বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের অন্তর্ধান: পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে গিয়ে বিখ্যাত বৈমানিকের কী হয়েছিল?

  • Author: Admin
  • August 28, 2026
অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের অন্তর্ধান: পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে গিয়ে বিখ্যাত বৈমানিকের কী হয়েছিল?
অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের অন্তর্ধান

১৯৩৭ সালের ২ জুলাই। প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে আকাশ আর সমুদ্র যেন একাকার হয়ে আছে। নিচে হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে শুধু পানি, সামনে একটি অতি ক্ষুদ্র দ্বীপ—হাওল্যান্ড। সেই দ্বীপে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত নারী বৈমানিকদের একজন অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন অভিজ্ঞ দিকনির্দেশক ফ্রেড নুনান। তাঁদের উড়োজাহাজে জ্বালানি ক্রমেই কমে আসছে, অথচ কাঙ্ক্ষিত দ্বীপটি চোখে পড়ছে না। উপকূলরক্ষী জাহাজ থেকে বারবার বেতার যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। তারপর একসময় ইয়ারহার্টের কণ্ঠ ভেসে আসে—তাঁরা হাওল্যান্ডের কাছাকাছি থাকার কথা মনে করছেন, কিন্তু দ্বীপটি দেখতে পাচ্ছেন না।

এর কিছুক্ষণ পরই পৃথিবীর সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

তারপর থেকে অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট, ফ্রেড নুনান কিংবা তাঁদের লকহিড ইলেকট্রা উড়োজাহাজের এমন কোনো ধ্বংসাবশেষ নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি, যা তাঁদের শেষ পরিণতি নিয়ে সব প্রশ্নের অবসান ঘটাতে পারে। আধুনিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে তাই তাঁর অন্তর্ধান শুধু একটি দুর্ঘটনার ঘটনা নয়; এটি হয়ে উঠেছে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটি।

অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের জন্ম ১৮৯৭ সালের ২৪ জুলাই, যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস অঙ্গরাজ্যের অ্যাটচিসনে। এমন এক সময়ে তিনি বড় হচ্ছিলেন, যখন বিমান চালানোই ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পেশা, আর নারী বৈমানিক হওয়া ছিল আরও অস্বাভাবিক। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে প্রচলিত সামাজিক প্রত্যাশার বাইরে যাওয়ার প্রবণতা ছিল। তবে বিমান চালনার প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ তৈরি হয় যৌবনে। প্রথমবার বিমানে চড়ার অভিজ্ঞতার পর তিনি বুঝতে পারেন, আকাশই হতে যাচ্ছে তাঁর জীবনের প্রধান ক্ষেত্র।

উড্ডয়নের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর খুব দ্রুতই তিনি নিজেকে ব্যতিক্রমী বৈমানিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯২৮ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে আকাশপথে আটলান্টিক মহাসাগর অতিক্রমকারী একটি অভিযানের অংশ হন, যদিও সে যাত্রায় তিনি মূল চালক ছিলেন না। কিন্তু ১৯৩২ সালে তিনি একাই আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। নিউফাউন্ডল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু করে প্রায় পনেরো ঘণ্টার কঠিন উড্ডয়নের পর তিনি উত্তর আয়ারল্যান্ডে অবতরণ করেন। এককভাবে আটলান্টিক অতিক্রমকারী প্রথম নারী বৈমানিক হিসেবে তাঁর নাম বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু ইয়ারহার্ট শুধু খ্যাতি অর্জনের জন্য উড়তেন না। বিমান চলাচলের সম্ভাবনা, নারীদের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘপথের উড্ডয়নের সীমা প্রসারিত করার ব্যাপারে তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। একের পর এক নতুন কীর্তি স্থাপনের পর তাঁর সামনে আসে আরও বড় একটি লক্ষ্য—পৃথিবী প্রদক্ষিণ।

এর আগে বৈমানিকেরা আকাশপথে পৃথিবী ঘুরে এসেছিলেন। কিন্তু ইয়ারহার্ট যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেটি বিষুবরেখার কাছাকাছি হওয়ায় অত্যন্ত দীর্ঘ এবং কঠিন ছিল। পরিকল্পনা সফল হলে তাঁর যাত্রাপথের দৈর্ঘ্য দাঁড়াত প্রায় সাতচল্লিশ হাজার কিলোমিটার। এই অভিযানের জন্য ব্যবহৃত হয় বিশেষভাবে পরিবর্তিত লকহিড ইলেকট্রা ১০ই দুই ইঞ্জিনের উড়োজাহাজ। দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রমের জন্য এতে অতিরিক্ত জ্বালানি বহনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

