সাইগনের পতন: ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সমাপ্তি ও দেশের একীকরণ
সিরিজ: ভিয়েতনাম যুদ্ধ
সাইগনের পতন ও একীভূত ভিয়েতনামের জন্ম
১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল সকালে উত্তর ভিয়েতনামের ট্যাংক সাইগনের স্বাধীনতা প্রাসাদের ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। কয়েক ঘণ্টা আগেও শহরের আকাশে মার্কিন হেলিকপ্টার শেষ দফার মানুষ সরিয়ে নিচ্ছিল, রাস্তায় উদ্বিগ্ন মানুষের ভিড় ছিল এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের নেতৃত্ব কোনো অলৌকিক যুদ্ধবিরতির আশা করছিল। কিন্তু দুপুরের আগেই প্রেসিডেন্ট দুয়ং ভ্যান মিন নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে কয়েক দশকের ঔপনিবেশিক যুদ্ধ, গৃহসংঘাত ও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের পর ভিয়েতনাম যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। সাইগনের পতন কোনো আকস্মিক এক দিনের বিপর্যয় ছিল না; এটি রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, সাহায্যের সংকট, ভুল সামরিক সিদ্ধান্ত এবং উত্তর ভিয়েতনামের সুপরিকল্পিত আক্রমণের চূড়ান্ত ফল।
১৯৭৩ সালের প্যারিস শান্তি চুক্তির পর মার্কিন যুদ্ধসেনারা ভিয়েতনাম ত্যাগ করলেও উত্তর ও দক্ষিণের সংঘর্ষ বন্ধ হয়নি। যুদ্ধবিরতির সময় যে পক্ষ যেখানে অবস্থান করছিল, সেখানেই থাকার অনুমতি পাওয়ায় দক্ষিণ ভিয়েতনামের ভেতরে উত্তর ভিয়েতনামের বিপুলসংখ্যক সেনা রয়ে যায়। উভয় পক্ষ নতুন ভূখণ্ড দখল, যোগাযোগপথ নিয়ন্ত্রণ এবং সামরিক ঘাঁটি শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। কাগজে যুদ্ধবিরতি থাকলেও বাস্তবে ছোট-বড় সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল।
দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট নগুয়েন ভ্যান থিয়েউ বিশ্বাস করতেন, উত্তর বড় আক্রমণ চালালে যুক্তরাষ্ট্র আবার বিমানশক্তি নিয়ে ফিরে আসবে। নিক্সন প্রশাসন তাঁকে কঠোর প্রতিক্রিয়ার ব্যক্তিগত আশ্বাসও দিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। কংগ্রেস ইন্দোচীনে নতুন মার্কিন সামরিক অভিযান সীমিত করে, যুদ্ধবিরোধী জনমত শক্তিশালী থাকে এবং ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে নিক্সনের ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। ১৯৭৪ সালের আগস্টে নিক্সন পদত্যাগ করলে দক্ষিণ ভিয়েতনাম তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আশ্বাস হারায়।
একই সময়ে মার্কিন অর্থ ও সামরিক সাহায্য কমতে থাকে। দক্ষিণ ভিয়েতনামের সেনাবাহিনী ছিল বিশাল, কিন্তু তার বিমান, হেলিকপ্টার, ট্যাংক, কামান ও পরিবহনব্যবস্থা চালু রাখতে বিপুল জ্বালানি, গোলাবারুদ ও যন্ত্রাংশ দরকার হতো। সাহায্য কমে গেলে প্রশিক্ষণ, বিমান অভিযান, টহল এবং কামানের গোলা ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করতে হয়। অনেক ইউনিট প্রয়োজনীয় রসদ পেত না। বিপরীতে উত্তর ভিয়েতনাম সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন থেকে সহায়তা নিয়ে সড়ক, পাইপলাইন ও রসদব্যবস্থা দক্ষিণের আরও গভীরে সম্প্রসারণ করছিল।
