রেনেসাঁর মানবতাবাদ: পেত্রার্ক, বোক্কাচ্চিও ও… | এসো-জানি

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

রেনেসাঁর মানবতাবাদ: পেত্রার্ক, বোক্কাচ্চিও ও এরাসমাসের চিন্তার বিপ্লব

সিরিজ: রেনেসাঁ আন্দোলন: ইউরোপের নবজাগরণ

রেনেসাঁর মানবতাবাদ: পেত্রার্ক, বোক্কাচ্চিও ও এরাসমাসের চিন্তার বিপ্লব
প্রাচীন সাহিত্যের পাঠ থেকে মানুষের বিচারবুদ্ধির নতুন মূল্যায়ন।

ইতালির নগররাষ্ট্র, বণিক ও পৃষ্ঠপোষকদের তৈরি সাংস্কৃতিক পরিসরে মানুষের শিক্ষা ও বিচারবুদ্ধি সম্পর্কে যে প্রশ্ন উঠেছিল, মানবতাবাদ সেই প্রশ্নকে সুসংহত রূপ দেয়। প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের উদ্দেশ্য তখন অতীতের গৌরব প্রদর্শনের বাইরেও বিস্তৃত হচ্ছিল। ইতিহাস পড়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বোঝা, কবিতায় মানুষের অনুভূতি বিচার করা এবং ভাষার সাহায্যে নৈতিক বক্তব্য প্রকাশ করা গুরুত্ব পাচ্ছিল। রেনেসাঁর মানবতাবাদ মানুষকে এমন এক শিক্ষার্থী হিসেবে দেখেছিল, যার চরিত্র, চিন্তা ও প্রকাশক্ষমতা অনুশীলনের মাধ্যমে উন্নত হতে পারে। পেত্রার্ক, বোক্কাচ্চিও ও এরাসমাস ভিন্ন সময়ে এই প্রবণতাকে পৃথক পথে এগিয়ে নিয়েছিলেন।

এখানে ‘মানবতাবাদ’ বলতে আধুনিক যুগের সব মানবকেন্দ্রিক দর্শনকে বোঝায় না। রেনেসাঁর ক্ষেত্রে এর ভিত্তি ছিল স্টুদিয়া হিউমানিতাতিস—ব্যাকরণ, অলংকারশাস্ত্র, কবিতা, ইতিহাস ও নৈতিক দর্শনের পাঠক্রম। ভালো ভাষা শেখা এই শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও লক্ষ্য নিছক সুন্দর বাক্য লেখা ছিল না। একজন মানুষ কীভাবে বিচার করবেন, অন্যকে বোঝাবেন এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন করবেন, সেই প্রশ্নও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। মানবতাবাদীরা কোনো একক দার্শনিক মতবাদের অনুসারী ছিলেন না; তাঁদের মধ্যে ধর্ম, রাজনীতি ও জীবনযাপন সম্পর্কে যথেষ্ট মতপার্থক্য ছিল।

মধ্যযুগীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় যুক্তিবিদ্যা এবং প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থের ব্যাখ্যার বিশেষ স্থান ছিল। মানবতাবাদীরা সেই শিক্ষার কিছু চর্চাকে অতিরিক্ত বিমূর্ত ও ভাষাগতভাবে দুর্বল বলে সমালোচনা করেন। তাঁরা জানতে চাইতেন, একটি যুক্তি মানুষের জীবন ও চরিত্র গঠনে কতটা কাজে লাগে। তবে মধ্যযুগীয় শিক্ষা সর্বত্র নিষ্প্রাণ ছিল কিংবা মানবতাবাদ এসে যুক্তির গুরুত্ব শেষ করে দিয়েছিল—এমন ধারণা ভুল। পরিবর্তনটি ঘটেছিল শিক্ষার অগ্রাধিকারে: যুক্তির কাঠামোর সঙ্গে ভাষা, ইতিহাস ও নৈতিক অভিজ্ঞতার সম্পর্ককে সামনে আনা হয়েছিল। পুরোনো ও নতুন পাঠধারা বহু ক্ষেত্রেই পাশাপাশি চলেছিল।

এই পরিবর্তনের অন্যতম অগ্রদূত ফ্রানচেসকো পেত্রার্ক, যিনি ১৩০৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর কাছে প্রাচীন লেখকদের রচনা ছিল জীবন্ত সংলাপের উপকরণ। সিসেরো কিংবা সেনেকার লেখা পড়ে তিনি নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দুর্বলতা ও নৈতিক সংকট বিচার করতেন। ১৩৪৫ সালে ভেরোনায় সিসেরোর কিছু চিঠি পাওয়ার পর তিনি প্রাচীন এই ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক দ্বিধা ও ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন। অতীতের মহৎ লেখককেও প্রশ্ন করার এই প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শ্রদ্ধা বজায় রেখেও একজন লেখকের বক্তব্য ও আচরণের মধ্যে অসংগতি শনাক্ত করা সম্ভব হয়ে ওঠে।

পেত্রার্কের আত্মসমীক্ষার বিশেষ উদাহরণ তাঁর সেক্রেতুম, যেখানে নিজের সঙ্গে সেন্ট অগাস্টিনের একটি কল্পিত সংলাপ নির্মিত হয়েছে। সেখানে খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা, পার্থিব আসক্তি এবং খ্রিষ্টীয় আত্মশুদ্ধির টানাপোড়েন উপস্থিত। অন্যদিকে ইতালীয় ভাষায় লেখা তাঁর প্রেমের কবিতায় স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক দ্বন্দ্ব সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ পায়। এই ব্যক্তিগত কণ্ঠস্বর পরবর্তী ইউরোপীয় সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তবে পেত্রার্ককে আধুনিক অর্থে ধর্ম থেকে মুক্ত ব্যক্তি ভাবলে তাঁর চিন্তার বড় অংশ হারিয়ে যায়। তাঁর আত্মবিশ্লেষণ গড়ে উঠেছিল প্রাচীন সাহিত্য ও খ্রিষ্টীয় নৈতিকতার পারস্পরিক আলোচনার মধ্যে।

জোভান্নি বোক্কাচ্চিও মানুষের অভিজ্ঞতাকে সামনে আনেন অন্য পথে। ১৩১৩ সালে জন্ম নেওয়া এই লেখক ব্যবসায়ীসমাজ, নগরজীবন এবং বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণির আচরণ সম্পর্কে সমৃদ্ধ পর্যবেক্ষণ অর্জন করেন। তাঁর ডেকামেরন শুরু হয় ১৩৪৮ সালের ফ্লোরেন্সের মহামারির প্রেক্ষাপটে। সাত তরুণী ও তিন তরুণ নগর ছেড়ে গ্রামীণ আশ্রয়ে যান এবং পালাক্রমে গল্প বলেন। তাঁদের বর্ণিত একশটি গল্পে বণিক, কারিগর, অভিজাত, ধর্মযাজক ও নানা অবস্থানের মানুষ উপস্থিত। বিপর্যয়ের মধ্যে গল্প বলা এখানে সামাজিক শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি উপায়।

এই গল্পগুলোতে ভাগ্য, বুদ্ধি, প্রেম, প্রতারণা ও সামাজিক ভণ্ডামির সংঘাত বারবার ফিরে আসে। কোনো চরিত্রের জন্মপরিচয় বা পদমর্যাদা তার নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করে না। সাধারণ অবস্থানের মানুষও উপস্থিতবুদ্ধি দিয়ে শক্তিশালী ব্যক্তিকে পরাস্ত করতে পারেন। আবার চতুরতা সব সময় ন্যায়পরায়ণতার সমার্থক হয় না। বোক্কাচ্চিও মানুষের আচরণকে বহুমাত্রিক করে দেখিয়েছিলেন; তাঁর চরিত্রগুলোকে শুধু পাপ বা পুণ্যের সহজ ছকে বিচার করা কঠিন। ধর্মযাজকদের ভণ্ডামি নিয়ে ব্যঙ্গও আছে, কিন্তু সেখান থেকে গোটা রচনাকে ধর্মবিশ্বাসের প্রত্যাখ্যান বলা যায় না।

বোক্কাচ্চিওর ভূমিকা গল্পকারের পরিচয়ের চেয়েও বিস্তৃত। তিনি দান্তের সাহিত্য নিয়ে কাজ করেন, প্রাচীন পুরাণ অধ্যয়ন করেন এবং গ্রিক জ্ঞানচর্চার প্রসারে আগ্রহ দেখান। গ্রিকভাষী পণ্ডিত লেওন্তিও পিলাতোর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হোমারের রচনা লাতিনে পাঠের সুযোগ তৈরিতে সাহায্য করেছিল। পেত্রার্কের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বও সাহিত্যিক ও বৌদ্ধিক বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল। একই সঙ্গে তাঁর রচনায় নারীদের অভিজ্ঞতার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হলেও আধুনিক লিঙ্গসমতার আদর্শ আরোপ করা ঠিক হবে না। তাঁর লেখায় সহানুভূতি ও সমসাময়িক পুরুষতান্ত্রিক ধারণা পাশাপাশি রয়েছে।

এই মানবিক শিক্ষাধারা বিদ্যালয়ের পাঠক্রমেও পরিবর্তন আনে। প্রাচীন ইতিহাসের উদাহরণ, চিঠি লেখা, বক্তৃতা অনুশীলন এবং নৈতিক আলোচনা শিক্ষার্থীর প্রস্তুতির অংশ হয়ে ওঠে। ভিত্তোরিনো দা ফেলত্রের মতো শিক্ষক মানসিক শিক্ষার সঙ্গে শরীরচর্চা ও চরিত্র গঠনের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেন। শাসক, কর্মকর্তা কিংবা কূটনীতিক তৈরির কাজে এই শিক্ষা বিশেষ আকর্ষণীয় ছিল। তবে এর সুযোগ সমাজজুড়ে সমানভাবে ছড়ায়নি। কিছু শিক্ষিত নারী মানবতাবাদী আলোচনায় অংশ নিলেও উচ্চশিক্ষা ও সরকারি কর্মজীবনে তাঁদের প্রবেশ কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ ছিল। মানবিক সম্ভাবনার প্রশংসার সঙ্গে সামাজিক বর্জনের এই বাস্তবতা বহাল থাকে।

পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ ও ষোড়শ শতকে মুদ্রণ, ভ্রমণ এবং পণ্ডিতদের চিঠিপত্র মানবতাবাদকে আল্পসের উত্তরে বিস্তৃত করে। এই পরিসরের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন নেদারল্যান্ডসের দেসিদেরিয়ুস এরাসমাস। ইতালীয় মানবতাবাদীদের মতো তিনিও প্রাচীন ভাষা ও সাহিত্যকে গুরুত্ব দেন, তবে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল খ্রিষ্টীয় শিক্ষা ও আচরণের সংস্কার। বাহ্যিক আচার পালনের পাশাপাশি অন্তরের নৈতিক পরিবর্তন জরুরি—এই বিশ্বাস তাঁর রচনায় প্রবল। এরাসমাসের খ্রিষ্টীয় মানবতাবাদে ভাষাগত পাণ্ডিত্য ছিল ধর্মীয় বোঝাপড়া উন্নত করার একটি উপায়।

এর সবচেয়ে প্রভাবশালী উদাহরণ ১৫১৬ সালে প্রকাশিত তাঁর গ্রিক নতুন নিয়মের মুদ্রিত সংস্করণ, যার সঙ্গে সংশোধিত লাতিন অনুবাদ ও ব্যাখ্যামূলক টীকা ছিল। প্রচলিত লাতিন পাঠকে তিনি গ্রিক পাঠের সঙ্গে তুলনা করেন এবং শব্দের অর্থ নিয়ে আলোচনা তোলেন। তাঁর ব্যবহৃত পাণ্ডুলিপি সীমিত ছিল এবং প্রথম সংস্করণেও ত্রুটি ছিল; পরবর্তী সংস্করণে সংশোধন আসে। তবু উদ্যোগটির গুরুত্ব বিরাট। ধর্মীয় পাঠ বোঝার ক্ষেত্রে মূল ভাষা, অনুলিপির পার্থক্য এবং অনুবাদকের সিদ্ধান্ত যে অর্থ বদলাতে পারে, তা বৃহত্তর আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

এরাসমাস ব্যঙ্গের মাধ্যমেও চিন্তাকে নাড়া দেন। তাঁর মূর্খতার প্রশস্তি গ্রন্থে পণ্ডিতের আত্মগরিমা, শাসকের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ধর্মীয় জীবনের অসংগতি হাস্যরসের সাহায্যে উন্মোচিত হয়। শিক্ষাসংক্রান্ত লেখায় তিনি ভাষাদক্ষতা, নৈতিক উদাহরণ এবং শিশুর উপযোগী শিক্ষাদানের পক্ষে কথা বলেন। সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তিনি ধর্মীয় সংঘাত ও বিভাজন নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। মার্টিন লুথারের সঙ্গে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা নিয়ে তাঁর মতবিরোধ স্পষ্ট করে যে মানবতাবাদ ও প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন অভিন্ন ছিল না। মানুষের নৈতিক দায়িত্ব বোঝার ক্ষেত্রেও তাঁদের অবস্থান আলাদা হয়ে যায়।

পেত্রার্ক আত্মসমীক্ষায়, বোক্কাচ্চিও গল্পের জগতে এবং এরাসমাস পাঠসমালোচনা ও ধর্মীয় শিক্ষায় মানুষের বিচারক্ষমতাকে প্রসারিত করেছিলেন। তাঁদের অবদান কোনো প্রস্তুত আধুনিক বিশ্বদর্শন তৈরি করেনি; বরং পড়া, ব্যাখ্যা করা ও প্রশ্ন করার অভ্যাস বদলেছিল। প্রাচীন লেখকের মর্যাদা বজায় রেখেও তাঁর সীমাবদ্ধতা দেখা, সামাজিক পদমর্যাদার আড়ালে মানুষের আচরণ বিচার করা এবং অনুবাদের শুদ্ধতা পরীক্ষা করা শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কাজে পরিণত হয়। মানুষের অনুভূতি ও সম্ভাবনার প্রতি এই মনোযোগ একই সময়ে শিল্পীদেরও নতুন অনুসন্ধানে উৎসাহিত করছিল—মুখের অভিব্যক্তি, দেহের গঠন ও দৃশ্যমান জগৎকে কীভাবে আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়।