তাঁর সঙ্গে দিকনির্দেশক হিসেবে ছিলেন ফ্রেড নুনান। নুনান ছিলেন দীর্ঘ সমুদ্রপথে আকাশযাত্রার দিক নির্ধারণে অত্যন্ত অভিজ্ঞ। তখনকার যুগে আজকের মতো কৃত্রিম উপগ্রহনির্ভর অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থা ছিল না। সূর্য ও নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ, মানচিত্র, সময়, গতি, দিক এবং বেতার সংকেতের ওপর নির্ভর করেই বিশাল সমুদ্রের ওপর উড়োজাহাজের অবস্থান নির্ণয় করতে হতো। সামান্য ভুলও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অবস্থানে বড় ব্যবধান তৈরি করতে পারত।

ইয়ারহার্টের প্রথম পৃথিবী প্রদক্ষিণ প্রচেষ্টা শুরু হয় ১৯৩৭ সালের মার্চে। পরিকল্পনা ছিল পশ্চিমমুখী যাত্রা। কিন্তু হাওয়াই থেকে উড্ডয়নের সময় উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায় সেই প্রচেষ্টা বাতিল করতে হয়। উড়োজাহাজটি মেরামত করা হয় এবং নতুন পরিকল্পনায় এবার পূর্বদিকে পৃথিবী প্রদক্ষিণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১৯৩৭ সালের ১ জুন ইয়ারহার্ট ও নুনান যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি থেকে যাত্রা শুরু করেন। এরপর দক্ষিণ আমেরিকা, আটলান্টিক, আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল অতিক্রম করে তাঁরা নিউ গিনির লায়েতে পৌঁছান। ততক্ষণে অভিযানের বিশাল অংশ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার কিলোমিটার পথ তাঁরা অতিক্রম করে ফেলেছিলেন।

কিন্তু সামনে অপেক্ষা করছিল অভিযানের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশগুলোর একটি।

লায়ে থেকে তাঁদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত ক্ষুদ্র হাওল্যান্ড দ্বীপ। দ্বীপটির দৈর্ঘ্য মাত্র কয়েক কিলোমিটার। অসীম সমুদ্রের মধ্যে আকাশ থেকে এমন একটি ছোট ও নিচু দ্বীপ খুঁজে বের করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। লায়ে থেকে হাওল্যান্ড পর্যন্ত সরল দূরত্বই ছিল চার হাজার কিলোমিটারের বেশি। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় সমুদ্রের ওপর উড়ে শেষ মুহূর্তে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অবস্থান নির্ণয় করতে হতো।

১৯৩৭ সালের ২ জুলাই স্থানীয় সময় সকালে ইয়ারহার্ট ও নুনান লায়ে থেকে উড্ডয়ন করেন। উড়োজাহাজে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি নেওয়া হয়েছিল। আবহাওয়া পুরোপুরি প্রতিকূল না হলেও পথে মেঘ ও পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি দিকনির্ণয়ের কাজ কঠিন করে তুলতে পারত। বিশেষ করে নুনানের জন্য সূর্য বা নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের সুযোগ সীমিত হলে অবস্থান নির্ধারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

হাওল্যান্ড দ্বীপের কাছে অবস্থান করছিল মার্কিন উপকূলরক্ষী বাহিনীর জাহাজ ইটাসকা। জাহাজটির কাজ ছিল ইয়ারহার্টকে বেতার সংকেত দিয়ে দ্বীপের অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করা। দ্বীপ থেকেও ধোঁয়ার স্তম্ভ তৈরি করা হয়েছিল, যাতে আকাশ থেকে অবস্থান বোঝা সহজ হয়।

কাগজে পরিকল্পনাটি যথেষ্ট কার্যকর মনে হলেও বাস্তবে যোগাযোগব্যবস্থায় গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়।

ইয়ারহার্টের পাঠানো বেশ কয়েকটি বেতার বার্তা ইটাসকা গ্রহণ করতে পারছিল, কিন্তু ইয়ারহার্ট জাহাজটির পাঠানো অধিকাংশ বার্তা শুনতে পাচ্ছিলেন না বা সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছিলেন না। কোন কম্পাঙ্কে কখন যোগাযোগ হবে, দিকনির্ণয়ের জন্য কোন সংকেত ব্যবহার করা হবে এবং উড়োজাহাজের বেতার যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা—এসব বিষয় নিয়ে অসামঞ্জস্য ছিল।

শেষ পর্যায়ে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ইয়ারহার্ট জানান যে তাঁরা হাওল্যান্ড দ্বীপের কাছাকাছি থাকার কথা, কিন্তু দ্বীপটি দেখতে পাচ্ছেন না। তাঁর একটি বহুল আলোচিত বার্তায় জানানো হয় যে জ্বালানি কমে আসছে এবং তাঁরা জাহাজটিকে দেখতে পাচ্ছেন না।

সমস্যাটি ছিল ভয়াবহ। হাওল্যান্ড এত ছোট যে কয়েক দশ কিলোমিটার দূর দিয়ে চলে গেলেও সেটি সহজে চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। আর সমুদ্রের ওপর কোনো পরিচিত ভূচিহ্ন না থাকায় নিজের অবস্থানের ভুল দ্রুত সংশোধন করার সুযোগও ছিল না।

ইয়ারহার্টের শেষ দিকের গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলোর একটিতে তিনি একটি অবস্থানরেখা ধরে উড়ছেন বলে জানান। এর অর্থ সাধারণভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে নুনান সূর্যের অবস্থান ব্যবহার করে একটি দিকরেখা নির্ণয় করেছিলেন এবং তাঁরা সেই রেখা বরাবর হাওল্যান্ড খোঁজার চেষ্টা করছিলেন। এই শেষ অবস্থানরেখাই পরবর্তী কয়েক দশকের অনুসন্ধান ও তত্ত্বের কেন্দ্রীয় সূত্রগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

এরপর যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

ইটাসকা প্রথমে ধরে নিয়েছিল ইয়ারহার্ট হয়তো কাছাকাছিই রয়েছেন। জাহাজটি দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করে। পরে মার্কিন নৌবাহিনী ও অন্যান্য সংস্থা বিশাল অনুসন্ধান অভিযানে অংশ নেয়। জাহাজ ও উড়োজাহাজ দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তল্লাশি করা হয়। সে সময়ের হিসাবে অভিযানটি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ব্যাপক।

কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না।

উড়োজাহাজের কোনো নিশ্চিত ডানা, ইঞ্জিন, জ্বালানি ট্যাংক কিংবা ভাসমান ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা যায়নি। ইয়ারহার্ট বা নুনানের কোনো নিশ্চিত ব্যক্তিগত সামগ্রীও পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৩৯ সালে অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টকে আইনগতভাবে মৃত ঘোষণা করা হয়।

সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাটি তুলনামূলকভাবে সরল—ইয়ারহার্ট ও নুনান হাওল্যান্ড দ্বীপ খুঁজে পাননি, উড়োজাহাজের জ্বালানি শেষ হয়ে যায় এবং সেটি প্রশান্ত মহাসাগরে বিধ্বস্ত হয়। বিমান চলাচলের গবেষকদের বড় একটি অংশ এই ব্যাখ্যাকেই সম্ভাব্য মনে করেন।

এই ধারণার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে। শেষ বেতার বার্তাগুলো থেকে বোঝা যায় তাঁরা হাওল্যান্ডের সন্ধান করছিলেন এবং পরিস্থিতি ক্রমেই সংকটজনক হচ্ছিল। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় তাঁদের জ্বালানিও সীমিত পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার কথা। যদি তাঁরা দ্বীপ থেকে সামান্য দূরেও অবস্থান করে থাকেন, শেষ পর্যন্ত জ্বালানি শেষ হয়ে সমুদ্রে নামতে বাধ্য হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়—তাহলে ধ্বংসাবশেষ কোথায়?

প্রশান্ত মহাসাগরের ওই অঞ্চল অত্যন্ত গভীর। একটি উড়োজাহাজ সমুদ্রে পড়লে তার বড় অংশ দ্রুত ডুবে যেতে পারে। ১৯৩৭ সালের অনুসন্ধান প্রযুক্তিও আজকের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত ছিল। সঠিক দুর্ঘটনাস্থল জানা না থাকলে হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার গভীর সমুদ্রতল থেকে একটি অপেক্ষাকৃত ছোট উড়োজাহাজ খুঁজে পাওয়া এখনো কঠিন, তখন তো আরও বেশি ছিল।

আরেকটি আলোচিত তত্ত্ব অনুযায়ী, হাওল্যান্ড খুঁজে না পেয়ে ইয়ারহার্ট ও নুনান দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এগিয়ে নিকুমারোরো নামের একটি দ্বীপে পৌঁছাতে পারেন। তখন দ্বীপটি গার্ডনার দ্বীপ নামে পরিচিত ছিল। ধারণাটির সমর্থকেরা মনে করেন, শেষ অবস্থানরেখা ধরে এগোলে ওই অঞ্চলে পৌঁছানো সম্ভব ছিল এবং ইয়ারহার্ট হয়তো দ্বীপের প্রবালপ্রাচীরের সমতল অংশে উড়োজাহাজ নামিয়েছিলেন।

পরবর্তী সময়ে নিকুমারোরোতে কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়, যেগুলো নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে। কাচের টুকরা, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রীর সম্ভাব্য অংশ এবং মানুষের হাড়ের পুরোনো আবিষ্কারকে কেন্দ্র করে ইয়ারহার্ট সেখানে কিছুদিন বেঁচে ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু এসবের কোনোটিই এমন নিশ্চিত প্রমাণ হয়ে ওঠেনি, যার মাধ্যমে বলা যায় যে ইয়ারহার্ট সত্যিই নিকুমারোরোতে পৌঁছেছিলেন।

বিশেষ করে মানুষের হাড়ের ঘটনাটি রহস্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ১৯৪০ সালে দ্বীপে কিছু মানবদেহের অস্থি পাওয়া গিয়েছিল। সে সময়কার পরীক্ষায় সেগুলো একজন পুরুষের বলে ধারণা করা হয়। পরে মূল হাড়গুলো হারিয়ে যায়। বহু বছর পর সংরক্ষিত পরিমাপ পুনর্বিশ্লেষণ করে কেউ কেউ দাবি করেন, সেগুলো ইয়ারহার্টের শারীরিক গঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। অন্য গবেষকেরা আবার এই সিদ্ধান্তের পদ্ধতি ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে এটি আকর্ষণীয় সূত্র হলেও চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।

ইয়ারহার্টের অন্তর্ধানকে ঘিরে আরও নাটকীয় তত্ত্বও জন্ম নিয়েছে। একটি বহুল প্রচারিত ধারণা হলো, তিনি জাপানের নিয়ন্ত্রিত কোনো দ্বীপের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন এবং জাপানি বাহিনী তাঁকে আটক করেছিল। কেউ কেউ আরও দাবি করেছেন, তাঁর পৃথিবী প্রদক্ষিণ অভিযান আসলে গোপন গোয়েন্দা তৎপরতার আড়াল ছিল।

এই তত্ত্বগুলো জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও এগুলোর পক্ষে শক্ত, ধারাবাহিক এবং যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই। বিভিন্ন সময়ে ছবি, প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি কিংবা নথিকে ইয়ারহার্টের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর ব্যাখ্যা নিয়ে গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কয়েক দশক পর দেওয়া প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি এবং অস্পষ্ট আলোকচিত্রকে ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে গবেষকেরা স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ইয়ারহার্টের উড়োজাহাজে থাকা বেতার সরঞ্জাম এবং তাঁর যোগাযোগ পদ্ধতি কি দুর্ঘটনায় বড় ভূমিকা রেখেছিল?

