বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ডি. বি. কুপার রহস্য: বিমান ছিনতাইয়ের পর মুক্তিপণের টাকা নিয়ে প্যারাসুটে ঝাঁপ দেওয়া লোকটি কোথায় হারিয়ে গেল?

  • Author: Admin
  • August 28, 2026
ডি. বি. কুপার রহস্য: বিমান ছিনতাইয়ের পর মুক্তিপণের টাকা নিয়ে প্যারাসুটে ঝাঁপ দেওয়া লোকটি কোথায় হারিয়ে গেল?
ডি. বি. কুপার রহস্য

১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রে তখন থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের আগের দিন। পোর্টল্যান্ড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অসংখ্য যাত্রীর ভিড়ের মধ্যে একজন মধ্যবয়সী ব্যক্তি কাউন্টারে এসে নগদ অর্থ দিয়ে সিয়াটলগামী একটি বিমানের একমুখী টিকিট কিনলেন। টিকিটে তিনি নিজের নাম লিখিয়েছিলেন ড্যান কুপার। তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই সাধারণ চেহারার যাত্রী যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধ ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্রগুলোর একটিতে পরিণত হবেন।

লোকটির বয়স আনুমানিক চল্লিশের মাঝামাঝি। উচ্চতা প্রায় ছয় ফুট। পরনে ছিল গাঢ় রঙের ব্যবসায়িক পোশাক, সাদা জামা ও কালো টাই। চোখে ছিল গাঢ় চশমা। তাঁর আচরণে আতঙ্ক, উত্তেজনা কিংবা অস্বাভাবিক তাড়াহুড়োর লক্ষণ ছিল না। বরং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় তিনি ছিলেন শান্ত, সংযত এবং আশ্চর্যরকম ভদ্র। এই স্বাভাবিক আচরণই পরবর্তী ঘটনাকে আরও অস্বস্তিকর করে তোলে।

তিনি নর্থওয়েস্ট ওরিয়েন্ট এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৩০৫-এ উঠেছিলেন। বিমানটি ছিল বোয়িং ৭২৭। পোর্টল্যান্ড থেকে সিয়াটলের যাত্রা ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। কুপার বিমানের পেছনের দিকে একটি আসনে বসেন। বিমান আকাশে ওঠার পর তিনি পানীয় চান এবং স্বাভাবিক যাত্রীর মতোই বসে থাকেন।

কিছুক্ষণ পর তিনি ফ্লোরেন্স শ্যাফনার নামের এক বিমানসেবিকার হাতে একটি ছোট কাগজ দেন। প্রথমে শ্যাফনার ভেবেছিলেন, যাত্রীটি হয়তো নিজের যোগাযোগের ঠিকানা বা ব্যক্তিগত কোনো বার্তা দিয়েছেন। ফলে তিনি কাগজটি সঙ্গে সঙ্গে পড়েননি। তখন লোকটি শান্তভাবে তাঁকে জানায়, কাগজটি পড়া উচিত—কারণ তার কাছে একটি বোমা রয়েছে।

শ্যাফনার কাগজটি পড়ে তাঁর পাশে বসেন। কুপার তখন নিজের বহন করা একটি ব্যাগ সামান্য খুলে দেখান। ভেতরে লালচে রঙের কয়েকটি নল, তার এবং ব্যাটারির মতো বস্তু দেখা গিয়েছিল। সেটি সত্যিই কার্যকর বোমা ছিল কি না, তা কখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। কিন্তু পরিস্থিতিতে সেটিকে মিথ্যা ধরে নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।

এরপর কুপার নিজের দাবি জানালেন। তিনি চাইলেন দুই লাখ মার্কিন ডলার নগদ অর্থ, চারটি প্যারাসুট এবং সিয়াটলে বিমান অবতরণের পর জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা। সেই সময়ের হিসাবে দুই লাখ ডলার ছিল বিপুল অর্থ। বর্তমান ক্রয়ক্ষমতার বিচারে এর মূল্য বহু গুণ বেশি।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল চারটি প্যারাসুট চাওয়া। তদন্তকারীরা পরে ধারণা করেন, একাধিক প্যারাসুট চাওয়ার মাধ্যমে কুপার হয়তো কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে তিনি কোনো জিম্মিকেও সঙ্গে নিয়ে ঝাঁপ দিতে পারেন। ফলে তাঁকে নষ্ট বা ত্রুটিপূর্ণ প্যারাসুট দেওয়ার ঝুঁকি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এটি পরিকল্পিত কৌশল ছিল কি না, নিশ্চিত নয়, কিন্তু কুপারের পুরো অভিযানের মতো এই দাবিটিও তাঁর রহস্যময় প্রস্তুতির পরিচয় বহন করে।

বিমানটি সিয়াটলের দিকে এগিয়ে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে অবতরণ করেনি। কর্তৃপক্ষকে মুক্তিপণের টাকা ও প্যারাসুট সংগ্রহের সময় দিতে বিমানটিকে কিছুক্ষণ আকাশে ঘুরতে হয়। যাত্রীদের অধিকাংশই তখনও জানতেন না আসলে কী ঘটছে। তাঁদের বলা হয়েছিল, যান্ত্রিক সমস্যার কারণে অবতরণে বিলম্ব হচ্ছে।

কুপারের আচরণ এ সময়ও বিস্ময়করভাবে শান্ত ছিল। তিনি বিমানসেবিকাদের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলেন। তাঁর মধ্যে এমন কোনো অস্থিরতা দেখা যায়নি, যা সাধারণত মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ করতে থাকা একজন মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাশিত হতে পারে। যেন তিনি প্রতিটি ধাপ আগেই ভেবে রেখেছিলেন এবং শুধু পরিকল্পনার পরবর্তী পর্যায়ের অপেক্ষা করছিলেন।

সিয়াটলে বিমান অবতরণের পর তাঁর দাবি অনুযায়ী অর্থ ও প্যারাসুট সরবরাহ করা হয়। মুক্তিপণের অর্থ ছিল বিশ ডলারের নোটে। কর্তৃপক্ষ নোটগুলোর ক্রমিক নম্বর সংরক্ষণ করে রেখেছিল, যাতে পরে সেগুলো ব্যবহৃত হলে শনাক্ত করা যায়।

কুপার অর্থ ও প্যারাসুট হাতে পাওয়ার পর বিমানের যাত্রীদের ছেড়ে দেন। কয়েকজন বিমানকর্মীকে রেখে আবার বিমান ওড়ানোর নির্দেশ দেন। এবার তাঁর পরিকল্পনা ছিল দক্ষিণ দিকে যাওয়া। তিনি মেক্সিকো সিটির কথা বলেন, যদিও বিমানের জ্বালানি ও পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে মাঝপথে জ্বালানি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল।

এখানেই কুপারের পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি স্পষ্ট হতে শুরু করে।

বোয়িং ৭২৭ বিমানের পেছনের অংশে একটি বিশেষ সিঁড়ি ছিল, যা নিচের দিকে নামানো যেত। কুপার চেয়েছিলেন বিমানটি এমনভাবে উড়ুক, যাতে তিনি আকাশে থাকা অবস্থায় সেই পেছনের সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেন। তিনি কম উচ্চতায়, তুলনামূলক ধীর গতিতে এবং নির্দিষ্ট বিন্যাসে বিমান চালানোর নির্দেশ দেন।

এই নির্দেশগুলো দেখে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে—কুপার কি বিমান সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান রাখতেন?

