সারায়েভো হত্যাকাণ্ড: যেভাবে প্রিন্সিপ হত্যা করেন ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও সোফিকে
সিরিজ: আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ হত্যাকাণ্ড ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা
সারায়েভোর দুই গুলি বদলে দিয়েছিল ইউরোপের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
সারায়েভোর রাস্তায় রাজকীয় মোটরযাত্রার অপেক্ষায় থাকা তরুণেরা জানত, তাদের হাতে সুযোগ আসতে পারে কয়েক মুহূর্তের জন্য। আগের কয়েক সপ্তাহের গোপন যোগাযোগ, অস্ত্র সংগ্রহ এবং সীমান্ত পেরোনোর প্রস্তুতি এবার বাস্তব পরীক্ষার সামনে। ১৯১৪ সালের ২৮ জুন, রবিবার সকালে আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও তাঁর স্ত্রী সোফি শহরে পৌঁছান। বাইরে থেকে এটি ছিল আনুষ্ঠানিক সফর; পথের পাশে তাঁদের দেখার জন্য মানুষ জড়ো হয়েছিল। কিন্তু সেই জনতার মধ্যেই অবস্থান করছিল হত্যার পরিকল্পনায় যুক্ত কয়েকজন তরুণ। প্রকাশ্য অভ্যর্থনা ও গোপন হামলার প্রস্তুতি একই রাস্তায় পাশাপাশি চলছিল।
ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ বসনিয়ায় এসেছিলেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সামরিক মহড়া পরিদর্শনের জন্য। সফরের শেষ পর্যায়ে সারায়েভোতে অভ্যর্থনা ও অন্যান্য অনুষ্ঠান নির্ধারিত ছিল। সোফির উপস্থিতি তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি অভিজাত পরিবারের হলেও হাবসবার্গ রাজবংশের বিবাহযোগ্য সমমর্যাদার পরিবার থেকে আসেননি। ফলে ভিয়েনার দরবারে স্বামীর পাশে তাঁর অবস্থান নানা নিয়মে সীমিত থাকত। বসনিয়ার এই সফরে তাঁরা তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক দম্পতি হিসেবে একসঙ্গে উপস্থিত হতে পারছিলেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই সুযোগ তাঁদের জীবনের শেষ যাত্রায় পরিণত হবে।
সকাল প্রায় দশটার দিকে তাঁরা গাড়িবহরে নগর ভবনের উদ্দেশে রওনা হন। ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও সোফি ছিলেন খোলা ছাদের মোটরগাড়িতে; সঙ্গে ছিলেন বসনিয়ার গভর্নর অস্কার পোতিওরেক। চালকের নাম লেওপোল্ড লোইকা। গাড়িবহর মিলিয়াচকা নদীর পাশের আপেল কুয়ে ধরে এগোচ্ছিল। খোলা গাড়িতে জনতা অতিথিদের ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছিল, কিন্তু একই কারণে হামলাকারীদের কাছেও তাঁরা দৃশ্যমান ছিলেন। প্রকাশিত যাত্রাপথ, জনতার নৈকট্য এবং অপর্যাপ্ত সুরক্ষা মিলে হত্যার সুযোগ তৈরি করেছিল। নিরাপত্তা ছিল, তবে সেটি সম্ভাব্য সংগঠিত হামলা ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট কার্যকর ছিল না।
ষড়যন্ত্রকারীরা পথের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছিল। পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল, একজন ব্যর্থ হলে অন্যজন চেষ্টা করবে। কিন্তু তাদের উপস্থিতি মানেই প্রত্যেকে কার্যকরভাবে হামলা করতে পারবে—এমন নয়। প্রথম দিকের অবস্থানগুলো থেকে কোনো আঘাত আসেনি। ভয়, দ্বিধা এবং উপযুক্ত মুহূর্ত হারানোর কারণে সুযোগ নষ্ট হয়। অভিজ্ঞ সামরিক অভিযানের সঙ্গে এই পরিকল্পনার পার্থক্য এখানেই স্পষ্ট। অস্ত্র ও রাজনৈতিক সংকল্প থাকলেও হামলাকারীদের দক্ষতা ও মানসিক প্রস্তুতি সমান ছিল না। গাড়িবহর এগিয়ে যাচ্ছিল, আর তাদের হাতে থাকা সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল।
প্রথম কার্যকর হামলা করেন নেদেলকো চাব্রিনোভিচ। তিনি ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের গাড়ির দিকে একটি বোমা ছোড়েন। বিস্ফোরকটি লক্ষ্যবস্তু গাড়ির ভেতরে বিস্ফোরিত হয়নি; গাড়ির পেছনে গিয়ে অনুসারী একটি গাড়ির কাছে বিস্ফোরণ ঘটে। বোমাটি ঠিক কীভাবে প্রতিহত বা সরে গিয়েছিল, তার বিবরণে কিছু পার্থক্য আছে। তবে নিশ্চিত বিষয় হলো, ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও সোফি প্রথম হামলা থেকে বেঁচে যান। পেছনের গাড়ির যাত্রী ও আশপাশের মানুষ আহত হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন গভর্নরের সহকারী এরিক ফন মেরিৎসি।