শেষ যাত্রার আগে উড়োজাহাজের যোগাযোগব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছিল। দীর্ঘ তারযুক্ত নিম্ন কম্পাঙ্কের অ্যান্টেনা অপসারণ করা হয়েছিল। ফলে নির্দিষ্ট ধরনের বেতার দিকনির্ণয় সহায়তা ব্যবহারের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ইয়ারহার্ট ও ইটাসকার মধ্যে যোগাযোগের কম্পাঙ্ক এবং সংকেত ব্যবহারে যে অসামঞ্জস্য দেখা দেয়, তা শেষ মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ইটাসকা ইয়ারহার্টের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছিল—কখনো কখনো এত শক্তিশালীভাবেই যে মনে হচ্ছিল উড়োজাহাজটি খুব দূরে নয়। কিন্তু শুধু কণ্ঠের শক্তি থেকে নির্ভুল দিক বা দূরত্ব নির্ধারণ করা সম্ভব ছিল না। অন্যদিকে ইয়ারহার্ট যদি জাহাজের সংকেত সঠিকভাবে গ্রহণ করতে না পারেন, তবে তাঁর কাছে হাওল্যান্ডের সঠিক দিক বের করার কার্যকর উপায় অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে।

এখানেই ঘটনাটির সবচেয়ে মর্মান্তিক দিকটি ফুটে ওঠে। সম্ভবত ইয়ারহার্ট ও নুনান তাঁদের গন্তব্য থেকে খুব বেশি দূরে ছিলেন না। তাঁরা হয়তো হাওল্যান্ডের ওপর দিয়ে নয়, মাত্র কয়েক দশ কিলোমিটার পাশ দিয়ে চলে গিয়েছিলেন—কিন্তু বিশাল প্রশান্ত মহাসাগরে সেই সামান্য ভুলই জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান হয়ে দাঁড়ায়।

নুনানের দিকনির্ণয় নিয়েও অনেক আলোচনা হয়েছে। তাঁকে কখনো কখনো ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হলেও বিষয়টি এত সরল নয়। তিনি অত্যন্ত দক্ষ দিকনির্দেশক ছিলেন এবং দীর্ঘ যাত্রার আগের অংশগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। সমস্যা হলো, হাওল্যান্ডের মতো ক্ষুদ্র লক্ষ্য খুঁজতে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ থেকে শুধু একটি অবস্থানরেখা পাওয়া যথেষ্ট নয়; নির্ভুল অবস্থানের জন্য একাধিক তথ্য দরকার। মেঘ, বাতাসের প্রকৃত গতি, সময়ের সামান্য ত্রুটি কিংবা অনুমিত গতির পার্থক্য তাঁদের হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে।

ইয়ারহার্টের শেষ বার্তাগুলোর পরও রহস্য থামেনি। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পর বিভিন্ন অঞ্চলে কিছু মানুষ দাবি করেছিলেন যে তাঁরা দুর্বল বেতার সংকেত শুনেছেন, যেগুলো সম্ভবত ইয়ারহার্টের উড়োজাহাজ থেকে আসছিল। যদি সত্যিই উড়োজাহাজটি কোনো প্রবালপ্রাচীর বা অগভীর স্থানে অবতরণ করে কিছু সময় অক্ষত অবস্থায় থেকে থাকে, তাহলে এমন সংকেত পাঠানো সম্ভব হতে পারে। এই ধারণাই নিকুমারোরো তত্ত্বকে শক্তিশালী করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।

কিন্তু সমস্যাটি আবারও প্রমাণের। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে অপেশাদার বেতার ব্যবহারকারীরা নানা সংকেত শুনেছিলেন বলে দাবি করেন। কোনটি সত্যিই ইয়ারহার্টের উড়োজাহাজ থেকে এসেছিল, কোনটি ভুল শোনা, অন্য কোনো সম্প্রচার কিংবা মানুষের কল্পনা—এগুলো নিশ্চিতভাবে পৃথক করা কঠিন।

পরবর্তী কয়েক দশকে আধুনিক সমুদ্র অনুসন্ধান প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্ভাব্য দুর্ঘটনাস্থল খোঁজার বহু প্রচেষ্টা হয়েছে। সমুদ্রতলের মানচিত্র, শব্দতরঙ্গনির্ভর অনুসন্ধান, দূরনিয়ন্ত্রিত ডুবোযান এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষের ছবি বা অস্বাভাবিক আকৃতির বস্তু নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোনো আবিষ্কার সর্বজনস্বীকৃতভাবে লকহিড ইলেকট্রা ১০ই উড়োজাহাজটির ধ্বংসাবশেষ হিসেবে নিশ্চিত হয়নি।

এই অনিশ্চয়তাই ইয়ারহার্টের ঘটনাকে সাধারণ বিমান দুর্ঘটনা থেকে এক ঐতিহাসিক রহস্যে পরিণত করেছে। তাঁর শেষ মুহূর্ত সম্পর্কে আমাদের কাছে কিছু তথ্য আছে, কিন্তু পুরো চিত্রটি নেই। আমরা জানি তিনি কোথা থেকে উড্ডয়ন করেছিলেন। জানি কোথায় যেতে চেয়েছিলেন। তাঁর কিছু বেতার বার্তা সম্পর্কে জানি। তাঁর উড়োজাহাজে আনুমানিক কত জ্বালানি ছিল এবং কী ধরনের দিকনির্ণয় ব্যবস্থা ব্যবহৃত হচ্ছিল, সে সম্পর্কেও ধারণা রয়েছে। কিন্তু তাঁর শেষ অবস্থানটি জানা নেই।

আর এই একটি অজানা তথ্যই পুরো রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু।

যদি কোনো দিন সমুদ্রতলে তাঁর উড়োজাহাজের ইঞ্জিন বা এমন কোনো অংশ পাওয়া যায় যার পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব, তাহলে দুর্ঘটনাস্থল নির্ধারণ করা যাবে। অন্যদিকে নিকুমারোরো বা অন্য কোনো দ্বীপে যদি তাঁর বা নুনানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নিঃসন্দেহ কোনো বস্তু আবিষ্কৃত হয়, তাহলে ইতিহাসের সম্পূর্ণ ভিন্ন অধ্যায় খুলে যেতে পারে।

তবে রহস্যের বাইরে অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও গভীর। তিনি এমন সময়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, যখন বিমান চলাচল নিজেই ছিল নবীন প্রযুক্তি এবং নারীদের পেশাগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রও ছিল সীমিত। তাঁর সাফল্য অসংখ্য নারীকে বিমান চালনা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং প্রচলিতভাবে পুরুষপ্রধান পেশায় প্রবেশের সাহস দিয়েছিল।

তিনি নিজের খ্যাতিকে নারীদের সক্ষমতা প্রমাণের ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহার করেছিলেন। নারী বৈমানিকদের সংগঠিত করা, তাঁদের জন্য সুযোগ তৈরি করা এবং বিমান চলাচলে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পক্ষে তিনি সক্রিয় ছিলেন। ফলে তাঁর জীবনকে শুধু রহস্যময় অন্তর্ধানের আলোকে দেখলে তাঁর প্রকৃত অবদানকে ছোট করে দেখা হয়।

অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের শেষ যাত্রার সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি হয়তো কোনো গুপ্তচর কাহিনি বা গোপন বন্দিশিবিরের নাটকীয় গল্প নয়। বাস্তবতা সম্ভবত আরও নির্মম—একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ, সীমিত জ্বালানি, অসম্পূর্ণ বেতার যোগাযোগ, বিশাল সমুদ্র এবং দিকনির্ণয়ের সামান্য ভুলের সমন্বয়।

তবু যতক্ষণ তাঁর উড়োজাহাজের নিশ্চিত ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যাচ্ছে না, ততক্ষণ সেই শেষ কয়েক ঘণ্টা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। ১৯৩৭ সালের ২ জুলাই প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া রুপালি লকহিড ইলেকট্রা ঠিক কোথায় গিয়েছিল? জ্বালানি শেষ হওয়ার পর কি সেটি গভীর সমুদ্রে তলিয়ে যায়? নাকি ইয়ারহার্ট ও নুনান কোনো নির্জন দ্বীপে পৌঁছে কয়েক দিন বা আরও বেশি সময় বেঁচে ছিলেন?

প্রায় এক শতাব্দী পরও সেই প্রশ্নগুলোর নিশ্চিত উত্তর নেই। অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের অন্তর্ধানের প্রকৃত রহস্য তাই শুধু তিনি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন, তা নয়; বরং আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অনুসন্ধান সত্ত্বেও কীভাবে একজন বিশ্ববিখ্যাত বৈমানিক, তাঁর সহযাত্রী এবং একটি পূর্ণাঙ্গ উড়োজাহাজ প্রশান্ত মহাসাগরের বিশালতার মধ্যে এমনভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল যে পৃথিবী আজও তাঁদের শেষ অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি।