হিট্টাইট রাজবংশ: আনাতোলিয়ার সাম্রাজ্যের উত্থান ও……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হিট্টাইট রাজবংশ: আনাতোলিয়ার সাম্রাজ্যের উত্থান ও রহস্যময় পতন

সিরিজ: রাজবংশের উত্থান-পতন: ক্ষমতা, গৌরব ও পতনের ইতিহাস

হিট্টাইট রাজবংশ: আনাতোলিয়ার সাম্রাজ্যের উত্থান ও রহস্যময় পতন
হাত্তুসার উত্থান থেকে ব্রোঞ্জ যুগের সংকটে হিট্টাইট সাম্রাজ্যের পতন।

আজকের তুরস্কের মধ্য আনাতোলিয়ার পাহাড়ি ভূখণ্ডে একসময় এমন একটি সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল, যার রাজারা মিশরের ফারাওদের সমমর্যাদার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তাঁদের রাজধানী হাত্তুসার প্রাচীর, মন্দির ও মাটির ফলকের সংগ্রহ প্রকাশ করে যুদ্ধ, কূটনীতি এবং রাজপরিবারের দ্বন্দ্বে পূর্ণ এক ইতিহাস। এই হিট্টাইট সাম্রাজ্য খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের প্রধান শক্তিগুলোর একটি হয়ে ওঠে। অথচ খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতকের শুরুতে এর কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। হিট্টাইটদের পতন রহস্যময়, কারণ কোনো একক ঘটনা দিয়ে তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায় না।

হিট্টাইট পরিচয়ের মধ্যেই রয়েছে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। মধ্য আনাতোলিয়ায় তাঁদের আগে হাত্তীয় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী বাস করত; হিট্টাইট রাজারা সেই ভূখণ্ডের ‘হাত্তি’ নাম গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁদের প্রধান লিখিত ভাষা ছিল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের অন্তর্গত, যাকে তাঁরা নেসা নগরের নাম অনুসারে নেসিলি বলতেন। রাজ্যে লুভীয়সহ অন্য ভাষাও ব্যবহৃত হতো। ফলে এটি একজাতিক রাষ্ট্র ছিল না। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দেবতা, আচার ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা গ্রহণ করেই রাজশক্তি বিকশিত হয়। আনাতোলিয়ার পুরোনো আসিরীয় বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর লিখিত ঐতিহ্যও এই অঞ্চলের প্রাথমিক রাজনৈতিক ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করে।

খ্রিস্টপূর্ব অষ্টাদশ শতকের কুশশারার শাসক আনিত্তা আনাতোলিয়ার কয়েকটি নগর জয় করেছিলেন এবং হাত্তুসা ধ্বংসের দাবি করেছিলেন। তবে তাঁর সঙ্গে পরবর্তী হিট্টাইট রাজপরিবারের সরাসরি বংশগত সম্পর্ক নিশ্চিত নয়। সুস্পষ্ট হিট্টাইট রাজ্যের বিকাশ সাধারণত খ্রিস্টপূর্ব সপ্তদশ শতকের লাবারনা ও প্রথম হাত্তুসিলির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। প্রথম হাত্তুসিলি হাত্তুসাকে রাজকীয় কেন্দ্র করেন এবং দক্ষিণ-পূর্ব আনাতোলিয়া ও উত্তর সিরিয়ায় অভিযান চালান। রাজবংশের সূচনাপর্বের কালপঞ্জি ও কিছু শাসকের পরিচয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। পরবর্তী সাম্রাজ্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বহু নগর ও আঞ্চলিক শক্তিকে ধীরে ধীরে বশীভূত করার মাধ্যমে।

প্রথম মুরশিলি সেই সামরিক সম্প্রসারণকে আরও দূরে নিয়ে যান। তিনি আলেপ্পোর শক্তি ভেঙে দেন এবং প্রচলিত মধ্য কালপঞ্জি অনুযায়ী খ্রিস্টপূর্ব ১৫৯৫ সালের দিকে ব্যাবিলনে অভিযান চালান। ব্যাবিলনের প্রথম রাজবংশের অবসানে এই আক্রমণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু এত দূরের নগর লুণ্ঠন করা আর সেখানে স্থায়ী শাসন প্রতিষ্ঠা এক বিষয় নয়; হিট্টাইটরা ব্যাবিলন ধরে রাখেনি। দেশে ফিরে মুরশিলি রাজপরিবারের ষড়যন্ত্রে নিহত হন। এই ঘটনায় হিট্টাইট রাজনীতির দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা স্পষ্ট হয়: বিজয়ী রাজাও নিজের প্রাসাদের ভেতরে নিরাপদ ছিলেন না।

পরবর্তী কয়েক প্রজন্মে হত্যা, প্রতিশোধ ও উত্তরাধিকারসংঘাত কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করে। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ষোড়শ শতকে রাজা তেলিপিনু উত্তরাধিকারের ক্রম নির্ধারণ এবং রাজপরিবারের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তাঁর ঘোষণায় পূর্ববর্তী রাজাদের সাফল্য ও পারিবারিক অপরাধের বিবরণ রয়েছে। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে যোগ্য রাজপুত্রের অগ্রাধিকার এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অন্য উত্তরাধিকারীর ব্যবস্থা করা হয়। তবে এটিকে আধুনিক সংবিধান বা গণতান্ত্রিক ক্ষমতাবিভাজন বলা ভুল। তেলিপিনুর লক্ষ্য ছিল রাজতন্ত্রের অবসান নয়, রাজপরিবারের ভেতর ক্ষমতা হস্তান্তরকে স্থিতিশীল করা।

হিট্টাইট রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান একই সঙ্গে সুবিধা ও বিপদ তৈরি করেছিল। হাত্তুসার দুর্গম পাহাড় প্রতিরক্ষা সহজ করলেও বিশাল রাজধানীতে খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ কঠিন ছিল। উত্তরের কাস্কা জনগোষ্ঠী বারবার চাপ সৃষ্টি করত; পশ্চিম আনাতোলিয়ায় আরজাওয়ার মতো শক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত। দক্ষিণ-পূর্বের পথগুলো আবার সিরিয়ার বাণিজ্য, ধাতু ও সমৃদ্ধ নগরগুলোর দিকে নিয়ে যেত। ফলে রাজাকে একাধিক সীমান্তে যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ আনুগত্য রক্ষার ব্যবস্থা করতে হতো। রাজকীয় ক্ষমতার বাস্তব সীমা নির্ধারিত হতো সেনা, খাদ্য, রাস্তা এবং অধীন শাসকদের সহযোগিতায়।

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে প্রথম শুপ্পিলুলিউমার শাসনে সাম্রাজ্য নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। তিনি মিতান্নির প্রভাব দুর্বল করে উত্তর সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল অধীন করেন। কারকেমিশ ও আলেপ্পোতে রাজপরিবারের সদস্যদের বসিয়ে সীমান্তশাসন শক্ত করেন। সব ভূখণ্ড সরাসরি হাত্তুসা থেকে পরিচালিত হতো না; বহু স্থানীয় রাজা চুক্তির মাধ্যমে অধীনতা স্বীকার করতেন। তাঁদের সৈন্য, কর ও আনুগত্য দিতে হতো, বিনিময়ে মিলত সুরক্ষা ও রাজত্বের স্বীকৃতি। হিট্টাইট সাম্রাজ্য ছিল প্রত্যক্ষ শাসন এবং চুক্তিনির্ভর অধীন রাজ্যের সমন্বয়, যার স্থায়িত্ব ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের ওপরও নির্ভর করত।

সাম্রাজ্যিক সাফল্যের মধ্যেই বিপর্যয় আসে। মিশরসংক্রান্ত অভিযানের পর বন্দিদের মাধ্যমে রোগ ছড়িয়েছিল বলে হিট্টাইট রাজকীয় প্রার্থনায় অভিযোগ পাওয়া যায়। দীর্ঘস্থায়ী মহামারি রাজপরিবার ও প্রজাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে; প্রথম শুপ্পিলুলিউমা এবং তাঁর উত্তরসূরি দ্বিতীয় আরনুওয়ান্দার মৃত্যুও এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত। পরবর্তী রাজা দ্বিতীয় মুরশিলির প্রার্থনাগুলো দেখায়, শাসক রোগকে দেবতাদের অসন্তোষের ভাষায় বোঝার চেষ্টা করছিলেন। তবে ধর্মীয় ব্যাখ্যার নিচে ছিল বাস্তব প্রশাসনিক সমস্যা—জনশক্তির ক্ষতি, বিদ্রোহের আশঙ্কা এবং সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার চাপ।

