ব্রিটেনে দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলন: উইলবারফোর্স, একুইয়ানো ও ১৮০৭ সালের আইন
সিরিজ: দাসপ্রথা বিলুপ্তির ইতিহাস
দাসবাণিজ্য বন্ধের বিজয়, পূর্ণ মুক্তির অপেক্ষা
আটলান্টিকের দুই তীরে দাসত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছিল, তখন সেই প্রশ্ন ব্রিটেনের বন্দর, গির্জা, বসার ঘর ও সংসদেও পৌঁছাতে শুরু করে। যে দেশের জাহাজ আফ্রিকার মানুষকে বন্দি করে আমেরিকায় নিয়ে যাচ্ছিল, সেই দেশেই গড়ে উঠছিল মানুষ কেনাবেচা বন্ধের সংগঠিত আন্দোলন। কিন্তু লাভজনক একটি বাণিজ্যের বিরুদ্ধে নৈতিক আপত্তি জানানো আর সেটিকে আইন করে নিষিদ্ধ করা এক বিষয় ছিল না। এই দূরত্ব অতিক্রম করতে প্রয়োজন হয়েছিল কয়েক দশকের প্রচার, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিবরণ, জনমত এবং বারবার সংসদীয় পরাজয়ের পরও ফিরে আসার দৃঢ়তা।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ দাসবাণিজ্য ছিল বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ। লিভারপুল, ব্রিস্টল ও লন্ডনের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যুক্ত ছিল জাহাজ নির্মাতা, ঋণদাতা, বীমাকারী এবং ক্যারিবীয় বাগানমালিকেরা। দাসশ্রমে উৎপাদিত চিনি ব্রিটিশ পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে ঢুকে পড়েছিল। ফলে আন্দোলনকারীরা নিষ্ঠুরতার পাশাপাশি এমন সম্পদ ও প্রভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, যার শিকড় সংসদেও বিস্তৃত ছিল। বাণিজ্যের সমর্থকেরা কর্মসংস্থান, নৌবাহিনীর শক্তি এবং বিদেশি প্রতিযোগিতার যুক্তি তুলতেন। তাঁদের দাবি ছিল, ব্রিটেন সরে গেলে অন্য দেশ লাভ করবে; আফ্রিকানদের দুর্দশা তাতে কমবে না।
এই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার প্রাথমিক সংগঠকদের মধ্যে কোয়েকার ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। মানুষের আধ্যাত্মিক সমতার বিশ্বাস তাঁদের অনেককে দাসত্বের বিরোধিতায় উদ্বুদ্ধ করে। তাঁরা আবেদনপত্র, প্রকাশনা ও যোগাযোগের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনেন। অন্যদিকে গ্র্যানভিল শার্প ব্রিটেনে আফ্রিকানদের স্বাধীনতার দাবিসংক্রান্ত আইনি লড়াইয়ে সক্রিয় ছিলেন। ১৭৭২ সালের সমারসেট মামলার রায়ে জেমস সমারসেটকে জোর করে ইংল্যান্ড থেকে সরিয়ে দাস হিসেবে বিদেশে পাঠানোর বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত আসে। এই রায় সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাসপ্রথা বিলোপ করেনি, তবে মালিকের ক্ষমতা যে প্রশ্নাতীত নয়, তা স্পষ্ট করেছিল।
১৭৮৭ সালে লন্ডনে দাসবাণিজ্য বিলোপের উদ্দেশ্যে একটি সংগঠিত সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শার্প, টমাস ক্লার্কসন এবং কোয়েকার সংগঠকেরা। আন্দোলনের পরিকল্পনা ছিল দাসবাণিজ্যের বাস্তব চেহারা জনসমক্ষে উন্মোচন করা এবং সংসদকে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা। প্রথম লক্ষ্য হিসেবে বাণিজ্য বন্ধকে বেছে নেওয়া হয়েছিল, কারণ উপনিবেশের দাসমালিকানার বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাতের তুলনায় এটি রাজনৈতিকভাবে অর্জনযোগ্য মনে করা হচ্ছিল। তবে এই কৌশলের সীমাও ছিল। নতুন মানুষ আনা বন্ধ হলেও ইতিমধ্যে বন্দি মানুষদের শ্রম ও সন্তানদের ওপর মালিকের দাবি বহাল থাকতে পারত।
ক্লার্কসন বুঝেছিলেন, আবেগের সঙ্গে প্রমাণও দরকার। তিনি বন্দরনগরে ঘুরে নাবিক, চিকিৎসক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ করেন। জাহাজে ব্যবহৃত শিকল ও নির্যাতনের সরঞ্জামও প্রচারের উপকরণ হয়ে ওঠে। দাসবাহী জাহাজ ‘ব্রুকস’-এর বহুল প্রচারিত নকশায় দেখানো হয়, কীভাবে সীমিত জায়গায় মানুষের শরীর পাশাপাশি গুঁজে রাখা হতো। দূর সমুদ্রের অদৃশ্য দুর্দশা তখন কাগজের ওপর দৃশ্যমান হয়ে উঠল। বন্দিদের কষ্টের পাশাপাশি নাবিকদের মৃত্যুঝুঁকির তথ্যও বাণিজ্যকে জাতীয় সমৃদ্ধির নিরীহ উৎস হিসেবে দেখানোর যুক্তি দুর্বল করে।
তবে আফ্রিকানদের অভিজ্ঞতা শুধু শ্বেতাঙ্গ সংগঠকদের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি। ওলাউদাহ একুইয়ানো ছিলেন নিজের অধিকার ও নিজের জনগোষ্ঠীর মর্যাদার পক্ষে কথা বলা একজন স্বাধীন রাজনৈতিক কর্মী। তাঁর আত্মজীবনীর বর্ণনা অনুযায়ী, শৈশবে আফ্রিকা থেকে অপহরণের পর তাঁকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি সমুদ্রযাত্রা, বেচাকেনা এবং দাসত্বের অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৭৬৬ সালে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে নিজের স্বাধীনতা কেনেন। যে সমাজ মানুষকে সম্পত্তি মনে করত, সেখানে তাঁকে নিজের ওপর নিজের অধিকারও অর্থ দিয়ে অর্জন করতে হয়েছিল।
১৭৮৯ সালে প্রকাশিত একুইয়ানোর আত্মজীবনী ব্রিটিশ পাঠকের সামনে দাসত্বের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বক্তব্য হাজির করে। সেখানে বন্দিজীবনের ভয়ের পাশাপাশি ছিল পরিবার, বিশ্বাস, শ্রম, বুদ্ধিমত্তা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। আফ্রিকানদের সভ্যতা ও অনুভূতিহীন বলে প্রচার করা ধারণাকে তাঁর লেখকসত্তাই চ্যালেঞ্জ জানায়। তিনি বিভিন্ন স্থানে গিয়ে বই প্রচার ও আন্দোলনের পক্ষে বক্তব্য দেন। অটোবাহ কুগোয়ানোসহ কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলনকারীদের ‘সন্স অব আফ্রিকা’ গোষ্ঠী চিঠি, সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাত। তাঁদের উপস্থিতি দেখায়, দাসত্বের শিকার মানুষেরা এই সংগ্রামের সক্রিয় নির্মাতা ছিলেন।
সংসদের ভেতরে আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন উইলিয়াম উইলবারফোর্স। ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে তিনি রাজনীতিকে নৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন। জন নিউটনের মতো ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগও তাঁর চিন্তায় প্রভাব ফেলে; নিউটন নিজে আগে দাসবাণিজ্যে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু উইলবারফোর্সের সংসদীয় ভূমিকা কার্যকর হয়েছিল বাইরের সংগঠকেরা তথ্য ও জনসমর্থন জোগাচ্ছিলেন বলেই। ১৭৮৯ সালের ১২ মে তিনি কমন্স সভায় দাসবাণিজ্যের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা দেন। নিষ্ঠুরতার অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে সরিয়ে দেওয়ার বদলে তিনি বাণিজ্যব্যবস্থাটিকেই বিচারের বিষয় করেন।
বক্তৃতা দিলেই অবশ্য স্বার্থের দেয়াল ভাঙেনি। ১৭৯১ সালে বিলোপের প্রস্তাব পরাজিত হয়। পরের বছর ধীরে বিলোপের ধারণা সমর্থন পেলেও দ্রুত কার্যকর নিষেধাজ্ঞা আসেনি। বিলম্ব দাসব্যবসায়ীদের সময় দিচ্ছিল, আর আফ্রিকা থেকে মানুষ বহন চলছিল। ফরাসি বিপ্লব, ব্রিটেনের সঙ্গে ফ্রান্সের যুদ্ধ এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে বিদ্রোহের খবর বিতর্ককে আরও জটিল করে। সাঁ-দোম্যাঙের বিপ্লব দাসত্বের বিরুদ্ধে আত্মমুক্তির শক্তি প্রকাশ করলেও ব্রিটেনের রক্ষণশীলদের অনেকে সেটিকে বিশৃঙ্খলার সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যবহার করেন। তাই দাসদের প্রতিরোধের প্রভাব ছিল গভীর, কিন্তু ব্রিটিশ রাজনীতিতে তার প্রতিক্রিয়া একমুখী ছিল না।
সংসদের বাইরে আন্দোলন ক্রমে দৈনন্দিন জীবনের সিদ্ধান্তেও প্রবেশ করে। বিভিন্ন শহরে জনসভা হয়, আবেদনপত্রে স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয় এবং দাসশ্রমে উৎপাদিত চিনি বর্জনের আহ্বান ছড়ায়। ভোটাধিকারবঞ্চিত নারীরাও কেনাকাটা, পারিবারিক আলোচনা ও প্রচারের মাধ্যমে অংশ নেন। এক কাপ চায়ের মিষ্টতার সঙ্গে ক্যারিবীয় বাগানের জোরপূর্বক শ্রমের সম্পর্ক সামনে আসে। রাজনৈতিক ক্ষমতা সীমিত হলেও সাধারণ মানুষ জনমত ও ভোগের সিদ্ধান্ত দিয়ে চাপ তৈরি করতে পারতেন। তবে চিনি বর্জন একাই আইন এনে দেয়নি; এটি বৃহত্তর সাংগঠনিক ও সংসদীয় সংগ্রামকে শক্তি জুগিয়েছিল।
১৮০৬ সালে আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সাফল্য পায়। বিদেশি শক্তির উপনিবেশে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের দাস সরবরাহ নিষিদ্ধ করার আইন পাস হয়। যুদ্ধকালীন প্রতিপক্ষের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার যুক্তিও এই পদক্ষেপকে গ্রহণযোগ্য করে। এতে ব্রিটিশ দাসবাণিজ্যের ওপর বড় আঘাত আসে এবং আরও বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞার পথ তৈরি হয়। পরের বছর প্রধানমন্ত্রী লর্ড গ্রেনভিলের সরকার পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগকে সমর্থন করে। দীর্ঘদিনের নৈতিক প্রচার তখন অনুকূল সরকারি সিদ্ধান্ত ও সংসদীয় সমর্থনের সঙ্গে যুক্ত হয়। বিজয় তাই একজন বক্তার সাফল্যের চেয়ে অনেক বিস্তৃত রাজনৈতিক সমাবেশের ফল।
১৮০৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কমন্স সভার গুরুত্বপূর্ণ ভোটে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে পড়ে ২৮৩ ভোট, বিপক্ষে ১৬। দীর্ঘ সংগ্রামের পর উইলবারফোর্স সহকর্মীদের অভিনন্দন পান। প্রয়োজনীয় আইনপ্রণয়ন প্রক্রিয়া শেষে ২৫ মার্চ ১৮০৭ সালে দাসবাণিজ্য নিষিদ্ধকরণের আইন রাজকীয় অনুমোদন লাভ করে। ব্রিটিশ জাহাজ ও ব্রিটিশ প্রজাদের এই বাণিজ্যে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি হয়। একুইয়ানো অবশ্য দিনটি দেখে যেতে পারেননি; তিনি ১৭৯৭ সালে মারা যান। তাঁর লেখা ও প্রচার আন্দোলনকে যে শক্তি দিয়েছিল, তা তাঁর মৃত্যুর পরও কার্যকর ছিল।
কিন্তু সংসদের বিজয়ধ্বনি ক্যারিবীয় আখখেতে সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা আনেনি। ১৮০৭ সালের আইন দাসবাণিজ্য নিষিদ্ধ করেছিল; দাসমালিকানা বিলোপ করেনি। উপনিবেশে বন্দি মানুষেরা তখনো মালিকের অধীনে শ্রম দিতে বাধ্য ছিলেন, আর বেআইনি পাচার ঠেকাতেও দীর্ঘ লড়াই প্রয়োজন হয়। অধিকাংশ ব্রিটিশ উপনিবেশে দাসত্ব বিলোপের আইন আসবে ১৮৩৩ সালে; তার পরও বাধ্যতামূলক শিক্ষানবিশ ব্যবস্থার আড়ালে শ্রমনিয়ন্ত্রণ চলবে। ফলে ১৮০৭ ছিল গুরুত্বপূর্ণ দরজা খোলার বছর। পরবর্তী সংগ্রামের প্রশ্ন আরও সরাসরি হয়ে উঠল—মানুষ কেনাবেচা বন্ধ হলে, মানুষকে সম্পত্তি করে রাখা চলবে কীভাবে?
আমেরিকার গৃহযুদ্ধ ও দাসপ্রথার অবসান: লিংকনের মুক্তির ঘোষণা থেকে ত্রয়োদশ সংশোধনী
যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলন: ডগলাস, টাবম্যান ও আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড
অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরি: যেভাবে এক কিশোরী হলোকাস্টের বিশ্বজনীন প্রতীক হয়ে উঠল
মার্গারেট স্যাঙ্গার: জন্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলনের অগ্রদূত ও তাঁর বিতর্কিত উত্তরাধিকার
র্যাচেল কারসন ও সাইলেন্ট স্প্রিং: যে বই পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাস বদলে দিল