বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ম্যান্টিস শ্রিম্পের চোখ এত বিশেষ কেন? মানুষের কল্পনার বাইরে তার দৃষ্টিশক্তির বিস্ময়কর রহস্য

  • Author: Admin
  • August 28, 2026
ম্যান্টিস শ্রিম্পের চোখ এত বিশেষ কেন? মানুষের কল্পনার বাইরে তার দৃষ্টিশক্তির বিস্ময়কর রহস্য
ম্যান্টিস শ্রিম্পের চোখ এত বিশেষ কেন?

সমুদ্রের অগভীর প্রবালপ্রাচীরের ভেতর তাকালে ম্যান্টিস শ্রিম্পকে প্রথম দর্শনে রঙিন ও অদ্ভুত এক সামুদ্রিক প্রাণী বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু তার শরীরের সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ শক্তিশালী আঘাতকারী অঙ্গ নয়, বরং মাথার ওপর থাকা দুটি সচল চোখ। প্রাণিজগতের দৃষ্টিব্যবস্থা নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে, তার মধ্যে ম্যান্টিস শ্রিম্পের চোখ বিজ্ঞানীদের বিশেষভাবে বিস্মিত করেছে। কারণ এই চোখ শুধু আলো ও রং শনাক্ত করার জন্য তৈরি সাধারণ কোনো ব্যবস্থা নয়। এর মধ্যে একই সঙ্গে রয়েছে অসংখ্য আলোকগ্রাহী ব্যবস্থা, অতিবেগুনি আলো শনাক্ত করার ক্ষমতা, সরল ও বৃত্তাকার মেরুকৃত আলো বোঝার বিশেষ কৌশল এবং এমন এক চোখের গঠন, যার প্রতিটি চোখ নিজেই গভীরতা নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় একাধিক দৃষ্টিক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

ম্যান্টিস শ্রিম্প আসলে চিংড়ি নয়। এটি স্টোমাটোপোডা বর্গের সামুদ্রিক খোলসধারী প্রাণী। পৃথিবীর উষ্ণ ও উপক্রান্তীয় সমুদ্রের অগভীর অঞ্চলে এর বহু প্রজাতি বাস করে। কোনো কোনো প্রজাতি প্রবালপ্রাচীরের গর্তে আশ্রয় নেয়, আবার কোনোটি বালুময় সমুদ্রতলে সুড়ঙ্গ তৈরি করে। শিকার ধরার কৌশল অনুযায়ী এদের মধ্যে শক্তিশালী আঘাতকারী এবং ধারালো অঙ্গ দিয়ে বিদ্ধকারী ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। কিন্তু তাদের বৈচিত্র্যময় শিকারকৌশলের পাশাপাশি বিবর্তনের আরেকটি অসাধারণ সৃষ্টি হলো দুটি অত্যন্ত জটিল যৌগিক চোখ।

মানুষের চোখে মূলত তিন ধরনের শঙ্কু আকৃতির আলোকগ্রাহী কোষ রং শনাক্ত করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এগুলো দৃশ্যমান আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রতি ভিন্ন মাত্রায় সংবেদনশীল। মস্তিষ্ক এই আলোকগ্রাহী কোষগুলো থেকে আসা সংকেতের তুলনা করে অসংখ্য রঙের অনুভূতি তৈরি করে। ম্যান্টিস শ্রিম্পের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিভিন্ন প্রজাতিতে চোখের গঠন ও আলোকগ্রাহী ব্যবস্থার পার্থক্য থাকলেও বিশেষভাবে অধ্যয়ন করা কিছু ম্যান্টিস শ্রিম্পে প্রায় বারো ধরনের বর্ণসংবেদনশীল আলোকগ্রাহী ব্যবস্থা পাওয়া যায়। মেরুকৃত আলো শনাক্তকারী ব্যবস্থাগুলো ধরলে এর দৃশ্যজগত আরও জটিল হয়ে ওঠে।

