বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

পিরিয়ডের সময় পেটব্যথা কেন হয়? কারণ, স্বস্তির উপায় ও কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন

পিরিয়ডের সময় পেটব্যথা কেন হয়? কারণ, স্বস্তির উপায় ও কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
পিরিয়ডের পেটব্যথা: কারণ ও স্বস্তির কার্যকর উপায়

পিরিয়ড বা মাসিকের সময় তলপেটে ব্যথা হওয়া অত্যন্ত পরিচিত একটি অভিজ্ঞতা। কারও ক্ষেত্রে ব্যথা হালকা টান বা অস্বস্তির মতো, আবার কারও ক্ষেত্রে এতটাই তীব্র হতে পারে যে স্বাভাবিক কাজ, পড়াশোনা, ঘুম বা দৈনন্দিন চলাফেরাও কঠিন হয়ে পড়ে। এই ব্যথাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ঋতুকষ্ট বলা হয়।

তবে পিরিয়ডের সময় সব ধরনের পেটব্যথাকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সাধারণ মাসিকজনিত ব্যথার পেছনে জরায়ুর স্বাভাবিক সংকোচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও কখনো কখনো এন্ডোমেট্রিওসিস, জরায়ুর গাঁট বা অন্য কোনো স্ত্রীরোগের কারণেও তীব্র ব্যথা হতে পারে। তাই ব্যথা কেন হচ্ছে, কোন লক্ষণ স্বাভাবিক এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার—এসব জানা গুরুত্বপূর্ণ।

পিরিয়ডের সময় পেটব্যথা কেন হয়?

প্রতি মাসে সম্ভাব্য গর্ভধারণের প্রস্তুতি হিসেবে জরায়ুর ভেতরের আবরণ পুরু হয়। গর্ভধারণ না হলে এই আবরণের একটি অংশ রক্ত ও অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে আসে। এটিই মাসিক বা ঋতুস্রাব।

এই আবরণ বের করে দেওয়ার জন্য জরায়ুর পেশি বারবার সংকুচিত ও শিথিল হয়। এই সংকোচনের সঙ্গে মাসিকের ব্যথার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের ভূমিকা

মাসিক শুরু হওয়ার সময় জরায়ুর আবরণে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন নামের কিছু রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয়। এগুলো জরায়ুর পেশিকে সংকুচিত হতে সাহায্য করে। প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের মাত্রা বেশি হলে সংকোচনও তুলনামূলক শক্তিশালী হতে পারে এবং ব্যথা বেশি অনুভূত হতে পারে।

জরায়ু শক্তভাবে সংকুচিত হওয়ার সময় এর পেশিতে সাময়িকভাবে রক্তপ্রবাহ ও অক্সিজেন সরবরাহ কমে যেতে পারে। এর ফলে ব্যথার অনুভূতি তৈরি হয়। অনেকটা শরীরের অন্য কোনো পেশিতে তীব্র খিঁচুনি হলে যেমন ব্যথা হয়, তার সঙ্গে এর কিছুটা মিল রয়েছে।

সাধারণত মাসিক শুরুর ঠিক আগে অথবা শুরু হওয়ার পর প্রথম এক থেকে দুই দিনে ব্যথা বেশি থাকে। পরে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের মাত্রা কমতে থাকলে ব্যথাও ধীরে ধীরে কমে আসে।

শুধু পেটেই কেন ব্যথা সীমাবদ্ধ থাকে না?

মাসিকের ব্যথা অনেক সময় তলপেট থেকে কোমর, পিঠ কিংবা উরুর ওপরের অংশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। জরায়ু ও আশপাশের অঞ্চলের স্নায়ুপথের কারণে একই ব্যথার সংকেত শরীরের কাছাকাছি অন্য অংশেও অনুভূত হতে পারে।

এ সময় কারও কারও বমি বমি ভাব, পাতলা পায়খানা, মাথাব্যথা, ক্লান্তি বা মাথা ঘোরার মতো সমস্যাও দেখা যায়। প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন শুধু জরায়ুতেই নয়, অন্ত্রসহ শরীরের অন্য অংশেও প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই পিরিয়ডের সঙ্গে পেটের গোলমালও দেখা দিতে পারে।

কোন ধরনের মাসিকের ব্যথা সাধারণ এবং কোনটি অন্য সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে?

মাসিকের ব্যথাকে মূলত দুই ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে দেখা হয়। প্রথম ক্ষেত্রে অন্য কোনো রোগ ছাড়াই মাসিকের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার কারণে ব্যথা হয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অন্য কোনো স্ত্রীরোগ ব্যথার পেছনে ভূমিকা রাখে।

সাধারণ মাসিকজনিত ব্যথা

এ ধরনের ব্যথা সাধারণত মাসিক শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে বা মাসিক শুরু হওয়ার সঙ্গে দেখা দেয়। প্রথম দিন বা প্রথম দুই দিনে বেশি থাকে এবং পরে ধীরে ধীরে কমে যায়।

কৈশোর ও তরুণ বয়সে এটি বেশি দেখা যায়। অনেকের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে ব্যথার তীব্রতা কমে আসতে পারে।

যখন অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে

আগে মাসিকে তেমন ব্যথা না হলেও হঠাৎ করে কয়েক মাস ধরে ব্যথা বাড়তে থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। বিশেষ করে তীব্র ব্যথার সঙ্গে অতিরিক্ত রক্তপাত, মাসিকের বাইরে রক্তপাত, যৌনমিলনের সময় গভীর ব্যথা বা দীর্ঘস্থায়ী শ্রোণি অঞ্চলের ব্যথা থাকলে অন্য কোনো কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন হতে পারে।

এন্ডোমেট্রিওসিস এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, যেখানে জরায়ুর ভেতরের আবরণের মতো কোষ জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পায়। এতে মাসিকের সময় তীব্র ব্যথা হতে পারে।

জরায়ুর পেশির ভেতরে অনুরূপ টিস্যু প্রবেশ করলে অ্যাডেনোমায়োসিস হতে পারে। এটিও তীব্র ব্যথা ও অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণ হতে পারে।

জরায়ুর গাঁট বা ফাইব্রয়েডের কারণেও কারও মাসিক ভারী হতে পারে এবং তলপেটে চাপ, অস্বস্তি বা ব্যথা দেখা দিতে পারে। শ্রোণি অঞ্চলের সংক্রমণসহ আরও কিছু অবস্থাতেও মাসিকের আশপাশে ব্যথা বেশি অনুভূত হতে পারে।

তাই “পিরিয়ডে ব্যথা হয়ই”—এই ধারণা দিয়ে অসহনীয় বা ক্রমশ বেড়ে যাওয়া ব্যথাকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।

পিরিয়ডের পেটব্যথা কমাতে কী করা যায়?

সাধারণ মাসিকজনিত ব্যথা নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি পদ্ধতি বেশ কার্যকর হতে পারে। সবার শরীর একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না, তাই কোন পদ্ধতিতে বেশি স্বস্তি পাওয়া যায় তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।

তলপেটে উষ্ণতা দিন

তলপেটে গরম পানির ব্যাগ, উষ্ণ পানির বোতল বা নিরাপদ তাপপট্টি ব্যবহার করলে পেশি শিথিল হতে সাহায্য করতে পারে এবং ব্যথা কমতে পারে। তবে ত্বক পুড়ে যাওয়ার মতো অতিরিক্ত গরম কিছু সরাসরি ত্বকের ওপর রাখা উচিত নয়।

হালকা নড়াচড়া ও ব্যায়াম করুন

ব্যথার সময় সারাদিন বিছানায় থাকতে ইচ্ছা করতে পারে, কিন্তু সহনীয় হলে হালকা হাঁটা, শরীর প্রসারিত করার ব্যায়াম বা কোমল যোগব্যায়াম অনেকের ক্ষেত্রে উপকারী হয়। শারীরিক নড়াচড়া রক্তসঞ্চালন ও শরীরের স্বাভাবিক ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করতে সাহায্য করতে পারে।

পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিন

ঘুমের অভাব ও অতিরিক্ত ক্লান্তি ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। মাসিকের সময় নিয়মিত ঘুম এবং প্রয়োজনীয় বিশ্রাম তাই গুরুত্বপূর্ণ।

পানি ও স্বাভাবিক খাবারের দিকে নজর রাখুন

পর্যাপ্ত পানি পান করা সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মাসিকের সময় পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি থাকলে অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার কমিয়ে দেখা যেতে পারে। একসঙ্গে খুব বেশি খাবারের পরিবর্তে পরিমিত ও সহজপাচ্য খাবার কারও কারও জন্য আরামদায়ক হতে পারে।

ব্যথার ওষুধ কখন কাজে আসে?

মাসিকের ব্যথায় কিছু প্রদাহনাশক ব্যথানাশক কার্যকর হতে পারে, কারণ এগুলো প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন তৈরির প্রক্রিয়া কমাতে সাহায্য করে। তবে সবার জন্য একই ওষুধ নিরাপদ নয়। পাকস্থলীর আলসার, কিডনির সমস্যা, কিছু ধরনের হাঁপানি, রক্তপাতের সমস্যা, নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন অথবা গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকলে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

তাই ওষুধের ধরন ও মাত্রা নিজের মতো করে বাড়ানোর পরিবর্তে চিকিৎসক বা যোগ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

বারবার তীব্র মাসিকের ব্যথা হলে চিকিৎসক কিছু ক্ষেত্রে হরমোনভিত্তিক চিকিৎসার কথাও বিবেচনা করতে পারেন। এটি ব্যক্তির স্বাস্থ্য, উপসর্গ ও প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়।

কখন পিরিয়ডের ব্যথাকে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত?

ব্যথার তীব্রতার পাশাপাশি ব্যথার ধরন কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আগে যে ব্যথা সহজে সহ্য করা যেত সেটি হঠাৎ অনেক বেশি হয়ে গেলে কারণ অনুসন্ধান করা দরকার।

বিশেষভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত যদি—

  • ব্যথার কারণে নিয়মিত স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরি বা দৈনন্দিন কাজ বন্ধ রাখতে হয়।
  • সাধারণ ব্যবস্থা গ্রহণের পরও ব্যথা নিয়ন্ত্রণে না আসে।
  • কয়েক মাস ধরে ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকে।
  • মাসিক অস্বাভাবিকভাবে বেশি বা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
  • মাসিকের মাঝখানেও রক্তপাত হয়।
  • যৌনমিলনের সময় গভীর ব্যথা হয়।
  • মাসিক ছাড়াও নিয়মিত তলপেট বা শ্রোণি অঞ্চলে ব্যথা থাকে।
  • জ্বর, অস্বাভাবিক স্রাব বা অসুস্থতার অন্য লক্ষণ দেখা দেয়।

অত্যন্ত তীব্র ও আকস্মিক তলপেটের ব্যথা, অস্বাভাবিক রক্তপাত, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা অজ্ঞান হওয়ার মতো অনুভূতি, কিংবা গর্ভধারণের সম্ভাবনার সঙ্গে তীব্র ব্যথা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। কারণ সব তলপেটের ব্যথাই মাসিকের কারণে হয় না।

নিজের মাসিক ও ব্যথার ধরন পর্যবেক্ষণ করা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

একটি সহজ মাসিকের দিনপঞ্জি রাখা বেশ কাজে আসতে পারে। কোন তারিখে মাসিক শুরু হলো, কত দিন চলল, কোন দিনে ব্যথা সবচেয়ে বেশি ছিল, রক্তপাত কেমন ছিল এবং ব্যথার সঙ্গে অন্য কী লক্ষণ ছিল—এসব লিখে রাখা যায়।

ব্যথার তীব্রতা শূন্য থেকে দশের মধ্যে একটি সংখ্যা দিয়েও নথিভুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি কী করলে ব্যথা কমেছে বা বেড়েছে সেটিও লিখে রাখা যায়। কয়েক মাসের তথ্য একসঙ্গে দেখলে নিজের মাসিকের স্বাভাবিক ধরন বোঝা সহজ হয় এবং কোনো পরিবর্তন ঘটলে তা দ্রুত ধরা পড়ে। চিকিৎসকের কাছে যেতে হলে এই তথ্য রোগের কারণ নির্ণয়েও সহায়ক হতে পারে।

পিরিয়ডের সময় হালকা থেকে মাঝারি পেটব্যথা অনেকের ক্ষেত্রেই মাসিকের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অংশ। এর মূল কারণগুলোর একটি হলো প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের প্রভাবে জরায়ুর পেশির সংকোচন। উষ্ণতা, হালকা শারীরিক নড়াচড়া, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই অস্বস্তি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

তবে ব্যথা সহ্য করাই মাসিকের স্বাভাবিক নিয়ম—এমন ধারণা ঠিক নয়। ব্যথা যদি জীবনযাত্রাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত করে, আগের তুলনায় বাড়তে থাকে অথবা অন্য অস্বাভাবিক লক্ষণের সঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে এর পেছনে কোনো চিকিৎসাযোগ্য কারণ রয়েছে কি না তা পরীক্ষা করানোই যথাযথ পদক্ষেপ।


আপনার পছন্দ হতে পারে