বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

জুলাই সংকট ১৯১৪: ব্ল্যাঙ্ক চেক, অস্ট্রিয়ার আল্টিমেটাম ও সার্বিয়ার জবাব

সিরিজ: আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ হত্যাকাণ্ড ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা

জুলাই সংকট ১৯১৪: ব্ল্যাঙ্ক চেক, অস্ট্রিয়ার আল্টিমেটাম ও সার্বিয়ার জবাব
কূটনৈতিক আশ্বাস ও কঠোর শর্তে সংকুচিত হয়েছিল শান্তির সুযোগ।

সারায়েভো থেকে ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও সোফির মৃত্যুসংবাদ ভিয়েনায় পৌঁছানোর পর প্রশ্ন উঠেছিল, এই হত্যার জন্য কাকে দায়ী করা হবে এবং কী প্রতিক্রিয়া জানাবে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। তদন্ত শুরু হলেও সাম্রাজ্যের নীতিনির্ধারকদের আলোচনা দ্রুত অপরাধীদের বিচারের সীমা ছাড়িয়ে যায়। তাঁদের কাছে সার্বিয়া ছিল দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সমস্যা, যা দক্ষিণ স্লাভ জাতীয়তাবাদকে উৎসাহ দিয়ে হাবসবার্গ রাষ্ট্রের অখণ্ডতাকে হুমকিতে ফেলছিল। হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এবং সার্বিয়াকে রাজনৈতিকভাবে দমন করার পরিকল্পনা তাই পাশাপাশি চলতে থাকে। এই পরিবর্তনই জুলাই সংকটের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

সার্বিয়ার সঙ্গে হামলাকারীদের যোগাযোগের বাস্তব ভিত্তি ছিল। অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও সীমান্তপারের সহায়তায় সার্বীয় সামরিক চক্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু সার্বীয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল—এমন সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ থেকে সরাসরি টানা যাচ্ছিল না। ভিয়েনার কঠোর অবস্থানের প্রবক্তারা এই পার্থক্যকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে রাখেননি। তাঁদের ধারণা ছিল, সার্বিয়াকে নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যতে আরও বিপদ আসবে। ফলে একটি হত্যার তদন্ত ক্রমে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের শক্তি ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত করার প্রশ্নে রূপ নেয়।

অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির ভেতরে অবশ্য শুরু থেকেই পূর্ণ ঐকমত্য ছিল না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী লেওপোল্ড বের্খটোল্ড ও সামরিক নেতৃত্বের প্রভাবশালী অংশ কঠোর ব্যবস্থা চাইছিলেন। কিন্তু হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ইশ্তভান তিসা তাৎক্ষণিক যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে আপত্তি তোলেন। রাশিয়ার হস্তক্ষেপ, বৃহত্তর সংঘাত এবং সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ জাতিগত ভারসাম্য তাঁর উদ্বেগের বিষয় ছিল। প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও যুদ্ধ ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অনিবার্য প্রতিক্রিয়া নয়। সেই সিদ্ধান্তের আগে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, প্রধান মিত্র জার্মানি কতটা পাশে থাকবে।

এই প্রশ্নের উত্তর জানতে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় দূত আলেকজান্ডার হোয়োস বার্লিনে যান। ৫ জুলাই কাইজার দ্বিতীয় ভিলহেল্ম সমর্থনের আশ্বাস দেন; পরদিন চ্যান্সেলর থেওবাল্ড ফন বেথমান হলভেগ তা নিশ্চিত করেন। সার্বিয়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপের ফলে রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত হলেও জার্মান সহায়তা পাওয়া যাবে—ভিয়েনা এমন বার্তাই গ্রহণ করে। পরে এই আশ্বাস পরিচিত হয় ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ নামে। এটি কোনো অর্থনৈতিক চেক ছিল না। কথাটির অর্থ, মিত্রকে আগাম এমন সমর্থন দেওয়া, যাতে তার পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর কার্যকর শর্ত বা সংযম আরোপ করা হয়নি।

জার্মান নেতৃত্বের হিসাব ছিল বিপজ্জনকভাবে আশাবাদী। দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপে সংকটকে অস্ট্রিয়া-সার্বিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে, অথবা রাশিয়া শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। পাশাপাশি জার্মানির একমাত্র প্রধান নির্ভরযোগ্য মিত্র দুর্বল হয়ে পড়ুক, বার্লিন তা চাইছিল না। কিন্তু সমর্থনের আশ্বাস ভিয়েনার ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। মিত্রকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি মিত্রের সংযম কমিয়ে দিতে পারে—জুলাই সংকটে এই সমস্যাটি স্পষ্ট হয়। জার্মানি যুদ্ধের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেয়নি, কিন্তু অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় কঠোরতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাবোধ তৈরি করেছিল।

৭ জুলাইয়ের মন্ত্রীপরিষদের আলোচনায় কঠোর কূটনৈতিক দাবির পথ সামনে আসে। তিসার আপত্তি কাটাতে সময় লাগে; পরে তিনি শর্তসাপেক্ষে কঠোর পদক্ষেপে সম্মত হন। আল্টিমেটামের উদ্দেশ্য শুধু সহযোগিতা চাওয়া ছিল না। প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকেরা এমন দাবি চাইছিলেন, যা সার্বিয়ার পক্ষে সম্পূর্ণ গ্রহণ করা কঠিন হবে। প্রত্যাখ্যান যুদ্ধের যুক্তি দেবে; পূর্ণ গ্রহণ সার্বিয়াকে গুরুতর রাজনৈতিক অধীনতায় ফেলবে। ফলে নথিটি আলোচনার সূচনা হিসেবে নয়, সার্বিয়াকে আত্মসমর্পণ অথবা সংঘাতের মুখোমুখি করার উপায় হিসেবে প্রস্তুত হতে থাকে।

আল্টিমেটাম পৌঁছাতে হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় এক মাস লেগেছিল। এই বিলম্ব শান্তিপূর্ণ সমাধান অনুসন্ধানের প্রমাণ ছিল না। অভ্যন্তরীণ মতভেদ, প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির হিসাব এতে ভূমিকা রাখে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট রেমোঁ পয়েনকারে ও প্রধানমন্ত্রী রেনে ভিভিয়ানি ২০–২৩ জুলাই রাশিয়ায় ছিলেন। তাঁদের সফর চলাকালে আল্টিমেটাম দিলে ফ্রান্স ও রাশিয়া সরাসরি বসে প্রতিক্রিয়া সমন্বয় করতে পারবে—ভিয়েনার এই উদ্বেগও সময় নির্ধারণে কাজ করে। কূটনৈতিক আঘাত দেওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিপক্ষের যোগাযোগের সুবিধা-অসুবিধা হিসাব করা হচ্ছিল।

২৩ জুলাই সন্ধ্যায় বেলগ্রেডে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। সার্বিয়াকে জবাবের জন্য মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা দেওয়া হয়েছিল। নথিতে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে প্রচার বন্ধ, বিদ্বেষমূলক প্রকাশনা দমন, জাতীয়তাবাদী সংগঠন বিলুপ্ত এবং শিক্ষা থেকে সাম্রাজ্যবিরোধী উপাদান সরানোর দাবি ছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অপসারণ, সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অস্ত্র পাচার বন্ধের শর্তও রাখা হয়। অনেক দাবি অপরাধ দমন ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিরাপত্তার ভাষায় লেখা হলেও তাদের ব্যাপ্তি সার্বিয়ার সংবাদমাধ্যম, শিক্ষা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থাকে স্পর্শ করছিল।

সবচেয়ে বিতর্কিত ছিল পঞ্চম ও ষষ্ঠ ধারা। পঞ্চম ধারায় সার্বিয়ার ভূখণ্ডে সাম্রাজ্যবিরোধী তৎপরতা দমনে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় প্রতিনিধিদের সহযোগিতা গ্রহণের দাবি ছিল। ষষ্ঠ ধারায় হত্যার ষড়যন্ত্রের বিচারিক তদন্তে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ চাওয়া হয়। তথ্য বিনিময় এবং বিদেশি কর্মকর্তাকে দেশের ভেতরে তদন্তক্ষমতা দেওয়া এক বিষয় নয়। বেলগ্রেডের কাছে এই দাবিগুলো সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক কর্তৃত্বের প্রশ্ন তৈরি করে। আবার ভিয়েনা মনে করছিল, সার্বীয় প্রশাসনের ওপর নির্ভর করলে প্রকৃত সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে না।

সার্বীয় প্রধানমন্ত্রী নিকোলা পাশিচের সরকার গভীর চাপে পড়ে। বলকান যুদ্ধের পর দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা নতুন বড় সংঘাতের জন্য অনুকূল ছিল না। কিন্তু নিঃশর্তভাবে সব দাবি মানলে স্বাধীন রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা ছিল। সরকার রাশিয়ার সমর্থন চায় এবং একই সঙ্গে সমঝোতামূলক জবাব প্রস্তুত করে। যুদ্ধের আশঙ্কায় সামরিক প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। কূটনৈতিক ছাড় এবং প্রতিরক্ষার প্রস্তুতি পাশাপাশি চলছিল। সার্বিয়া শান্তি চাইছিল বলেই যে সম্ভাব্য আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নেবে না, তা নয়।

২৫ জুলাই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে সার্বিয়া জবাব দেয়। সাম্রাজ্যবিরোধী প্রচারের নিন্দা, নারোদনা ওদব্রানা বিলুপ্ত করা এবং অস্ত্র পাচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সম্মতি জানানো হয়। তবে বিভিন্ন দাবিতে প্রমাণ, বিচারিক সিদ্ধান্ত বা আইন পরিবর্তনের প্রয়োজন উল্লেখ করা হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তা অপসারণের ক্ষেত্রেও অপরাধ প্রমাণের শর্ত রাখা হয়। টানকোসিচকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ এবং সিগানোভিচকে খোঁজার কথাও জানানো হয়। তাই “একটি ছাড়া সব দাবি নিঃশর্ত গ্রহণ” কথাটি পুরো জবাবের যথার্থ বিবরণ নয়; সম্মতির সঙ্গে একাধিক আইনি সংরক্ষণ ছিল।

পঞ্চম ধারায় সার্বিয়া সহযোগিতার অর্থ ও সীমা স্পষ্ট নয় বলে জানায়। আন্তর্জাতিক আইন ও নিজস্ব আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সহযোগিতায় সম্মত হওয়ার কথা বলে। ষষ্ঠ ধারায় নিজ দেশে তদন্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বিদেশি প্রতিনিধিদের সরাসরি অংশগ্রহণ প্রত্যাখ্যান করে, কারণ তা সংবিধান ও বিচারপদ্ধতির বিরোধী বলে মনে করেছিল। তদন্তের ফল জানানো সম্ভব বলেও উল্লেখ করে। শেষে বিরোধ নিষ্পত্তিতে আন্তর্জাতিক বিচার বা বৃহৎ শক্তির মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেওয়া হয়। জবাবটি তাই ছিল বড় ধরনের ছাড় দিয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তৃত্ব ধরে রাখার চেষ্টা।

অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এই জবাবকে যথেষ্ট মনে করেনি। তার প্রতিনিধি কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে বেলগ্রেড ত্যাগ করেন। এখানেই সংকটের একটি বড় সুযোগ হারিয়ে যায়। জবাবের অস্পষ্ট অংশ নিয়ে আরও আলোচনা, তদন্তে সহযোগিতার সীমা নির্ধারণ কিংবা সময় বাড়ানো সম্ভব ছিল। কিন্তু ভিয়েনার নেতৃত্বের বড় অংশ তখন সার্বিয়ার বিরুদ্ধে শক্তিপ্রয়োগে স্থির। কূটনৈতিক নথির প্রতিটি শব্দের চেয়ে পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক লক্ষ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সার্বিয়ার ছাড় যুদ্ধের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেনি, কারণ আল্টিমেটাম কেবল অপরাধ তদন্তের জন্য তৈরি হয়নি।

অন্য রাজধানিগুলোও সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাশিয়া সার্বিয়ার পরাজয়কে বলকানে নিজের প্রভাব ও মর্যাদার ক্ষতি হিসেবে দেখছিল। ফ্রান্স রুশ মিত্রকে সমর্থন করছিল। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এডওয়ার্ড গ্রে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেন, কিন্তু তা কার্যকর আলোচনায় রূপ নেয়নি। জার্মানি অস্ট্রিয়া-সার্বিয়ার বিরোধকে স্থানীয় রাখতে চাইছিল; অথচ রাশিয়ার কাছে সার্বিয়াকে একা ফেলে দেওয়া গ্রহণযোগ্য ছিল না। ব্রিটেনের সম্ভাব্য অবস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা ছিল। ফলে প্রতিটি রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তার হিসাব করলেও অন্যদের প্রতিক্রিয়া সঠিকভাবে বুঝতে পারছিল না।

২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সার্বীয় জবাব পড়ে কাইজার তখন সমঝোতার সম্ভাবনা দেখেছিলেন এবং বেলগ্রেডে সীমিত সামরিক পদক্ষেপের পর থামার ধারণা তুলেছিলেন। কিন্তু তা যুদ্ধের ঘোষণা ঠেকায়নি। সারায়েভোর হত্যাকাণ্ড থেকে যুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বিকল্প ছিল; সিদ্ধান্তগুলো সেই বিকল্প সংকুচিত করেছে। ব্ল্যাঙ্ক চেক ঝুঁকি নেওয়ার সাহস বাড়ায়, আল্টিমেটাম আপস কঠিন করে এবং জবাব প্রত্যাখ্যান কূটনৈতিক পথ বন্ধ করে। এখন রাশিয়ার সামরিক প্রস্তুতি ও জার্মানির প্রতিক্রিয়ার প্রশ্ন সামনে আসে—যা আঞ্চলিক যুদ্ধকে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার পরবর্তী ধাপ হবে।