১৯৭৪ সালের শেষদিকে উত্তর ভিয়েতনাম দক্ষিণের ফুওক লং প্রদেশে আক্রমণ চালায়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে প্রদেশটির রাজধানী পতিত হয়। এটি শুধু একটি আঞ্চলিক বিজয় ছিল না; হ্যানয়ের জন্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের পরীক্ষা। প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড প্রতিবাদ জানালেও মার্কিন বিমান বা স্থলবাহিনী পাঠাননি। ফুওক লংয়ের পতন উত্তর ভিয়েতনামের নেতৃত্বকে বুঝিয়ে দেয়, নতুন আক্রমণ হলেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে ফিরে আসার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
হ্যানয় প্রথমে ১৯৭৫ ও ১৯৭৬—দুই বছরের মধ্যে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পরিকল্পনা করেছিল। ১৯৭৫ সালে সীমিত আক্রমণ চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখল ও দক্ষিণের প্রতিক্রিয়া যাচাই করার কথা ছিল। প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয় মধ্যাঞ্চলীয় উচ্চভূমির বান মে থুওত শহরকে। দক্ষিণ ভিয়েতনামের নেতৃত্ব ধারণা করেছিল, উত্তর ভিয়েতনাম প্লেইকু বা কনটুমে প্রধান হামলা চালাবে। উত্তর সেই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তৎপরতা চালায় এবং গোপনে বান মে থুওতের দিকে বাহিনী কেন্দ্রীভূত করে।
১০ মার্চ উত্তর ভিয়েতনামের সেনারা ট্যাংক ও কামানের সহায়তায় বান মে থুওতে আক্রমণ করে। শহরের প্রতিরক্ষা দ্রুত ভেঙে পড়ে। দক্ষিণ ভিয়েতনামি বাহিনী বিমান ও পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে শহর পুনর্দখলের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। এ অবস্থায় থিয়েউ একটি বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেন—প্লেইকু ও কনটুমসহ উচ্চভূমির বিস্তৃত অঞ্চল ছেড়ে সেনাদের উপকূলের দিকে সরিয়ে নেওয়া হবে, যাতে বাহিনী পুনর্গঠন করে গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল অঞ্চল রক্ষা করা যায়।
সিদ্ধান্তটি গোপন রাখা হয়েছিল এবং প্রত্যাহারের জন্য বেছে নেওয়া রুট ৭বি বহু বছর ধরে অব্যবহৃত ও ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। সেনাদের সঙ্গে তাদের পরিবার এবং হাজার হাজার বেসামরিক মানুষও রাস্তায় নেমে পড়ে। ভাঙা সেতু, যানজট, রসদের অভাব এবং উত্তর ভিয়েতনামের আক্রমণে দীর্ঘ বহরটি বিশৃঙ্খল হয়ে যায়। ইউনিটগুলো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, বিপুল সামরিক সরঞ্জাম ফেলে যেতে হয় এবং অসংখ্য মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়। এই ঘটনাকে পরে ‘কনভয় অব টিয়ার্স’ বা অশ্রুর বহর বলা হয়।
উচ্চভূমির বিপর্যয়ের খবর ছড়িয়ে পড়লে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সামরিক ও বেসামরিক কাঠামোয় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। হ্যানয় বুঝতে পারে, দক্ষিণের পতন প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত ঘটতে পারে। ফলে ধীরগতির দুই বছরের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে ১৯৭৫ সালেই চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। উত্তর ভিয়েতনামের বাহিনী উপকূলীয় শহর ও যোগাযোগপথের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়।
