ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ও উত্তরাধিকার: উপনিবেশমুক্তি থেকে কমনওয়েলথের উত্থান
সিরিজ: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার
সাম্রাজ্যের পতন থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র ও কমনওয়েলথের উত্থান
বিশ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পৃথিবীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভূখণ্ড ও জনসংখ্যার ওপর কর্তৃত্ব করত। কানাডা থেকে ক্যারিবীয় অঞ্চল, আফ্রিকা থেকে ভারত এবং মালয় থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই সাম্রাজ্যকে অপরাজেয় বলে মনে হতো। কিন্তু এক শতাব্দীরও কম সময়ে এর অধিকাংশ উপনিবেশ স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। পতনটি কোনো একদিনে কিংবা একটি যুদ্ধে ঘটেনি; দুটি বিশ্বযুদ্ধ, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, আন্তর্জাতিক চাপ, সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং পরিবর্তিত জনমতের সম্মিলিত প্রভাবে সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ছিল দীর্ঘ উপনিবেশমুক্তি প্রক্রিয়ার ফল, যার প্রভাব আজও বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজে দৃশ্যমান।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরই সাম্রাজ্যের ভেতরের পরিবর্তন স্পষ্ট হতে শুরু করে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও আইরিশ মুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে বিপুল সৈন্য ও সম্পদ দিয়েছিল। এর বিনিময়ে তারা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার দাবি করে। ১৯৩১ সালের ওয়েস্টমিনস্টার সংবিধি এসব ডোমিনিয়নকে আইনগতভাবে ব্রিটিশ সংসদের অধীনতা থেকে অনেকাংশে মুক্ত করে। তারা রাজমুকুটের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলেও স্বশাসিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সাম্রাজ্যের পুরোনো ঊর্ধ্বতন-অধস্তন সম্পর্ক ধীরে ধীরে সমমর্যাদার অংশীদারত্বের দিকে যেতে শুরু করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এই পরিবর্তনকে দ্রুততর করে। জার্মানির বিরুদ্ধে বিজয়ী হলেও ব্রিটেন যুদ্ধ শেষে ঋণগ্রস্ত, ক্লান্ত ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ছিল। শহর, শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল; বিদেশে বিপুল সেনাবাহিনী রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। একই সময়ে জাপানের হাতে সিঙ্গাপুর, মালয় ও বার্মার পতন এশিয়ায় ইউরোপীয় অজেয়তার ধারণা ভেঙে দেয়। উপনিবেশের মানুষ দেখেছিল যে ব্রিটিশদের পরাজিত করা সম্ভব। যুদ্ধে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের নামে লড়াই করে ফিরে আসা উপনিবেশিক সৈন্যরাও নিজেদের রাজনৈতিক অধীনতাকে আর স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা সাম্রাজ্য ভাঙনের নির্ণায়ক মোড় হয়ে ওঠে। ভারত ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রধান অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত ভিত্তি। ভারতীয় রাজস্ব, সৈন্য ও বন্দর ব্যবহার করে ব্রিটেন মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় শক্তি বজায় রাখত। ভারত হারানোর পর পুরো সাম্রাজ্যিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৪৮ সালে বার্মা ও সিলন স্বাধীন হয় এবং একই বছরে ব্রিটেন ফিলিস্তিনের ম্যান্ডেট ত্যাগ করে। এশিয়ায় ব্রিটিশ শাসনের অবসান আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি অপরিবর্তনীয় ধারায় পরিণত হয়।
তবে সর্বত্র ক্ষমতা হস্তান্তর শান্তিপূর্ণ ছিল না। মালয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হলে ১৯৪৮ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত জরুরি অবস্থা চলে। সামরিক অভিযান, পুনর্বাসন ও রাজনৈতিক সংস্কারের সমন্বয়ে ব্রিটেন বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। ১৯৫৭ সালে মালয়া স্বাধীনতা লাভ করে এবং পরে সাবাহ ও সারাওয়াকসহ অন্যান্য অঞ্চল যুক্ত হয়ে মালয়েশিয়া গঠিত হয়। কেনিয়ায় মাউ মাউ বিদ্রোহ দমনে জরুরি অবস্থা, বন্দিশিবির, জিজ্ঞাসাবাদ ও ব্যাপক সহিংসতা ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘদিন এসব নির্যাতনের অনেক অংশ সরকারি বর্ণনার বাইরে রাখা হয়েছিল।
আফ্রিকায় উপনিবেশমুক্তির প্রতীকী সূচনা ঘটে ১৯৫৭ সালে ঘানার স্বাধীনতার মাধ্যমে। কোয়ামে নক্রুমার নেতৃত্বে গোল্ড কোস্টের আন্দোলন দেখায় যে রাজনৈতিক সংগঠন, ধর্মঘট ও গণসমর্থনের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শাসন শেষ করা সম্ভব। ১৯৬০ সালে নাইজেরিয়া স্বাধীন হয়। এরপর সিয়েরা লিওন, উগান্ডা, কেনিয়া, গাম্বিয়া, বতসোয়ানা, লেসোথো, সোয়াজিল্যান্ড ও অন্যান্য ব্রিটিশ উপনিবেশ একে একে স্বাধীনতা অর্জন করে। ব্রিটিশ সরকার অনেক ক্ষেত্রে এমন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চেয়েছিল, যারা পশ্চিমা অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখবে।
১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক শক্তির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। মিশরের রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল গোপন পরিকল্পনায় মিশর আক্রমণ করে। সামরিক অভিযান সফলভাবে এগোলেও যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ব্রিটেনকে দ্রুত পিছু হটতে হয়। সুয়েজ সংকট দেখিয়ে দেয় যে ব্রিটেন আর এককভাবে বিশ্বরাজনীতির গতিপথ নির্ধারণকারী পরাশক্তি নয়। এরপর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ক্যারিবীয় অঞ্চলেও স্বাধীনতার পথ ছিল জটিল। প্রথমে কয়েকটি দ্বীপকে নিয়ে একটি সংঘ গঠনের চেষ্টা করা হলেও অভ্যন্তরীণ মতবিরোধে সেটি ভেঙে যায়। ১৯৬২ সালে জ্যামাইকা ও ত্রিনিদাদ ও টোবাগো স্বাধীন হয়। পরে বার্বাডোস, বাহামা, গ্রেনাডা এবং অন্যান্য দ্বীপরাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করে। কিছু ক্ষুদ্র দ্বীপ ব্রিটেনের অধীন বিদেশি অঞ্চল হিসেবেই থেকে যায়। অর্থাৎ সাম্রাজ্যের পতন সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ছিল না; বিভিন্ন ভূখণ্ডের আকার, অর্থনীতি ও জনগণের মতামত অনুযায়ী ভিন্ন রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ রোডেশিয়ার ক্ষেত্রে উপনিবেশমুক্তি বর্ণবাদী শাসনের প্রশ্নে জটিল হয়ে ওঠে। দক্ষিণ আফ্রিকা আগেই স্বশাসিত ডোমিনিয়ন হলেও ক্ষমতা শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘুদের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। দেশটি ১৯৬১ সালে প্রজাতন্ত্র হয়ে কমনওয়েলথ ত্যাগ করে। দক্ষিণ রোডেশিয়ার শ্বেতাঙ্গ সরকার কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ঠেকাতে ১৯৬৫ সালে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করে। দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রাম ও আন্তর্জাতিক চাপের পর ১৯৮০ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসনের ভিত্তিতে জিম্বাবুয়ে স্বাধীন হয়।
হংকং হস্তান্তরকে প্রায়ই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শেষ বড় অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়। ঊনবিংশ শতকের আফিম যুদ্ধের পর ব্রিটেন হংকং দ্বীপ ও আশপাশের অঞ্চল দখল করেছিল। ভূখণ্ডের বড় অংশের ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ব্রিটেন ও চীন আলোচনায় বসে। ১৯৯৭ সালের ১ জুলাই হংকং চীনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর মাধ্যমে ব্রিটেনের একসময়ের বিশাল এশীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবশিষ্ট ভূখণ্ডগুলোর একটি হারিয়ে যায়। তবে কয়েকটি দ্বীপ ও ক্ষুদ্র অঞ্চল আজও ব্রিটিশ সার্বভৌমত্বের অধীনে রয়েছে।
সাম্রাজ্য ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে কমনওয়েলথের ধারণা বিকশিত হয়। প্রথমদিকে এটি মূলত ব্রিটেন ও শ্বেতাঙ্গ-অধ্যুষিত ডোমিনিয়নগুলোর সংগঠন ছিল। ভারত স্বাধীনতার পর প্রজাতন্ত্র হয়েও সংগঠনে থাকতে চাইলে ১৯৪৯ সালের লন্ডন ঘোষণার মাধ্যমে নতুন ভিত্তি তৈরি করা হয়। সদস্যদেশগুলো ব্রিটিশ রাজাকে নিজেদের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গ্রহণ না করেও স্বাধীন ও সমমর্যাদার রাষ্ট্র হিসেবে কমনওয়েলথে থাকতে পারে। এর ফলে এশিয়া, আফ্রিকা, ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু সাবেক উপনিবেশ সংগঠনটিতে যোগ দেয়।
কমনওয়েলথ কোনো নতুন সাম্রাজ্য বা বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক জোট নয়। সদস্যদেশগুলো স্বাধীন এবং তাদের মধ্যে কোনো একক সরকার, সেনাবাহিনী বা অভিন্ন পররাষ্ট্রনীতি নেই। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, শিক্ষা, ক্রীড়া, উন্নয়ন, আইনি সহযোগিতা ও কূটনৈতিক আলোচনায় সংগঠনটি ভূমিকা রাখে। কমনওয়েলথ গেমস এর সবচেয়ে দৃশ্যমান কার্যক্রমগুলোর একটি। তবে সমালোচকেরা মনে করেন, সংগঠনটি কখনো কখনো সাম্রাজ্যিক অতীতের বেদনাদায়ক প্রশ্ন এড়িয়ে প্রতীকী ঐক্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহু দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় রয়ে গেছে। সংসদীয় সরকার, মন্ত্রিসভা, বিরোধী দল, নির্দিষ্ট প্রশাসনিক বিভাগ এবং ব্রিটিশ সাধারণ আইন বহু সাবেক উপনিবেশে গ্রহণ করা হয়েছে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও সরকারি চাকরির কাঠামো ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিকশিত হয়েছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থা প্রথমে জনগণের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের জন্য নয়, বরং সীমিতসংখ্যক কর্মকর্তার মাধ্যমে বিশাল জনগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল। স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে তাই একই প্রতিষ্ঠান নতুন রাজনৈতিক লক্ষ্য অনুযায়ী রূপান্তর করতে হয়েছে।
ইংরেজি ভাষা সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বিস্তৃত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারগুলোর একটি। প্রশাসন, উচ্চশিক্ষা, বাণিজ্য ও আইনে ব্যবহারের কারণে এটি বহু দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বিজ্ঞান ও বিশ্ববাণিজ্যের প্রসার ইংরেজির অবস্থান আরও শক্তিশালী করে। ক্রিকেট, ফুটবল, রাগবি এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও সাম্রাজ্যের পথ ধরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি স্থানীয় ভাষা ও জ্ঞানব্যবস্থাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছিল এবং ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
রেলপথ, বন্দর, টেলিগ্রাফ ও আধুনিক প্রশাসনকেও কখনো সাম্রাজ্যের ইতিবাচক উত্তরাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়। এসব অবকাঠামো স্বাধীনতার পর জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এগুলোর মূল নকশা ছিল খনি, বাগান ও উৎপাদন এলাকা থেকে কাঁচামাল বন্দরে পৌঁছে দেওয়া এবং সৈন্য দ্রুত স্থানান্তর করা। অনেক উপনিবেশে প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোর মধ্যে যোগাযোগের চেয়ে উপকূলমুখী রপ্তানিপথ বেশি উন্নত হয়েছিল। ফলে স্বাধীনতার পরও বহু দেশ সীমিত কয়েকটি কাঁচামাল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল থেকে যায়।