এই তথ্য থেকেই বহু বছর ধরে একটি জনপ্রিয় ধারণা ছড়িয়েছে—মানুষ যেখানে তিনটি প্রধান বর্ণগ্রাহী ব্যবস্থা ব্যবহার করে, সেখানে ম্যান্টিস শ্রিম্পের বারোটি থাকার অর্থ নিশ্চয়ই সে মানুষের তুলনায় অকল্পনীয় সংখ্যক রং দেখতে পায়। বাস্তবতা কিন্তু আরও আকর্ষণীয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এতগুলো আলোকগ্রাহী ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও খুব কাছাকাছি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রং আলাদা করার পরীক্ষায় কিছু ম্যান্টিস শ্রিম্প মানুষের চেয়ে ভালো নয়। অর্থাৎ বেশি সংখ্যক আলোকগ্রাহী ব্যবস্থা থাকা মানেই মানুষের তুলনায় অসীম সূক্ষ্ম রঙের পার্থক্য দেখার ক্ষমতা নয়।

এই আপাতবিরোধী বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই ম্যান্টিস শ্রিম্পের দৃষ্টিশক্তির অন্যতম বড় রহস্য লুকিয়ে আছে। মানুষের মস্তিষ্ক বিভিন্ন আলোকগ্রাহী কোষের সংকেত তুলনা ও বিশ্লেষণ করে রং নির্ণয় করে। ম্যান্টিস শ্রিম্পের ক্ষেত্রে ধারণা করা হয়, তার বহু বর্ণসংবেদনশীল ব্যবস্থা আলোকে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের শ্রেণিতে দ্রুত শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে। অর্থাৎ প্রতিটি দৃশ্যের রঙের সূক্ষ্ম পার্থক্য নিয়ে দীর্ঘ স্নায়বিক বিশ্লেষণের বদলে নির্দিষ্ট আলোকসংকেতকে দ্রুত চিহ্নিত করার সুবিধা তার থাকতে পারে। প্রবালপ্রাচীরের অত্যন্ত জটিল পরিবেশে দ্রুত শিকার, প্রতিদ্বন্দ্বী কিংবা সম্ভাব্য সঙ্গী শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।

ম্যান্টিস শ্রিম্পের চোখের দিকে খুব কাছ থেকে তাকালে এর মাঝামাঝি অংশে বিশেষ এক অঞ্চল দেখা যায়। একে সাধারণত মধ্যবর্তী বিশেষ অঞ্চল হিসেবে বোঝানো যায়। যৌগিক চোখের অসংখ্য ক্ষুদ্র আলোকগ্রাহী এককের মধ্যে এই অঞ্চলের কয়েকটি সারি অত্যন্ত বিশেষায়িত। এখানেই বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো এবং মেরুকরণের বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা অবস্থান করে। ফলে একটি ম্যান্টিস শ্রিম্পের চোখ শুধু একটি সাধারণ যৌগিক চোখ নয়; একই চোখের বিভিন্ন অংশ যেন আলাদা আলাদা দৃষ্টিসংক্রান্ত কাজের জন্য বিশেষভাবে গড়ে উঠেছে।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো অতিবেগুনি আলো শনাক্ত করার ক্ষমতা। মানুষের চোখ সাধারণভাবে অতিবেগুনি আলো দেখতে পারে না। কিন্তু অনেক ম্যান্টিস শ্রিম্প দৃশ্যমান আলোর বাইরের এই অংশের সংকেত গ্রহণ করতে পারে। কিছু প্রজাতির চোখে একাধিক ধরনের অতিবেগুনি সংবেদনশীলতা পাওয়া গেছে। তাদের চোখের বিশেষ আলোকগ্রাহী উপাদান ও ছাঁকনি ব্যবস্থা নির্দিষ্ট অতিবেগুনি তরঙ্গদৈর্ঘ্য আলাদা করতে সাহায্য করে।