মিশরের সঙ্গে সিরিয়ার আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষের সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনা কাদেশের যুদ্ধ। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১২৭৪ সালে দ্বিতীয় মুওয়াতাল্লির বাহিনী দ্বিতীয় রামেসিসের সেনাদের মুখোমুখি হয়। হিট্টাইট রথবাহিনীর আকস্মিক আক্রমণ মিশরীয়দের বড় বিপদে ফেলে, কিন্তু যুদ্ধ চূড়ান্ত মিশরীয় বিজয়ে শেষ হয়নি। রামেসিসের স্মারকে বিজয়ের দাবি থাকলেও কাদেশ হিট্টাইট প্রভাবাধীন থেকে যায়। পরে তৃতীয় হাত্তুসিলি ও রামেসিসের মধ্যে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১২৫৯ সালে শান্তিচুক্তি হয়। এটি যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি পারস্পরিক সহায়তার সম্পর্ক গড়ে তোলে; পরবর্তী রাজকীয় বিবাহ সেই সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে।

তৃতীয় হাত্তুসিলি নিজেই ভ্রাতুষ্পুত্র তৃতীয় মুরশিলিকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাজা হয়েছিলেন। ফলে বিদেশে মর্যাদা অর্জনের পাশাপাশি নিজের বৈধতা প্রতিষ্ঠাও তাঁর প্রয়োজন ছিল। তাঁর স্ত্রী পুদুহেপা ধর্মীয় ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। হিট্টাইট সমাজে রানি বা তাওয়ানান্না গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান ধারণ করতেন। অন্যদিকে আইনসংকলনে বহু অপরাধের জন্য ক্ষতিপূরণ ও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিধান দেখা যায়, যদিও দাসত্ব ও সামাজিক বৈষম্য বহাল ছিল। হিট্টাইটদের শক্তিকে কেবল লোহার অস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা ভুল; তাঁদের সাম্রাজ্যিক সেনাবাহিনীতে ব্রোঞ্জের অস্ত্রই প্রধান ছিল।

খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতকের শেষদিকে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে। আসিরীয় সম্প্রসারণ পূর্বাঞ্চলের ভারসাম্য বদলায়, অধীন রাজ্যগুলোর ওপর কর্তৃত্ব ধরে রাখা কঠিন হয় এবং খাদ্য সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগে পরিণত হয়। কিছু নথিতে শস্যের জরুরি প্রয়োজনের উল্লেখ আছে। মধ্য আনাতোলিয়ার প্রাচীন কাঠের বলয় বিশ্লেষণে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১১৯৮–১১৯৬ সালের তীব্র খরার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এটি সংকট বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, কিন্তু সমগ্র সাম্রাজ্যে একই প্রভাবের প্রমাণ নয়। খাদ্যাভাব, রাজনৈতিক বিভাজন ও সামরিক চাপ পরস্পরকে বাড়িয়ে দিতে পারে, বিশেষত যেখানে রাজধানী বাইরের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।

শেষ পরিচিত মহান রাজা দ্বিতীয় শুপ্পিলুলিউমার পর কেন্দ্রীয় রাজবংশের ধারাবাহিকতা অস্পষ্ট হয়ে যায়। হাত্তুসায় পরিত্যাগ ও অগ্নিকাণ্ডের প্রমাণ আছে, কিন্তু সব ধ্বংস একই সময়ে ঘটেনি; গুরুত্বপূর্ণ ভবন খালি করার ইঙ্গিতও রয়েছে। তাই ‘সমুদ্রজাতি’ এসে এক আঘাতে রাজধানী ধ্বংস করেছিল—এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্ত সমর্থিত নয়। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ সালের আশপাশে বৃহত্তর ব্রোঞ্জ যুগের যোগাযোগব্যবস্থা ভাঙার মধ্যে হিট্টাইট কেন্দ্রও হারিয়ে যায়। তবু কারকেমিশসহ দক্ষিণ-পূর্ব আনাতোলিয়া ও উত্তর সিরিয়ার রাজ্যগুলোতে রাজবংশীয় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার টিকে ছিল। পতন ঘটেছিল হাত্তুসাকেন্দ্রিক সাম্রাজ্যের; হিট্টাইট ঐতিহ্য একদিনে বিলুপ্ত হয়নি।


আপনার পছন্দ হতে পারে