মার্চের শেষদিকে প্রাচীন রাজধানী হুয়ে রক্ষার চেষ্টা ভেঙে পড়ে। দক্ষিণ ভিয়েতনামের সেনা ও সাধারণ মানুষ দা নাংয়ের দিকে ছুটতে থাকে। দা নাং তখন শরণার্থী, পশ্চাদপসরণকারী সৈনিক এবং বিচ্ছিন্ন সামরিক ইউনিটে পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বন্দর ও বিমানবন্দরে স্থান পাওয়ার জন্য বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ২৯ মার্চ উত্তর ভিয়েতনামি বাহিনী প্রায় প্রতিরোধ ছাড়াই শহরে প্রবেশ করে। দক্ষিণের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটির পতন যুদ্ধের ফল প্রায় নিশ্চিত করে দেয়।
দক্ষিণের সেনাবাহিনী সর্বত্র বিনা লড়াইয়ে ভেঙে পড়েনি। সাইগনের পূর্বে জুয়ান লোক শহরে ১৮তম ডিভিশন কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ৯ এপ্রিল শুরু হওয়া যুদ্ধে দক্ষিণ ভিয়েতনামি সেনারা উত্তর ভিয়েতনামের ট্যাংক ও পদাতিক বাহিনীর একাধিক আক্রমণ প্রতিহত করে। দক্ষিণের বিমানবাহিনীও অবশিষ্ট শক্তি নিয়ে সহায়তা দেয়। উত্তর ভিয়েতনাম সরাসরি প্রতিরোধ ভাঙার পাশাপাশি শহরটি ঘিরে সাইগনের যোগাযোগপথ বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করে।
প্রায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধের পর জুয়ান লোক ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। উত্তর ভিয়েতনামের বাহিনী পাশ কাটিয়ে সাইগনের দিকে অগ্রসর হওয়ায় প্রতিরক্ষাকারীদের প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই লড়াই দক্ষিণ ভিয়েতনামের সেনাদের সাহস দেখালেও একই সঙ্গে প্রমাণ করে, বিচ্ছিন্ন একটি ডিভিশনের প্রতিরোধ পুরো রাষ্ট্রের পতন ঠেকাতে পারে না। জুয়ান লোক ছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামের শেষ উল্লেখযোগ্য সামরিক প্রতিরোধ, কিন্তু তখন তার পেছনে কার্যকর জাতীয় প্রতিরক্ষা আর অবশিষ্ট ছিল না।
প্রেসিডেন্ট ফোর্ড কংগ্রেসের কাছে দক্ষিণ ভিয়েতনামের জন্য অতিরিক্ত সামরিক সাহায্য চান। কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধ, পূর্ববর্তী সরকারি প্রতারণা, ওয়াটারগেট এবং দক্ষিণের দ্রুত পতনের প্রেক্ষাপটে কংগ্রেস নতুন বিপুল সহায়তা দিতে প্রস্তুত ছিল না। মার্কিন জনগণের মধ্যেও আবার যুদ্ধ শুরু করার সমর্থন ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ভিয়েতনামের জন্য কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করলেও উত্তর ভিয়েতনাম তখন সামরিক বিজয়ের এত কাছে পৌঁছে গেছে যে বড় কোনো আপসের প্রয়োজন অনুভব করেনি।
২১ এপ্রিল থিয়েউ প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন। আবেগপূর্ণ ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামকে পরিত্যাগ করার অভিযোগ করেন। এরপর তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান। অল্প সময়ের জন্য ত্রান ভ্যান হুওং দায়িত্ব নেন এবং ২৮ এপ্রিল দুয়ং ভ্যান মিন প্রেসিডেন্ট হন। মিনের সমর্থকেরা আশা করেছিলেন, তাঁর তুলনামূলক নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু তখন উত্তর ভিয়েতনামের সেনারা সাইগনের উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে।
সাইগনে মার্কিন দূতাবাস কয়েক সপ্তাহ ধরে আমেরিকান নাগরিক ও ঝুঁকিতে থাকা ভিয়েতনামিদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। প্রথমে বাণিজ্যিক বিমান ও সামরিক পরিবহন বিমানে মানুষ সরানো হয়। ৪ এপ্রিল অপারেশন বেবিলিফটের প্রথম দিকের একটি বিমান উড্ডয়নের পর বিধ্বস্ত হলে বহু শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক নিহত হন। দুর্ঘটনা সত্ত্বেও অনাথ ও অন্যান্য শিশুদের বিদেশে সরিয়ে নেওয়া অব্যাহত থাকে। একই সময়ে হাজার হাজার ভিয়েতনামি পরিবার সমুদ্র ও আকাশপথে পালানোর চেষ্টা করে।
২৮ এপ্রিল উত্তর ভিয়েতনামের বাহিনী তান সন নুত বিমানঘাঁটিতে গোলাবর্ষণ শুরু করে এবং দখল করা দক্ষিণ ভিয়েতনামি বিমান থেকে হামলাও চালানো হয়। রানওয়ে ব্যবহার অনিরাপদ হয়ে পড়লে স্থির ডানার বিমান দিয়ে উদ্ধার বন্ধ করতে হয়। ২৯ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র অপারেশন ফ্রিকোয়েন্ট উইন্ড শুরু করে—ভিয়েতনাম যুদ্ধের ইতিহাসে বৃহত্তম হেলিকপ্টার উদ্ধার অভিযান।
মার্কিন মেরিন ও অন্যান্য হেলিকপ্টার দূতাবাস প্রাঙ্গণ এবং নির্ধারিত স্থান থেকে মানুষ তুলে দক্ষিণ চীন সাগরে অপেক্ষমাণ বিমানবাহী জাহাজে নিয়ে যায়। শহরের বিভিন্ন ছাদ থেকেও মানুষ উদ্ধার করা হয়। যে বিখ্যাত ছবিতে একটি ভবনের ছাদে মই বেয়ে ভিয়েতনামিদের হেলিকপ্টারে উঠতে দেখা যায়, সেটি মার্কিন দূতাবাসের ছাদ নয়; এটি ছিল সাইগনে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ব্যবহৃত একটি আবাসিক ভবন। তবু ছবিটি পতনের বিশৃঙ্খলা ও মরিয়া পলায়নের স্থায়ী প্রতীক হয়ে ওঠে।
হাজার হাজার মানুষ দূতাবাসের বাইরে অপেক্ষা করছিল। অনেকেই মার্কিন সরকার, সেনাবাহিনী বা দূতাবাসের সঙ্গে কাজ করেছিল এবং নতুন সরকারের প্রতিশোধের আশঙ্কা করছিল। কিন্তু সবার জন্য জায়গা ছিল না। ৩০ এপ্রিল ভোরে শেষ মার্কিন মেরিনরা দূতাবাস ছেড়ে গেলে বহু ভিয়েতনামি ফটকের বাইরে থেকে যায়। বিমানবাহী জাহাজে জায়গা তৈরি করতে কিছু দক্ষিণ ভিয়েতনামি হেলিকপ্টার সমুদ্রে ঠেলে ফেলা হয়। যে মিত্রদের রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে প্রবেশ করেছিল, শেষ মুহূর্তে তাদের সবাইকে সঙ্গে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
৩০ এপ্রিল সকালে উত্তর ভিয়েতনামের বাহিনী বিভিন্ন দিক থেকে সাইগনে প্রবেশ করে। উল্লেখযোগ্য সমন্বিত প্রতিরোধ আর ছিল না। দুয়ং ভ্যান মিন রক্তপাত এড়াতে দক্ষিণ ভিয়েতনামের বাহিনীকে যুদ্ধ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। ট্যাংক স্বাধীনতা প্রাসাদের ফটক ভেঙে প্রবেশ করলে উত্তর ভিয়েতনামের সেনারা ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং তাদের পতাকা উত্তোলন করে। মিন ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বললে তাঁকে জানানো হয়, হস্তান্তর করার মতো ক্ষমতা আর তাঁর নেই; তাঁকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে।
দুপুরে রেডিওতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা প্রচারিত হয়। দক্ষিণ ভিয়েতনাম প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব কার্যত শেষ হয় এবং সাইগনের নাম পরে হো চি মিন সিটি রাখা হয়। উত্তর ভিয়েতনামে ৩০ এপ্রিলকে মুক্তি ও জাতীয় পুনরেকত্রীকরণের বিজয় হিসেবে উদ্যাপন করা হয়। দক্ষিণের বহু মানুষের কাছে দিনটি ছিল পরাজয়, ঘরবাড়ি হারানো এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সূচনা। একই ঐতিহাসিক মুহূর্ত এক পক্ষের কাছে মুক্তি এবং অন্য পক্ষের কাছে নির্বাসন ও রাষ্ট্রহীনতার স্মৃতি হয়ে থাকে।
পতনের পর ভিয়েতনাম তাৎক্ষণিকভাবে একক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়নি। দক্ষিণে অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার প্রশাসন পরিচালনা করে এবং উত্তর ও দক্ষিণের পৃথক কাঠামো কিছু সময় বহাল থাকে। ১৯৭৬ সালের এপ্রিলে দেশব্যাপী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তর ও দক্ষিণ একীভূত হয়ে ভিয়েতনামের সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়, যার রাজধানী রাখা হয় হ্যানয়।
একীকরণের পর সরকার দক্ষিণের সামরিক কর্মকর্তা, সরকারি কর্মচারী ও রাজনৈতিকভাবে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পুনঃশিক্ষা শিবিরে পাঠায়। অনেককে প্রত্যাশার তুলনায় দীর্ঘ সময় আটক থাকতে হয়। দক্ষিণের অর্থনীতি সমাজতান্ত্রিক কাঠামোয় রূপান্তর, সম্পত্তি পুনর্বণ্টন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামোর কারণে বড় সংকটে পড়ে। ভয়, রাজনৈতিক দমন ও অর্থনৈতিক দুর্দশায় পরবর্তী বছরগুলোতে লাখো মানুষ নৌকায় দেশ ছাড়ার চেষ্টা করে; তারা ‘বোট পিপল’ নামে পরিচিত হয়।
যুদ্ধ শেষে ভিয়েতনামকে বিধ্বস্ত শহর, বিপুলসংখ্যক নিহত ও আহত মানুষ, অবিস্ফোরিত বোমা, এজেন্ট অরেঞ্জে দূষিত এলাকা এবং লক্ষাধিক বাস্তুচ্যুত পরিবার নিয়ে পুনর্গঠন শুরু করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রেও যুদ্ধ গভীর ক্ষত রেখে যায়—নিহত ও আহত সেনা, যুদ্ধফেরতদের মানসিক সংকট, সরকারের ওপর অবিশ্বাস এবং বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক। ভিয়েতনামের বিজয় ঔপনিবেশিকতা ও বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক হলেও এর মূল্য ছিল অসাধারণভাবে ভারী।
সাইগনের পতন দেখিয়েছিল, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব রাজনৈতিক বৈধতা, স্থানীয় স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জনসমর্থনের বিকল্প নয়। যুক্তরাষ্ট্র বহু যুদ্ধে জয়ী হয়েও নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য রক্ষা করতে পারেনি; দক্ষিণ ভিয়েতনাম বিশাল সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও বিদেশি সহায়তা ছাড়া ভেঙে পড়ে; আর উত্তর ভিয়েতনাম বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। ৩০ এপ্রিল ১৯৭৫ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায়, কিন্তু এর স্মৃতি, শরণার্থী সংকট, পরিবেশগত ক্ষতি এবং রাজনৈতিক শিক্ষা বহু দশক ধরে ভিয়েতনাম ও বিশ্বের ইতিহাসকে প্রভাবিত করে চলেছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্য: উপনিবেশের সৈন্য, নতুন ম্যান্ডেট ও সর্বোচ্চ বিস্তার
যে সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না: নৌবাহিনী, বাণিজ্য, রেলপথ ও টেলিগ্রাফের ভূমিকা
হেলেন কেলার: দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি হারিয়েও বিশ্বজুড়ে অধিকার আন্দোলনের কণ্ঠ হয়ে ওঠার ইতিহাস
মেরি শেলি: ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ লিখে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির ইতিহাস বদলে দেওয়া তরুণী
অ্যাডা লাভলেস: প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে পরিচিত নারীর বিস্ময়কর ইতিহাস
মেরি অ্যানিং: জীবাশ্ম আবিষ্কার করে পৃথিবীর প্রাচীন প্রাণের ইতিহাস যেভাবে বদলে দিয়েছিলেন