সমুদ্রের পরিবেশে অতিবেগুনি আলো দেখা নিছক অতিরিক্ত একটি সুবিধা নয়। প্রাণীর শরীরের প্রতিফলন, সম্ভাব্য শিকার, নিজ প্রজাতির সদস্য কিংবা আশপাশের বিভিন্ন জৈব বস্তু দৃশ্যমান আলো ও অতিবেগুনি আলোতে একরকম দেখায় না। মানুষের কাছে একই রঙের মনে হওয়া দুটি বস্তু ম্যান্টিস শ্রিম্পের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন আলোকসংকেত তৈরি করতে পারে। ফলে আমরা যে প্রবালপ্রাচীর দেখি এবং ম্যান্টিস শ্রিম্প যে আলোকজগৎ অনুভব করে, দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য থাকতে পারে।

তবে তার চোখের সবচেয়ে অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য সম্ভবত রং নয়, বরং মেরুকৃত আলো শনাক্ত করার ক্ষমতা। আলোকে আমরা সাধারণত উজ্জ্বলতা ও রঙের মাধ্যমে অনুভব করি। কিন্তু আলোকতরঙ্গের কম্পনের দিকের মধ্যেও তথ্য থাকে। কোনো পরিবেশে আলো প্রতিফলিত, বিচ্ছুরিত কিংবা বিভিন্ন পদার্থের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করলে এর মেরুকরণ পরিবর্তিত হতে পারে। মানুষের খালি চোখ এই তথ্যের অধিকাংশ সরাসরি অনুভব করতে পারে না।

ম্যান্টিস শ্রিম্পের চোখ সেই অদৃশ্য তথ্য ব্যবহার করতে পারে। তার চোখের নির্দিষ্ট আলোকগ্রাহী গঠন সরল মেরুকৃত আলো শনাক্ত করতে সক্ষম। আরও বিস্ময়করভাবে কিছু ম্যান্টিস শ্রিম্প বৃত্তাকার মেরুকৃত আলোও শনাক্ত করতে পারে। প্রাণিজগতে এই ক্ষমতা অত্যন্ত বিরল। তাদের চোখে এমন বিশেষ কোষীয় গঠন রয়েছে যা বৃত্তাকার মেরুকরণের তথ্যকে এমন রূপে পরিবর্তিত করতে পারে, যা অন্য আলোকগ্রাহী অংশ শনাক্ত করতে পারে।

এটি বোঝার একটি সহজ উপায় হলো কল্পনা করা যে আমাদের পরিচিত দৃশ্যের ওপর আরেকটি অদৃশ্য নকশা আঁকা রয়েছে। আমরা একটি মাছ, প্রবাল কিংবা চকচকে খোলস দেখি তার রং ও উজ্জ্বলতার মাধ্যমে। ম্যান্টিস শ্রিম্প একই বস্তু থেকে আসা আলোর মেরুকরণের বৈশিষ্ট্যও শনাক্ত করতে পারে। ফলে পটভূমির সঙ্গে রঙের দিক থেকে মিশে থাকা কোনো বস্তু মেরুকরণের কারণে তার কাছে আলাদা হয়ে উঠতে পারে।

এই ক্ষমতার সঙ্গে তাদের নিজেদের শরীরের সংকেতেরও সম্পর্ক রয়েছে। কিছু ম্যান্টিস শ্রিম্পের শরীরের নির্দিষ্ট অংশ বিশেষ ধরনের মেরুকৃত আলো প্রতিফলিত করতে পারে। ফলে এমন সম্ভাবনা রয়েছে যে মেরুকরণ তাদের জন্য এক ধরনের গোপন দৃশ্যসংকেত হিসেবে কাজ করে। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে সতর্ক করা, নিজের পরিচয় প্রকাশ করা কিংবা প্রজননের সময় সঙ্গীকে সংকেত দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হতে পারে। আশপাশের বহু শিকারি যদি এই সংকেত দেখতে না পারে, তাহলে একই প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য এটি বিশেষ সুবিধাজনক ব্যবস্থা।

