ের নিচে অগভীর জল, মাথার ওপরে মেঘভরা আকাশ; অথচ দিগন্তের দিকে তাকালে বোঝা কঠিন হয়ে যায়, আকাশ কোথায় শেষ আর মাটি কোথায় শুরু। মেঘের প্রতিচ্ছবি এত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে যে হাঁটতে থাকা মানুষকে আকাশের ভেতর দিয়ে হাঁটছে বলে মনে হয়। এই দৃশ্য কোনো গভীর হ্রদের সৃষ্টি নয়। পৃথিবীর বৃহত্তম লবণসমতলের ওপর জমে থাকা অল্প জল, প্রায় সমতল ভূমি এবং উপযুক্ত আবহাওয়া মিলে এমন বিস্ময়কর প্রতিফলন তৈরি করে।

সালার দে উয়ুনি দক্ষিণ-পশ্চিম বলিভিয়ার আন্দিজ পর্বতমালার উঁচু মালভূমিতে অবস্থিত। এর আয়তন প্রায় দশ হাজার পাঁচশ বর্গকিলোমিটার। ‘লবণের মরুভূমি’ নাম শুনে বালিয়াড়ির কথা মনে হতে পারে, কিন্তু এখানে বালুর বদলে দিগন্তজোড়া লবণের শক্ত আবরণ দেখা যায়। এই আবরণের নিচে রয়েছে বিভিন্ন খনিজ মেশানো অতিলবণাক্ত জল। সমুদ্র থেকে এত দূরে এবং পাহাড়ঘেরা উঁচু অঞ্চলে এমন বিপুল লবণ এল কীভাবে, সেটিই উয়ুনির গল্পের প্রথম প্রশ্ন।

এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্রাচীন হ্রদের ইতিহাসে। বহু হাজার বছর আগে এই মালভূমির বড় অংশজুড়ে বিস্তৃত হ্রদ ছিল। সময়ের সঙ্গে জলবায়ু বদলেছে; হ্রদের জল কখনো বেড়েছে, কখনো সরে গেছে। অঞ্চলটির ভেতরে জমা জল বাইরে সমুদ্রের দিকে অবাধে বেরিয়ে যেতে পারেনি। ফলে হ্রদের জল বাষ্প হয়ে উড়ে গেলেও তাতে দ্রবীভূত লবণ ও অন্য খনিজ থেকে গেছে। বারবার জল জমা, বাষ্পীভবন এবং খনিজের সঞ্চয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে আজকের বিশাল লবণস্তর। তাই সালার দে উয়ুনি কেবল সাদা পাথুরে মাঠ নয়; এটি হারিয়ে যাওয়া হ্রদগুলোর রেখে যাওয়া ভূতাত্ত্বিক স্মৃতি।

কোনো নদী যদি একটি হ্রদে লবণ ও খনিজ বয়ে আনে, আর সেই হ্রদ থেকে জল বেরিয়ে যাওয়ার পথ সীমিত থাকে, তাহলে শুকনো আবহাওয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। সূর্যের তাপে জল বাষ্পীভূত হয়, কিন্তু লবণ একইভাবে উড়ে যায় না। জলে তার ঘনত্ব বাড়তে থাকে। একসময় দ্রবীভূত লবণের একটি অংশ কঠিন দানা বা স্ফটিক হিসেবে জমা হয়। উয়ুনিতে বহু দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রক্রিয়া ঘটেছে। উপরিভাগের সাদা স্তরের প্রধান উপাদান সাধারণ লবণের খনিজ রূপ; তার নিচের অতিলবণাক্ত জলে আরও নানা খনিজ উপস্থিত রয়েছে।

শুকনো মৌসুমে উয়ুনির সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য হলো সাদা পৃষ্ঠে আঁকা অসংখ্য বহুভুজ। দূর থেকে মনে হয় কেউ মাপজোক করে বিশাল সমতলজুড়ে রেখা টেনেছে। প্রকৃতপক্ষে লবণস্তর শুকানো, সংকুচিত হওয়া এবং ফাটল তৈরি হওয়ার সঙ্গে এই নকশার সম্পর্ক রয়েছে। জমে থাকা জল যখন সরে যায়, উপরিভাগে লবণের নতুন আস্তরণও তৈরি হতে পারে। ফাটল ও উঁচু কিনারার পুনরাবৃত্তিতে একটির পাশে আরেকটি বহুভুজ দেখা দেয়। এগুলোর আকার ও রেখা সর্বত্র এক রকম নয়; স্থানীয় জল, লবণ এবং শুকানোর অবস্থার ওপর দৃশ্যটি বদলাতে পারে।

এত বড় একটি অঞ্চল কীভাবে আয়না হতে পারে, তা বুঝতে ভূমির সমতল প্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। উয়ুনির বিস্তীর্ণ লবণপৃষ্ঠ পৃথিবীর সবচেয়ে সমতল প্রাকৃতিক ভূভাগগুলোর একটি। বর্ষার জল এখানে জমলে তা অতি নিচু অংশে সীমাবদ্ধ না থেকে অনেক দূর পর্যন্ত পাতলা স্তর হিসেবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। জলপূর্ণ একটি গভীর গর্তের পাশে শুকনো উঁচু জমি থাকলে এমন নিরবচ্ছিন্ন প্রতিফলন তৈরি হতো না। উয়ুনিতে সমতল ভূমি আয়নার জন্য প্রয়োজনীয় বিস্তৃত জলপৃষ্ঠের ভিত্তি গড়ে দেয়।