তিনি বোয়িং ৭২৭-এর পেছনের সিঁড়ির সুবিধা জানতেন। বিমানটি কী ধরনের গতিতে এবং উচ্চতায় চললে ঝাঁপ দেওয়া সম্ভব হতে পারে, সে সম্পর্কেও তাঁর কিছু ধারণা ছিল বলে মনে হয়। এ কারণে বিভিন্ন সময়ে সন্দেহ করা হয়েছে, তিনি হয়তো সামরিক বাহিনী, বিমান পরিবহন, প্যারাসুট প্রশিক্ষণ বা বিমান শিল্পের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন।

সিয়াটল থেকে বিমানটি আবার উড্ডয়ন করে। বাইরে তখন রাত। আবহাওয়া ছিল প্রতিকূল। আকাশে মেঘ, নিচে বিস্তীর্ণ বন, পাহাড় এবং দুর্গম ভূখণ্ড। বাতাসও অনুকূল ছিল না। আধুনিক উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ণয়ের ব্যবস্থা তখন ছিল না। একজন মানুষ যদি এমন রাতে চলন্ত বিমান থেকে ঝাঁপ দেন, তাহলে ঠিক কোথায় অবতরণ করবেন তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন।

কুপার বিমানসেবিকাকে ককপিটে চলে যেতে বলেন। এরপর তিনি একা থেকে যান বিমানের পেছনের অংশে। কিছু সময় পর ককপিটের কর্মীরা লক্ষ্য করেন, পেছনের সিঁড়ির অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এরপর বিমানের গতিবিধিতেও এমন একটি পরিবর্তন অনুভূত হয়, যা থেকে ধারণা করা হয়—রাত প্রায় আটটার দিকে কোনো এক সময় কুপার পেছনের সিঁড়ি দিয়ে বিমান থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন।

তারপর তিনি যেন পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

বিমান পরে নিরাপদে অবতরণ করে। কিন্তু কুপার আর সেখানে ছিলেন না। তাঁর সঙ্গে চলে গেছে মুক্তিপণের অধিকাংশ অর্থ। বিমানে রয়ে যায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বস্তু, যার মধ্যে ছিল তাঁর কালো টাই। পরবর্তী দশকগুলোতে এই টাইও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামতে পরিণত হয়।

শুরু হয় বিশাল অনুসন্ধান অভিযান। সম্ভাব্য ঝাঁপ দেওয়ার অঞ্চল নির্ধারণের জন্য বিমানের গতি, উচ্চতা, বাতাসের দিক, সময় এবং সিঁড়ির অবস্থার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়। তদন্তকারীরা ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, নদী, দুর্গম পাহাড় এবং সম্ভাব্য অবতরণস্থল খুঁজতে থাকেন।

কিন্তু একটি মৌলিক সমস্যা ছিল—কেউ জানত না কুপার ঠিক কখন ঝাঁপ দিয়েছিলেন।

মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানও সম্ভাব্য অবতরণস্থলকে বহু দূরে সরিয়ে দিতে পারে। তার ওপর বাতাসের গতি ও দিক, প্যারাসুট খোলার সময় এবং ঝাঁপের পর তাঁর গতিপথ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য ছিল না। ফলে অনুসন্ধানের ক্ষেত্র ছিল বিশাল।

আরও রহস্যজনক বিষয় হলো তাঁর প্যারাসুট নির্বাচন। তাঁকে দেওয়া প্যারাসুটগুলোর মধ্যে তিনি এমন একটি প্যারাসুট ব্যবহার করেছিলেন, যা আধুনিক ক্রীড়ামূলক প্যারাসুটের মতো সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য ছিল না। তাঁর পোশাকও দুর্গম বনাঞ্চলে রাতের বেলা অবতরণের জন্য উপযুক্ত ছিল না। ব্যবসায়িক পোশাক ও সাধারণ জুতা পরে শীতল, ভেজা এবং দুর্গম অঞ্চলে নেমে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন হতে পারত।

এই কারণেই অনেক তদন্তকারী মনে করেছেন, কুপার হয়তো ঝাঁপ দেওয়ার পরই মারা গিয়েছিলেন। প্যারাসুট খুলতে ব্যর্থ হওয়া, গাছ বা পাথরে আঘাত পাওয়া, নদীতে পড়া, ঠান্ডায় মারা যাওয়া কিংবা দুর্গম বনে আহত হয়ে আটকে পড়া—সবই সম্ভব।

কিন্তু এখানেই আসে পাল্টা প্রশ্ন। যদি তিনি মারা গিয়ে থাকেন, তাঁর দেহ কোথায়? প্যারাসুট কোথায়? মুক্তিপণের ব্যাগ কোথায়?

