ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাসপ্রথার বিলুপ্তি: ১৮৩৩ সালের আইন……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাসপ্রথার বিলুপ্তি: ১৮৩৩ সালের আইন থেকে ১৮৩৮ সালের মুক্তি

সিরিজ: দাসপ্রথা বিলুপ্তির ইতিহাস

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাসপ্রথার বিলুপ্তি: ১৮৩৩ সালের আইন থেকে ১৮৩৮ সালের মুক্তি
আইনি মুক্তি থেকে বাধ্যতামূলক শ্রমের অবসান

মানুষ কেনাবেচা বন্ধ হলে, মানুষকে সম্পত্তি করে রাখা চলবে কীভাবে? ১৮০৭ সালের দাসবাণিজ্য নিষিদ্ধকরণের পর ব্রিটিশ আন্দোলনকারীদের সামনে এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল। আটলান্টিক পেরিয়ে নতুন বন্দি আনার বৈধ পথ বন্ধ হলেও ক্যারিবীয় দ্বীপগুলোর আখবাগানে দাসত্ব বহাল ছিল। সেখানে জন্ম নেওয়া শিশুর ভবিষ্যৎও মায়ের দাসত্বের সঙ্গে বাঁধা থাকত। ফলে বাণিজ্য বন্ধের বিজয়ের পর প্রয়োজন হলো আরও মৌলিক সংগ্রাম—মালিকের সম্পত্তির তালিকা থেকে মানুষকে বের করে স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

বাগানমালিকেরা এই পরিবর্তন ঠেকাতে অর্থনীতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখাতেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, বাধ্যতামূলক শ্রম ছাড়া চিনি উৎপাদন টিকবে না; মুক্ত মানুষ নিয়মিত কাজও করবে না। এই যুক্তির মধ্যে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষ সম্পর্কে গভীর বর্ণবাদী ধারণা কাজ করছিল। স্বাধীনতার অধিকারকে স্বীকার করার বদলে তাঁদের স্বাধীনতার উপযোগী হয়ে ওঠার শর্ত দেওয়া হচ্ছিল। অথচ বাগানের সম্পদ তৈরি হতো তাঁদেরই শ্রমে। যাঁরা উৎপাদন করতেন, নিজেদের শ্রমের সময় ও মূল্য নির্ধারণের অধিকার তাঁদের ছিল না।

১৮২৩ সালে ব্রিটেনে দাসপ্রথা বিলোপের দাবিতে নতুন সংগঠিত উদ্যোগ গড়ে ওঠে। উইলিয়াম উইলবারফোর্স তখন বয়স ও অসুস্থতার কারণে আগের মতো সক্রিয় ছিলেন না; সংসদীয় নেতৃত্বে টমাস ফাওয়েল বাক্সটন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। টমাস ক্লার্কসনসহ অভিজ্ঞ আন্দোলনকারীরাও প্রচার চালিয়ে যান। প্রথমদিকে নেতৃত্বের একটি অংশ ধীরে সংস্কারের মাধ্যমে মুক্তির কথা বলতেন। কিন্তু উপনিবেশের আইনসভা ও মালিকেরা পরিবর্তন আটকে দেওয়ায় প্রশ্ন উঠল, যাঁরা দাসত্ব থেকে লাভ করছেন, তাঁদের সদিচ্ছার ওপর মুক্তি নির্ভর করবে কেন?

এই প্রশ্নকে তীব্র করেন নারী আন্দোলনকারীরা। এলিজাবেথ হেইরিক ১৮২৪ সালে অবিলম্বে দাসত্ব বিলোপের পক্ষে লেখেন। তাঁর যুক্তি ছিল, অন্যায় স্বীকার করেও সেটি দীর্ঘায়িত করার নৈতিক ভিত্তি নেই। নারীদের সংগঠন চিনি বর্জন, অর্থ সংগ্রহ ও জনমত গঠনে সক্রিয় হয়। পাশাপাশি ১৮৩১ সালে প্রকাশিত মেরি প্রিন্সের জীবনবিবরণ পাঠকদের সামনে দাসত্বের দৈনন্দিন নির্যাতন তুলে ধরে। একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীর অভিজ্ঞতা দেখায়, সংসদীয় আলোচনার আড়ালে বাস্তব মানুষের শরীর, পরিবার ও নিরাপত্তা প্রতিদিন বিপন্ন হচ্ছিল।

উপনিবেশের বন্দি মানুষেরাও নিজেদের মুক্তির লড়াই চালাচ্ছিলেন। ১৮৩১ সালের শেষদিকে জামাইকায় স্যামুয়েল শার্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমপ্রত্যাখ্যানের পরিকল্পনা বড় বিদ্রোহে রূপ নেয়। ব্যাপটিস্ট যুদ্ধ নামে পরিচিত এই প্রতিরোধ নির্মমভাবে দমন করা হয়; শার্পকে পরের বছর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু দমনপীড়নের খবর ব্রিটেনে পৌঁছে বাগানব্যবস্থার নিষ্ঠুরতা আরও প্রকাশ করে। বিদ্রোহ দেখিয়েছিল, দাসত্ব বজায় রাখার অর্থ ক্রমাগত সহিংসতা ও অস্থিরতা। মুক্তির আইন শুধু ব্রিটিশ সহানুভূতির ফল ছিল না; দাসত্বে আবদ্ধ মানুষের প্রতিরোধও পরিবর্তন ত্বরান্বিত করেছিল।

১৮৩২ সালের সংসদীয় সংস্কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে সাহায্য করে। এতে গণতন্ত্র সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবে প্রতিনিধিত্বের পুরোনো কাঠামোর কিছু পরিবর্তন আসে। আন্দোলনকারীরা নির্বাচনে দাসপ্রথাবিরোধী প্রার্থীদের সমর্থন করেন এবং আবেদনপত্রের চাপ বাড়ান। আর্ল গ্রের সরকারের সময় উপনিবেশবিষয়ক মন্ত্রী এডওয়ার্ড স্ট্যানলি বিলোপের পরিকল্পনা সামনে আনেন। সরকারের লক্ষ্য ছিল দাসত্ব শেষ করার পাশাপাশি বাগানের উৎপাদন ও মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করা। এই আপসই পরবর্তী আইনের সবচেয়ে বিতর্কিত দুটি ব্যবস্থা তৈরি করে—মালিকদের ক্ষতিপূরণ এবং মুক্ত মানুষদের বাধ্যতামূলক শিক্ষানবিশ শ্রম।

১৮৩৩ সালের ২৮ আগস্ট দাসপ্রথা বিলোপ আইন রাজকীয় অনুমোদন পায়। এর মাধ্যমে আওতাভুক্ত উপনিবেশে দাসত্বের আইনি অবসানের ভিত্তি স্থাপিত হয়। তবে নামের ব্যাপকতা দেখে সমগ্র সাম্রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলে একই সঙ্গে মুক্তি এসেছিল মনে করা ভুল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীন অঞ্চল, সিলন ও সেন্ট হেলেনা আইনের সাধারণ প্রয়োগের বাইরে ছিল। ক্যারিবীয় অঞ্চল, মরিশাস ও কেপের মতো এলাকাতেও বাস্তবায়নের সময় ও ব্যবস্থা এক ছিল না। তাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাসত্বের অবসানকে একটি তারিখে সম্পূর্ণ হওয়া ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না।

আইনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বৈপরীত্য ছিল ক্ষতিপূরণ। সরকার সাবেক দাসমালিকদের দাবির জন্য দুই কোটি পাউন্ড বরাদ্দ করে। তাঁদের মানুষের শ্রমের ওপর স্বীকৃত অধিকার হারানোর বিনিময়ে এই অর্থ দেওয়া হয়। কিন্তু যাঁদের জীবন থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তাঁরা নিজেদের হারানো শ্রম, নির্যাতন বা বিচ্ছিন্ন পরিবারের জন্য এই ব্যবস্থায় ক্ষতিপূরণ পাননি। অর্থাৎ রাষ্ট্র দাসত্বের অবসান ঘটালেও সম্পত্তির পুরোনো ধারণাকে আর্থিকভাবে সম্মান জানাল। মুক্ত মানুষের নতুন জীবন গড়ার চেয়ে মালিকের ক্ষতি পূরণ আইনপ্রণেতাদের কাছে বেশি সুনির্দিষ্ট দাবি হয়ে উঠেছিল।

১৮৩৪ সালের ১ আগস্ট ব্রিটিশ ক্যারিবীয় অঞ্চলের অধিকাংশ স্থানে আইন কার্যকর হয়। দাস হিসেবে মানুষের আইনি অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু ছয় বছর বা তার বেশি বয়সীদের বড় অংশকে শিক্ষানবিশ শ্রমিকে পরিণত করা হয়। ছয় বছরের কম শিশুদের এই সাধারণ বাধ্যতামূলক পর্যায়ে রাখা হয়নি। কৃষিকাজে নিযুক্তদের জন্য শিক্ষানবিশকাল নির্ধারিত ছিল ছয় বছর, অন্য শ্রেণির জন্য চার বছর। ফলে অনেকের কাছে মুক্তির ঘোষণার অর্থ দাঁড়াল—পুরোনো মালিকের অধীনে আরও কয়েক বছর কাজ করা। আইনি দাসত্ব শেষ হলেও নিজের শ্রমের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব সঙ্গে সঙ্গে আসেনি।