বোমা ছোড়ার পর চাব্রিনোভিচ বিষ গ্রহণ করে মিলিয়াচকা নদীতে ঝাঁপ দেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ধরা পড়ার আগেই মৃত্যু, যাতে জিজ্ঞাসাবাদে পরিকল্পনা প্রকাশ না পায়। কিন্তু বিষ প্রাণঘাতী হয়নি এবং নদীর অগভীর জলও তাঁকে আত্মহত্যার সুযোগ দেয়নি। তাঁকে আটক করা হয়। এদিকে বিস্ফোরণের পর গাড়িবহর দ্রুত নগর ভবনের দিকে চলে যায়। পথের পরবর্তী হামলাকারীরা নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। প্রিন্সিপের কাছেও তখন পরিকল্পনার সাফল্য অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। কিন্তু চাব্রিনোভিচকে আটক করলেই যে অন্য সব বিপদ শেষ হয়েছে, তা কর্তৃপক্ষ জানত না।
নগর ভবনে পৌঁছে পরিস্থিতির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার অস্বস্তিকর সংঘাত ঘটে। মেয়র প্রস্তুত করা স্বাগত ভাষণ শুরু করলে ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অতিথিকে বোমা দিয়ে অভ্যর্থনা জানানোর ঘটনায় তিনি স্পষ্টতই বিচলিত ছিলেন। সোফি তাঁকে শান্ত করতে সাহায্য করেন এবং অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্তভাবে এগোয়। এই বিরতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এখানেই সফরের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আসে। প্রথম হামলার পর নিরাপত্তার পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল। তবু অবশিষ্ট হামলাকারীদের অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য তখনও ছিল না।
সফর বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার পরিবর্তে ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ আহতদের দেখতে হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিশেষ করে আহত কর্মকর্তার অবস্থা জানতে চেয়েছিলেন তিনি। সোফিও স্বামীর সঙ্গে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই সিদ্ধান্তকে কেবল নির্বুদ্ধিতা বলে ব্যাখ্যা করলে আহতদের প্রতি তাঁর উদ্বেগ ও রাজকীয় দায়িত্ববোধের দিকটি বাদ পড়ে। কিন্তু মানবিক উদ্দেশ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি দূর করেনি। গাড়িবহরকে আবার শহরের পথে নামতে হচ্ছিল, যেখানে কিছুক্ষণ আগেই হামলা ঘটেছে এবং অন্য ষড়যন্ত্রকারীরা এখনও মুক্ত অবস্থায় ছিল।
হাসপাতালের দিকে যাওয়ার জন্য যাত্রাপথ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়। নদীর পাশের রাস্তা ধরে সরাসরি এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরিবর্তিত নির্দেশ চালকদের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছায়নি। লাতিন সেতুর কাছে গাড়ি ফ্রাঞ্জ ইয়োজেফ সড়কের দিকে মোড় নিলে পোতিওরেক ভুলটি বুঝতে পারেন এবং চালককে থামতে বলেন। লোইকা গাড়ি থামিয়ে পথ ঠিক করার চেষ্টা করেন। ইঞ্জিন বন্ধ হওয়া বা গাড়ি পিছিয়ে নেওয়ার যান্ত্রিক বিবরণ বিভিন্ন বর্ণনায় এক নয়। নির্ণায়ক বিষয় ছিল, গাড়িটি অল্প সময়ের জন্য প্রায় স্থির হয়ে যায়।
সেখানেই কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন গ্যাভ্রিলো প্রিন্সিপ। মরিৎস শিলারের দোকানের কাছে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে পরে নানা গল্প তৈরি হয়। সবচেয়ে পরিচিত গল্পে বলা হয়, ব্যর্থ পরিকল্পনার পর তিনি স্যান্ডউইচ খেতে গিয়েছিলেন এবং হঠাৎ রাজকীয় গাড়ি সামনে এসে পড়ে। কিন্তু এই খাবারের গল্পের নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তিনি এমন এলাকায় ছিলেন, যা রাজকীয় যাত্রাপথের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ঘটনাকে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যহীন উপস্থিতি হিসেবে দেখানোও ঠিক নয়। ষড়যন্ত্রের প্রস্তুতি এবং পথ পরিবর্তনের বিভ্রান্তি মিলেই তাঁর সামনে দ্বিতীয় সুযোগ এনে দেয়।
বেলা এগারোটার কিছু আগে প্রিন্সিপ গাড়ির খুব কাছে এসে ব্রাউনিং আধা-স্বয়ংক্রিয় পিস্তল থেকে দুটি গুলি করেন। একটি গুলি ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের ঘাড়ে এবং অন্যটি সোফির পেটে আঘাত করে। কোন গুলি আগে কাকে লেগেছিল, তা নিয়ে বিবরণে পার্থক্য থাকলেও দুটি আঘাতই প্রাণঘাতী ছিল। প্রিন্সিপ পরে বলেন, তাঁর লক্ষ্য ছিলেন ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও পোতিওরেক; সোফিকে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু তাঁর দাবি বাস্তব ফল বদলায় না। জনসমাগমের মধ্যে কাছ থেকে গুলি চালিয়ে তিনি দুজন মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছিলেন।
গুলির পরপরই প্রিন্সিপকে ধরে ফেলা হয়। তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তা সফল হয়নি। জনতার একাংশ তাঁকে মারধর করে; পুলিশ তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। হামলাকারীর জন্য ঘটনাটি দ্রুত শেষ হলেও আহত দম্পতির জন্য তখন জীবনরক্ষার মরিয়া চেষ্টা চলছিল। গাড়ি গভর্নরের বাসভবনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। বাইরের বিশৃঙ্খলার তুলনায় গাড়ির ভেতরে পরিস্থিতি প্রথমে পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না। ক্ষত, রক্তক্ষরণ এবং সোফির নিস্তেজ হয়ে পড়া বুঝিয়ে দেয়, আঘাত কতটা গুরুতর।
সোফি দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যান। ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দও ঘাড়ের আঘাতে মারাত্মক রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে পাওয়া যায়, তিনি স্ত্রীকে সন্তানদের জন্য বেঁচে থাকতে বলেছিলেন। কথাগুলো ইতিহাসে আবেগঘনভাবে স্মরণ করা হয়, যদিও প্রত্যেক শব্দের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা কঠিন। সকাল সাড়ে এগারোটার মধ্যে দুজনই মারা যান। সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী এবং তাঁর স্ত্রীকে রক্ষার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তাঁদের তিন সন্তান বাবা-মা দুজনকেই হারায়; রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি এটি ছিল একটি পরিবারের অপূরণীয় বিপর্যয়।
সারায়েভোর ঘটনার গুরুত্ব তাই শুধু গুলির মুহূর্তে সীমাবদ্ধ নয়। প্রথম হামলার পর সফর চালিয়ে যাওয়া, পরিবর্তিত নির্দেশের ব্যর্থতা এবং থেমে যাওয়া গাড়ির কাছে প্রিন্সিপের উপস্থিতি—প্রতিটি ধাপ ফলাফলে ভূমিকা রেখেছিল। তবু দুটি গুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্বযুদ্ধ ঘোষণা করেনি। হত্যাকাণ্ড সৃষ্টি করেছিল সংকট; সেই সংকটকে যুদ্ধে রূপ দেবে পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সারায়েভোতে গ্রেপ্তার ও তদন্ত শুরু হয়, আর ভিয়েনায় পৌঁছায় উত্তরাধিকারীর মৃত্যুসংবাদ। এরপর প্রশ্নটি হয়ে ওঠে আরও বিপজ্জনক: অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এই হত্যার জন্য কাকে দায়ী করবে এবং কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে?
রোমুলাস ও রেমাস: নেকড়ের দুধে বেঁচে যাওয়া দুই ভাই ও রোমের জন্ম
এনিয়াস থেকে আলবা লঙ্গা: রোমুলাস ও রেমাসের জন্মের পৌরাণিক ইতিহাস
এনিয়াসের কিংবদন্তি: ট্রয় থেকে ইতালিতে রোমের পূর্বপুরুষের অভিযাত্রা
রোমান পুরাণের উৎপত্তি: ইতালীয় বিশ্বাস ও গ্রিক প্রভাবে দেবদেবীর জগৎ
হলোকাস্ট ও ফাইনাল সলিউশন: ঘেটো, আইনজাটসগ্রুপেন ও গণহত্যার ইতিহাস
নাৎসি সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বিস্তার: ১৯৪২ সালে হিটলারের ইউরোপীয় আধিপত্য