বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মঙ্গল গ্রহকে লাল গ্রহ বলা হয় কেন? লাল ধুলো ও লোহার খনিজের রহস্য

মঙ্গল গ্রহকে লাল গ্রহ বলা হয় কেন? লাল ধুলো ও লোহার খনিজের রহস্য
লোহার জারিত খনিজসমৃদ্ধ সূক্ষ্ম ধুলো মঙ্গলকে লালচে দেখায়।

রাতের আকাশে মঙ্গলকে খালি চোখে দেখলে অনেক সময় অন্য উজ্জ্বল বিন্দুগুলোর তুলনায় আলাদা মনে হয়। তার আলোয় লালচে বা কমলা আভা থাকে। দূরবিন আবিষ্কারের বহু আগেই মানুষ এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছিল। প্রাচীন রোমানরা রক্তের রঙের সঙ্গে মিল দেখে নিজেদের যুদ্ধদেবতার নামে গ্রহটির নাম রাখে। আজ মহাকাশযান ও অনুসন্ধানী যান সেই লালচে অবয়বের কারণ অনেকটাই পরিষ্কার করেছে। মঙ্গলের রঙের মূল উৎস হলো পাথর ও ধুলোর মধ্যে থাকা লোহার জারিত খনিজ। তবে একে শুধু বিশাল মরচে ধরা বল বললে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্থক্য হারিয়ে যায়।

মঙ্গল নিজের আলো তৈরি করে না। সূর্যের আলো তার পৃষ্ঠে পড়ে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পৌঁছায়। পৃষ্ঠের খনিজ কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বেশি শোষণ করবে এবং কোন অংশ বেশি প্রতিফলিত বা ছড়িয়ে দেবে, তার ওপর দৃশ্যমান রং নির্ভর করে। মঙ্গলের সূক্ষ্ম ধুলোয় থাকা লোহার কিছু খনিজ তুলনামূলক বেশি লাল ও কমলা আভা তৈরি করে। দূর থেকে সেই ধুলোর বিস্তৃত আবরণই গ্রহটির সামগ্রিক চেহারায় প্রাধান্য পায়।

পৃথিবীতে লোহার দরজা বা যন্ত্রে মরচে পড়লে লালচে বাদামি আবরণ দেখা যায়। মঙ্গলের ব্যাখ্যায় এই পরিচিত উদাহরণটি কাজে লাগে। কিন্তু সেখানে সর্বত্র খাঁটি ধাতব লোহা পড়ে থেকে দরজার মতো মরচে ধরেছে, এমন নয়। লোহা মূলত বিভিন্ন শিলাগঠনকারী খনিজের অংশ। রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সেই লোহার জারণাবস্থা বদলে নতুন খনিজ তৈরি হয়েছে। লোহার অক্সাইড এবং অক্সাইড-হাইড্রক্সাইডজাত উপাদানের উপস্থিতিই লালচে ধুলোর পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে।

জারণ বলতে শুধু পৃথিবীর মতো অক্সিজেনসমৃদ্ধ বাতাসে কোনো ধাতু রেখে দেওয়া বোঝায় না। এটি ইলেকট্রন আদানপ্রদানের সঙ্গে যুক্ত রাসায়নিক প্রক্রিয়া। পানি এবং বিভিন্ন জারক পদার্থও এতে ভূমিকা রাখতে পারে। মঙ্গলের বর্তমান বায়ুমণ্ডলে মুক্ত অক্সিজেন খুব কম থাকলেও তা অতীতে লোহার জারণ ঘটার সম্ভাবনা বাতিল করে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আজকের শুষ্ক পরিবেশ দেখে কোটি কোটি বছর আগেও একই অবস্থা ছিল বলে ধরে নেওয়া যায় না।

মঙ্গলের প্রাচীন নদীখাত, হ্রদতলের পলি এবং পানির উপস্থিতিতে পরিবর্তিত খনিজ জানায়, গ্রহটির অতীত বর্তমানের চেয়ে আলাদা ছিল। সেই ইতিহাস লাল ধুলো তৈরির প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ। পানি শিলার সঙ্গে বিক্রিয়া করে লোহাযুক্ত খনিজ বদলে দিতে পারে। পরে শিলা ক্ষয় হয়ে ছোট কণা তৈরি হলে সেই উপাদান ধুলোয় মিশে যায়। তবে লাল ধুলোর প্রতিটি কণা ঠিক কখন, কোথায় এবং কোন পরিবেশে তৈরি হয়েছে, তার সম্পূর্ণ ইতিহাস এখনো নির্ধারিত নয়।

দীর্ঘদিন মঙ্গলের লাল ধুলো ব্যাখ্যায় হেমাটাইট নামের লোহার অক্সাইড বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। হেমাটাইট মঙ্গলে পাওয়া গেছে এবং তার সূক্ষ্ম কণা লালচে হতে পারে। কিন্তু একটি গ্রহের সব ধুলোকে একটি খনিজের সমান ধরে নেওয়া যায় না। খনিজের মিশ্রণ, কণার আকার এবং স্ফটিকের বিন্যাস আলো প্রতিফলনের ধরন বদলে দেয়। তাই মহাকাশযানের তথ্যের সঙ্গে পরীক্ষাগারে তৈরি মিশ্রণের তুলনা করে বিজ্ঞানীরা আরও নির্দিষ্ট উত্তর খোঁজেন।

২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা এই আলোচনায় নতুন তথ্য যোগ করে। কক্ষপথের মহাকাশযান, পৃষ্ঠের পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষাগারের বিশ্লেষণ মিলিয়ে গবেষকেরা দেখান, ফেরিহাইড্রাইট নামের পানিযুক্ত লোহার খনিজের সঙ্গে ব্যাসল্টজাত উপাদানের সূক্ষ্ম মিশ্রণ মঙ্গলের ধুলোর পর্যবেক্ষিত বৈশিষ্ট্য ভালোভাবে মেলাতে পারে। ফেরিহাইড্রাইটকে তাঁরা লাল ধুলোর গুরুত্বপূর্ণ লোহাবাহী উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেন। এতে লোহার জারণের মূল ব্যাখ্যা বদলায় না; বরং কোন খনিজ রঙে বড় ভূমিকা রাখে, সেই প্রশ্ন আরও স্পষ্ট হয়।

ফেরিহাইড্রাইটের সম্ভাব্য গুরুত্ব তার গঠনের পরিবেশেও। পৃথিবীতে এটি ঠান্ডা পানির উপস্থিতিতে তুলনামূলক দ্রুত তৈরি হতে পারে। গবেষণার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মঙ্গলের কিছু লাল উপাদান প্রাচীন ভেজা পরিবেশে গঠিত হয়ে পরে শুষ্ক অবস্থায় টিকে থাকতে পারে। এটি অতীতের আবহাওয়া সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। তবে এই ফল থেকে পুরো মঙ্গল একই সময়ে একই পরিবেশে লাল হয়েছে বা সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

ধুলো তৈরি হওয়ার পরে বাতাস সেটিকে বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে দেয়। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পাতলা হলেও সেখানে ধুলিঘূর্ণি ও বড় ধুলিঝড় ঘটে। কখনো ঝড় গ্রহের বিশাল অংশ ঢেকে দেয়। সূক্ষ্ম কণা বাতাসে ভেসে থাকে, পরে অন্য অঞ্চলে জমে। এভাবে বিভিন্ন শিলাময় পৃষ্ঠের ওপর তুলনামূলক পরিচিত লালচে আবরণ তৈরি হয়। দূর থেকে দেখা গ্রহের রঙে এই ছড়িয়ে পড়া ধুলোর অবদান তাই অত্যন্ত বড়।

কিন্তু মঙ্গলের সব জায়গা লাল নয়। সেখানে বাদামি, হলদে, ধূসর ও প্রায় কালো অঞ্চল রয়েছে। আগ্নেয় শিলা, গাঢ় বালিয়াড়ি, পলিস্তর এবং ভিন্ন খনিজের উপস্থিতিতে স্থানভেদে রং বদলে যায়। মেরু অঞ্চলের বরফ আবার উজ্জ্বল সাদা দেখাতে পারে। অনুসন্ধানী যান কোনো পাথরের ওপরের ধুলো সরালে বা ভেতরের অংশ পরীক্ষা করলে বাইরের লালচে চেহারার নিচে আলাদা রং দেখা যায়। অর্থাৎ পাতলা আবরণও পুরো পাথরের দৃশ্যমান পরিচয় বদলে দিতে পারে।

মঙ্গলের ছবি বিচার করার সময় ক্যামেরার প্রক্রিয়াকরণও বিবেচনা করতে হয়। কিছু ছবি মানুষের চোখে সম্ভাব্য দৃশ্য বোঝাতে প্রস্তুত করা হয়, আবার কিছুতে পৃথিবীর মতো আলোর পরিস্থিতি ধরে রং সমন্বয় করা হয়। খনিজের পার্থক্য স্পষ্ট করতে কৃত্রিমভাবে রং বাড়িয়েও দেখানো হতে পারে। তাই কোনো উজ্জ্বল নীল বা বেগুনি শিলার ছবি দেখলেই সেটি বাস্তবে ঠিক সেই রঙের, এমন ধরে নেওয়া উচিত নয়। ছবির উদ্দেশ্য ও ব্যাখ্যা জানা জরুরি।

লাল গ্রহের সূর্যাস্তে নীল আভা দেখা যায়—এ তথ্য প্রথমে অদ্ভুত শোনাতে পারে। কিন্তু পৃষ্ঠের রং এবং আকাশে সূর্যালোকের বিচ্ছুরণ আলাদা বিষয়। মঙ্গলের বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম ধুলোকণা আলোকে এমনভাবে ছড়ায় যে সূর্যাস্তের সময় সূর্যের আশপাশে নীল আলো তুলনামূলক বেশি প্রাধান্য পেতে পারে। বাকি আকাশ একই সময়ে বাদামি বা কমলা দেখাতে পারে। নীল আভার মাত্রা ধুলোর পরিমাণ ও আলোকপথের ওপরও নির্ভর করে।

মঙ্গলের লাল রং তাই কেবল একটি নামের উৎস নয়; এটি গ্রহটির শিলা, পানি, বায়ুমণ্ডল ও আবহাওয়ার দীর্ঘ ইতিহাসের সূত্র। লোহাবাহী খনিজের পরিবর্তন রং তৈরি করেছে, ক্ষয় ধুলো তৈরি করেছে এবং বাতাস সেই ধুলো ছড়িয়ে দিয়েছে। আজকের লালচে মরুভূমির ভেতর পুরোনো ভেজা পরিবেশের চিহ্নও সংরক্ষিত থাকতে পারে। মঙ্গলকে লাল গ্রহ বলার সহজ উত্তর লোহার জারিত খনিজ, আর সেই উত্তরের গভীরে রয়েছে একটি গ্রহ কীভাবে বদলে গেছে, তার বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক ইতিহাস।