বলিভিয়ার এই অঞ্চলে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে বর্ষার প্রভাব বেশি থাকে। বৃষ্টি সরাসরি লবণসমতলে পড়ে; আশপাশের উঁচু ভূমি থেকে আসা জলও নিচের দিকে পৌঁছাতে পারে। কোথাও কয়েক সেন্টিমিটার জল জমে, কোথাও তার পরিমাণ বেশি হয়, আবার একই সময়ে অন্য অংশ শুকনো থাকতে পারে। ফলে ‘বর্ষাকাল’ মানেই পুরো সালার একসঙ্গে সমান আয়না হয়ে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। কোন দিন কোথায় কতটা জল রয়েছে, তা সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও স্থানীয় অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

আয়নার মতো দেখানোর মূল ঘটনা হলো আলোর প্রতিফলন। আকাশ থেকে আসা আলো শান্ত জলের পৃষ্ঠে পড়ে পর্যবেক্ষকের চোখের দিকে ফিরে আসে। জলের পৃষ্ঠ যথেষ্ট মসৃণ থাকলে মেঘ, নীল আকাশ কিংবা দূরের পাহাড়ের অবয়ব চেনা যায়। কিন্তু বাতাসের ধাক্কায় জল কেঁপে ছোট ছোট ঢেউ উঠলে প্রতিটি ঢেউ আলোকে ভিন্ন দিকে ফেরায়। তখন পরিষ্কার প্রতিবিম্ব ভেঙে যায়। এ কারণেই বৃষ্টির পর জল জমলেও প্রবল বাতাসের দিনে ছবির মতো নিখুঁত প্রতিফলন নাও দেখা যেতে পারে।

জলের গভীরতার ক্ষেত্রেও একটি সূক্ষ্ম ব্যাপার রয়েছে। উয়ুনির লবণস্তরের ওপর পাতলা, অবিচ্ছিন্ন জল ছড়ালে নিচের অসমান স্ফটিকের বদলে ওপরে তুলনামূলক মসৃণ একটি প্রতিফলক পৃষ্ঠ তৈরি হয়। আকাশের ছবি দেখতে জলের গভীর হ্রদ হওয়ার দরকার নেই। বরং সামান্য জলেই মেঘ ও দিগন্তের প্রতিফলন দেখা যায়। তবে খুব কম জল থাকলে শুকনো অংশ প্রতিফলনের ধারাবাহিকতা ভেঙে দিতে পারে; আবার জল বেশি হলে কোনো কোনো পথ বা দ্বীপে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য নির্ভর করে জল, বাতাস ও আলোর মিলের ওপর।

দিগন্ত উধাও হয়ে যাওয়ার অনুভূতির পেছনেও ভূদৃশ্যের ভূমিকা আছে। সাধারণত মানুষ দূরের গাছ, ভবন বা উঁচু-নিচু জমি দেখে আকাশ ও মাটির সীমানা বুঝতে পারে। উয়ুনির বিস্তৃত সমতলে এমন পরিচিত চিহ্ন কম। তার ওপর নিচের জল যখন ওপরের আকাশের রং ও মেঘের অবয়ব ফিরিয়ে দেয়, তখন মাটি ও আকাশ দেখতে অনেকটা একই রকম হয়। দূরের পাহাড় বা কোনো গাড়ি থাকলে বোঝা যায় কোথায় স্থলভাগ, কিন্তু সেগুলো চোখের আড়ালে গেলে সীমারেখা প্রায় মুছে যায়।

এই প্রতিফলনের সৌন্দর্য সময়ের সঙ্গেও বদলায়। উজ্জ্বল দিনের নীল আকাশ ও সাদা মেঘ জলে স্পষ্ট রঙের বৈপরীত্য তৈরি করতে পারে। সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তে আলো নিচু কোণ থেকে পড়লে জলপৃষ্ঠে সোনালি, কমলা কিংবা গোলাপি আভা দেখা যায়। আবার মেঘলা দিনে আকাশ ও নিচের প্রতিফলন মিলিয়ে চারপাশ ধূসর হয়ে যেতে পারে। তাই সামাজিক মাধ্যমে দেখা প্রতিটি উয়ুনির ছবি একই মৌসুমের একই রকম দিনের ছবি নয়। আকাশের অবস্থা ও ছবি তোলার মুহূর্ত দৃশ্যটিকে অনেকখানি বদলে দেয়।

শুকনো মৌসুমের উয়ুনিও আলাদা কারণে বিস্ময়কর। তখন জল সরে গেলে বহুভুজ আঁকা লবণপৃষ্ঠ অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। খোলা আকাশের নিচে পরিচিত আকারের অন্য বস্তু কম থাকায় দূরত্ব ও আকার আন্দাজ করা কঠিন হয়। এই বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে পর্যটকেরা এমন ছবি তোলেন, যেখানে দূরে দাঁড়ানো মানুষকে হাতে তুলে রাখা হচ্ছে বা ছোট কোনো বস্তুর পাশে বিশাল মানুষ দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হয়। ছবিগুলো চোখের ভুলকে কাজে লাগালেও তাদের পটভূমি তৈরি করে উয়ুনির ব্যতিক্রমী সমতল ও উন্মুক্ত দিগন্ত।

লবণের এই আবরণের নিচে থাকা খনিজসমৃদ্ধ জল অর্থনৈতিক কারণেও আলোচনায় আসে। বিশেষ করে ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত লিথিয়াম নিয়ে উয়ুনির নাম প্রায়ই শোনা যায়। তবে লবণসমতলে লিথিয়াম থাকা আর তা সহজে, দ্রুত ও পরিবেশের ক্ষতি ছাড়া সংগ্রহ করা এক বিষয় নয়। খনিজের ঘনত্ব, প্রক্রিয়াজাতকরণের পদ্ধতি, জলের ব্যবহার, অবকাঠামো এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থ—সবই গুরুত্বপূর্ণ। উয়ুনিকে শুধু সম্ভাব্য খনিজভান্ডার হিসেবে দেখলে এর ভূপ্রকৃতি, জলব্যবস্থা এবং চারপাশের জনজীবনের জটিল সম্পর্ক আড়ালে থেকে যায়।

এই অঞ্চলে পর্যটনের অভিজ্ঞতাও ঋতুভেদে ভিন্ন। শুকনো সময়ে লবণসমতলের অনেক পথ তুলনামূলক সহজে ব্যবহার করা যায় এবং বহুভুজ নকশা স্পষ্ট দেখা যায়। বর্ষায় আয়নার দৃশ্য পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু জল জমলে কিছু পথ চলাচলের অনুপযোগী হতে পারে। কোথাও শক্ত দেখানো লবণস্তরের পাশে জলভরা গর্ত বা ভঙ্গুর অংশও থাকতে পারে। তাই বিস্তীর্ণ সাদা মাঠকে সাধারণ রাস্তা ভেবে ইচ্ছেমতো গাড়ি চালানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। স্থানীয় পথ ও সেই দিনের অবস্থার জ্ঞান এখানে বিশেষ মূল্যবান।

উয়ুনির উঁচু মালভূমির পরিবেশও মনে রাখা দরকার। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে থাকার কারণে সেখানে বাতাস পাতলা, রোদ তীব্র এবং দিন ও রাতের তাপমাত্রায় বড় পার্থক্য অনুভূত হতে পারে। সাদা লবণপৃষ্ঠ সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে; ফলে চোখে ঝলকানি লাগে। অল্প জলের ওপর দিয়ে হাঁটলেও পায়ের নিচে অসমান লবণ বা ধারালো কিনারা পাওয়া যায়। এসব বাস্তবতা ছবির সৌন্দর্য কমায় না; বরং মনে করিয়ে দেয় যে এটি সাজানো দৃশ্যপট নয়, নিজস্ব নিয়মে চলা এক প্রাকৃতিক ভূভাগ।

সালার দে উয়ুনির ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আয়না’ পরিচয়টি তাই স্থায়ী কোনো বস্তু বোঝায় না। আয়নাটি প্রতি বর্ষায় উপযুক্ত অবস্থায় তৈরি হয়, আবার জল শুকিয়ে গেলে অদৃশ্য হয়। যে লবণস্তর শুকনো সময়ে বহুভুজ নকশা দেখায়, সেই স্তরের ওপরই বৃষ্টির অগভীর জল বর্ষায় আকাশ ফিরিয়ে দেয়। প্রাচীন হ্রদের সঞ্চিত লবণ, বদ্ধ অববাহিকা, অসাধারণ সমতল ভূমি এবং মৌসুমি বৃষ্টি—এই চারটি দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি প্রক্রিয়া এক জায়গায় মিলেছে বলেই দৃশ্যটি সম্ভব হয়েছে।

উয়ুনির দিকে তাকালে তাই একই সঙ্গে দুটি সময় দেখা যায়। পায়ের নিচের লবণ বলে বহু পুরোনো হ্রদ শুকিয়ে যাওয়ার ইতিহাস; তার ওপরের ক্ষণস্থায়ী জল বলে সদ্য পেরিয়ে যাওয়া বৃষ্টির কথা। বাতাস থেমে গেলে সেই জল আকাশের ছবি ধরে রাখে, আর বাতাস উঠলেই ছবি ভেঙে যায়। বলিভিয়ার এই বিশাল লবণসমতলের বিস্ময় এখানেই: যে ভূভাগকে শুকনো মৌসুমে নিঃশেষ সাদা মরুভূমি মনে হয়, বর্ষার কয়েক সেন্টিমিটার জল তাকেই দিগন্তজোড়া আয়নায় বদলে দেয়।


আপনার পছন্দ হতে পারে