বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ স্থানের নাম কোনটি? নিউজিল্যান্ডের পাহাড়টির নামের অর্থ ও গল্প

বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ স্থানের নাম কোনটি? নিউজিল্যান্ডের পাহাড়টির নামের অর্থ ও গল্প
একটি পাহাড়ের নামে সংরক্ষিত আছে তামাতেয়ার গল্প

পৃথিবীর মানচিত্রে কত পাহাড়, নদী, গ্রাম ও শহরের নাম আছে! অধিকাংশ নাম আমরা এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলতে পারি। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের একটি পাহাড়ের নাম পড়তে গিয়েই অনেকে মাঝপথে থেমে যান। নামটি এত দীর্ঘ যে রাস্তার পাশে লেখা থাকলেও চোখ বুলিয়ে শেষ করতে সময় লাগে। এই পাহাড়কে সাধারণভাবে ‘তাউমাতা’ বলা হয়। তার বহুল পরিচিত দীর্ঘ মাওরি নামটি হলো ‘তাউমাতাওয়াকাতাঙ্গিহাঙ্গাকোয়াউয়াউওতামাতেয়াতুরিপুকাকাপিকিমাউঙ্গাহোরোনুকুপোকাইওয়েনুয়াকিতানাতাহু’। বিস্ময়ের বিষয় শুধু নামটির দৈর্ঘ্য নয়। আপাতদৃষ্টিতে একটি শব্দ মনে হলেও এর মধ্যে রয়েছে একজন মানুষের পরিচয়, তাঁর পথচলা এবং বাঁশি বাজানোর একটি স্মৃতিচিত্র।

পাহাড়টি নিউজিল্যান্ডের উত্তর দ্বীপে, হকস বে অঞ্চলের পোরাঙ্গাহাউ এলাকার কাছে অবস্থিত। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতগুলোর সঙ্গে এর উচ্চতার তুলনা চলে না; সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৩০৫ মিটার। দূর থেকে দেখলে ঘাসে ঢাকা সাধারণ একটি পাহাড় বলেই মনে হতে পারে। তবু নামের কারণে এটি বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ভৌগোলিক স্থান। রাস্তার পাশের দীর্ঘ নামফলকটি অনেক পর্যটকের কাছে পাহাড়ের চেয়েও বেশি পরিচিত। এই অস্বাভাবিক জনপ্রিয়তার পেছনে পাহাড়টির আকার নয়, তার নামের ভেতরে লুকিয়ে থাকা গল্প।

দীর্ঘ নামটির অর্থ মোটামুটি এভাবে বলা যায়: ‘সেই পাহাড়চূড়া, যেখানে বড় হাঁটু বা শক্ত হাঁটুর অধিকারী তামাতেয়া, যিনি পাহাড়ে উঠতেন, পাহাড় পেরোতেন ও দেশময় ঘুরে বেড়াতেন, তাঁর প্রিয়জনের জন্য বাঁশি বাজিয়েছিলেন।’ বিভিন্ন অনুবাদে তামাতেয়ার পরিচয়ের কিছু অংশের ভাষা বদলে যায়। কোথাও তাঁর হাঁটুর বর্ণনায় ‘বড়’ বলা হয়, কোথাও ‘হাড়যুক্ত’ বা ‘শক্ত’। পাহাড় পার হওয়া এবং দেশ ঘুরে বেড়ানোর অংশটিরও ইংরেজি ব্যাখ্যায় ভিন্নতা দেখা যায়। তবে মূল দৃশ্যটি একই থাকে: পাহাড়ের চূড়া, পথিক তামাতেয়া এবং তাঁর বাজানো বাঁশি।

এই অর্থ শুনে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়। নামটি অর্থহীন অক্ষরের সারি নয়। এটি মাওরি ভাষায় গঠিত দীর্ঘ একটি বর্ণনামূলক নাম। বাংলা ভাষায় আমরা যেমন ‘অমুকের বাঁশি বাজানোর পাহাড়চূড়া’ বলে কয়েকটি শব্দে একটি ঘটনা বুঝিয়ে দিই, এখানে সেই বর্ণনা একটি দীর্ঘ নামের মধ্যে জুড়ে গেছে। তাই নামটি শুধু উচ্চারণের কৌতুক হিসেবে দেখলে তার আসল গুরুত্ব চোখ এড়িয়ে যায়। মাওরি ভাষা জানা মানুষের কাছে এর অংশগুলো একটি স্থান ও ব্যক্তিকে ঘিরে অর্থ তৈরি করে; ভাষাটি না জানা পাঠকের কাছে তা প্রথমে দুর্বোধ্য মনে হওয়াই স্বাভাবিক।

