বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূচনা: সমুদ্রবাণিজ্য, নৌবাহিনী ও উপনিবেশের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের বিশ্বশক্তি হয়ে ওঠার ইতিহাস

সিরিজ: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূচনা: সমুদ্রবাণিজ্য, নৌবাহিনী ও উপনিবেশের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের বিশ্বশক্তি হয়ে ওঠার ইতিহাস
সমুদ্রবাণিজ্য ও নৌশক্তির ওপর গড়ে ওঠা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূচনা

ষোড়শ শতকের শুরুতেও ইংল্যান্ড পৃথিবীর প্রধান সাম্রাজ্য ছিল না। ইউরোপীয় শক্তির ভারসাম্যে দেশটি স্পেন, পর্তুগাল কিংবা ফ্রান্সের তুলনায় পিছিয়ে ছিল। পর্তুগিজ নাবিকেরা তখন আফ্রিকার উপকূল ঘুরে ভারত মহাসাগরে পৌঁছে গেছে, আর স্পেন আমেরিকার বিশাল ভূখণ্ড দখল করে সোনা ও রুপার বিপুল সম্পদ ইউরোপে নিয়ে আসছে। বিপরীতে ইংল্যান্ড ছিল সীমিত সম্পদ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ধর্মীয় সংঘাতে জর্জরিত একটি দ্বীপরাষ্ট্র। অথচ পরবর্তী দুই শতাব্দীর মধ্যে এই দেশই এমন এক সাম্রাজ্যের ভিত্তি নির্মাণ করে, যার প্রভাব পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মহাদেশে পৌঁছেছিল। এই পরিবর্তনের পেছনে কোনো একক বিজয় ছিল না; বরং সমুদ্রবাণিজ্য, নৌপ্রযুক্তি, বেসরকারি বিনিয়োগ, সশস্ত্র বাণিজ্যিক কোম্পানি ও পরিকল্পিত উপনিবেশ স্থাপনের সম্মিলিত ভূমিকা ছিল।

ইংল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান তার সামুদ্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে ইংলিশ চ্যানেল দ্বারা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দেশটির নিরাপত্তা অনেকাংশে সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। একই সঙ্গে আটলান্টিক মহাসাগরের কাছাকাছি অবস্থান নতুন বাণিজ্যপথে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে ভূমধ্যসাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্যের গুরুত্ব কিছুটা কমে আটলান্টিকমুখী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজ বন্দরগুলোর সম্ভাবনাও বাড়তে থাকে। রাজপরিবার, অভিজাত ব্যবসায়ী ও বন্দরনির্ভর বণিকেরা বুঝতে পারেন, সমুদ্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বাণিজ্য এবং বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে রাষ্ট্রক্ষমতা শক্তিশালী করা সম্ভব।

ইংল্যান্ডের সামুদ্রিক অভিযানের প্রথম পর্যায়ে অনুসন্ধান ও বিকল্প বাণিজ্যপথের সন্ধান ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। রাজা সপ্তম হেনরির পৃষ্ঠপোষকতায় জন ক্যাবট ১৪৯৭ সালে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে উত্তর আমেরিকার উপকূলে পৌঁছান। তার অভিযান তাৎক্ষণিকভাবে স্থায়ী উপনিবেশ সৃষ্টি না করলেও ইংল্যান্ডকে উত্তর আমেরিকায় ভবিষ্যৎ দাবি প্রতিষ্ঠার একটি ভিত্তি দেয়। পরবর্তী অভিযাত্রীরা উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে এশিয়ায় পৌঁছানোর পথ খুঁজতে থাকে। কাঙ্ক্ষিত পথ পাওয়া না গেলেও এসব অভিযান নৌচালনা, মানচিত্র নির্মাণ এবং দূরবর্তী সমুদ্র সম্পর্কে ইংরেজদের জ্ঞান বাড়িয়ে দেয়।

রানি প্রথম এলিজাবেথের শাসনামলে সামুদ্রিক সম্প্রসারণ আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ফ্রান্সিস ড্রেক, জন হকিন্স ও মার্টিন ফ্রোবিশারের মতো নাবিকেরা অভিযাত্রিক, বণিক এবং প্রয়োজনে জলদস্যুর ভূমিকাও পালন করতেন। ইংরেজ মুকুটের অনুমতিপ্রাপ্ত এসব নাবিক স্প্যানিশ জাহাজ ও বন্দর আক্রমণ করে সম্পদ দখল করতেন। রাষ্ট্র সরাসরি পূর্ণ ব্যয় বহন না করেও তাদের অভিযানের লাভের অংশ পেত। এই ব্যবস্থা ইংল্যান্ডকে তুলনামূলক কম খরচে স্পেনের সামুদ্রিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দেয়। তবে এই উত্থানের সঙ্গে সহিংসতা ও মানবিক শোষণও জড়িত ছিল। জন হকিন্সের মতো ইংরেজ ব্যবসায়ীরা আটলান্টিক দাসবাণিজ্যে অংশ নিয়ে আফ্রিকান মানুষদের বন্দী ও বিক্রি করেছিলেন। ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রাথমিক অর্থনৈতিক বিকাশের ইতিহাসকে দাসত্ব ও জোরপূর্বক শ্রমের অন্ধকার অধ্যায় থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।

১৫৮৮ সালে স্প্যানিশ আর্মাডার বিরুদ্ধে ইংরেজ বিজয় সামুদ্রিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হয়। স্পেন ইংল্যান্ড আক্রমণের উদ্দেশ্যে বিশাল নৌবহর পাঠালেও ইংরেজদের দ্রুতগামী জাহাজ, দূরপাল্লার কামান, কার্যকর কৌশল, স্প্যানিশ পরিকল্পনার দুর্বলতা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অভিযান ব্যর্থ হয়। এই বিজয়ের পরই ইংল্যান্ড সমুদ্রের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে যায়নি; স্পেন আরও বহু বছর শক্তিশালী নৌশক্তি হিসেবে টিকে ছিল। কিন্তু আর্মাডার ব্যর্থতা ইংরেজদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং প্রমাণ করে যে স্প্যানিশ সামুদ্রিক শক্তিকে পরাজিত করা অসম্ভব নয়। এটি ইংল্যান্ডের নৌ-আত্মবিশ্বাস ও বিদেশমুখী উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীকী সূচনায় পরিণত হয়।

সাম্রাজ্য গঠনের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে কার্যকর উদ্ভাবনগুলোর একটি ছিল যৌথ মূলধনি কোম্পানি। দূরসমুদ্রের অভিযান ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। একটি জাহাজ ডুবে গেলে বা শত্রুর হাতে ধরা পড়লে একক বিনিয়োগকারী সর্বস্ব হারাতে পারতেন। যৌথ মূলধনি ব্যবস্থায় বহু ব্যবসায়ী অর্থ বিনিয়োগ করতেন এবং লাভ-ক্ষতির ঝুঁকি ভাগ করে নিতেন। রাজকীয় সনদপ্রাপ্ত কোম্পানিগুলো নির্দিষ্ট অঞ্চলে বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার পেত। এভাবে ব্যক্তিগত পুঁজি, রাষ্ট্রীয় অনুমোদন ও সামরিক শক্তির মধ্যে এক নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়।

১৬০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ। প্রাথমিকভাবে কোম্পানিটির লক্ষ্য ছিল এশিয়ার মসলা, রেশম, তুলাবস্ত্র ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্যের বাণিজ্যে প্রবেশ করা। পর্তুগিজ ও ডাচ প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলা করে কোম্পানি ভারত মহাসাগরে অবস্থান তৈরি করে এবং পরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। শুরুতে এটি সরাসরি সাম্রাজ্য শাসনের প্রতিষ্ঠান ছিল না; কিন্তু নিজস্ব জাহাজ, দুর্গ, কর্মচারী ও সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার ফলে ধীরে ধীরে কোম্পানিটি একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার ভিত্তি লাভ করে।

উত্তর আমেরিকায় ইংরেজ উপনিবেশ স্থাপনের প্রাথমিক প্রচেষ্টা সবসময় সফল হয়নি। ১৫৮০-এর দশকে রোয়ানোক দ্বীপের বসতি রহস্যজনকভাবে বিলীন হয়ে যায়। স্থায়ী সাফল্য আসে ১৬০৭ সালে ভার্জিনিয়ায় জেমসটাউন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। প্রথম বছরগুলোতে রোগ, অনাহার, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং স্থানীয় পোহাটান জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষে বহু বসতি স্থাপনকারী মারা যান। পরে তামাকচাষ লাভজনক হয়ে ওঠায় উপনিবেশটি টিকে যায়। তামাক উৎপাদনের জন্য বিপুল জমি ও শ্রমের প্রয়োজন ছিল। প্রথমে চুক্তিবদ্ধ ইউরোপীয় শ্রমিক এবং পরে ক্রমবর্ধমানভাবে দাসত্বে আবদ্ধ আফ্রিকানদের শ্রম ব্যবহার করা হয়। ফলে অর্থনৈতিক সাফল্যের সঙ্গে ভূমি দখল, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদ এবং বর্ণভিত্তিক দাসব্যবস্থা আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে।

১৬২০ সালে পিউরিটান বিচ্ছিন্নতাবাদীদের একটি দল মেফ্লাওয়ার জাহাজে নিউ ইংল্যান্ডে পৌঁছে প্লাইমাউথ বসতি স্থাপন করে। তাদের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরবর্তী ইংরেজ অভিবাসনের পেছনে জমি, ব্যবসা এবং সামাজিক উন্নতির আকাঙ্ক্ষাও কাজ করেছিল। সপ্তদশ শতাব্দীজুড়ে আটলান্টিক উপকূলে একাধিক ইংরেজ উপনিবেশ গড়ে ওঠে। এসব উপনিবেশ কৃষিপণ্য, কাঠ, পশম ও জাহাজ নির্মাণের উপকরণ সরবরাহ করত এবং ইংরেজ উৎপাদিত পণ্যের বাজারে পরিণত হয়। একই সময়ে আদিবাসী সমাজগুলো রোগ, যুদ্ধ, ভূমি হারানো এবং উপনিবেশিক সম্প্রসারণের ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হয়।