ম্যান্টিস শ্রিম্পের দুটি চোখ মাথার ওপর আলাদা আলাদা ডাঁটার সঙ্গে যুক্ত। ফলে দুটি চোখ প্রায় স্বাধীনভাবে নড়াচড়া করতে পারে। একটি চোখ একদিকে তাকিয়ে থাকলেও অন্যটি ভিন্ন দিকে ঘুরতে পারে। কখনো তাদের চোখের নড়াচড়া মানুষের কাছে এলোমেলো বলে মনে হয়। কিন্তু এই স্বাধীন গতিশীলতা চারপাশের জটিল পরিবেশ দ্রুত পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মানুষের গভীরতা বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো দুই চোখ থেকে সামান্য ভিন্ন দুটি ছবি পাওয়া এবং মস্তিষ্কে সেগুলোর তুলনা করা। কিন্তু ম্যান্টিস শ্রিম্পের প্রতিটি চোখের গঠনেই এমন ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে একই বস্তু চোখটির একাধিক অঞ্চলের দৃষ্টিক্ষেত্রে পড়তে পারে। অর্থাৎ একটি চোখ দিয়েই সে দূরত্ব ও গভীরতা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। একে একচক্ষু ত্রিমাত্রিক দৃষ্টির অত্যন্ত বিশেষায়িত রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এখানে তার চোখের মধ্যবর্তী বিশেষ অঞ্চল আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চোখের ওপরের ও নিচের অংশের দৃষ্টিক্ষেত্রের সঙ্গে মধ্যবর্তী অঞ্চলের বিভিন্ন অংশের দৃষ্টিক্ষেত্র মিলিত হয়ে একই বস্তু সম্পর্কে একাধিক আলোকসংকেত সংগ্রহ করতে পারে। শিকার কত দূরে রয়েছে তা দ্রুত নির্ধারণ করা ম্যান্টিস শ্রিম্পের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কিছু প্রজাতির আক্রমণ এত দ্রুত ঘটে যে ভুল দূরত্ব অনুমান করলে শিকার পালিয়ে যেতে পারে।

শিকার ধরার সময় দৃষ্টিশক্তি ও আঘাতের সমন্বয় তাই অসাধারণ। বিশেষ করে শক্তিশালী আঘাতকারী ম্যান্টিস শ্রিম্প শামুক, কাঁকড়া ও অন্যান্য শক্ত খোলসের প্রাণীর ওপর অত্যন্ত দ্রুত আঘাত হানতে পারে। শিকারের অবস্থান, দূরত্ব ও উপযুক্ত আঘাতের স্থান নির্ধারণে কার্যকর দৃষ্টিব্যবস্থা তাকে সাহায্য করে। অন্যদিকে ধারালো অঙ্গ দিয়ে শিকার বিদ্ধ করা প্রজাতির ক্ষেত্রেও দ্রুতগতির মাছ বা নরমদেহী প্রাণীর অবস্থান নির্ধারণে দৃষ্টির নির্ভুলতা গুরুত্বপূর্ণ।

ম্যান্টিস শ্রিম্পের চোখের আরেকটি চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো চোখের ভেতরেই আলোর ওপর প্রাথমিক পর্যায়ের জটিল প্রক্রিয়াকরণ। কিছু প্রজাতিতে আলোকগ্রাহী কোষের ওপর বিশেষ রঞ্জক ছাঁকনি থাকে। আলো এসব ছাঁকনির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেছে নেওয়া বা বাদ দেওয়া সম্ভব হয়। ফলে একই ধরনের আলোকসংবেদনশীল অণু থেকেও ভিন্ন ভিন্ন বর্ণগত প্রতিক্রিয়া তৈরি করা যায়। প্রকৃতি যেন একটি সাধারণ আলোকগ্রাহী ব্যবস্থার সামনে বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম ছাঁকনি বসিয়ে অনেকগুলো বিশেষায়িত গ্রহণপথ তৈরি করেছে।

এ কারণেই ম্যান্টিস শ্রিম্পের চোখকে শুধু একটি জীবন্ত আলোকগ্রাহী যন্ত্র বললে এর জটিলতা পুরোপুরি বোঝানো যায় না। এখানে আলো সংগ্রহ, তরঙ্গদৈর্ঘ্য নির্বাচন, মেরুকরণ বিশ্লেষণ এবং দৃষ্টিক্ষেত্র ভাগ করার মতো একাধিক কাজ চোখের গঠনগত স্তরেই সম্পন্ন হচ্ছে। চোখটি যেন একই সঙ্গে রং শনাক্তকারী, অতিবেগুনি পর্যবেক্ষক, মেরুকরণ বিশ্লেষক এবং দূরত্ব নির্ণায়ক।

কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—এত জটিল চোখের প্রয়োজন হলো কেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে ম্যান্টিস শ্রিম্পের আবাসস্থলের দিকে তাকাতে হয়। প্রবালপ্রাচীর পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল দৃশ্যপরিবেশগুলোর একটি। এখানে অসংখ্য রঙের প্রবাল, শৈবাল, মাছ, খোলসধারী প্রাণী, ছায়া, সূর্যালোকের পরিবর্তন, পানিতে আলোর বিচ্ছুরণ এবং প্রতিফলন একই সঙ্গে কাজ করে। এমন পরিবেশে শুধু রং নয়, আলোর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য থেকে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করতে পারা বিশাল বিবর্তনীয় সুবিধা দিতে পারে।

একই সঙ্গে ম্যান্টিস শ্রিম্প অত্যন্ত অঞ্চলসচেতন প্রাণী হতে পারে। আশ্রয়স্থল নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, শিকার শনাক্তকরণ, অন্য ম্যান্টিস শ্রিম্পের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং প্রজনন—সব ক্ষেত্রেই দ্রুত ও নির্ভুল দৃশ্যসংকেত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের চোখের বিবর্তনকে শুধু সুন্দর রং দেখার ক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। বরং এটি সম্ভবত একটি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বিশেষায়িত জৈব তথ্যসংগ্রহ ব্যবস্থা।

তাদের চোখ বিজ্ঞানীদের প্রযুক্তিগত দিক থেকেও আগ্রহী করেছে। মেরুকৃত আলো শনাক্তকারী যন্ত্র চিকিৎসাবিজ্ঞান, সমুদ্র পর্যবেক্ষণ, পদার্থ শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন আলোকচিত্র প্রযুক্তিতে কাজে লাগতে পারে। ম্যান্টিস শ্রিম্পের ক্ষুদ্র চোখ কীভাবে বিভিন্ন ধরনের মেরুকরণ দক্ষতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করে, তা বোঝা ভবিষ্যতের ক্ষুদ্রাকৃতির আলোকসংবেদী যন্ত্র তৈরিতে ধারণা দিতে পারে। প্রকৃতির কোটি কোটি বছরের বিবর্তন অনেক সময় এমন প্রকৌশলসমাধান তৈরি করেছে, যা মানুষের প্রযুক্তি এখনো অনুকরণ করার চেষ্টা করছে।

তবে ম্যান্টিস শ্রিম্প সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি মনে রাখা জরুরি। তাকে এমন প্রাণী হিসেবে কল্পনা করা ঠিক নয়, যে মানুষের তুলনায় শুধু অসংখ্য গুণ বেশি রঙিন পৃথিবী দেখে। তার বিশেষত্ব আরও গভীরে। মানুষের চোখ ও মস্তিষ্ক যেখানে তিনটি প্রধান বর্ণগ্রাহী সংকেতের তুলনা করে অত্যন্ত সূক্ষ্ম রঙের অনুভূতি তৈরি করে, সেখানে ম্যান্টিস শ্রিম্পের চোখ আলোর বিভিন্ন অংশকে বহু বিশেষায়িত পথে শনাক্ত করে এবং এমন তথ্যও গ্রহণ করে, যা মানুষের স্বাভাবিক দৃষ্টির সম্পূর্ণ বাইরে।

