বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

স্পুটনিক-১: ১৯৫৭ সালে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়ে যেভাবে বিশ্বকে চমকে দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন

সিরিজ: মহাকাশ প্রতিযোগিতা: যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন

স্পুটনিক-১: ১৯৫৭ সালে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়ে যেভাবে বিশ্বকে চমকে দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন
ছোট এক উপগ্রহের সংকেতে বদলে গেল পৃথিবীর ইতিহাস।

সোভিয়েত উপগ্রহের সেই বিপ-বিপ শব্দ যুক্তরাষ্ট্রে এত গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল কেন—এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে ছিল তার সরলতার মধ্যেই। শব্দটি কোনো সামরিক হুমকির ঘোষণা ছিল না; কিন্তু সেটি প্রমাণ করছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন এমন একটি রকেট তৈরি করেছে, যা মানুষের বানানো যন্ত্রকে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরিয়ে রাখতে পারে। ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত মহাকাশে রাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতা ছিল মূলত পরিকল্পনা, পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন ও রাজনৈতিক ঘোষণার বিষয়। স্পুটনিক-১ সেই প্রতিযোগিতাকে এমন এক বাস্তবতায় পরিণত করেছিল, যার সংকেত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধরা সম্ভব ছিল।

প্রথম উপগ্রহ পাঠানোর সোভিয়েত পরিকল্পনা অবশ্য এত সরল ছিল না। সের্গেই কোরোলিয়ভের নেতৃত্বাধীন কর্মসূচিতে প্রথমে প্রায় দেড় টন ওজনের একটি বৈজ্ঞানিক উপগ্রহ তৈরির কাজ চলছিল, যার পরিচিতি ছিল অবজেক্ট ডি। এতে বায়ুমণ্ডল, মহাজাগতিক রশ্মি ও পৃথিবীর আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন যন্ত্র থাকার কথা ছিল। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা প্রস্তুত করতে সময় লাগছিল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। কোরোলিয়ভ বুঝেছিলেন, সব যন্ত্র প্রস্তুত হওয়ার অপেক্ষা করলে প্রথম হওয়ার সুযোগ হারিয়ে যেতে পারে। তাই আগে একটি ছোট ও তুলনামূলক সহজ উপগ্রহ পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এই বিকল্প উপগ্রহের প্রকৌশলগত পরিচিতি ছিল পিএস-১, অর্থাৎ সরলতম উপগ্রহ। তার পরিচিত নাম হয় স্পুটনিক-১; রুশ ভাষায় ‘স্পুটনিক’ শব্দটির অর্থ সহযাত্রী বা উপগ্রহ। প্রায় ৫৮ সেন্টিমিটার ব্যাসের গোলকটির ওজন ছিল ৮৩.৬ কিলোগ্রাম। চকচকে বাইরের আবরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল চারটি লম্বা অ্যান্টেনা। ভেতরে রাখা হয় দুটি বেতার প্রেরক, বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যাটারি এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ব্যবস্থা। এতে ক্যামেরা, সৌরপ্যানেল কিংবা পৃথিবীর ছবি পাঠানোর যন্ত্র ছিল না; প্রধান লক্ষ্য ছিল কক্ষপথে পৌঁছে নির্ভরযোগ্যভাবে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া।

দেখতে সরল হলেও উপগ্রহটি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল সমস্যা সমাধান করতে হয়েছিল। উৎক্ষেপণের কম্পন সহ্য করা, মহাশূন্যের তাপীয় পরিবেশে যন্ত্র সচল রাখা এবং পৃথিবী থেকে ধরা যায় এমন বেতারসংকেত পাঠানো নিশ্চিত করতে হয়। গোলকের ভেতর চাপযুক্ত নাইট্রোজেন রাখা হয়েছিল। অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ও চাপের পরিবর্তন সংকেতের ধরনে প্রভাব ফেলতে পারত, ফলে যন্ত্রটির অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব ছিল। বাইরের গোলাকার অবয়ব ও পালিশ করা পৃষ্ঠ তাপ ব্যবস্থাপনাতেও সহায়তা করত। ছোট আকারের পেছনে তাই শুধু দ্রুত নির্মাণের চিন্তা নয়, নির্ভরযোগ্যতার হিসাবও কাজ করেছিল।

উপগ্রহ বহনের শক্তি আসে আর-৭ আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের ভিত্তিতে তৈরি উৎক্ষেপণযান থেকে। এর কেন্দ্রীয় অংশের চারপাশে চারটি পার্শ্বীয় বুস্টার ছিল; উৎক্ষেপণের সময় এগুলো একসঙ্গে কাজ করত। তরল অক্সিজেন ও কেরোসিনচালিত এই ব্যবস্থার বিপুল উত্তোলনক্ষমতা সামরিক প্রকল্প থেকে মহাকাশ অভিযানে কাজে লাগানো হয়। আর-৭-এর উন্নয়ন সহজ ছিল না; আগের পরীক্ষাগুলোতে ব্যর্থতা ও সংশোধনের প্রয়োজন হয়েছিল। ফলে স্পুটনিকের সাফল্য একটি ছোট গোলক তৈরির গল্পের চেয়ে বড়: এর পেছনে ছিল ইঞ্জিন, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, ভূমিভিত্তিক সরঞ্জাম এবং পরীক্ষার দীর্ঘ প্রস্তুতি।

১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর রাতের অন্ধকারে সোভিয়েত কাজাখস্তানের উৎক্ষেপণকেন্দ্র থেকে রকেটটি যাত্রা করে। স্থানটি আজ বাইকোনুর কসমোড্রোম হিসেবে পরিচিত। মস্কোর সময় রাত ১০টা ২৮ মিনিটের দিকে উৎক্ষেপণ ঘটে। রকেটের কাজ ছিল উপগ্রহকে শুধু ওপরে তোলা নয়, পৃথিবীর চারপাশে ঘোরার উপযোগী অনুভূমিক বেগ দেওয়া। নির্ধারিত পর্যায়ে উপগ্রহটি রকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। এরপর তার বেতারসংকেত ধরা পড়ে। মানুষের তৈরি একটি বস্তু প্রথমবারের মতো পৃথিবীকে কেন্দ্র করে স্বাধীনভাবে কক্ষপথে চলতে শুরু করেছিল।

স্পুটনিক-১ প্রায় ৯৬ মিনিটে পৃথিবী একবার প্রদক্ষিণ করত। প্রাথমিক উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে তার নিকটতম দূরত্ব ছিল প্রায় ২১৫ কিলোমিটার এবং দূরতম দূরত্ব প্রায় ৯৩৯ কিলোমিটার। সে মহাকর্ষের বাইরে চলে যায়নি। বরং পৃথিবীর আকর্ষণে ক্রমাগত নিচের দিকে পড়তে পড়তেই এত দ্রুত সামনে এগোচ্ছিল যে ভূপৃষ্ঠে আছড়ে পড়ছিল না। কক্ষপথে থাকা মানে মহাকর্ষ থেকে মুক্ত হওয়া নয়; যথেষ্ট গতিতে পৃথিবীর চারপাশে অবিরাম পতনের অবস্থায় থাকা। স্পুটনিক এই বৈজ্ঞানিক ধারণাকে প্রথমবার একটি কৃত্রিম বস্তুর মাধ্যমে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করে।

উপগ্রহটির বেতার প্রেরক প্রায় ২০ ও ৪০ মেগাহার্টজ কম্পাঙ্কে সংকেত পাঠাত। উপযুক্ত যন্ত্র থাকলে পেশাদার পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের বাইরেও বেতারপ্রেমীরা সেই সংকেত ধরতে পারতেন। এই বৈশিষ্ট্য সোভিয়েত দাবিকে স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ দেয়। মানুষ শুধু সংবাদপত্রের ঘোষণার ওপর নির্ভর করেনি; পৃথিবী প্রদক্ষিণকারী বস্তুটির উপস্থিতি বেতারে শনাক্ত করা যাচ্ছিল। তবে খালি চোখে আকাশে দেখা উজ্জ্বল চলমান বিন্দুটি অনেক ক্ষেত্রে স্পুটনিকের ক্ষুদ্র গোলক ছিল না; তার সঙ্গে কক্ষপথে পৌঁছানো অপেক্ষাকৃত বড় রকেট অংশটি বেশি সহজে দৃশ্যমান হতো।

