বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আট জাতির জোট কারা ছিল? চীন আক্রমণে ব্রিটেন, জাপান, রাশিয়া ও অন্যান্য বিশ্বশক্তির ভূমিকা

Series: বক্সার প্রোটোকল: চীনের অপমান, বিদেশি শক্তি ও এক অসম চুক্তির ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 15, 2026
আট জাতির জোট কারা ছিল? চীন আক্রমণে ব্রিটেন, জাপান, রাশিয়া ও অন্যান্য বিশ্বশক্তির ভূমিকা
আট জাতির জোট কারা ছিল?

১৯০০ সালের বক্সার বিদ্রোহ যখন বেইজিংয়ের বিদেশি দূতাবাস, মিশনারি এবং বিদেশি নাগরিকদের সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে, তখন এক বিরল আন্তর্জাতিক সামরিক জোট গড়ে ওঠে। এই জোট ইতিহাসে “আট জাতির জোট” বা Eight-Nation Alliance নামে পরিচিত। এর সদস্য ছিল ব্রিটেন, জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। তাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল প্রবল, কিন্তু চীনে নিজেদের নাগরিক, কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে তারা সাময়িকভাবে একসঙ্গে সামরিক অভিযান চালায়।

আট জাতির জোটের জন্ম কোনো দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বন্ধুত্ব থেকে হয়নি। বরং এটি ছিল একটি সঙ্কটভিত্তিক সামরিক সহযোগিতা। তখন ইউরোপ ও এশিয়ায় এসব শক্তির স্বার্থ প্রায়ই পরস্পরের বিপরীত ছিল। ব্রিটেন রাশিয়ার সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল, জাপান ও রাশিয়ার মধ্যে উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় প্রতিযোগিতা বাড়ছিল, জার্মানি চীনে নিজস্ব প্রভাববলয় বিস্তার করছিল এবং ফ্রান্সও দক্ষিণ চীন ও ইন্দোচীন ঘিরে প্রভাব শক্তিশালী করতে চাইছিল। তবু বক্সার সংকট এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যেখানে সাময়িক যৌথ অভিযান তাদের সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

বক্সার আন্দোলন বিদেশি শক্তি ও খ্রিস্টান মিশনারিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শুরু করলে প্রথমে সংকটটি উত্তর চীনের স্থানীয় সমস্যা হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। কিন্তু ১৯০০ সালের জুনে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। বক্সাররা বেইজিংয়ে প্রবেশ করে, বিদেশি প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয় এবং জার্মান রাষ্ট্রদূত ক্লেমেন্স ফন কেটেলার নিহত হন। একই সঙ্গে লেগেশন কোয়ার্টারে বিদেশি কূটনীতিক, সৈন্য ও সাধারণ নাগরিকেরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।

এই অবস্থায় বিদেশি শক্তিগুলো বুঝতে পারে যে কূটনৈতিক চাপ যথেষ্ট নয়। বেইজিংয়ে অবরুদ্ধ মানুষদের উদ্ধারের জন্য সামরিক বাহিনী পাঠানো ছাড়া আর কোনো কার্যকর পথ নেই। প্রথমদিকে অ্যাডমিরাল এডওয়ার্ড সেমুরের নেতৃত্বে একটি বহুজাতিক বাহিনী রাজধানীর দিকে অগ্রসর হলেও তা ব্যর্থ হয়। এরপর আরও বড় এবং সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠন করা হয়।

জাপান এই জোটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৮৯৫ সালের চীন-জাপান যুদ্ধে জয়ের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে জাপান নিজেকে আধুনিক সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ভৌগোলিকভাবে চীনের কাছাকাছি হওয়ায় জাপান দ্রুত সৈন্য পাঠাতে সক্ষম হয় এবং আট জাতির জোটের স্থলবাহিনীর একটি বড় অংশ জাপানি সৈন্যদের নিয়ে গঠিত হয়।

জাপানের অংশগ্রহণের পেছনে শুধু দূতাবাস রক্ষা নয়, আরও বৃহত্তর কৌশলগত হিসাব ছিল। দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সমকক্ষ আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছিল। চীনে বহুজাতিক অভিযানে কার্যকর সামরিক ভূমিকা নেওয়া জাপানের জন্য আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রদর্শনের সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।

জাপানি বাহিনী তিয়ানজিন এবং পরে বেইজিং অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের শৃঙ্খলা, প্রশিক্ষণ ও দ্রুত মোতায়েন সক্ষমতা অন্যান্য শক্তির নজর কাড়ে। কয়েক দশক আগের তুলনায় এই পরিবর্তন ছিল নাটকীয়—যে জাপান একসময় পশ্চিমা চাপের মুখে নিজেকে আধুনিক করতে বাধ্য হয়েছিল, ১৯০০ সালে সেই জাপানই চীনে পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামরিক অভিযান চালাচ্ছিল।

ব্রিটেনের ভূমিকা ছিল সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার বাহিনীর গঠন ছিল বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তখন বিশ্বের বৃহত্তম ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর একটি এবং চীনে তার বাণিজ্যিক স্বার্থ দীর্ঘদিনের। হংকং, চুক্তিবন্দর এবং চীনা বাণিজ্যের সঙ্গে ব্রিটেনের গভীর সম্পর্ক ছিল।

কিন্তু ব্রিটিশ স্থলবাহিনীর উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি ব্রিটেন থেকে আসেনি। ভারত ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিশাল সামরিক ঘাঁটি, ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটকে দ্রুত চীনে পাঠানো হয়। ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন ভারতীয় সৈন্যরা বেইজিং অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিখ, গুর্খা ও অন্যান্য ভারতীয় ইউনিট বহুজাতিক বাহিনীর অংশ হিসেবে যুদ্ধ করে।

এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে—সাম্রাজ্য শুধু ইউরোপীয় সৈন্যের ওপর নির্ভর করত না; উপনিবেশিক সেনাবাহিনী ছিল তার বৈশ্বিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। ফলে ১৯০০ সালের চীন অভিযানে ব্রিটিশ পতাকার নিচে যুদ্ধরত সৈন্যদের একটি বড় অংশই ছিল এশীয়।

রাশিয়ার স্বার্থ ছিল আরও ভূরাজনৈতিক। উনিশ শতকের শেষভাগে রুশ সাম্রাজ্য পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত প্রভাব বিস্তার করছিল। ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলপথ নির্মাণ, মাঞ্চুরিয়ায় অর্থনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি এবং লিয়াওদং উপদ্বীপের বন্দরগুলোর প্রতি আগ্রহ রাশিয়াকে চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রধান শক্তিতে পরিণত করছিল।

বক্সার সংকট রাশিয়াকে মাঞ্চুরিয়ায় আরও বড় সামরিক উপস্থিতির সুযোগ দেয়। বক্সার ও চীনা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের অজুহাতে রাশিয়ান সৈন্যরা ব্যাপকভাবে মাঞ্চুরিয়ায় প্রবেশ করে। ফলে আট জাতির জোটের যৌথ লক্ষ্য বেইজিং অবরোধ ভাঙা হলেও রাশিয়া একই সঙ্গে নিজের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগও কাজে লাগায়।

এই রুশ সম্প্রসারণ পরবর্তী সময়ে জাপানের সঙ্গে সংঘাতকে তীব্র করে তোলে। মাঞ্চুরিয়া ও কোরিয়ায় প্রভাব নিয়ে দুই দেশের প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত ১৯০৪–১৯০৫ সালের রুশ-জাপান যুদ্ধে রূপ নেয়। অর্থাৎ বক্সার সংকটে সাময়িক সহযোগিতা করলেও রাশিয়া ও জাপান খুব শিগগিরই পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রও জোটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৮৯৮ সালের স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধের পর ফিলিপাইন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে, ফলে পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দ্রুত বেড়ে যায়। চীনের বাজারে সমান বাণিজ্যিক সুযোগ বজায় রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র “Open Door” নীতির পক্ষে ছিল।

বক্সার সংকটের সময় মার্কিন সৈন্যদের একটি অংশ ফিলিপাইন থেকে দ্রুত চীনে পাঠানো হয়। তারা তিয়ানজিন ও বেইজিং অভিযানে অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সম্পূর্ণ বিভাজন চায়নি, কারণ তার প্রধান আগ্রহ ছিল এমন একটি চীন যেখানে সব বিদেশি শক্তি তুলনামূলকভাবে সমান বাণিজ্যিক সুযোগ পাবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপও বাস্তবে চীনের সার্বভৌমত্বে বিদেশি হস্তক্ষেপের অংশ ছিল। একদিকে মার্কিন সরকার চীনের ভৌগোলিক অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথা বলছিল, অন্যদিকে তার সৈন্যরাও আন্তর্জাতিক অভিযানে অংশ নিয়ে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এই দ্বৈততা বক্সার সংকটের কূটনৈতিক জটিলতার একটি ভালো উদাহরণ।

ফ্রান্সের চীনে আগ্রহের পেছনে ছিল বাণিজ্য, ধর্মীয় সুরক্ষা এবং ইন্দোচীনকেন্দ্রিক কৌশলগত স্বার্থ। ফরাসি ক্যাথলিক মিশনারিরা দীর্ঘদিন ধরে চীনে সক্রিয় ছিল এবং তাদের সুরক্ষাকে ফরাসি সরকার নিজের কূটনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখত। বক্সার সহিংসতায় ক্যাথলিক প্রতিষ্ঠান ও ধর্মান্তরিত চীনারা আক্রান্ত হলে ফরাসি হস্তক্ষেপের অন্যতম যুক্তি তৈরি হয়।

ফরাসি সৈন্যরা বহুজাতিক বাহিনীর সঙ্গে তিয়ানজিন এবং বেইজিং অভিযানে অংশ নেয়। দক্ষিণ চীনে ফরাসি ঔপনিবেশিক উপস্থিতি থাকার কারণে দেশটি চীনের রাজনৈতিক দুর্বলতাকে গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল।

জার্মানির ভূমিকা বিশেষভাবে আবেগপূর্ণ ও প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে, কারণ বেইজিংয়ে জার্মান রাষ্ট্রদূত কেটেলার নিহত হয়েছিলেন। সম্রাট দ্বিতীয় ভিলহেল্ম চীনে পাঠানো জার্মান বাহিনীকে কঠোর প্রতিশোধমূলক মনোভাব নিয়ে যুদ্ধ করার আহ্বান জানান। এই বক্তব্য পরবর্তী ইতিহাসে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জার্মানির বড় বাহিনী চীনে পৌঁছানোর সময় বেইজিংয়ের মূল অবরোধ ইতিমধ্যে ভেঙে গিয়েছিল। ফলে জার্মান সৈন্যদের বড় ভূমিকা পড়ে পরবর্তী শাস্তিমূলক অভিযানগুলোতে। উত্তর চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে বক্সারদের অনুসন্ধান ও দমন অভিযানে জার্মান বাহিনী অংশ নেয়।

জার্মানির আগ্রহের পেছনে শানতুংয়ে তার পূর্ববর্তী অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৮৯৭ সালে জার্মানি জিয়াওঝৌ উপসাগরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং ওই অঞ্চলে রেলপথ ও খনি-সম্পর্কিত বিশেষ সুবিধা অর্জন করেছিল। বক্সার আন্দোলনের অন্যতম জন্মভূমি শানতুং হওয়ায় জার্মানি সরাসরি সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

ইতালির ভূমিকা তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। ইতালি তখন ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতায় তুলনামূলকভাবে নতুন শক্তি এবং চীনে অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রের মতো নিজস্ব প্রভাব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী ছিল। ইতালীয় নৌ ও স্থলসেনার সীমিতসংখ্যক সদস্য অভিযান ও লেগেশন প্রতিরক্ষায় অংশ নেন।

অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরিও তুলনামূলক ছোট বাহিনী পাঠিয়েছিল। পূর্ব এশিয়ায় তার অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ব্রিটেন বা রাশিয়ার মতো বিশাল ছিল না, কিন্তু সাম্রাজ্যটি ইউরোপীয় শক্তির মর্যাদা বজায় রাখতে এবং নিজের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের রক্ষার জন্য অভিযানে যোগ দেয়।

এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—আট জাতির জোটের সব দেশ সমানসংখ্যক সৈন্য বা সমান সামরিক গুরুত্ব নিয়ে অংশগ্রহণ করেনি। জাপান, রাশিয়া, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী মাঠের অভিযানে বেশি দৃশ্যমান ছিল। ফ্রান্সও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। অন্যদিকে ইতালি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বাহিনী ছোট ছিল।

তবে রাজনৈতিকভাবে আটটি দেশের সম্মিলিত উপস্থিতিই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি চিং সরকারের সামনে পরিষ্কার বার্তা দেয় যে সংকটটি আর কোনো একক রাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ নয়। চীন একসঙ্গে একাধিক প্রধান সামরিক শক্তির মুখোমুখি হয়েছে।

বহুজাতিক বাহিনী প্রথমে তিয়ানজিন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করে। তিয়ানজিন ছিল বেইজিংয়ের সঙ্গে সমুদ্রপথের সংযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে তীব্র যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাহিনী শহরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং রাজধানীর দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নেয়।

১৯০০ সালের আগস্টে প্রায় বিশ হাজারের কাছাকাছি একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী বেইজিংয়ের দিকে অগ্রসর হয়। বিভিন্ন দেশের সৈন্যরা আলাদা কমান্ড কাঠামো বজায় রেখেছিল, ফলে জোটটি আধুনিক অর্থে একীভূত সেনাবাহিনী ছিল না। অভিযান পরিচালনায় জাতীয় প্রতিযোগিতা ও মর্যাদার প্রশ্নও কাজ করছিল।

১৪ আগস্ট বাহিনী বেইজিংয়ে পৌঁছায়। বিভিন্ন দেশের সৈন্যরা শহরের বিভিন্ন ফটক দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করে। ব্রিটিশ বাহিনী তুলনামূলকভাবে দ্রুত লেগেশন কোয়ার্টারে পৌঁছাতে সক্ষম হয় এবং ৫৫ দিনের অবরোধের সমাপ্তি ঘটে।

কিন্তু এখানেই আট জাতির জোটের ভূমিকার সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় শুরু হয়। বেইজিং দখলের পর বিদেশি সৈন্যদের ব্যাপক লুটপাট ও প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। প্রাসাদ, বাড়িঘর, দোকান এবং মূল্যবান সাংস্কৃতিক সম্পদ লুট হয়। সাধারণ চীনা জনগণও সহিংসতার শিকার হয়।

উত্তর চীনের বিভিন্ন এলাকায় পরে তথাকথিত শাস্তিমূলক অভিযান পরিচালনা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল বক্সারদের এবং তাদের সমর্থনকারী ব্যক্তিদের দমন করা। কিন্তু এসব অভিযানে বহু ক্ষেত্রে নির্বিচার শাস্তি, মৃত্যুদণ্ড, লুটপাট ও সাধারণ জনগণের ওপর সহিংসতার অভিযোগ ওঠে।

এই কারণে আট জাতির জোটকে শুধু “অবরুদ্ধ কূটনীতিকদের উদ্ধারকারী বাহিনী” হিসেবে উপস্থাপন করলে ইতিহাসের অর্ধেকই বলা হয়। তাদের তাৎক্ষণিক সামরিক লক্ষ্য সত্যিই লেগেশন অবরোধ ভাঙা ও বিদেশি নাগরিকদের রক্ষা করা ছিল, কিন্তু এর সঙ্গে প্রত্যেক শক্তির নিজস্ব সাম্রাজ্যবাদী, বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থও জড়িত ছিল।

চিং রাজদরবার বেইজিং ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর বিদেশি শক্তিগুলো শান্তি আলোচনায় অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে চলে যায়। ফলস্বরূপ ১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকল চীনের ওপর কঠোর শর্ত চাপিয়ে দেয়।

চীনকে ৪৫০ মিলিয়ন হাইকওয়ান তায়েল ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়, বেইজিংয়ের লেগেশন কোয়ার্টারে বিদেশি সেনা রাখার অধিকার স্বীকৃত হয়, বেইজিং থেকে সমুদ্রের দিকে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথে বিদেশি সেনা মোতায়েনের ব্যবস্থা করা হয় এবং দাগু দুর্গ ধ্বংস করা হয়। বক্সারদের সমর্থনকারী কর্মকর্তাদের শাস্তিও চুক্তির অংশ ছিল।

অর্থাৎ আট জাতির জোটের সামরিক বিজয় শেষ পর্যন্ত চীনের সার্বভৌম ক্ষমতাকে আরও সীমিত করার কূটনৈতিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়।

তবে জোটটি বেশিদিন ঐক্যবদ্ধ থাকেনি। বক্সার সংকটের তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য পূরণ হওয়ার পর পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবার সামনে আসে। বিশেষ করে রাশিয়ার মাঞ্চুরিয়া দখল নিয়ে জাপান এবং অন্যান্য শক্তির উদ্বেগ বাড়ে। কয়েক বছরের মধ্যেই রাশিয়া ও জাপান পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে।

এ কারণেই আট জাতির জোট ছিল স্বার্থের ঐক্য, বিশ্বাসের নয়। ব্রিটেন চেয়েছিল বাণিজ্যিক স্বার্থ ও সাম্রাজ্যিক যোগাযোগ রক্ষা করতে, জাপান চেয়েছিল নিজের সামরিক শক্তি ও আঞ্চলিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে, রাশিয়া উত্তর-পূর্ব চীনে প্রভাব বিস্তার করছিল, যুক্তরাষ্ট্র বাজার উন্মুক্ত রাখতে চাইছিল, আর অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তিও নিজেদের নাগরিক, মিশনারি ও অর্থনৈতিক সুবিধা রক্ষা করছিল।

চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই জোট ছিল আরও ভয়াবহ প্রতীক। কয়েক দশক ধরে পৃথকভাবে বিদেশি শক্তির কাছে পরাজিত হওয়ার পর এবার চিং সাম্রাজ্যকে একই সময়ে আটটি রাষ্ট্রের সম্মিলিত সামরিক অভিযানের মুখোমুখি হতে হয়। রাজধানী দখল এবং রাজদরবারের পলায়ন প্রমাণ করে দেয় যে রাষ্ট্রটি নিজের রাজনৈতিক কেন্দ্রও রক্ষা করতে সক্ষম নয়।

বক্সার বিদ্রোহ বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ থেকে শুরু হয়েছিল, আট জাতির জোটের আক্রমণ সেই আধিপত্যকেই আরও দৃশ্যমান ও শক্তিশালী করে তোলে। বেইজিংয়ের রাস্তায় জাপানি, ভারতীয়, ব্রিটিশ, রুশ, মার্কিন, ফরাসি, জার্মান, ইতালীয় ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সৈন্যের উপস্থিতি চীনের জাতীয় অপমানের এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।

এই সামরিক পরাজয়ের স্মৃতি পরবর্তী চীনা জাতীয়তাবাদে গভীর প্রভাব ফেলে। চিং রাজবংশের ওপর জনগণের আস্থা আরও কমে যায় এবং এই ধারণা শক্তিশালী হয় যে পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা বিদেশি শক্তির সামনে চীনকে রক্ষা করতে পারছে না।

তাই আট জাতির জোটকে শুধু আটটি দেশের একটি সামরিক তালিকা হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বোঝা যায় না। এটি ছিল বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদ, চীনের দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সাময়িক সহযোগিতার এক অসাধারণ উদাহরণ। নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো ১৯০০ সালে একটি সাধারণ সংকটে একত্রিত হয়েছিল; কিন্তু তাদের বিজয়ের মূল্য বহন করতে হয়েছিল চীনের রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং সাধারণ জনগণকে। আর সেই বিজয়ের কূটনৈতিক পরিণতিই ১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকলকে চীনের ইতিহাসের অন্যতম কঠোর ও অপমানজনক অসম চুক্তিতে পরিণত করেছিল।