ফলে তার অনুভূত জগৎ কেমন, সেটি মানুষের পক্ষে সরাসরি কল্পনা করাও কঠিন। আমরা অতিবেগুনি আলোকে একটি কাল্পনিক রং দিয়ে দেখাতে পারি, মেরুকরণের পার্থক্যকে কম্পিউটারের সাহায্যে দৃশ্যমান করতে পারি, কিংবা বৈজ্ঞানিক যন্ত্র দিয়ে সেই সংকেত পরিমাপ করতে পারি। কিন্তু এগুলো ম্যান্টিস শ্রিম্পের প্রকৃত দৃষ্টিগত অভিজ্ঞতার সমতুল্য নয়। কারণ আমাদের মস্তিষ্ক এমন অনুভূতি তৈরির জন্য বিবর্তিত হয়নি।

এই ছোট সামুদ্রিক প্রাণী তাই দৃষ্টিশক্তি সম্পর্কে মানুষের একটি মৌলিক ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। আমরা সাধারণত মনে করি, চোখের কাজ হলো পৃথিবীর একটি ছবি তৈরি করা। বাস্তবে কোনো প্রাণীই পৃথিবীকে সম্পূর্ণভাবে দেখে না। প্রত্যেক প্রজাতির চোখ তার বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো বেছে নেওয়ার মতো করে বিবর্তিত হয়েছে। মৌমাছি অতিবেগুনি ফুলের নকশা দেখতে পারে, অনেক সাপ অবলোহিত বিকিরণের সাহায্যে শিকার শনাক্ত করতে পারে, আর ম্যান্টিস শ্রিম্প আলোকে এমন কয়েকটি মাত্রায় বিশ্লেষণ করে যেগুলো আমাদের দৈনন্দিন দৃশ্যজগতেই নেই।

ম্যান্টিস শ্রিম্পের চোখের প্রকৃত বিস্ময় তাই সে মানুষের চেয়ে শুধু ‘বেশি রং’ দেখে—এই সরল ধারণায় নয়। বিস্ময়টি হলো, আলো থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের একটি দৃষ্টিব্যবস্থা তৈরি করেছে। অতিবেগুনি সংকেত, দৃশ্যমান বর্ণালি, সরল মেরুকরণ, বৃত্তাকার মেরুকরণ, স্বাধীনভাবে ঘোরানো চোখ এবং একই চোখে গভীরতা নির্ণয়ের বিশেষ ব্যবস্থা—সবকিছু মিলিয়ে তার দৃষ্টি প্রাণিজগতের অন্যতম অস্বাভাবিক সংবেদনব্যবস্থা।

সমুদ্রের প্রবালপ্রাচীরে একটি ম্যান্টিস শ্রিম্প যখন তার দুটি অদ্ভুত চোখ ঘুরিয়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে, তখন সে সম্ভবত এমন সব আলোকসংকেত সংগ্রহ করছে যার বড় একটি অংশ আমাদের চোখের সামনে থেকেও আমাদের কাছে অদৃশ্য। একই সমুদ্র, একই প্রবাল, একই সূর্যালোক—তবু তার দৃশ্যজগৎ আমাদের জগতের অনুলিপি নয়। আর এখানেই ম্যান্টিস শ্রিম্পের চোখের সবচেয়ে গভীর রহস্য: পৃথিবী দেখতে কেমন, তার কোনো একক উত্তর নেই; উত্তরটি নির্ভর করে কোন প্রাণীর চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখা হচ্ছে তার ওপর।