সাম্রাজ্যের আঁকা সীমান্ত আধুনিক বিশ্বের বহু সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত। প্রশাসনিক সুবিধা ও ইউরোপীয় শক্তির সমঝোতার ভিত্তিতে তৈরি সীমান্ত একই জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত করেছে, আবার ঐতিহাসিকভাবে পৃথক সমাজকে একই রাষ্ট্রের মধ্যে এনেছে। ভারত ও পাকিস্তানের বিভাজন, কাশ্মীর বিরোধ, ফিলিস্তিন সংকট এবং আফ্রিকার বিভিন্ন সীমান্তসংঘাতে ঔপনিবেশিক সিদ্ধান্তের দীর্ঘ ছায়া রয়েছে। সব পরবর্তী সংঘাতকে শুধু ব্রিটিশ শাসনের ফল বলা ঠিক নয়, কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের পদ্ধতি ও সীমান্ত নির্ধারণ অনেক বিরোধকে গভীর করেছে।
সাম্রাজ্য ব্রিটেনকেও পরিবর্তন করেছে। ক্যারিবীয় অঞ্চল, ভারতীয় উপমহাদেশ, আফ্রিকা ও হংকং থেকে অভিবাসনের ফলে ব্রিটিশ সমাজ বহুসাংস্কৃতিক হয়ে ওঠে। এসব জনগোষ্ঠী শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, সাহিত্য, সংগীত, খাদ্য ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একই সঙ্গে বর্ণবাদ, নাগরিকত্ব, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ব্রিটেনের শহর, জাদুঘর, প্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক ইতিহাসে সাম্রাজ্যের উপস্থিতি আজও স্পষ্ট।
ঔপনিবেশিক যুগে সংগৃহীত শিল্পকর্ম ও মানবদেহাবশেষ ফেরত দেওয়ার দাবি সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বেনিন ব্রোঞ্জ, ভারতীয় মূল্যবান বস্তু এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পবিত্র সামগ্রী ব্রিটিশ সংগ্রহশালায় রয়েছে। কোন বস্তু আইনসম্মতভাবে সংগৃহীত হয়েছিল এবং কোনটি যুদ্ধ, দমন বা অসম চুক্তির মাধ্যমে নেওয়া হয়েছিল—এই প্রশ্নের উত্তর সব সময় সহজ নয়। ক্ষতিপূরণ, আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনা এবং দাসত্ব ও ঔপনিবেশিক সহিংসতার স্বীকৃতি নিয়েও বিতর্ক চলছে।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারকে শুধু উন্নয়ন কিংবা শুধু ধ্বংস—কোনো একটি শব্দে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ, আইন, ভাষা ও প্রতিষ্ঠান ছড়িয়েছে, কিন্তু সেই বিস্তার ঘটেছে বিজয়, ভূমি দখল, বর্ণগত বৈষম্য ও অর্থনৈতিক শোষণের কাঠামোর মধ্যে। স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের প্রয়োজনে রূপান্তর করেছে, আবার অনেক অসমতা ও বিভাজনের বোঝাও বহন করছে। সাম্রাজ্য রাজনৈতিকভাবে ভেঙে গেলেও তার নির্মিত সীমান্ত, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক ধারণা ও অভিবাসনের ধারা আজও আধুনিক বিশ্বকে প্রভাবিত করছে।
মেরি শেলি: ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ লিখে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির ইতিহাস বদলে দেওয়া তরুণী
অ্যাডা লাভলেস: প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে পরিচিত নারীর বিস্ময়কর ইতিহাস
মেরি অ্যানিং: জীবাশ্ম আবিষ্কার করে পৃথিবীর প্রাচীন প্রাণের ইতিহাস যেভাবে বদলে দিয়েছিলেন
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বিস্তার: পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ কীভাবে ব্রিটিশ শাসনে এসেছিল?
বোয়ার যুদ্ধ ও দক্ষিণ আফ্রিকা: সোনা, হীরা ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক আধিপত্যের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস
আফ্রিকার জন্য প্রতিযোগিতা: মিশর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাস