বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের অবসান: ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহার, হটলাইন ও নতুন পারমাণবিক কূটনীতি

সিরিজ: কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট

কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের অবসান: ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহার, হটলাইন ও নতুন পারমাণবিক কূটনীতি
পারমাণবিক সংকট থেকে সংলাপ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পথে

১৯৬২ সালের ২৮ অক্টোবর মস্কো বেতারে নিকিতা ক্রুশ্চেভের বার্তা প্রচারিত হওয়ার পর পৃথিবী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল। সোভিয়েত নেতা ঘোষণা করেন, কিউবায় মোতায়েন করা আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র খুলে ফেলা হবে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় আক্রমণ না করার আশ্বাস দেয় এবং সামুদ্রিক নিরোধ তুলে নেওয়ার পথে এগোয়। তবে এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সংকট পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সমঝোতার বাস্তবায়ন, অস্ত্র অপসারণের যাচাই এবং কিউবার আপত্তি মোকাবিলা করতে দুই পরাশক্তিকে আরও কয়েক সপ্তাহ সতর্ক কূটনীতি চালাতে হয়েছিল।

ক্রুশ্চেভের সিদ্ধান্তের পর কিউবার বিভিন্ন স্থানে থাকা সোভিয়েত আর-১২ মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম ভেঙে ফেলার কাজ দ্রুত শুরু হয়। উৎক্ষেপণযন্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহনকারী যান, জ্বালানি সরঞ্জাম ও অন্যান্য অংশ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সোভিয়েত জাহাজে সেগুলো তুলে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র আকাশ থেকে ইউ-২ ও নিচু দিয়ে ওড়া নজরদারি বিমানের মাধ্যমে ঘাঁটিগুলো পর্যবেক্ষণ করছিল। আলোকচিত্রে একের পর এক উৎক্ষেপণস্থল খালি হতে দেখা গেলে ওয়াশিংটন নিশ্চিত হতে শুরু করে যে মস্কো তার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করছে।

যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল জাতিসংঘের পরিদর্শকেরা কিউবায় গিয়ে অস্ত্র অপসারণ সরাসরি যাচাই করুক। কিন্তু ফিদেল কাস্ত্রো এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, স্বাধীন কিউবার ভূখণ্ডে বিদেশি পরিদর্শক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া জাতীয় সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। ক্রুশ্চেভ যে কাস্ত্রোর পূর্ণ সম্মতি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করেছিলেন, তাতে কিউবার নেতা আগেই ক্ষুব্ধ ছিলেন। ফলে স্থলভিত্তিক পরিদর্শনের পরিবর্তে আকাশ থেকে তোলা ছবি এবং প্রত্যাহারকারী সোভিয়েত জাহাজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যাচাই সম্পন্ন করতে হয়।

সোভিয়েত জাহাজগুলো কিউবার বন্দর ছাড়ার সময় ক্ষেপণাস্ত্রগুলো খোলা ডেকে রাখা হয়, যাতে মার্কিন বিমান ও যুদ্ধজাহাজ সেগুলো গণনা এবং ছবি তুলতে পারে। এই ব্যবস্থা মস্কোর জন্য কিছুটা অপমানজনক হলেও সমঝোতার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠায় তা জরুরি ছিল। ১৯৬২ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ কিউবায় মোতায়েন করা ৪২টি সোভিয়েত মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হয়। পারমাণবিক বিস্ফোরকগুলোও গোপনে সোভিয়েত ইউনিয়নে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

তবে আরেকটি বিরোধ দেখা দেয় সোভিয়েত ইলিউশিন-২৮ বোমারু বিমান নিয়ে। কেনেডি প্রশাসন এগুলোকে আক্রমণাত্মক অস্ত্রের অংশ হিসেবে বিবেচনা করলেও ক্রুশ্চেভের প্রাথমিক ঘোষণায় বিমানগুলোর কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। ওয়াশিংটন জানিয়ে দেয়, বোমারু বিমান প্রত্যাহার না করলে নৌ নিরোধ পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে না। আলোচনা ও চাপের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন বিমানগুলোও সরাতে সম্মত হয়। ২০ নভেম্বর কেনেডি কিউবার বিরুদ্ধে সামুদ্রিক নিরোধের অবসান ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে সংকটের সক্রিয় সামরিক পর্যায় শেষ হয়।

প্রকাশ্য সমঝোতার প্রধান শর্ত ছিল, যুক্তরাষ্ট্র কিউবা আক্রমণ করবে না। বে অব পিগস অভিযান ও অপারেশন মঙ্গুজের পর এই অঙ্গীকার ফিদেল কাস্ত্রোর সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে স্বীকৃতি বা অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার না করলেও সরাসরি সামরিক আক্রমণের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। বিদ্রূপাত্মকভাবে, কাস্ত্রোর সরকারকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে যে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন সংকট সৃষ্টি করেছিল, তার প্রত্যাহারের পরও কিউবা একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সুবিধা অর্জন করে।

সমঝোতার গোপন অংশে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ক থেকে পুরোনো জুপিটার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র সরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এগুলো প্রযুক্তিগতভাবে অচল হয়ে পড়ছিল এবং অধিক কার্যকর সাবমেরিনভিত্তিক পোলারিস ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যে বিকল্প প্রতিরক্ষা সরবরাহ করছিল। তবু যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে কিউবার অস্ত্রের বিনিময়ে জুপিটার প্রত্যাহারের কথা স্বীকার করেনি, কারণ এতে উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থার মিত্ররা মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দিহান হতে পারত। ১৯৬৩ সালের এপ্রিলের মধ্যে তুরস্কের জুপিটার ক্ষেপণাস্ত্র অপসারণ সম্পন্ন হয়।

এই গোপন সমঝোতা বহু বছর সাধারণ মানুষের অজানা ছিল। ফলে সংকটের পর প্রচলিত বিবরণে কেনেডিকে দৃঢ় অবস্থানে থেকে ক্রুশ্চেভকে সম্পূর্ণ পিছু হটতে বাধ্য করা নেতা হিসেবে দেখানো হয়। বাস্তবে সমাধানটি ছিল একতরফা সোভিয়েত পরাজয় নয়; উভয় পক্ষই ছাড় দিয়েছিল। মস্কো কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়েছিল, ওয়াশিংটন কিউবা আক্রমণ না করার অঙ্গীকার এবং তুরস্কের ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহারের গোপন নিশ্চয়তা দিয়েছিল। এই বাস্তবতা সংকট সমাধানে শক্তির পাশাপাশি আপসের গুরুত্ব প্রকাশ করে।

রাজনৈতিকভাবে কেনেডি সংকটের পর দেশে ও বিদেশে শক্তিশালী নেতার মর্যাদা লাভ করেন। তিনি সামরিক বাহিনীর তাৎক্ষণিক আক্রমণের পরামর্শ অনুসরণ না করে চাপ, সংযম ও আলোচনার সমন্বয় করেছিলেন। তাঁর নৌ নিরোধ সোভিয়েত সরবরাহ আটকে দিয়েছিল, কিন্তু সরাসরি যুদ্ধের জন্য কোনো অপরিবর্তনীয় পদক্ষেপ সৃষ্টি করেনি। বিপরীতে ক্রুশ্চেভকে প্রকাশ্যে পিছু হটতে হওয়ায় সোভিয়েত নেতৃত্বের একাংশ তাঁর ওপর অসন্তুষ্ট হয়। ১৯৬৪ সালে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পেছনে কিউবান সংকট একমাত্র কারণ না হলেও এটি তাঁর মর্যাদা দুর্বল করেছিল।

তবে ক্রুশ্চেভের সিদ্ধান্তকে কেবল পরাজয় হিসেবে দেখা ভুল। তিনি কিউবায় মার্কিন আক্রমণের ঝুঁকি কমিয়েছিলেন, তুরস্ক থেকে জুপিটার ক্ষেপণাস্ত্র সরানোর লক্ষ্য অর্জন করেছিলেন এবং পারমাণবিক যুদ্ধ এড়িয়েছিলেন। সংকট তাঁকে সোভিয়েত কৌশলগত সক্ষমতা আরও সম্প্রসারণের প্রয়োজনও বুঝিয়ে দেয়। পরবর্তী বছরগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক সাবমেরিন ও অন্যান্য অস্ত্রে ব্যাপক বিনিয়োগ করে। এর ফলে পরবর্তী দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে আরও শক্তিশালী পারমাণবিক ভারসাম্য গড়ে ওঠে।

ফিদেল কাস্ত্রো সমঝোতার ফলাফলে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি মনে করেছিলেন, কিউবার নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মস্কো হাভানাকে উপেক্ষা করেছে। কাস্ত্রো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার, কিউবাবিরোধী গোপন অভিযান বন্ধ, নির্বাসিতদের হামলা প্রতিরোধ, কিউবার আকাশ ও জলসীমা লঙ্ঘন বন্ধ এবং গুয়ানতানামো নৌঘাঁটি ফিরিয়ে দেওয়াসহ পাঁচটি দাবি উত্থাপন করেন। এগুলোর কোনোটিই মূল সমঝোতায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে সোভিয়েত-কিউবা সম্পর্ক বজায় থাকলেও দুই নেতৃত্বের মধ্যে সাময়িক অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়।

সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল যোগাযোগের বিপজ্জনক ধীরগতি। কেনেডি ও ক্রুশ্চেভের মধ্যে তাৎক্ষণিক সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল না। লিখিত বার্তা অনুবাদ, প্রেরণ ও বিশ্লেষণ করতে বহু ঘণ্টা লাগত। এমনকি সংকটের চরম মুহূর্তেও উভয় নেতা প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন। এই ঝুঁকি কমাতে ১৯৬৩ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি সরাসরি যোগাযোগ সংযোগ স্থাপনের চুক্তি করে, যা জনপ্রিয়ভাবে মস্কো-ওয়াশিংটন হটলাইন নামে পরিচিত হয়।

প্রচলিত চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মতো এটি প্রথমে লাল রঙের টেলিফোন ছিল না। নিরাপদ লিখিত বার্তা দ্রুত পাঠানোর জন্য টেলিটাইপ সংযোগ স্থাপন করা হয়েছিল, কারণ লিখিত ভাষা অনুবাদ ও যাচাই করা তুলনামূলক নিরাপদ। ওয়াশিংটন ও মস্কোকে তারযোগে যুক্ত করার পাশাপাশি বিকল্প বেতার যোগাযোগও রাখা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল সংকটের সময় নেতারা যেন মধ্যবর্তী কূটনৈতিক জটিলতা এড়িয়ে দ্রুত নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারেন এবং ভুল বোঝাবুঝি থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা কমে।

কিউবান সংকট পারমাণবিক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণের আলোচনাতেও নতুন গতি আনে। উভয় পক্ষ উপলব্ধি করেছিল, সীমাহীন অস্ত্র প্রতিযোগিতা তাদের নিরাপত্তা বাড়ানোর পরিবর্তে পারস্পরিক ধ্বংসের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে। ১৯৬৩ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য আংশিক পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে বায়ুমণ্ডল, মহাকাশ ও পানির নিচে পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়, যদিও ভূগর্ভস্থ পরীক্ষা চালু থাকে। এটি সব সমস্যার সমাধান না করলেও পরবর্তী অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।

সংকটের পর “পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংস” ধারণার বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পারমাণবিক যুদ্ধে প্রথম আঘাতকারী দেশও নিরাপদ থাকবে না; প্রতিপক্ষের পাল্টা আঘাতে উভয় পক্ষই ধ্বংস হবে। তাই সামরিক বিজয়ের প্রচলিত ধারণা পারমাণবিক সংঘাতে অর্থহীন। এই উপলব্ধি পরবর্তীকালে অস্ত্রসীমিতকরণ আলোচনা, পারমাণবিক বিস্তার রোধের প্রচেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত উত্তেজনা প্রশমনের নীতিতে প্রভাব ফেলে।

তবু সংকট পারমাণবিক প্রতিযোগিতা শেষ করেনি। বরং উভয় পরাশক্তি নিজেদের অস্ত্রভান্ডার, সাবমেরিন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং প্রতিশোধমূলক আঘাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি মৌলিক নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়—প্রতিপক্ষকে এমন অবস্থায় ঠেলে দেওয়া বিপজ্জনক, যেখান থেকে সম্মান বজায় রেখে ফিরে আসার কোনো পথ নেই। কূটনীতির লক্ষ্য শুধু নিজের দাবি আদায় নয়; প্রতিপক্ষকে বিপর্যয়কর সিদ্ধান্ত না নিয়ে আপস করার সুযোগ দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের অবসান তাই কেবল কিউবা থেকে কয়েকটি অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ছিল না। এটি পারমাণবিক যুগের রাষ্ট্রনীতি, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং পরাশক্তির যোগাযোগকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল। পৃথিবী বুঝেছিল, নেতাদের কাছে বিপুল সামরিক শক্তি থাকলেও অসম্পূর্ণ তথ্য, ধীর যোগাযোগ ও মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত কয়েক মুহূর্তে সভ্যতার ভবিষ্যৎ বিপন্ন করতে পারে। ১৯৬২ সালের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সংঘাতের মাঝেও সংলাপ, সংযম এবং যাচাইযোগ্য সমঝোতার প্রয়োজনীয়তাকে পারমাণবিক কূটনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করেছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে