বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হিমালয়: পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালা এখনো প্রতি বছর উঁচু হচ্ছে কেন?

হিমালয়: পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালা এখনো প্রতি বছর উঁচু হচ্ছে কেন?
ভূত্বকীয় সংঘর্ষে আজও উঁচু হচ্ছে হিমালয়

হিমালয়কে দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পৃথিবীর উত্তর দিগন্তজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশাল পর্বতমালা বুঝি অনন্তকাল ধরে একই অবস্থায় রয়েছে। বরফে ঢাকা শৃঙ্গ, গভীর উপত্যকা ও পাথরের বিশাল প্রাচীর স্থিরতার প্রতীক বলেই মনে হয়। বাস্তবে হিমালয় এক মুহূর্তের জন্যও পুরোপুরি স্থির নয়। এর নিচে দুটি বিশাল ভূত্বকীয় পাতের সংঘর্ষ এখনো চলছে। সেই সংঘর্ষ পাথরকে সংকুচিত করছে, শিলাস্তর ভাঁজ করছে, ভূত্বকের এক অংশকে অন্য অংশের ওপর ঠেলে দিচ্ছে এবং পর্বতমালার বিভিন্ন অঞ্চলকে ধীরে ধীরে ওপরে তুলছে। একই সময়ে বৃষ্টি, নদী, হিমবাহ, ভূমিধস ও ভূমিকম্প তাকে ক্ষয় ও পুনর্গঠন করছে। ফলে হিমালয় কোনো সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া প্রাচীন স্থাপনা নয়; এটি এখনো নির্মাণাধীন একটি জীবন্ত পর্বতমালা।

হিমালয়ের জন্মের ইতিহাস শুরু হয় আজ থেকে প্রায় দুইশ কোটি নয়, বরং দুইশ মিলিয়ন বছরের কাছাকাছি সময় আগে, যখন বর্তমান পৃথিবীর মহাদেশগুলোর অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। ভারতীয় ভূখণ্ড তখন গন্ডোয়ানা নামে পরিচিত দক্ষিণের একটি বৃহৎ মহাদেশীয় ভূখণ্ডের অংশ। আফ্রিকা, অ্যান্টার্কটিকা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, মাদাগাস্কার ও ভারতীয় অংশ এই প্রাচীন ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পৃথিবীর গভীরের তাপ ও ভূত্বকের চলাচলের কারণে গন্ডোয়ানা ধীরে ধীরে ভেঙে যায়। ভারতীয় ভূখণ্ডও বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বতন্ত্র ভূত্বকীয় পাতের অংশ হিসেবে উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করে।

ভারতীয় ভূখণ্ড ও ইউরেশিয়ার মাঝখানে তখন টেথিস নামে একটি প্রাচীন সমুদ্র ছিল। কোটি কোটি বছর ধরে সেই সমুদ্রের তলদেশে বালি, কাদা, চুনযুক্ত সামুদ্রিক অবশেষ এবং নানা খনিজ জমে পুরু পললস্তর তৈরি করেছিল। ভারতীয় পাত উত্তর দিকে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টেথিস মহাসাগরের তলদেশ সংকুচিত হতে থাকে। সমুদ্রের ভারী ভূত্বকের কিছু অংশ ইউরেশীয় পাতের নিচে নেমে গেলেও দুই পাশের হালকা মহাদেশীয় ভূত্বক সহজে গভীরে ডুবে যেতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় ও ইউরেশীয় মহাদেশীয় ভূত্বকের সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হয়।

এই সংঘর্ষ আনুমানিক পাঁচ কোটি বছর আগে তীব্র রূপ নেয়, যদিও সঠিক সময় নির্ধারণে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ কিছুটা ভিন্ন ধারণা দেয়। সংঘর্ষের ফলে টেথিস সমুদ্র ক্রমে সংকুচিত ও বিলুপ্ত হয়। সমুদ্রতলের পুরু পলল চাপের মধ্যে ভাঁজ হয়ে ওপরে উঠতে থাকে। ভারতীয় ভূত্বকের উত্তর প্রান্তের শিলাস্তরও ভেঙে একটির ওপর আরেকটি উঠে যায়। বহু পর্যায়ের এই সংকোচন, ভাঁজ, চ্যুতি ও উত্তোলনের মাধ্যমে জন্ম নেয় হিমালয়।

এই কারণেই হিমালয়ের অনেক উঁচু শৃঙ্গে সামুদ্রিক উৎসের চুনাপাথর এবং প্রাচীন সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া যায়। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টের ওপরের অংশেও এমন শিলা রয়েছে, যা একসময় উষ্ণ অগভীর সমুদ্রের তলদেশে জমেছিল। আজ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় নয় কিলোমিটার ওপরে থাকা পাথর যে কোনো একসময় সমুদ্রের নিচে ছিল, তা প্রথমে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। অথচ এটি ভূত্বকীয় সংঘর্ষের বিশাল শক্তি এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলা পর্বত গঠনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণগুলোর একটি।

পৃথিবীর বাইরের কঠিন স্তর একটিমাত্র অবিচ্ছিন্ন আবরণ নয়। এটি বিভিন্ন আকারের বহু ভূত্বকীয় পাতে বিভক্ত। এসব পাত পৃথিবীর গভীরের তুলনামূলক নমনীয় ও উষ্ণ স্তরের ওপর অত্যন্ত ধীরে চলাচল করে। মানুষের দৃষ্টিতে এই গতি নগণ্য হলেও কয়েক কোটি বছরে তা একটি মহাসাগর বন্ধ করে দিতে কিংবা সম্পূর্ণ পর্বতমালা তৈরি করতে পারে। ভারতীয় পাত বর্তমানে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ইউরেশীয় পাতের ওপর অবিরাম চাপ সৃষ্টি করছে।

ভারতীয় পাতের মোট গতিবেগ অঞ্চল ও পরিমাপপদ্ধতি অনুযায়ী কিছুটা পরিবর্তিত হলেও এটি প্রতিবছর কয়েক সেন্টিমিটার উত্তর দিকে এগোচ্ছে। তবে এই সম্পূর্ণ গতি শুধু হিমালয়কে উঁচু করে না। এর কিছু অংশ তিব্বতীয় মালভূমি ও মধ্য এশিয়ার ভূত্বককে বিকৃত করে, কিছু অংশ বিভিন্ন চ্যুতির পাশে পার্শ্বীয় চলাচল ঘটায় এবং কিছু অংশ হিমালয়ের সম্মুখভাগে সংকোচন হিসেবে জমা হয়। ফলে হিমালয়ের উত্তোলনের হার ভারতীয় পাতের উত্তরমুখী গতির সমান নয়। পর্বতমালার বিভিন্ন অংশ সাধারণত বছরে কয়েক মিলিমিটার হারে ওপরে উঠতে পারে, কিন্তু এই হার স্থান ও সময়ভেদে পরিবর্তিত হয়।

মহাদেশীয় ভূত্বক প্রধানত তুলনামূলক হালকা শিলা দিয়ে গঠিত। এ কারণে ভারতীয় পাতের উত্তরাংশ ইউরেশিয়ার সঙ্গে সংঘর্ষের পর পুরোপুরি গভীর আবরণে তলিয়ে যায়নি। এর বদলে ভারতীয় ভূত্বকের একটি অংশ তিব্বতের নিচে প্রবেশ করেছে, আর ওপরের শিলাস্তরগুলো সংকুচিত, ভাঁজ ও পুরু হয়েছে। যেমন একটি মোটা কাপড়কে দুই দিক থেকে ঠেলে দিলে তা কুঁচকে ওপরে উঠে যায়, তেমনি দুই মহাদেশীয় পাতের সংঘর্ষে ভূত্বক পুরু হয়ে হিমালয় ও তিব্বতীয় মালভূমিকে উঁচু করেছে। তবে বাস্তব প্রক্রিয়াটি কাপড়ের ভাঁজের চেয়ে অনেক জটিল; এখানে শিলা ভাঙে, গলে, রূপান্তরিত হয় এবং গভীর চ্যুতির মাধ্যমে বহু কিলোমিটার সরে যায়।

হিমালয়ের নিচে একাধিক বড় সক্রিয় চ্যুতি রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে ভারতীয় পাতের ওপরের শিলা উত্তর দিকে ও নিচের দিকে প্রবেশ করছে, আর পর্বতমালার শিলাস্তর দক্ষিণ দিকে ঠেলে উঠছে। হিমালয়ের সম্মুখভাগে অপেক্ষাকৃত নতুন চ্যুতি, মাঝের অংশে পুরোনো প্রধান চ্যুতি এবং উত্তরের গভীরে আরও জটিল ভূতাত্ত্বিক সীমা রয়েছে। এসব চ্যুতি পর্বতমালার বিভিন্ন অংশের গঠন, উচ্চতা ও ভূমিকম্পের আচরণ নির্ধারণ করে।

পাত দুটি সব সময় মসৃণভাবে একে অপরের পাশ দিয়ে সরে যায় না। শিলার অসম পৃষ্ঠ ও প্রবল ঘর্ষণের কারণে বহু স্থানে তারা আটকে থাকে। কিন্তু গভীরের চলাচল বন্ধ হয় না বলে আটকে থাকা অঞ্চলে ক্রমাগত স্থিতিস্থাপক চাপ জমতে থাকে। কয়েক দশক বা কয়েক শতাব্দী পর সেই চাপ শিলার ধারণক্ষমতা অতিক্রম করলে চ্যুতি হঠাৎ সরে যায়। তখন সঞ্চিত শক্তি ভূকম্পীয় তরঙ্গ হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বড় ভূমিকম্প ঘটে।

এই ভূমিকম্প হিমালয়ের চলমান উত্থানের প্রত্যক্ষ প্রমাণ। কোনো বড় ভূমিকম্পে কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিটের মধ্যে ভূমির একটি অংশ ওপরে উঠতে পারে, অন্য অংশ নিচে নামতে পারে কিংবা অনুভূমিকভাবে কয়েক মিটার সরে যেতে পারে। তাই হিমালয়ের বৃদ্ধি সব সময় সমান গতিতে ঘটে না। বহু বছর ধীরে ধীরে চাপ জমার পর হঠাৎ একটি ভূমিকম্পে বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে। আবার ভূমিকম্পের মধ্যবর্তী সময়েও ভূত্বক ধীরে বিকৃত হতে থাকে।

দুই হাজার পনেরো সালের নেপাল ভূমিকম্প দেখিয়েছিল, একটি বড় কম্পন পর্বতমালার উচ্চতায় কত জটিল পরিবর্তন আনতে পারে। ভূমিকম্পে কিছু অঞ্চল ওপরে উঠলেও এভারেস্টসহ কোনো কোনো উচ্চ এলাকার অবস্থানে সামান্য নিম্নমুখী পরিবর্তন ধরা পড়ে। অর্থাৎ ভারতীয় পাতের সংঘর্ষ চলমান বলে হিমালয় সামগ্রিকভাবে উঁচু হচ্ছে—এই বক্তব্য সত্য হলেও প্রতিটি শৃঙ্গ প্রতি বছর নিশ্চিতভাবে একই পরিমাণ উঁচু হয়, এমন ধারণা ভুল। স্থানীয় চ্যুতি, ভূমিকম্প, ভূমিধস ও শিলার বিকৃতির কারণে পৃথক শৃঙ্গের উচ্চতা বাড়তেও পারে, কমতেও পারে।

এভারেস্টের উচ্চতা নিয়ে যে আলোচনা হয়, সেখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উচ্চতা কোন ভিত্তি থেকে মাপা হচ্ছে। সাধারণভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতাকে ভিত্তি ধরা হয়। কিন্তু পৃথিবী নিখুঁত গোল নয়, সমুদ্রপৃষ্ঠও সর্বত্র একই জ্যামিতিক স্তরে থাকে না এবং মহাকর্ষের পরিবর্তনের কারণে পরিমাপ জটিল হয়। শৃঙ্গের ওপরের বরফের পুরুত্বও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই কয়েক সেন্টিমিটার বা কয়েক দশ সেন্টিমিটারের পার্থক্য কখনো প্রকৃত শিলা-উত্থান, কখনো বরফের পরিবর্তন, আবার কখনো পরিমাপপদ্ধতির পার্থক্য থেকে আসতে পারে।

দুই হাজার বিশ সালে নেপাল ও চীন যৌথভাবে এভারেস্টের স্বীকৃত উচ্চতা আট হাজার আটশ আটচল্লিশ দশমিক ছিয়াশি মিটার ঘোষণা করে। এই পরিমাপে শৃঙ্গের ওপরের তুষারঢাকা অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু এই সংখ্যাকে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট হারে বাড়িয়ে ভবিষ্যতের উচ্চতা নির্ধারণ করা যায় না। কারণ এভারেস্টের নিচের ভূমি যতটা ওঠে, ক্ষয়, ভূমিকম্প ও বরফের পরিবর্তন তার দৃশ্যমান উচ্চতাকে ততটাই প্রভাবিত করতে পারে।

হিমালয়কে উঁচু করার প্রধান শক্তি ভূত্বকীয় সংঘর্ষ হলেও তাকে নিচু করার শক্তিগুলোও অত্যন্ত সক্রিয়। গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বৃষ্টি দক্ষিণ ঢালে প্রচুর পানি নিয়ে আসে। সেই পানি পাথরের ফাটলে প্রবেশ করে, শিলাকে দুর্বল করে এবং নদীর মাধ্যমে ভাঙা পদার্থ সরিয়ে নিয়ে যায়। খাড়া ঢালে ভূমিধস ঘটে। উঁচু এলাকায় পানি জমে বরফ হলে আয়তন বাড়ে, ফলে ফাটল আরও প্রসারিত হয়। বারবার জমাট বাঁধা ও গলে যাওয়ার মাধ্যমে শক্ত শিলাও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।

হিমবাহ হিমালয়ের শক্তিশালী ক্ষয়কারী শক্তিগুলোর একটি। ধীরে চলমান বরফ নিজের নিচে আটকে থাকা পাথর দিয়ে পাহাড়ের তলদেশ ঘষে। এতে প্রশস্ত উপত্যকা, ধারালো শৈলশিরা ও গভীর অববাহিকা তৈরি হয়। বরফ গলে গেলে নদী সেই পলি ও পাথর আরও নিচে নিয়ে যায়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও সিন্ধুসহ এশিয়ার বহু বৃহৎ নদী হিমালয় থেকে বিপুল পরিমাণ পলি বহন করে সমভূমি ও সমুদ্রে জমা করে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের বিশাল পলিভূমি হিমালয়ের ক্ষয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

নদীগুলো শুধু পাহাড় থেকে পাথর সরিয়ে নিচ্ছে না; অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত নিচের দিকে খাত কেটে পর্বতমালার ভেতরে গভীর গিরিখাত তৈরি করছে। ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু এবং তাদের শাখানদীগুলোর কোনো কোনোটি পর্বতের উত্থানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজের পথ গভীর করেছে। পর্বত ওপরে ওঠার সময় নদী নিচে কাটতে থাকলে একই অঞ্চলে অত্যন্ত উঁচু শৃঙ্গ ও গভীর উপত্যকা পাশাপাশি তৈরি হয়। হিমালয়ের নাটকীয় ভূদৃশ্যের পেছনে এই উত্তোলন ও ক্ষয়ের প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।

পাহাড় থেকে বিপুল শিলা ও পলি সরে গেলে ভূত্বকের ওপরের ওজন কমে যায়। পৃথিবীর তুলনামূলক নমনীয় গভীর স্তরের ওপর মহাদেশীয় ভূত্বক অনেকটা পানিতে ভাসমান বরফের মতো ভারসাম্য বজায় রাখে। ওপর থেকে ওজন কমলে ভূত্বক কিছুটা ওপরে উঠে নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। একে ভূসমস্থিতীয় প্রত্যাবর্তন বলা হয়। হিমবাহ গলে যাওয়া এবং নদীর ক্ষয়ে শিলা অপসারণ—উভয় কারণেই কিছু অঞ্চলে এ ধরনের অতিরিক্ত উত্থান ঘটতে পারে। তবে এটি ভারতীয় ও ইউরেশীয় পাতের সংঘর্ষ থেকে সৃষ্ট প্রধান উত্তোলনের বিকল্প নয়; বরং তার সঙ্গে যুক্ত আরেকটি প্রক্রিয়া।

একটি পর্বতের প্রকৃত পরিবর্তন বুঝতে বিজ্ঞানীরা দুটি আলাদা বিষয় বিবেচনা করেন। প্রথমটি হলো শিলাভিত্তি কত দ্রুত ওপরে উঠছে, আর দ্বিতীয়টি হলো ভূমির দৃশ্যমান উপরিভাগের উচ্চতা কত দ্রুত বদলাচ্ছে। শিলাভিত্তি বছরে কয়েক মিলিমিটার ওপরে উঠলেও ক্ষয় যদি একই হারে পাথর সরিয়ে দেয়, তাহলে পৃষ্ঠের গড় উচ্চতা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। ক্ষয় উত্তোলনের চেয়ে দ্রুত হলে পাহাড় নিচু হতে পারে। আবার কোনো অঞ্চলে উত্তোলন দ্রুত এবং ক্ষয় ধীর হলে উচ্চতা বাড়বে। তাই ‘হিমালয় উঁচু হচ্ছে’ বলতে মূলত সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক উত্তোলন বোঝানো হয়, প্রতিটি শৃঙ্গের নিরবচ্ছিন্ন উচ্চতা বৃদ্ধি নয়।

হিমালয়ের বিভিন্ন অংশ একই হারে উঁচু হচ্ছে না। পশ্চিমে পাকিস্তান ও ভারতের পর্বতাঞ্চল, মধ্যভাগে নেপাল এবং পূর্বে ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক বিন্যাস আলাদা। শিলার শক্তি, চ্যুতির অবস্থান, বৃষ্টিপাত, নদীর ক্ষয় এবং ভূমিকম্পের ইতিহাসও এক নয়। দক্ষিণ ঢালে মৌসুমি বৃষ্টি বেশি হওয়ায় ক্ষয় সাধারণত প্রবল। তিব্বতের দিকে অনেক অঞ্চল শুষ্ক হওয়ায় ক্ষয়ের ধরন ভিন্ন। এ কারণে একই পর্বতমালার মধ্যে কোথাও দ্রুত উত্তোলন, কোথাও প্রবল ক্ষয়, আবার কোথাও তুলনামূলক স্থিতিশীল উচ্চতা দেখা যায়।

হিমালয়ের উত্থান দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ুর সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশাল পর্বতপ্রাচীর ভারত মহাসাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ুকে বাধা দিয়ে দক্ষিণ ঢালে বৃষ্টি ঘটায়। অন্যদিকে পর্বতের উত্তরে তিব্বত ও মধ্য এশিয়ায় বৃষ্টিচ্ছায়া সৃষ্টি হয়। তিব্বতীয় মালভূমি গ্রীষ্মে প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে বায়ুচাপের বৃহৎ বিন্যাসে প্রভাব ফেলে। তবে হিমালয়ের উত্থানই একাই মৌসুমি বায়ু সৃষ্টি করেছে বলা অতিরিক্ত সরলীকরণ হবে। সমুদ্র ও স্থলের তাপমাত্রার পার্থক্য, বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহ এবং বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থাও এতে গুরুত্বপূর্ণ।

পর্বতের উচ্চতা ও মৌসুমি বৃষ্টির মধ্যে আবার পারস্পরিক প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। উঁচু পর্বত বেশি বৃষ্টি ঘটাতে পারে, আর বেশি বৃষ্টি নদীর ক্ষয় ও ভূমিধস বাড়ায়। ক্ষয়ে শিলা সরে গেলে কোনো কোনো অঞ্চলে ভূসমস্থিতীয়ভাবে আরও উত্থান ঘটতে পারে। আবার প্রবল ক্ষয় পর্বতের ওজন ও চাপের বিন্যাস বদলে চ্যুতির আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ পর্বত জলবায়ুকে বদলায়, জলবায়ু পর্বতকে ক্ষয় করে, আর সেই ক্ষয় ভূত্বকের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।

হিমালয়ের ওপর বরফ ও হিমবাহের পরিবর্তনও দৃশ্যমান উচ্চতা এবং ভূদৃশ্যকে প্রভাবিত করছে। উষ্ণায়নের কারণে বহু হিমবাহ পশ্চাদপসরণ করছে, যদিও সব হিমবাহের আচরণ একই নয়। বরফ কমলে শিলার ওপরের চাপ হ্রাস পায় এবং দীর্ঘ সময়ে সামান্য ভূসমস্থিতীয় উত্থান ঘটতে পারে। কিন্তু এই উত্থানকে জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিবাচক ফল হিসেবে দেখা যায় না। হিমবাহের সংকোচন নদীর মৌসুমি প্রবাহ, পানির নিরাপত্তা, হিমবাহ হ্রদ এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

উঁচু হতে থাকা হিমালয় মানুষের জন্য একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও বিপদের উৎস। এর বরফ, তুষার ও বৃষ্টির পানি এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের নদীব্যবস্থাকে পুষ্ট করে। উর্বর সমভূমির পলি, জলবিদ্যুৎ, বন, জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটন এই পর্বতমালার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সক্রিয় চ্যুতি, খাড়া ঢাল, দুর্বল শিলা ও ভারী বৃষ্টির কারণে অঞ্চলটি ভূমিকম্প, ভূমিধস, শিলাধস ও আকস্মিক বন্যার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

হিমালয়ের সামনে বড় ভূমিকম্পের বিপদ এখনো শেষ হয়নি। কোনো অঞ্চলে দীর্ঘদিন বড় ভূমিকম্প না হওয়া নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়; বরং আটকে থাকা চ্যুতিতে চাপ জমে থাকার ইঙ্গিত হতে পারে। তবে শুধু অতীতের বিরতি দেখে ঠিক কোন দিন বা বছরে ভূমিকম্প ঘটবে তা বলা যায় না। বিজ্ঞানীরা ভূমির চলাচল, ক্ষুদ্র কম্পন, চ্যুতির মানচিত্র এবং পুরোনো ভূমিকম্পের চিহ্ন বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিত করেন। কার্যকর নির্মাণবিধি, নিরাপদ অবকাঠামো ও প্রস্তুতিই এই ঝুঁকি কমানোর বাস্তব উপায়।

হিমালয়ের গতি পরিমাপের জন্য বর্তমানে উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ণয়, ভূমির দূরসংবেদন, ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ এবং অত্যন্ত নিখুঁত উচ্চতা পরিমাপ ব্যবহার করা হয়। পর্বতের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত যন্ত্র বছরের পর বছর অবস্থানের ক্ষুদ্র পরিবর্তন নথিভুক্ত করে। উপগ্রহ থেকে পাঠানো সংকেতের সাহায্যে ভূমি অনুভূমিক ও উল্লম্বভাবে কতটা সরছে, তা মিলিমিটার পর্যায়েও নির্ণয় করা সম্ভব। ভূমিকম্পের আগে ও পরে নেওয়া তথ্য তুলনা করলে চ্যুতির কোন অংশ কতটা সরে গেছে, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।

শিলার বয়স ও উন্মোচনের ইতিহাস জানার জন্য বিজ্ঞানীরা পাথরের ভেতরে থাকা বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় উপাদান এবং মহাজাগতিক রশ্মির প্রভাবে তৈরি কণা বিশ্লেষণ করেন। নদীর পলি পরীক্ষা করে পাহাড় কত দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে তা অনুমান করা যায়। হিমবাহের পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের ধরন এবং ভূমিধসের মানচিত্রের সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে হিমালয়ের সামগ্রিক বৃদ্ধি বোঝা হয়। তাই একটি শৃঙ্গের উচ্চতা একবার মাপলেই পর্বতমালার পরিবর্তনের সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।

হিমালয় চিরকাল উঁচু হতে থাকবে কি না, তার উত্তর হলো—না। যত দিন ভারতীয় পাত ইউরেশিয়ার দিকে অগ্রসর হয়ে কার্যকর সংকোচন সৃষ্টি করবে, তত দিন পর্বত গঠনের প্রক্রিয়া চলতে পারে। কিন্তু পাতের গতি, সংঘর্ষের ধরন এবং গভীর ভূত্বকের আচরণ ভবিষ্যতে বদলাবে। একই সঙ্গে ক্ষয়ও থেমে থাকবে না। অত্যন্ত দীর্ঘ সময় পরে সংঘর্ষ দুর্বল হলে এবং ক্ষয় প্রাধান্য পেলে হিমালয় ধীরে ধীরে নিচু হবে। পৃথিবীর বহু প্রাচীন পর্বতমালা একসময় হিমালয়ের মতোই বিশাল ছিল, কিন্তু কোটি কোটি বছরের ক্ষয়ে এখন অনেক নিচু ও গোলাকার হয়ে গেছে।

একটি পর্বতমালা কত উঁচু হতে পারে, তারও প্রাকৃতিক সীমা রয়েছে। উচ্চতা বাড়লে পর্বতের ওজন ও ভূত্বকের চাপ বেড়ে যায়। খাড়া ঢালে ভূমিধস ও শিলাধস দ্রুত হয়, উঁচু এলাকায় হিমবাহের ক্ষয় বৃদ্ধি পায় এবং গভীরের উষ্ণ ও দুর্বল শিলা চাপের মধ্যে পাশের দিকে প্রবাহিত হতে পারে। ফলে উত্তোলনের শক্তি বাড়লেই পাহাড় সীমাহীনভাবে উঁচু হয় না। একটি পর্যায়ে উত্তোলন, মহাকর্ষীয় ভাঙন ও ক্ষয়ের মধ্যে গতিশীল ভারসাম্য তৈরি হয়।

হিমালয়ের বর্তমান রূপ আসলে দুটি বিপরীত শক্তির মুহূর্তকালীন ফল। পৃথিবীর গভীরের শক্তি তাকে ওপরে তুলছে, আর ভূপৃষ্ঠের পানি, বরফ, বাতাস ও মহাকর্ষ তাকে নিচু করছে। কোনো স্থানে উত্থান এগিয়ে রয়েছে, কোনো স্থানে ক্ষয়, আবার কোথাও দুটি প্রায় সমান। মানুষের সময়ের হিসাবে পরিবর্তনগুলো ক্ষুদ্র মনে হলেও হাজার বা লক্ষ বছরে কয়েক মিলিমিটারের বার্ষিক গতি বিশাল ভূদৃশ্য বদলে দিতে পারে।

পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালা এখনো উঁচু হচ্ছে, কারণ যে মহাদেশীয় সংঘর্ষ থেকে এর জন্ম হয়েছিল তা শেষ হয়ে যায়নি। ভারতীয় পাত আজও উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, ইউরেশীয় ভূত্বক তাকে প্রতিরোধ করছে এবং সেই প্রবল চাপ হিমালয়ের শিলাস্তরকে সংকুচিত ও উত্তোলিত করছে। কিন্তু হিমালয়ের কাহিনি শুধু বৃদ্ধির নয়; এটি একই সঙ্গে ভাঙন, ক্ষয়, ভূমিকম্প, নদী ও বরফের কাহিনি। এভারেস্টসহ প্রতিটি শৃঙ্গ এই অবিরাম প্রতিযোগিতার অংশ। তাই হিমালয়কে স্থির পাথরের দেয়াল হিসেবে নয়, পৃথিবীর গভীর শক্তিতে প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া এক জীবন্ত ভূদৃশ্য হিসেবে দেখলেই তার প্রকৃত বিস্ময় উপলব্ধি করা যায়।


আপনার পছন্দ হতে পারে