নামের শুরুতে থাকা ‘তাউমাতা’ অংশটি পাহাড়ের চূড়া বা উঁচু স্থান বোঝায়। এর পরের অংশ বাঁশি বাজানোর ঘটনার দিকে নিয়ে যায়। ‘তামাতেয়া’ হলো সেই ব্যক্তির নাম, যাঁকে ঘিরে স্থানটির পরিচয় গড়ে উঠেছে। দীর্ঘ মাঝের অংশে তাঁর চলাফেরা ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা আছে। শেষের অংশটি তাঁর প্রিয়জনের উদ্দেশে বাঁশি বাজানোর ভাবনার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিটি অংশ আলাদা করে পড়লে দীর্ঘ শব্দটি আর এলোমেলো মনে হয় না; বরং ধীরে ধীরে একটি পূর্ণ বাক্যের মতো অর্থ প্রকাশ করে।

তামাতেয়ার পরিচয় নিয়ে প্রচলিত কাহিনিতে তাঁকে একজন মাওরি পথিক ও অনুসন্ধানী ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। তাঁর ভ্রমণ, পাহাড় অতিক্রম এবং বাঁশি বাজানোর স্মৃতি নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তবে নামটির অর্থ ব্যাখ্যা করা এবং কাহিনির প্রতিটি ঘটনাকে আধুনিক ঐতিহাসিক নথি দিয়ে প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। বহু স্থানের নামের মতো এখানেও ভাষা, মৌখিক স্মৃতি ও স্থানীয় ঐতিহ্য একসঙ্গে কাজ করেছে। সেই কারণে তামাতেয়াকে নিয়ে প্রতিটি বিবরণকে নিশ্চিত জীবনী ধরে নেওয়ার বদলে নামটিকে একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতির বাহক হিসেবে বোঝা বেশি যথাযথ।

মাওরি নামগুলোতে ভূপ্রকৃতির পাশাপাশি মানুষ ও ঘটনার উল্লেখ থাকা অস্বাভাবিক নয়। কোনো নাম নদীর বাঁক, পাহাড়ের আকৃতি বা উপকূলের অবস্থান জানাতে পারে। আবার কোনো নাম স্মরণ করিয়ে দিতে পারে পূর্বপুরুষের যাত্রা বা সেই স্থানের সঙ্গে যুক্ত একটি ঘটনা। তাউমাতার দীর্ঘ নামটি দ্বিতীয় ধরনের এক অসাধারণ উদাহরণ। নাম শুনেই বোঝা যায়, এটি কেবল পাহাড়টিকে অন্য পাহাড় থেকে আলাদা করার জন্য তৈরি হয়নি। এর মধ্যে একটি গল্প মনে রাখার চেষ্টাও আছে।

এখানেই ‘বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ স্থানের নাম’ দাবিটি একটু সাবধানে বুঝতে হয়। তাউমাতার বহুল প্রচারিত দীর্ঘ রূপটিকে পৃথিবীর দীর্ঘতম ভৌগোলিক নামগুলোর একটি বলা হয়। কিন্তু কোন নামটিকে ‘দীর্ঘতম’ বলা হবে, তা নির্ভর করে গণনার নিয়মের ওপর। কেউ প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতির নাম গোনেন, কেউ শহরের আনুষ্ঠানিক নামও যুক্ত করেন। আবার একই স্থানের সংক্ষিপ্ত, দীর্ঘ ও বিকল্প বানান থাকলে কোন রূপটি ধরা হবে, সেটিও ফল বদলে দিতে পারে। তাই কোনো তালিকায় তাউমাতাকে প্রথম স্থানে দেখে অন্য সব দীর্ঘ নামের অস্তিত্ব অস্বীকার করা ঠিক নয়।

