যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলন: ডগলাস, টাবম্যান……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলন: ডগলাস, টাবম্যান ও আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড

সিরিজ: দাসপ্রথা বিলুপ্তির ইতিহাস

যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলন: ডগলাস, টাবম্যান ও আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড
স্বাধীনতার পথে কলম, সাহস ও গোপন যাত্রা

ব্রিটিশ ক্যারিবীয় অঞ্চলে বাধ্যতামূলক শিক্ষানবিশ শ্রমের অবসান যখন স্বাধীনতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছিল, আটলান্টিকের অন্য তীরে তখন দাসত্ব আরও গভীরভাবে শিকড় গাড়ছিল। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে স্বাধীনতার দেশ বললেও দক্ষিণের তুলাখেত, তামাকবাগান ও আখখেতে লাখো মানুষ মালিকের সম্পত্তি হিসেবে বন্দি ছিলেন। তাঁদের শ্রমে উৎপাদিত পণ্য দেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে সমৃদ্ধ করছিল। এই বৈপরীত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে ওঠে বক্তৃতামঞ্চে, সংবাদপত্রে, আদালতে এবং অন্ধকার রাতে পালিয়ে যাওয়া মানুষের পদচিহ্নে। সেখানে স্বাধীনতা কোনো বিমূর্ত আদর্শ ছিল না; ছিল নিজের শরীর, পরিবার ও ভবিষ্যতের ওপর অধিকার।

উত্তরের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে দাসত্ব বিলোপ বা ধীরে বিলোপের ব্যবস্থা চালু হলেও দক্ষিণে তার বিস্তার চলছিল। তুলার চাহিদা বাড়ায় দেশীয় দাসবাণিজ্যে মানুষকে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বিক্রি করা হচ্ছিল। পরিবার ভেঙে যাওয়া ছিল এই ব্যবস্থার নিয়মিত পরিণতি। অন্যদিকে উত্তরের অনেক শ্বেতাঙ্গ দাসত্বের বিরোধিতা করলেও কৃষ্ণাঙ্গদের সমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার মানতে চাইতেন না। দাসত্ববিরোধিতা এবং বর্ণসমতার দাবি সব সময় এক ছিল না। কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলনকারীদের তাই মালিকানার শিকলের পাশাপাশি স্বাধীন সমাজের বৈষম্যের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনের শিকড় ছিল কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের আত্মরক্ষা, ধর্মীয় সংগঠন এবং আগের প্রজন্মের মুক্তির দাবিতে। উনিশ শতকের ত্রিশের দশকে অবিলম্বে বিলোপের আন্দোলন নতুন গতি পায়। উইলিয়াম লয়েড গ্যারিসনের সংবাদপত্র এবং ১৮৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আমেরিকান অ্যান্টি-স্লেভারি সোসাইটি প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু আন্দোলনের শক্তি শুধু শ্বেতাঙ্গ সংস্কারকদের থেকে আসেনি। স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ অর্থ সংগ্রহ করেন, সভা করেন, লেখেন এবং পালিয়ে আসা মানুষদের আশ্রয় দেন। দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসা ব্যক্তিদের জীবনবিবরণ মালিকদের প্রচারিত সুখী দাসজীবনের ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়।

এই কণ্ঠগুলোর মধ্যে ফ্রেডেরিক ডগলাস হয়ে ওঠেন অন্যতম প্রভাবশালী। মেরিল্যান্ডে দাসত্বে জন্ম নেওয়া ডগলাস বুঝেছিলেন, শিক্ষা মানুষকে নিজের অবস্থার ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা দেয়। পড়তে শেখার পথে বাধা তাঁকে দেখিয়েছিল, অজ্ঞতা ধরে রাখা দাসব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের অংশ। ১৮৩৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তিনি নাবিকের ছদ্মবেশে উত্তরের পথে যাত্রা করে দাসত্ব থেকে পালান। স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গ নারী আনা মারের সহায়তা তাঁর যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উত্তরে পৌঁছানোয় তাৎক্ষণিক বিপদ কিছু কমলেও আইনগতভাবে পুনরায় বন্দি হওয়ার আশঙ্কা তখনো শেষ হয়নি।

বক্তা হিসেবে ডগলাসের যুক্তি ও ভাষার শক্তি শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। অথচ বর্ণবাদ এত গভীর ছিল যে অনেকে সন্দেহ করতেন, এমন শিক্ষিত বক্তা কখনো দাস ছিলেন কি না। ১৮৪৫ সালে প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনী সেই সন্দেহের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি দাসত্বের বাস্তবতা উন্মোচন করে। সেখানে ক্ষুধা, প্রহার ও পরিবারবিচ্ছেদের সঙ্গে উঠে আসে মানুষের আত্মমর্যাদা ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়া। ডগলাস শুধু নির্যাতনের সাক্ষী ছিলেন না; তিনি সেই ব্যবস্থার রাজনৈতিক বিশ্লেষকও ছিলেন। নিজের পরিচয় প্রকাশ করে লেখা তাঁকে আবার মালিকের দাবির মুখে পড়ার ঝুঁকিতেও ফেলেছিল।

১৮৪৭ সালে নিউইয়র্কের রচেস্টারে ডগলাস ‘দ্য নর্থ স্টার’ সংবাদপত্র প্রকাশ শুরু করেন। এটি ছিল কৃষ্ণাঙ্গ নেতৃত্বে স্বাধীন জনমত তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তাঁর চিন্তায় দাসমুক্তির সঙ্গে শিক্ষা, নারীর অধিকার ও নাগরিক সমতার সম্পর্ক ছিল। সময়ের সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সংবিধানকে দাসত্বের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দেন। আন্দোলনের ভেতরে সবাই তাঁর সঙ্গে একমত ছিলেন না। কেউ নৈতিক আবেদনকে প্রধান পথ মনে করতেন, কেউ নির্বাচনী রাজনীতিকে। এই মতভেদ দেখায়, বিলোপ আন্দোলন একক কৌশলে পরিচালিত কোনো অভিন্ন সংগঠন ছিল না।

ডগলাস যখন প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিবেককে প্রশ্ন করছিলেন, তখন হ্যারিয়েট টাবম্যান স্বাধীনতার জন্য আরেক ধরনের বিপদ গ্রহণ করছিলেন। তিনিও মেরিল্যান্ডে দাসত্বে জন্মেছিলেন। শৈশবের কঠোর শ্রম ও সহিংসতা তাঁর শরীরে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করে। ১৮৪৯ সালে তিনি পালিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেন। কিন্তু নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই থেমে যাননি। পরিবার ও পরিচিত মানুষদের বন্দিজীবন তাঁকে ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ করে। একজন পলাতক মানুষের পক্ষে সেই অঞ্চলে ফিরে যাওয়া মানে ছিল আবার ধরা পড়া, বিক্রি হয়ে যাওয়া এবং সহযোগীদের বিপন্ন করার ঝুঁকি নেওয়া।

১৮৫০ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে টাবম্যান প্রায় তেরোবার মেরিল্যান্ডে ফিরে গিয়ে আনুমানিক সত্তরজন আত্মীয় ও পরিচিত মানুষকে স্বাধীনতার পথে নিয়ে আসেন। অন্যদের পালানোর নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। তাঁর সাফল্যের পেছনে ছিল স্থানীয় ভূগোলের জ্ঞান, বিশ্বস্ত যোগাযোগ, সতর্ক পরিকল্পনা এবং পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। তাঁকে নিয়ে প্রচলিত অতিরঞ্জিত সংখ্যার প্রয়োজন নেই; বাস্তব অর্জনই অসাধারণ। নিজে মুক্ত হওয়ার পর অন্যদের জন্য বারবার বিপদের মধ্যে ফিরে যাওয়াই তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য। উদ্ধারযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষদেরও নিজেদের জীবন বাজি রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হতো।

এই সহায়তার বিস্তৃত ব্যবস্থাকে বলা হয় আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড। নামটি শুনে ভূগর্ভস্থ রেলপথ মনে হলেও এটি ছিল মানুষ, আশ্রয় ও যোগাযোগের নেটওয়ার্ক। কোনো একক সদর দপ্তর বা সর্বজনীন পথনির্দেশ ছিল না। বিশ্বস্ত বাড়ি, কৃষ্ণাঙ্গ গির্জা, নদীপথ, গাড়ি এবং কখনো সাধারণ পরিবহন ব্যবহার করা হতো। পথপ্রদর্শকদের বোঝাতে রেলের কর্মীদের নাম থেকে ধার করা শব্দ ব্যবহৃত হতো। তবে অনেক মুক্তিকামী মানুষ পথপ্রদর্শক ছাড়াও যাত্রা সম্পন্ন করেন। তাঁদের উদ্যোগকে আড়াল করে কেবল উদ্ধারকারীদের গল্প বলা এই ইতিহাসকে অসম্পূর্ণ করে।

স্বাধীন ও দাসত্বে আবদ্ধ কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায় এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে ছিল। কোয়েকারসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও শ্বেতাঙ্গ সহযোগীও অংশ নেন। ফিলাডেলফিয়া, নিউইয়র্ক ও বোস্টনের সতর্কতা কমিটিগুলো খাদ্য, পোশাক, আশ্রয়, আইনি সহায়তা এবং পরবর্তী যাত্রার অর্থ জোগাত। সহায়তা শুধু লুকিয়ে রাখার মধ্যে সীমিত ছিল না; অপহরণ ঠেকানো এবং নতুন জীবনের ব্যবস্থা করাও জরুরি ছিল। পথের বিপদও বহুমুখী: ক্ষুধা, ঠান্ডা, অপরিচিত ভূখণ্ড, বিশ্বাসঘাতকতা ও দাসশিকারি। নিরাপদ আশ্রয়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব কখনো মানুষের সহ্যশক্তির কঠিন পরীক্ষা নিত।

১৮৫০ সালের পলাতক দাস আইন এই সংগ্রামকে আরও বিপজ্জনক করে। উত্তরের দাসত্ববিহীন অঙ্গরাজ্যে পৌঁছালেও পলাতক মানুষকে ধরে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তির নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার অধিকার ছিল না, আর সাহায্যকারীরাও শাস্তির মুখে পড়তে পারতেন। স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গদের অপহৃত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ে। ফলে অনেকের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের চেয়ে কানাডা নিরাপদ গন্তব্য হয়ে ওঠে। যে আইন মালিকের দাবি রক্ষা করছিল, সেটি অমান্য করাই অনেক সহায়তাকারীর কাছে মানুষের স্বাধীনতা রক্ষার নৈতিক কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।

তবু গোপন পথে পালানো দিয়ে গোটা দাসব্যবস্থা ধ্বংস করা সম্ভব ছিল না। বিপুলসংখ্যক মানুষ দক্ষিণে বন্দি রয়ে যান, আর দাসত্বের সম্প্রসারণ নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত বাড়তে থাকে। ১৮৬১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে বন্দি মানুষেরা ইউনিয়ন বাহিনীর অবস্থানের দিকে পালিয়ে নিজেদের মুক্তির সুযোগ তৈরি করেন। ডগলাস যুদ্ধকে দাসত্ব ধ্বংসের সংগ্রামে পরিণত করার দাবি তোলেন এবং কৃষ্ণাঙ্গ সেনা নিয়োগে সক্রিয় হন। টাবম্যানও ইউনিয়নকে সেবিকা, অনুসন্ধানকারী ও গোয়েন্দা হিসেবে সহায়তা করেন; কম্বাহি নদীর অভিযানে তাঁর পথনির্দেশ বহু মানুষের মুক্তিতে ভূমিকা রাখে।

১৮৬৩ সালের ১ জানুয়ারির দাসমুক্তির ঘোষণা যুদ্ধের চরিত্র বদলে দেয়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সারা যুক্তরাষ্ট্রের দাসত্ব শেষ করেনি। এটি নির্দিষ্ট বিদ্রোহী অঞ্চলে প্রযোজ্য ছিল; ইউনিয়নের অনুগত সীমান্ত অঙ্গরাজ্যগুলো এর বাইরে থাকে। দেশব্যাপী সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা আসে ১৮৬৫ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনীতে, যেখানে অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তির শাস্তির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়। ডগলাসের কলম, টাবম্যানের যাত্রা এবং অসংখ্য অখ্যাত মানুষের প্রতিরোধ এই পরিবর্তনের ইতিহাসে অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু শিকল খোলার পরও সমান নাগরিকত্ব নিশ্চিত হয়নি। মুক্তির পরের প্রশ্ন তাই হয়ে উঠল—স্বাধীন মানুষকে সমাজ ও রাষ্ট্র কতখানি সমান অধিকার দেবে?


আপনার পছন্দ হতে পারে