বছরের পর বছর অনুসন্ধানেও এমন কোনো নিশ্চিত দেহাবশেষ পাওয়া যায়নি, যা কুপারের বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর ব্যবহৃত প্রধান প্যারাসুটও উদ্ধার হয়নি। মুক্তিপণের বিপুল অংশও আর কখনো নিশ্চিতভাবে প্রচলনে শনাক্ত করা যায়নি।

রহস্য আরও গভীর হয় ১৯৮০ সালে। ব্রায়ান ইনগ্রাম নামের এক শিশু পরিবারের সঙ্গে কলাম্বিয়া নদীর তীরে ঘুরতে গিয়ে বালুর মধ্যে পচে যাওয়া কয়েকটি অর্থের বান্ডিল খুঁজে পায়। পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলো কুপারকে দেওয়া মুক্তিপণের অর্থেরই অংশ। মোট প্রায় পাঁচ হাজার আটশ ডলার উদ্ধার হয়েছিল।

এই আবিষ্কার মামলাটিকে নতুন মাত্রা দেয়।

টাকা নদীর তীরে এল কীভাবে? কুপার কি নদীতে পড়েছিলেন? তাঁর সঙ্গে থাকা অর্থের ব্যাগ কি ছিঁড়ে গিয়েছিল? নদীর স্রোত কি টাকা অন্য কোথাও থেকে সেখানে নিয়ে এসেছিল? নাকি কুপার বেঁচে গিয়ে কোনো কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু টাকা সেখানে রেখে গিয়েছিলেন?

কোনো ব্যাখ্যাই পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়।

টাকার অবস্থান এবং নদীর প্রবাহ নিয়ে বহু বিশ্লেষণ হয়েছে। অর্থগুলো যেভাবে একসঙ্গে পাওয়া গিয়েছিল, তা ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তোলে। যদি সেগুলো দীর্ঘ সময় ধরে নদীতে ভেসে এসে থাকে, তাহলে কীভাবে সেগুলো ওই অবস্থায় জমা হলো—এ প্রশ্নের সহজ উত্তর পাওয়া যায়নি। আবার যদি কোনো ব্যক্তি সেগুলো সেখানে পুঁতে রেখে থাকে, তাহলে কেন মাত্র অল্প পরিমাণ মুক্তিপণের টাকা রেখে যাবে?

কুপারের ফেলে যাওয়া টাই থেকেও রহস্যের নতুন শাখা তৈরি হয়েছে। আধুনিক পরীক্ষায় টাইয়ের ওপর বিভিন্ন ক্ষুদ্র কণা ও শিল্পজাত পদার্থের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। কেউ কেউ এগুলোকে বিমান বা ধাতুপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন। তবে এসব তথ্য থেকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ডি. বি. কুপার হিসেবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।

আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো, রহস্যময় ব্যক্তিটি আসলে নিজের নাম ড্যান কুপার বলেছিলেন। সংবাদমাধ্যমে ভুল যোগাযোগের কারণে পরে তিনি “ডি. বি. কুপার” নামে পরিচিত হয়ে যান। সেই ভুল নামই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে গেছে।

