বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ধূমকেতুর লেজ সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে কেন? ধুলো ও গ্যাসের লেজের বিজ্ঞান

ধূমকেতুর লেজ সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে কেন? ধুলো ও গ্যাসের লেজের বিজ্ঞান
সূর্যালোকের চাপ ও সৌরবায়ু ধূমকেতুর দুটি প্রধান লেজ গড়ে তোলে।

আকাশে ধূমকেতুর দীর্ঘ লেজ দেখে মনে হতে পারে, দ্রুত চলার কারণে তার পেছনে ধোঁয়ার মতো কিছু ছড়িয়ে পড়ছে। পৃথিবীতে চলন্ত যানবাহনের পেছনে ধোঁয়া বা ধুলো জমতে দেখে এমন ধারণা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ধূমকেতুর লেজের প্রধান দিক নির্ধারণ করে সূর্য। ধূমকেতু কোন দিকে এগোচ্ছে, তার চেয়ে সূর্য কোন দিকে রয়েছে সেটিই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর কারণ সূর্যালোকের চাপ এবং সূর্য থেকে বেরিয়ে আসা বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত কণার প্রবাহ, যাকে সৌরবায়ু বলা হয়।

তবে শিরোনামের ‘সবসময়’ শব্দটির একটি সীমা আছে। ধূমকেতুর দুটি প্রধান লেজের মধ্যে আয়নিত গ্যাসের লেজ সাধারণত সূর্যের বিপরীত দিকে প্রায় সোজা হয়ে থাকে। ধুলোর লেজ তুলনামূলক চওড়া ও বাঁকানো হতে পারে। আবার পর্যবেক্ষণের বিশেষ অবস্থানে কোনো ধূমকেতুর একটি অংশ সূর্যের দিকেও প্রসারিত বলে মনে হয়। তাই প্রতিটি লেজকে সূর্য ও ধূমকেতুর সংযোগরেখার ঠিক উল্টো দিকে টানা নিখুঁত সরলরেখা ভাবলে ভুল হবে।

লেজ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় ধূমকেতুর কেন্দ্র থেকে। এই কঠিন অংশে জলবরফ, অন্যান্য হিমায়িত উদ্বায়ী পদার্থ, ধুলো এবং পাথুরে উপাদান থাকে। সূর্য থেকে অনেক দূরে থাকলে ধূমকেতুর সক্রিয়তা সাধারণত কম থাকে এবং উজ্জ্বল লেজ দেখা নাও যেতে পারে। সূর্যের কাছাকাছি এলে পৃষ্ঠ উষ্ণ হয়। বরফের কিছু অংশ তরল না হয়েই সরাসরি গ্যাসে পরিণত হয়। পদার্থের এই পরিবর্তনকে ঊর্ধ্বপাতন বলে। কোন বরফ কত দূরত্বে সক্রিয় হবে, তা তার প্রকৃতি ও স্থানীয় অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

বেরিয়ে আসা গ্যাস সঙ্গে করে ছোট ধুলোকণাও বহন করে। এতে কঠিন কেন্দ্রের চারপাশে একটি বিস্তৃত, ঝাপসা আবরণ তৈরি হয়, যার নাম কোমা। দূরবীক্ষণে ধূমকেতুর উজ্জ্বল মাথা হিসেবে সাধারণত এই আবরণটিই চোখে পড়ে; ছোট কেন্দ্রটিকে আলাদা করে দেখা কঠিন হয়। কোমা থেকে পদার্থ আরও বাইরে ছড়িয়ে লেজ তৈরি করে। অর্থাৎ লেজ কেন্দ্রের গায়ে লাগানো স্থায়ী কোনো অঙ্গ নয়। নতুন গ্যাস ও ধুলো যোগ হওয়া এবং পুরোনো পদার্থ সরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সেটি ক্রমাগত বদলায়।

ধুলোর লেজ বোঝার জন্য প্রথমে বুঝতে হবে, আলোও পদার্থের ওপর চাপ দিতে পারে। আলোর কণা বা ফোটন ভরবেগ বহন করে। কোনো ধুলোকণা আলো শোষণ করলে কিংবা আলোকে ছড়িয়ে দিলে তার ওপর ভরবেগ স্থানান্তরিত হয়। সূর্য থেকে আসা বিপুল ফোটন ছোট ধুলোকণার ওপর মিলিতভাবে বাইরের দিকে বল প্রয়োগ করে। একে বিকিরণচাপ বলা হয়। পৃথিবীতে ভারী বস্তুর ক্ষেত্রে এই প্রভাব সহজে চোখে পড়ে না, কিন্তু মহাকাশের ক্ষুদ্র কণার গতিপথ বদলাতে তা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ধুলোকণার ওপর সূর্যের মহাকর্ষও কাজ করে। কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসার সময় কণাগুলো ধূমকেতুর কক্ষীয় গতির অনেকটাই বহন করে। এরপর মহাকর্ষ, বিকিরণচাপ, কণার আকার এবং নির্গমনের সময় মিলিয়ে প্রত্যেকটির পথ নির্ধারিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে ছোট কণার গতিপথ বড় কণার তুলনায় বেশি বদলে যায়। বিভিন্ন সময়ে বেরিয়ে আসা বিভিন্ন আকারের কণা একসঙ্গে ছড়িয়ে থাকায় ধুলোর লেজ চওড়া, পাখার মতো এবং বাঁকানো দেখায়। এটি কেবল ধূমকেতুর আগের চলার পথের ওপর পড়ে থাকা একটি সরু রেখা নয়।

আয়নিত গ্যাসের লেজ তৈরির প্রক্রিয়া আলাদা। কোমার গ্যাস সূর্যের অতিবেগুনি বিকিরণসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ইলেকট্রন হারিয়ে আয়নে পরিণত হতে পারে। আয়ন হলো বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত পরমাণু বা অণু। নিরপেক্ষ ধুলোকণার তুলনায় এসব কণা বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকীয় প্রভাবের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল। ফলে তাদের চলাচল বুঝতে শুধু সূর্যালোকের চাপ বিবেচনা করলে চলে না; সৌরবায়ু এবং তার সঙ্গে বহন হয়ে আসা চৌম্বক ক্ষেত্রও বিবেচনা করতে হয়।

সৌরবায়ু মূলত সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত পাতলা আধানযুক্ত কণার প্রবাহ। এতে প্রধানত ইলেকট্রন ও প্রোটন থাকে এবং এটি প্রতি সেকেন্ডে কয়েক শ কিলোমিটার বেগে সৌরজগতের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ধূমকেতুর নতুন তৈরি আয়ন এই প্রবাহের সঙ্গে তড়িৎচৌম্বকীয়ভাবে যুক্ত হয়ে সূর্য থেকে দূরের দিকে পরিবাহিত হয়। এর ফলেই সরু, দীর্ঘ আয়নলেজ তৈরি হয়। ‘সৌরবায়ু গ্যাসকে ঠেলে দেয়’ কথাটি সহজ ব্যাখ্যা, কিন্তু এর পেছনে আধানযুক্ত কণা ও ক্ষেত্রের পারস্পরিক ক্রিয়া রয়েছে।

এই প্রক্রিয়ায় আয়নলেজ সাধারণত সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে। তবে সৌরবায়ুর প্রবাহ ও চৌম্বক ক্ষেত্র বদলালে লেজে ঢেউ, বাঁক কিংবা বিচ্ছিন্ন অংশ দেখা যেতে পারে। তাই বাস্তব ধূমকেতুর ছবি পাঠ্যবইয়ের সোজা তিরচিহ্নের চেয়ে বেশি জটিল। অন্যদিকে ধুলোর লেজে কণার নিজস্ব কক্ষীয় গতির প্রভাব বেশি স্পষ্ট থাকে। একই ধূমকেতুর দুটি লেজ আলাদা দিকে প্রসারিত দেখানোর প্রধান কারণ এই দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়া।

ধূমকেতু সূর্যের কাছ থেকে দূরে যেতে শুরু করলে একটি আপাত অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি হতে পারে: তার লেজ চলার দিকের সামনেও প্রসারিত থাকতে পারে। কারণ সূর্য থেকে দূরে যাওয়ার সময়ও সৌরবায়ু ও বিকিরণচাপ বাইরের দিকেই কাজ করে। লেজ তাই ধূমকেতুর গতির পেছনে থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা মানে না। চলন্ত বস্তুর পেছনে পতাকা ওড়ার সঙ্গে ধূমকেতুর লেজের তুলনা এখানেই সীমিত হয়ে যায়। মহাকাশে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মতো স্থির বাতাসের মধ্যে ধূমকেতু ছুটছে না।

দুটি লেজের রং আলাদা হওয়ার কারণও তাদের উপাদান। ধুলোকণা সূর্যের আলো ছড়িয়ে দেয় বলে ধুলোর লেজ সাধারণত সাদাটে বা হলদে দেখায়। আয়নলেজে বিভিন্ন আয়ন নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বিকিরণ করে। কার্বন মনোক্সাইডের আয়ন নীল আভা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ছবি তোলার যন্ত্র, ব্যবহৃত ছাঁকনি এবং ছবির প্রক্রিয়াকরণের কারণে দৃশ্যমান রঙে পার্থক্য হতে পারে। সব ধূমকেতুতে খালি চোখে দুটি আলাদা রঙের লেজ দেখা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

কখনো দেখা যাওয়া সূর্যমুখী ‘বিপরীত লেজ’ মূলত দেখার অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। অপেক্ষাকৃত বড় ধুলোকণা ধূমকেতুর কক্ষপথের সমতলের কাছাকাছি ছড়িয়ে থাকতে পারে। পৃথিবী থেকে সেই ধুলোর স্তরকে বিশেষ কোণে, প্রায় ধার বরাবর দেখলে তার একটি অংশ সূর্যের দিকে বেরিয়ে আছে বলে মনে হয়। ধুলোটি বাস্তব, কিন্তু আকাশের সমতলে তার আপাত দিক বিভ্রান্তিকর। এটি সৌরবায়ু উল্টো দিকে বইছে বা সূর্যালোক ধুলোকে নিজের দিকে টানছে—এমন প্রমাণ নয়।

ধূমকেতুর লেজ তাই একই সঙ্গে পদার্থের পরিবর্তন, আলোর ভরবেগ এবং মহাকাশের তড়িৎচৌম্বকীয় পরিবেশের দৃশ্যমান ফল। সূর্যের তাপ লেজের উপাদান মুক্ত করে, বিকিরণচাপ ধুলোর গতিপথ বদলায়, আর সৌরবায়ুর সঙ্গে যুক্ত ক্ষেত্র আয়নিত গ্যাসকে দূরে নিয়ে যায়। কোন লেজ কতটা সোজা বা বাঁকানো হবে, তা উপাদান ও পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলায়। এই পার্থক্য মাথায় রাখলেই বোঝা যায়, সূর্যের বিপরীতে প্রসারিত লেজ কোনো ধোঁয়ার রেখা নয়; এটি সূর্য ও ধূমকেতুর সক্রিয় পারস্পরিক ক্রিয়ার চিহ্ন।