স্পুটনিকের বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম সীমিত হলেও তার অভিযান তথ্যহীন ছিল না। কক্ষপথের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে ওপরের বায়ুমণ্ডলের বিরল গ্যাসের বাধা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বেতার তরঙ্গের চলাচল আয়নমণ্ডল নিয়ে গবেষণায় সহায়তা করে। পৃথিবী থেকে উপগ্রহ শনাক্ত ও অনুসরণ করার পদ্ধতিও পরীক্ষা করা সম্ভব হয়। আন্তর্জাতিক ভূ-পদার্থবিজ্ঞান বর্ষের বৈজ্ঞানিক পরিবেশে এসবের মূল্য ছিল যথেষ্ট। কিন্তু সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কাছে প্রধান বিস্ময় ছিল আরও মৌলিক: পৃথিবীর একটি নতুন চাঁদ হয়েছে, আর সেটি তৈরি করেছে মানুষ।

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কেন্দ্রে ছিল নিরাপত্তা। সোভিয়েত রকেট যদি উপগ্রহকে কক্ষপথে তুলতে পারে, তাহলে দূরপাল্লায় পারমাণবিক অস্ত্র বহনের সামর্থ্য কত দূর এগিয়েছে—এই প্রশ্ন সামনে আসে। তবে স্পুটনিক উৎক্ষেপণ থেকে সোভিয়েতদের বিপুলসংখ্যক প্রস্তুত ও নির্ভরযোগ্য আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত টানা যেত না। আর-৭ প্রস্তুত ও পরিচালনা করা ছিল জটিল কাজ। কিন্তু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দৃশ্যমান প্রমাণ এবং সোভিয়েত সামরিক গোপনীয়তা মিলিয়ে জনমনে আশঙ্কা বাড়ায়। সম্ভাব্য বিপদ ও বিদ্যমান সক্ষমতার পার্থক্য রাজনৈতিক বিতর্কে প্রায়ই অস্পষ্ট হয়ে যায়।

প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার পরিস্থিতিকে জনসাধারণের অনেকের তুলনায় সংযতভাবে দেখেছিলেন। মার্কিন প্রশাসন জানত, সোভিয়েত উপগ্রহ উৎক্ষেপণের চেষ্টা চলছে। কিন্তু ঘটনা ঘটার পর এর মানসিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব সামাল দেওয়া কঠিন হয়। যে দেশ নিজেকে প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের আসনে দেখত, তার আগে প্রতিদ্বন্দ্বী মহাকাশে পৌঁছে গেছে। শিক্ষা, প্রকৌশল প্রশিক্ষণ, গবেষণার অর্থায়ন এবং সামরিক বাহিনীর প্রকল্প পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই বিস্তৃত উদ্বেগই পরে ‘স্পুটনিক সংকট’ নামে পরিচিত হয়। বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি তখন সরাসরি জাতীয় আত্মবিশ্বাসের বিষয় হয়ে ওঠে।

মার্কিন প্রতিক্রিয়া এক দিনের সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৫৭ সালের ডিসেম্বরে ভ্যানগার্ডের একটি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ পরীক্ষা ব্যর্থ হওয়ায় অস্বস্তি আরও বাড়ে। তবে ১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এক্সপ্লোরার-১ কক্ষপথে পাঠায়, যার যন্ত্রপাতি পৃথিবীর বিকিরণ বলয় শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই বছর নাসা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিজ্ঞান, গণিত ও প্রযুক্তিশিক্ষায় জোর দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব পরিবর্তনের পেছনে আগে থেকে চলমান পরিকল্পনাও ছিল, কিন্তু স্পুটনিক সেগুলোকে নতুন রাজনৈতিক জরুরিতা দেয়। মহাকাশ গবেষণা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের সামনের সারিতে উঠে আসে।

স্পুটনিক-১ প্রায় তিন সপ্তাহ সংকেত পাঠায়; ব্যাটারি নিঃশেষ হওয়ার পরও সেটি কক্ষপথে চলতে থাকে। ১৯৫৮ সালের ৪ জানুয়ারি বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের সময় উপগ্রহটি ধ্বংস হয়। কিন্তু তার প্রভাব তিন মাসের অস্তিত্বে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি প্রমাণ করেছিল, মহাকাশে পৌঁছানো সম্ভব এবং সেখানে প্রথম হওয়ার রাজনৈতিক মূল্য বিপুল। সোভিয়েত নেতৃত্ব দ্রুত আরেকটি সাফল্য চাইছিল, এবার জীবন্ত প্রাণী নিয়ে। স্পুটনিকের ধাতব গোলক পৃথিবীর বাইরে পৌঁছানোর পথ খুলেছিল; সেই পথে জীবন্ত শরীর টিকে থাকতে পারবে কি না, পরবর্তী অভিযানে সামনে আসতে চলেছিল সেই কঠিন প্রশ্ন।