এই পাহাড়ের নামের ক্ষেত্রেও একাধিক রূপ প্রচলিত আছে। দীর্ঘ নামফলকে দেখা রূপটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত। অন্যদিকে সংক্ষিপ্ত রূপও ব্যবহার করা হয়, যার ফলে স্থানটিকে দৈনন্দিন কথায় শনাক্ত করা সহজ হয়। নামের অক্ষরসংখ্যা নিয়ে ৮৫ সংখ্যাটি প্রায়ই বলা হয়, কিন্তু ভিন্ন বানান বা রূপ পাশাপাশি রাখলে পাঠক অন্য সংখ্যা দেখতে পারেন। তাই শুধু ‘কতটি অক্ষর’ দিয়ে বিষয়টি বিচার করার আগে জানতে হবে ঠিক কোন বানানটি গণনা করা হচ্ছে। দীর্ঘতম নামের আলোচনায় এই ছোট পার্থক্যই প্রায়শ বিভ্রান্তি তৈরি করে।

আরেকটি পরিচিত উদাহরণ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। শহরটির একটি অত্যন্ত দীর্ঘ আনুষ্ঠানিক নাম রয়েছে, যার শুরু ‘ক্রুং থেপ’ দিয়ে। সেটি নগরের একটি আনুষ্ঠানিক নাম; তাউমাতার নামটি একটি পাহাড়ের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ‘সবচেয়ে দীর্ঘ শহরের আনুষ্ঠানিক নাম’ এবং ‘দীর্ঘতম ভৌগোলিক স্থানের নাম’ একই প্রশ্ন নয়। দুই ধরনের নামকে এক তালিকায় ফেলে একটি চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলে সহজেই ভুল বোঝাবুঝি হয়। নিউজিল্যান্ডের পাহাড়টির প্রসিদ্ধি মূলত তার দীর্ঘ মাওরি ভৌগোলিক নাম এবং নামটির পূর্ণ বাক্যের মতো অর্থের জন্য।

যুক্তরাজ্যের ওয়েলসেও দীর্ঘ নামের একটি বসতি রয়েছে, যা প্রায়ই তাউমাতার সঙ্গে তুলনায় আসে। ওয়েলসের নামটি একটি জনবসতির; নিউজিল্যান্ডেরটি পাহাড়ের। নামের দৈর্ঘ্য নিয়ে প্রতিযোগিতা আকর্ষণীয় হলেও এই তুলনা দেখায় যে ‘স্থান’ বলতে আমরা ঠিক কী বুঝছি, সেটি আগে স্থির করা জরুরি। পাহাড়, গ্রাম, শহর কিংবা আনুষ্ঠানিক উপাধি—সবই কোনো না কোনো স্থানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, কিন্তু তাদের নামকরণের ইতিহাস ও ব্যবহার এক রকম নয়।

তাউমাতার নামফলক দেখে অনেকে ভাবেন, এত দীর্ঘ নাম স্থানীয় মানুষ প্রতিদিন কীভাবে বলেন। বাস্তবে কথাবার্তায় সংক্ষিপ্ত ‘তাউমাতা’ ব্যবহার করলেই পাহাড়টিকে বোঝানো যায়। দীর্ঘ নামটি তাই দৈনন্দিন নির্দেশ দেওয়ার জন্য প্রতিবার উচ্চারণ করতে হয় না। এই বিষয়টি আমাদের কাছেও পরিচিত: কোনো মানুষের পূর্ণ নাম সরকারি নথিতে থাকলেও পরিচিতজনেরা তাঁকে সংক্ষিপ্ত নামে ডাকেন। পূর্ণ রূপ হারিয়ে যায় না; প্রয়োজন অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহৃত হয়। পাহাড়টির ক্ষেত্রেও দীর্ঘ ও ছোট নামের সহাবস্থান সেই কাজ করে।