পরবর্তী কয়েক দশকে অসংখ্য ব্যক্তিকে সম্ভাব্য কুপার হিসেবে সন্দেহ করা হয়েছে। কারও চেহারা প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার সঙ্গে মিলেছে, কারও সামরিক প্যারাসুট প্রশিক্ষণ ছিল, কেউ বোয়িং বিমানের প্রযুক্তি জানতেন, আবার কারও জীবনযাত্রা বা অতীতের সঙ্গে ঘটনার অদ্ভুত মিল পাওয়া গেছে। পরিবারের সদস্যরাও কখনো কখনো দাবি করেছেন যে তাঁদের মৃত আত্মীয়ই ছিলেন কুপার।

কিন্তু সন্দেহ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।

এই মামলায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সম্ভাব্য পরিচয়ের তালিকা যত বড় হয়েছে, নিশ্চিত প্রমাণ ততটাই অধরা থেকেছে। প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি, পুরোনো ছবি, পরিস্থিতিগত মিল কিংবা কারও রহস্যময় অতীত আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু এগুলো কোনো ব্যক্তিকে নিশ্চিতভাবে সেই বিমানের ছিনতাইকারী প্রমাণ করে না।

কুপার বেঁচে গিয়েছিলেন—এই ধারণার পক্ষেও কিছু যুক্তি রয়েছে। তাঁর পুরো কর্মকাণ্ডে যে আত্মবিশ্বাস দেখা যায়, তা থেকে মনে হতে পারে তিনি নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি বিমানের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করেছিলেন, নিজের পরিচয় গোপন রাখতে পেরেছিলেন এবং বিমান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কোনো নিশ্চিত চিহ্ন রেখে যাননি।

তবে অভিজ্ঞ প্যারাসুটবিদদের দৃষ্টিতে তাঁর ঝাঁপ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রাতের অন্ধকার, প্রতিকূল আবহাওয়া, অনির্দিষ্ট অবতরণস্থল, ভারী অর্থের ব্যাগ, অনুপযুক্ত পোশাক এবং সীমিত নিয়ন্ত্রণক্ষম প্যারাসুট—সব মিলিয়ে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।

আরও একটি বিষয় রহস্যকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। মুক্তিপণের নোটগুলোর ক্রমিক নম্বর নথিভুক্ত ছিল। কুপার যদি বেঁচে থেকে স্বাভাবিকভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতেন, তাহলে অন্তত কিছু নোট শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু উদ্ধার হওয়া নদীতীরের অর্থ ছাড়া মুক্তিপণের বিশাল অংশের নির্ভরযোগ্য সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এ থেকে তিনটি প্রধান সম্ভাবনা সামনে আসে। কুপার ঝাঁপে মারা গিয়ে থাকতে পারেন এবং অর্থ তাঁর সঙ্গে দুর্গম কোথাও হারিয়ে গেছে। তিনি বেঁচে থাকতে পারেন, কিন্তু অর্থ ব্যবহার না করে বা অত্যন্ত সতর্কভাবে ব্যবহার করে থাকতে পারেন। অথবা ঘটনার প্রকৃত গতিপথ সম্পর্কে এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে, যা তদন্তকারীরা কখনো জানতে পারেননি।

দীর্ঘ তদন্তে হাজার হাজার সূত্র যাচাই করা হয়। সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের অতীত খতিয়ে দেখা হয়, আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করা হয়, অর্থের গতিবিধি অনুসরণ করা হয় এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পুরোনো আলামত পুনর্বিশ্লেষণ করা হয়। তবু ছিনতাইকারীর প্রকৃত পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সক্রিয়ভাবে মামলাটিতে নতুন তদন্তমূলক সম্পদ ব্যয় করা বন্ধ করে দেয়। এর অর্থ এই নয় যে রহস্যটির সমাধান হয়ে গেছে। বরং কয়েক দশকের অনুসন্ধানের পরও এমন কোনো নির্ণায়ক প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা কুপারের পরিচয় বা পরিণতি নিশ্চিত করতে পারে।

এই ঘটনার পর বিমান নিরাপত্তাতেও পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে বোয়িং ৭২৭-এর পেছনের সিঁড়ি যাতে উড্ডয়নের সময় ব্যবহার করা না যায়, সে জন্য একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়, যা কুপারের ঘটনার সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে যায় যে সেটি পরবর্তীকালে তাঁর নামের সঙ্গেই পরিচিতি পায়।

কিন্তু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চেয়েও বড় হয়ে আছে মানুষের কৌতূহল। ডি. বি. কুপারের গল্পে এমন কিছু আছে, যা সাধারণ অপরাধের কাহিনিকে অতিক্রম করেছে। এখানে রয়েছে একটি যাত্রীবাহী বিমান, একটি রহস্যময় মানুষ, বোমার হুমকি, দুই লাখ ডলার, চারটি প্যারাসুট, ঝড়ো রাত এবং অন্ধকারের মধ্যে একটি অসম্ভব ঝাঁপ।

সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো—ঘটনার শেষ দৃশ্যটি কেউ দেখেনি।

কেউ কুপারকে বিমান থেকে ঝাঁপ দিতে দেখেনি। কেউ তাঁকে মাটিতে নামতে দেখেনি। কেউ নিশ্চিতভাবে তাঁর মৃতদেহ খুঁজে পায়নি। আবার কেউ এমন প্রমাণও দেখাতে পারেনি যে তিনি নিরাপদে পালিয়ে গিয়ে নতুন পরিচয়ে জীবন কাটিয়েছেন।

তাই ডি. বি. কুপারের রহস্য মূলত একটি মানুষের নিখোঁজ হওয়ার গল্প নয়; এটি প্রমাণের মাঝখানে থাকা বিশাল এক শূন্যতার গল্প।

একদিকে বিমানের টিকিট, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, ফেলে যাওয়া টাই, প্যারাসুট, নথিভুক্ত মুক্তিপণের অর্থ এবং নদীতীরে পাওয়া নোট—সবই বাস্তব। অন্যদিকে সেই বাস্তব প্রমাণগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মানুষটির প্রকৃত নাম, অতীত, উদ্দেশ্য এবং শেষ পরিণতি আজও অজানা।

তিনি কি কয়েক হাজার ফুট নিচে অন্ধকার বনে পড়ে মারা গিয়েছিলেন? তাঁর দেহ কি এমন কোনো দুর্গম স্থানে হারিয়ে গেছে, যেখানে কেউ কখনো খুঁজে পায়নি? নাকি তিনি সত্যিই প্যারাসুট খুলে নিরাপদে নেমেছিলেন, অর্থ নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে হেঁটে চলে গিয়েছিলেন এবং এরপর এমনভাবে নিজের পুরোনো পরিচয় মুছে ফেলেছিলেন যে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ তদন্তও তাঁকে খুঁজে বের করতে পারেনি?

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরও সেই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর নেই।

হয়তো কোনো অচিহ্নিত কবর, পুরোনো বাক্সে লুকিয়ে থাকা মুক্তিপণের নোট, ভুলে যাওয়া ব্যক্তিগত নথি কিংবা আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার নতুন ফল একদিন রহস্যের শেষ অংশটি সামনে আনবে। আবার এমনও হতে পারে, ডি. বি. কুপারের প্রকৃত পরিচয় তাঁর সঙ্গে চিরতরে হারিয়ে গেছে।

১৯৭১ সালের সেই ঝড়ো রাতে বোয়িং ৭২৭-এর পেছনের সিঁড়ি দিয়ে অন্ধকার আকাশের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পর একজন মানুষ ইতিহাসের দৃশ্যমান অংশ থেকে অদৃশ্য হয়ে যান। তিনি বেঁচেছিলেন নাকি মারা গিয়েছিলেন—তা আজও অজানা; আর ঠিক এই অনিশ্চয়তাই ডি. বি. কুপারকে অপরাধ ইতিহাসের সবচেয়ে স্থায়ী রহস্যগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।