ক্যারিবীয় অঞ্চলেও ইংরেজ সম্প্রসারণ অত্যন্ত লাভজনক হয়ে ওঠে। বার্বাডোস ও জ্যামাইকার মতো দ্বীপে আখচাষ ও চিনি উৎপাদন ইউরোপীয় বাজারে বিপুল মুনাফা সৃষ্টি করে। এই বাগান অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল দাসত্বে আবদ্ধ আফ্রিকানদের নির্মম শ্রমের ওপর। ইংরেজ জাহাজ ইউরোপীয় পণ্য আফ্রিকায় নিয়ে যেত, বন্দী মানুষকে আটলান্টিক পার করে আমেরিকায় পৌঁছে দিত এবং সেখান থেকে চিনি, তামাক ও অন্যান্য উপনিবেশিক পণ্য ইংল্যান্ডে ফিরিয়ে আনত। এই আটলান্টিক বাণিজ্যব্যবস্থা ব্রিস্টল, লিভারপুল ও লন্ডনের মতো বন্দরকে সমৃদ্ধ করে এবং ব্রিটিশ অর্থনীতিতে পুঁজি সঞ্চয় ত্বরান্বিত করে। কিন্তু এই সমৃদ্ধির মূল্য দিয়েছিল স্বাধীনতা হারানো লাখো মানুষ।

সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডকে ডাচ প্রজাতন্ত্রের সঙ্গেও কঠিন বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। নেভিগেশন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ইংরেজ সরকার উপনিবেশিক বাণিজ্য ইংরেজ জাহাজ ও বন্দরের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। এর ফলে একাধিক অ্যাংলো-ডাচ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ডাচদের উন্নত বাণিজ্যিক ব্যবস্থা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইংল্যান্ড নিজস্ব নৌপরিবহন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ঋণব্যবস্থা শক্তিশালী করে। ১৬৯৪ সালে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠা সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সংগ্রহ এবং বিশাল নৌবাহিনীর ব্যয় বহনে সহায়তা করে। রাষ্ট্রের ঋণক্ষমতা, করব্যবস্থা ও নৌবাহিনীর এই সমন্বয় ইংল্যান্ডকে দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিচালনার শক্তি দেয়।

১৭০৭ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড রাজনৈতিকভাবে একীভূত হয়ে গ্রেট ব্রিটেন গঠন করলে স্কটিশ ব্যবসায়ীরাও ইংরেজ উপনিবেশ ও বাণিজ্যব্যবস্থায় প্রবেশের বিস্তৃত সুযোগ পান। এরপর ব্রিটিশ পরিচয়ের অধীনে সামুদ্রিক শক্তি আরও সুসংগঠিত হয়। ১৭১৩ সালের উট্রেখট চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন উত্তর আমেরিকায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড এবং স্প্যানিশ আমেরিকায় দাস সরবরাহের লাভজনক অধিকার অর্জন করে। তখন পর্যন্ত দেশটি কেবল উপনিবেশ স্থাপনকারী রাষ্ট্র নয়, বরং বাণিজ্যপথ, নৌঘাঁটি, আর্থিক ব্যবস্থা এবং সশস্ত্র কোম্পানির মাধ্যমে যুক্ত এক বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছিল।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূচনা তাই বীর নাবিকদের রোমাঞ্চকর অভিযানের সরল কাহিনি নয়। এটি ছিল বাণিজ্য ও যুদ্ধ, বিনিয়োগ ও লুণ্ঠন, প্রযুক্তিগত উন্নতি ও মানবিক শোষণের পরস্পরজড়িত ইতিহাস। ইংল্যান্ড তার দ্বীপভিত্তিক নিরাপত্তা, আটলান্টিকমুখী অবস্থান, শক্তিশালী নৌবাহিনী, বেসরকারি পুঁজি এবং রাজকীয় সনদপ্রাপ্ত কোম্পানিকে একটি কার্যকর সাম্রাজ্যিক ব্যবস্থায় যুক্ত করেছিল। সেই ব্যবস্থাই পরবর্তী শতাব্দীতে ভারত, উত্তর আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরে ব্রিটিশ বিস্তারের ভিত্তি তৈরি করে। সমুদ্র ছিল এই সাম্রাজ্যের পথ, জাহাজ ছিল তার বাহন, বাণিজ্য ছিল তার উদ্দেশ্য এবং সামরিক শক্তি ছিল সেই বাণিজ্য রক্ষার প্রধান অস্ত্র।


আপনার পছন্দ হতে পারে