দীর্ঘ নামটি উচ্চারণের চেষ্টা করতে গিয়ে মাওরি ভাষার নিজস্ব ধ্বনির কথাও মনে রাখা দরকার। পরিচিত বাংলা বা ইংরেজি বানানের নিয়ম দিয়ে প্রতিটি অংশের উচ্চারণ ধরে ফেললে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাংলা অক্ষরে লেখা রূপটি তাই পাঠককে নামের একটি ধারণা দেয়, মূল ভাষার নিখুঁত উচ্চারণ নয়। একই কারণে নামের আসল রূপ দেখে তার অংশগুলো বোঝার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ। অন্য ভাষার স্থাননামকে কেবল ‘কঠিন শব্দ’ বলে পাশ কাটালে সেই ভাষাভাষী মানুষের ইতিহাসও আমাদের অজানা থেকে যায়।

পাহাড়টির খ্যাতি পর্যটকদেরও সেখানে টেনে নিয়ে যায়। অনেকে দীর্ঘ নামফলকের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন কিংবা পুরো নামটি একবারে বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার ভেতর আরেকটি প্রশ্ন রাখা যায়: যে ভূমিকে আমরা ছবির পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করছি, স্থানীয় মানুষের কাছে তার অর্থ কী? তাউমাতার নামের উত্তর মেলে তামাতেয়ার স্মৃতিতে এবং মাওরি ভাষার বর্ণনাশক্তিতে। ছবির জন্য কয়েক মুহূর্ত থামা সহজ; নামটির অর্থ জানতে একটু বেশি সময় দিলে স্থানটিকে দেখার অভিজ্ঞতাই বদলে যায়।

নামের অর্থে বাঁশি বাজানোর যে দৃশ্যটি আছে, সেটিও পাহাড়টিকে আলাদা আবেগ দেয়। স্থাননামে সাধারণত আমরা দিকনির্দেশ, রং কিংবা আকৃতি খুঁজি। এখানে খুঁজে পাই একজন মানুষকে, যিনি পাহাড়ে উঠে প্রিয়জনের উদ্দেশে সুর তুলেছেন। গল্পটির সব বিবরণ নিশ্চিতভাবে জানা না থাকলেও নামটি সেই স্মৃতিচিত্রকে ধরে রেখেছে। ফলে পাহাড়টি শুধু একটি নির্দিষ্ট উচ্চতার ভূমি নয়; এটি এমন একটি স্থান, যার পরিচয়ের মধ্যে সংগীত, পথচলা ও ভালোবাসার ইঙ্গিত আছে।

একটি নাম সময়ের সঙ্গে কীভাবে বদলে যেতে পারে, তাউমাতার আলোচনায় সেটিও স্পষ্ট। স্থানীয় ভাষায় প্রচলিত নাম, মানচিত্রে নথিভুক্ত নাম, রাস্তার ফলকে লেখা নাম এবং পর্যটকদের ব্যবহৃত নাম—এই চারটি সব সময় হুবহু এক নাও হতে পারে। তাউমাতার সংক্ষিপ্ত ও দীর্ঘ রূপ পাশাপাশি থাকার কারণেই গবেষণা বা তথ্যভিত্তিক লেখা তৈরির সময় বানানটি মনোযোগ দিয়ে দেখা দরকার। দীর্ঘ নামের একটি অংশ বাদ পড়লে শুধু অক্ষরসংখ্যাই বদলায় না, নামের ভেতরের বর্ণনাও অসম্পূর্ণ হয়ে যেতে পারে।

তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ স্থানের নাম কোনটি? বহুল পরিচিত ভৌগোলিক নামের প্রশ্নে নিউজিল্যান্ডের তাউমাতা পাহাড়ের দীর্ঘ মাওরি নামটি একটি প্রধান উত্তর। তবে শহরের আনুষ্ঠানিক নাম বা ভিন্ন নামের রূপ যুক্ত করলে ‘সবচেয়ে দীর্ঘ’ দাবির ব্যাখ্যা বদলে যায়। আর নামটির অর্থ? সেটি তামাতেয়া নামের এক পথিকের পাহাড়চূড়ায় বাঁশি বাজানোর স্মৃতিকে বর্ণনা করে। একটি সাধারণ পাহাড়ের পরিচয়ের মধ্যে এত দীর্ঘ গল্প ধরে রাখার ক্ষমতাই এই নামের আসল বিস্ময়।


আপনার পছন্দ হতে পারে