অ্যাসিরীয় রাজবংশ: দুর্ধর্ষ সামরিক সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতনের কারণ
সিরিজ: রাজবংশের উত্থান-পতন: ক্ষমতা, গৌরব ও পতনের ইতিহাস
নিনেভেহর প্রাসাদ থেকে সাম্রাজ্যের পতন—অ্যাসিরীয় শক্তির ইতিহাস।
প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের বহু নগরের কাছে অ্যাসিরীয় সেনাবাহিনীর আগমন ছিল অবরোধ, লুণ্ঠন এবং নির্বাসনের আশঙ্কা। রাজপ্রাসাদের দেয়ালে শাসকেরা নিজেদের বিজয় ও শত্রুর শাস্তির দৃশ্য খোদাই করতেন। এই সাম্রাজ্য শুধু যুদ্ধ জিতত না; পরাজিত ভূখণ্ডকে প্রদেশে পরিণত করে কর, শ্রম ও সৈন্য সংগ্রহের ব্যবস্থাও গড়ত। অথচ খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের শেষভাগে এর প্রধান নগরগুলো একে একে ধ্বংস হয়ে যায়। অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যকে অজেয় করে তুলেছিল যে বিশাল সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা, অভ্যন্তরীণ সংকটে সেই ব্যবস্থাই দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
অ্যাসিরীয় ইতিহাস আসলে একটি অবিচ্ছিন্ন রাজপরিবারের ইতিহাস নয়। বর্তমান উত্তর ইরাকের আশুর নগরকে কেন্দ্র করে বহু শতাব্দীতে এর রাজনৈতিক শক্তি বিকশিত হয়। পুরাতন অ্যাসিরীয় যুগে আনাতোলিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল; মধ্য অ্যাসিরীয় যুগে ভূখণ্ডভিত্তিক রাজশক্তি বিস্তৃত হয়। সবচেয়ে পরিচিত সাম্রাজ্যিক পর্ব হলো নব্য-অ্যাসিরীয় যুগ, সাধারণভাবে খ্রিস্টপূর্ব ৯১১–৬০৯ সাল। এই সময়েও ক্ষমতায় পরিবর্তন ও নতুন রাজবংশীয় শাখার উত্থান ঘটে। তাই সাম্রাজ্যের পতন বোঝার জন্য বিশেষভাবে শেষ তিন শতাব্দীর সম্প্রসারণ ও শাসনব্যবস্থার দিকে তাকাতে হয়।
দ্বিতীয় আশুরনাসিরপাল ও তৃতীয় শালমানেসারের মতো রাজারা খ্রিস্টপূর্ব নবম শতকে ধারাবাহিক অভিযানে অ্যাসিরীয় প্রভাব বিস্তৃত করেন। কালহু, অর্থাৎ বর্তমান নিমরুদ, রাজকীয় কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়। রাজারা নিজেদের আশুর দেবতার অনুমোদিত শাসক হিসেবে উপস্থাপন করতেন; সামরিক বিজয় ধর্মীয় কর্তব্যের ভাষাও পেত। কিন্তু প্রতিটি বিজিত রাজ্যকে সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি শাসন করা হতো না। অনেক শাসক কর ও আনুগত্য দেওয়ার বিনিময়ে সিংহাসনে থাকতেন। সমস্যা হতো যখন তাঁরা কর বন্ধ করতেন, জোট বদলাতেন কিংবা অ্যাসিরীয় রাজার মৃত্যুকে বিদ্রোহের সুযোগ ভাবতেন।
খ্রিস্টপূর্ব ৭৪৫ সালে ক্ষমতায় আসা তৃতীয় তিগ্লাথ-পিলেসার সাম্রাজ্য পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। বিজিত অঞ্চলের বহু অংশকে প্রদেশে পরিণত করা হয় এবং রাজনিযুক্ত গভর্নরদের ভূমিকা বাড়ে। সেনাবাহিনীতে রাজকীয় নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি প্রাদেশিক সৈন্য ও অধীন জনগোষ্ঠীর যোদ্ধারা অংশ নিত। অ্যাসিরীয় শক্তির ভিত্তি কেবল নিষ্ঠুরতা বা উন্নত অস্ত্র ছিল না; নিয়মিত জনশক্তি, সরবরাহ ও সংগঠিত প্রশাসন ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় সারগন, সেন্নাখেরিব, এসারহাদ্দন ও আশুরবানিপালের সময় এই ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হয়।
অ্যাসিরীয় সেনাবাহিনী বিভিন্ন ধরনের বাহিনী একত্রে ব্যবহার করত। ধনুকধারীদের আড়াল দিত ঢালধারীরা; অশ্বারোহী বাহিনী দ্রুত চলাচল ও অনুসরণে সাহায্য করত; রথেরও ভূমিকা ছিল। অবরোধযন্ত্র, ঢালু পথ তৈরি এবং দুর্গপ্রাচীর দুর্বল করার কৌশল সুরক্ষিত নগরের বিরুদ্ধে কার্যকর হতো। নদী পারাপার ও দীর্ঘ অভিযানের জন্য প্রকৌশল এবং রসদ ব্যবস্থাপনা দরকার ছিল। লোহার অস্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও অ্যাসিরীয়দের একক লৌহপ্রযুক্তির আধিপত্য ছিল না। তাদের সাফল্য এসেছিল পরিচিত প্রযুক্তিকে বৃহৎ, সমন্বিত সামরিক ব্যবস্থায় ব্যবহার করার ক্ষমতা থেকে।
রাজকীয় সন্ত্রাস ছিল এই যুদ্ধনীতির প্রকাশ্য অংশ। বিদ্রোহীদের হত্যা, দেহ বিকৃত করা ও নগর ধ্বংসের বিবরণ শিলালিপিতে পাওয়া যায়। এগুলো বাস্তব সহিংসতার সাক্ষ্য, একই সঙ্গে শত্রুকে ভয় দেখানোর প্রচারও। তাই প্রতিটি রাজকীয় দাবি আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করা উচিত নয়। আতঙ্ক সৃষ্টি করে সম্ভাব্য বিদ্রোহ ঠেকানো ছিল উদ্দেশ্য, কিন্তু একই নীতি প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা ও শাসকদের প্রতি গভীর অবিশ্বাসও তৈরি করতে পারত। তবে সাম্রাজ্যের সব প্রজার অভিজ্ঞতা এক ছিল না; স্থানীয় সহযোগী ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীও অ্যাসিরীয় ব্যবস্থার অংশ ছিল।
জোরপূর্বক জনস্থানান্তর ছিল শাসনের আরেক প্রধান উপায়। বিজিত অঞ্চলের মানুষকে পরিবারসহ অন্যত্র পাঠিয়ে বিদ্রোহের সামাজিক ভিত্তি দুর্বল করা হতো। একই সঙ্গে কৃষক, কারিগর ও দক্ষ কর্মী এনে নতুন বসতি, নির্মাণ এবং উৎপাদনে ব্যবহার করা যেত। এই মানুষদের সবাই একই আইনি অবস্থার দাস ছিলেন না, কিন্তু স্থানান্তর ছিল বাধ্যতামূলক এবং প্রায়ই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের কারণ। নতুন পরিবেশে তাঁদের ওপর কর ও শ্রমের দায়িত্ব চাপত। সাম্রাজ্য বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত করলেও সেই সংযোগের ভিত্তিতে বলপ্রয়োগ গভীরভাবে উপস্থিত ছিল।
সেন্নাখেরিব নিনেভেহকে বিশাল রাজধানীতে রূপান্তর করেন। প্রাসাদ, উদ্যান, খাল ও জলসেতু নির্মাণ রাজশক্তির সম্পদ এবং প্রকৌশল দক্ষতা দেখায়। এসারহাদ্দন মিশরে অভিযান চালান; আশুরবানিপালের সময় অ্যাসিরীয় বাহিনী থিবস পর্যন্ত পৌঁছায়। আশুরবানিপালের সংগৃহীত কিউনিফর্ম ফলকে সাহিত্য, চিকিৎসা, জ্যোতিষ ও রাজকীয় জ্ঞানের বিপুল ভান্ডার ছিল। গিলগামেশের মহাকাব্যের গুরুত্বপূর্ণ পাঠও এই সংগ্রহে সংরক্ষিত হয়েছে। ফলে অ্যাসিরীয় ইতিহাসকে শুধু যুদ্ধের ইতিহাস করলে প্রশাসন, শিল্প ও জ্ঞানসংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়াল হয়ে যায়।
তবে শাসক পরিবারের ভেতরের সংঘর্ষ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে বারবার আঘাত করে। সেন্নাখেরিব খ্রিস্টপূর্ব ৬৮১ সালে রাজপরিবারের ষড়যন্ত্রে নিহত হন। পরে আশুরবানিপালের ভাই, ব্যাবিলনের রাজা শামাশ-শুম-উকিন, তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৬৫২–৬৪৮ সালের সেই সংঘর্ষ দমন করা হলেও ব্যাবিলনীয় অঞ্চলের অস্থিরতা শেষ হয়নি। বিশাল সাম্রাজ্যে উত্তরাধিকারসংকট কেবল প্রাসাদের সমস্যা থাকত না; তা প্রদেশ, সেনাবাহিনী ও অধীন রাজ্যের আনুগত্য নাড়িয়ে দিত। শক্তিশালী শাসকের ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও এখানে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
আশুরবানিপালের শেষ রাজত্বকাল ও পরবর্তী উত্তরাধিকারের কিছু বিবরণ অস্পষ্ট। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের শেষ দশকগুলোতে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও বিদ্রোহ সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে। দক্ষিণে নাবোপোলাসার খ্রিস্টপূর্ব ৬২৬ সালে ব্যাবিলনের সিংহাসনে বসে স্বাধীন শক্তি গড়ে তোলেন। পূর্বদিকে মিদীয় শক্তিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দীর্ঘ যুদ্ধ, দূরবর্তী সীমান্ত এবং প্রদেশ থেকে সম্পদ সংগ্রহের চাপ পরিস্থিতিকে জটিল করেছিল। কিছু জলবায়ু গবেষণায় শেষপর্বের শুষ্কতাকে সম্ভাব্য চাপ হিসেবে আলোচনা করা হয়; তবে খরাকেই পতনের একমাত্র কারণ বলা যায় না।
নির্ণায়ক পরিবর্তন ঘটে যখন প্রতিপক্ষরা অ্যাসিরীয় মূল ভূখণ্ডে সমন্বিত আঘাত হানে। খ্রিস্টপূর্ব ৬১৪ সালে মিদীয়রা আশুর দখল করে। এরপর ব্যাবিলনীয়-মিদীয় সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৬১২ সালে অবরোধের পর নিনেভেহ পতিত হয়; প্রাসাদ ও নগরের ধ্বংস সাম্রাজ্যের কেন্দ্রকে ভেঙে দেয়। রাজধানীর পতন মানে শুধু রাজপ্রাসাদ হারানো নয়—রাজকোষ, নথি, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং সামরিক সমন্বয়ের ওপর বিপুল আঘাত। একসময় পৃথক প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করা সাম্রাজ্য এবার নিজের কেন্দ্রে শক্তিশালী জোটের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়।
নিনেভেহ পতনের পরও প্রতিরোধ সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়নি। দ্বিতীয় আশুর-উবাল্লিত হারানকে কেন্দ্র করে অবশিষ্ট শক্তি সংগঠিত করেন এবং মিশরীয় সহায়তা পান। কিন্তু হারানও হারিয়ে যায়; খ্রিস্টপূর্ব ৬০৯ সালের পুনর্দখলের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর স্বাধীন অ্যাসিরীয় রাজশক্তির পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি। পতনের কারণ তাই ‘অত্যাচারের শাস্তি’ বলে শেষ করা ইতিহাসকে সরল করে ফেলে। রাজপরিবারের দ্বন্দ্ব, বিদ্রোহ, সম্পদের চাপ এবং প্রতিপক্ষের কার্যকর সামরিক জোট একসঙ্গে সাম্রাজ্য ধ্বংস করেছিল। অ্যাসিরীয় রাষ্ট্র বিলুপ্ত হলেও জনগোষ্ঠী ও বহু প্রশাসনিক ঐতিহ্য টিকে যায়; পরবর্তী সাম্রাজ্যগুলোও তার শাসনপদ্ধতির বিভিন্ন অভিজ্ঞতা গ্রহণ করে।
যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলন: ডগলাস, টাবম্যান ও আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাসপ্রথার বিলুপ্তি: ১৮৩৩ সালের আইন থেকে ১৮৩৮ সালের মুক্তি
ব্রিটেনে দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলন: উইলবারফোর্স, একুইয়ানো ও ১৮০৭ সালের আইন
অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরি: যেভাবে এক কিশোরী হলোকাস্টের বিশ্বজনীন প্রতীক হয়ে উঠল
মার্গারেট স্যাঙ্গার: জন্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলনের অগ্রদূত ও তাঁর বিতর্কিত উত্তরাধিকার
র্যাচেল কারসন ও সাইলেন্ট স্প্রিং: যে বই পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাস বদলে দিল