‘শিক্ষানবিশ’ শব্দটি কোনো নতুন দক্ষতা শেখার ধারণা তৈরি করলেও এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিল বাগানের শ্রম সরবরাহ নিশ্চিত করা। শ্রমিকদের নির্ধারিত সময় বিনা মজুরিতে কাজ করতে হতো; বিনিময়ে খাদ্য, বাসস্থানসহ কিছু দায়িত্ব সাবেক মালিকের ওপর থাকত। অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিতি, কাজ প্রত্যাখ্যান বা নির্ধারিত শ্রম নিয়ে বিরোধ শাস্তির কারণ হতে পারত। শাস্তি ও অভিযোগ দেখার জন্য বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ক্ষমতার অসমতা দূর হয়নি। কাজের হিসাব, অভিযোগ এবং শাস্তির মাধ্যমে পুরোনো নিয়ন্ত্রণ নতুন আইনি কাঠামোর মধ্যে টিকে থাকে।

সব উপনিবেশ অবশ্য একই পথ নেয়নি। অ্যান্টিগা ১৮৩৪ সালেই শিক্ষানবিশ পর্যায় ছাড়া মুক্তি কার্যকর করে। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, দাসত্ব থেকে স্বাধীন শ্রমে যেতে বাধ্যতামূলক অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা অবশ্যম্ভাবী ছিল না। অন্যদিকে মরিশাসে সংশ্লিষ্ট পরিবর্তন শুরু হয় ১৮৩৫ সালে এবং শিক্ষানবিশ ব্যবস্থার অবসান ঘটে ১৮৩৯ সালে। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ১৮৩৮ সালের মুক্তির কথা মূলত ব্রিটিশ ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে বলা হয়। সাম্রাজ্যের বিস্তৃত ভূখণ্ডের ইতিহাসকে ক্যারিবীয় অঞ্চলের সময়সূচির সঙ্গে পুরোপুরি মিলিয়ে ফেললে বাস্তবতা আড়াল হয়।

শিক্ষানবিশ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের অভিযোগ, প্রতিরোধ ও অভিজ্ঞতা ব্রিটেনে নতুন আন্দোলনের উপকরণ হয়ে ওঠে। জোসেফ স্টার্জ ১৮৩৬–১৮৩৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর করে এর কার্যপ্রণালি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। সমালোচকেরা দেখান, স্বাধীনতার প্রস্তুতির নামে পুরোনো মালিকদের জন্য বাধ্যতামূলক শ্রম ধরে রাখা হয়েছে। কৃষিশ্রমিকদের ১৮৪০ পর্যন্ত আটকে রেখে অন্যদের ১৮৩৮ সালে মুক্ত করার বৈষম্যও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। জনমত, রাজনৈতিক চাপ এবং উপনিবেশের বিরোধের মুখে ব্যবস্থা আগেই শেষ করার দাবি জোরদার হয়।

অবশেষে ১৮৩৮ সালের ১ আগস্ট ব্রিটিশ ক্যারিবীয় অঞ্চলে অবশিষ্ট শিক্ষানবিশ শ্রমব্যবস্থার অবসান ঘটে। কৃষিশ্রমিকদের নির্ধারিত ছয় বছরের মেয়াদও শেষ পর্যন্ত বহাল থাকেনি। এখন সাবেক মালিকের কাছে বিনা মজুরির নির্ধারিত শ্রম দেওয়ার বাধ্যবাধকতা উঠে যায়। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, কাজের শর্ত নিয়ে দরকষাকষি এবং নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নতুন অর্থ পায়। তবু জমি, মূলধন ও রাজনৈতিক ক্ষমতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরোনো সুবিধাভোগীদের হাতেই ছিল। কাজ ছাড়ার আইনি অধিকার পেলেও জীবিকা পাওয়ার বাস্তব পথ সবার জন্য সহজ হয়নি।

এই ইতিহাসে ১৮৩৩, ১৮৩৪ ও ১৮৩৮ তাই তিনটি পৃথক ধাপ: আইনপ্রণয়ন, শর্তযুক্ত মুক্তি এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে বাধ্যতামূলক শিক্ষানবিশ শ্রমের অবসান। স্বাধীনতা এসেছিল দীর্ঘ আন্দোলন ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে, আর তার সীমা নির্ধারিত হয়েছিল আপস ও ক্ষমতার সম্পর্ক দিয়ে। ব্রিটিশ উপনিবেশে এই পরিবর্তন ঘটলেও আটলান্টিকের অন্য তীরে দাসত্ব বহাল ছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে তুলাবাগানের বিস্তার মানুষকে সম্পত্তি করে রাখার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করছিল। দাসপ্রথা বিলোপের সংগ্রামের পরবর্তী অধ্যায় তাই সামনে আনবে স্বাধীনতার ঘোষণায় জন্ম নেওয়া একটি দেশের গভীর বৈপরীত্য।


আপনার পছন্দ হতে পারে