অক্টোপাসের তিনটি হৃদয় কেন? সমুদ্রের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীর বিস্ময়কর শরীরের রহস্য

  • Author: Admin
  • August 13, 2026
অক্টোপাসের তিনটি হৃদয় কেন? সমুদ্রের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীর বিস্ময়কর শরীরের রহস্য
অক্টোপাসের তিনটি হৃদয় কেন?

সমুদ্রের তলদেশে পাথরের ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা একটি অক্টোপাসকে বাইরে থেকে দেখলে তার শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অদ্ভুত জৈবিক ব্যবস্থার সামান্য অংশও বোঝা যায় না। আটটি নমনীয় বাহু, হাড়বিহীন দেহ, মুহূর্তের মধ্যে রং ও ত্বকের গঠন বদলে ফেলার ক্ষমতা এবং অবিশ্বাস্য সমস্যা সমাধানের দক্ষতার আড়ালে রয়েছে এমন এক শারীরিক নকশা, যা মেরুদণ্ডী প্রাণীদের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে বিবর্তিত হয়েছে। অক্টোপাসের রয়েছে তিনটি হৃদয়, নীলাভ রক্ত এবং এমন এক বিস্তৃত স্নায়ুতন্ত্র যার বড় অংশ তার বাহুগুলোর মধ্যেই ছড়িয়ে আছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো আলাদা আলাদা বিস্ময় নয়; বরং গভীর সমুদ্রের পরিবেশে টিকে থাকার জন্য গড়ে ওঠা একটি পরস্পরনির্ভর ব্যবস্থা।

মানুষের মতো অক্টোপাসের যদি একটি মাত্র হৃদয় থাকত, তবে তার শ্বাসপ্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালনের বর্তমান ব্যবস্থা এত কার্যকরভাবে কাজ করত না। অক্টোপাসের তিনটি হৃদয়ের মধ্যে দুটি হৃদয় সরাসরি ফুলকার সঙ্গে সম্পর্কিত, আর তৃতীয়টি শরীরের অন্যান্য অংশে রক্ত পৌঁছে দেয়। ফুলকার কাছে থাকা দুটি হৃদয়কে বলা যায় ফুলকা-সহায়ক হৃদয়। প্রতিটি হৃদয় শরীর থেকে ফিরে আসা অক্সিজেনস্বল্প রক্তকে একটি করে ফুলকার দিকে ঠেলে দেয়। সেখানে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন রক্তে প্রবেশ করে। এরপর অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত কেন্দ্রীয় হৃদয়ে পৌঁছায় এবং সেই হৃদয় তা পুরো শরীরে পাঠায়।

অর্থাৎ অক্টোপাসের তিনটি হৃদয় একই কাজের তিনটি অনুলিপি নয়। তাদের মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট কাজের বিভাজন। দুটি হৃদয়ের প্রধান দায়িত্ব শ্বাসযন্ত্রের সঙ্গে রক্তপ্রবাহ বজায় রাখা, আর কেন্দ্রীয় হৃদয়টির কাজ হলো মস্তিষ্ক, পেশি, বাহু এবং অন্যান্য অঙ্গে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত সরবরাহ করা। এই বিন্যাস বোঝার জন্য অক্টোপাসের রক্তের বিশেষ প্রকৃতি বোঝাও জরুরি।

মানুষের রক্তে অক্সিজেন পরিবহনের প্রধান উপাদান হিমোগ্লোবিন। এর কেন্দ্রে থাকা লোহা অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং রক্তকে লাল রং দেয়। অক্টোপাসের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাটি ভিন্ন। তার রক্তে অক্সিজেন বহনের জন্য হিমোসায়ানিন নামের তামাভিত্তিক এক ধরনের শ্বাসরঞ্জক ব্যবহৃত হয়। অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হলে এই পদার্থের কারণে রক্ত নীলাভ দেখায়। তাই অক্টোপাসের ‘নীল রক্ত’ কোনো কল্পকাহিনি নয়; এর পেছনে রয়েছে সম্পূর্ণ বাস্তব জৈবরাসায়নিক কারণ।

সমুদ্রের ঠান্ডা এবং অনেক ক্ষেত্রে অক্সিজেনস্বল্প পরিবেশে হিমোসায়ানিন কার্যকর হতে পারে। কিন্তু এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অক্টোপাসের রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থাকে পর্যাপ্ত চাপ সৃষ্টি করে এই রক্ত শরীরের বিভিন্ন অংশে চালাতে হয়। তিনটি হৃদয়ের ব্যবস্থা তাই তার শ্বাসপ্রশ্বাস, রক্তের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং সামুদ্রিক জীবনযাপনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। একে শুধু ‘অক্টোপাসের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য’ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় না।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, অক্টোপাস দ্রুত সাঁতার কাটলে তার কেন্দ্রীয় হৃদয়ের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হয়। অক্টোপাস সাধারণত সমুদ্রতলের ওপর বাহুর সাহায্যে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বিপদের সময় অবশ্য সে দ্রুত পালাতে পারে। তখন শরীরের আবরণী গহ্বরের মধ্যে পানি টেনে নিয়ে একটি নলাকার অঙ্গ দিয়ে প্রবল বেগে পানি বের করে দেয়। বিপরীত দিকে সৃষ্ট ধাক্কায় অক্টোপাস দ্রুত এগিয়ে যায়। এই পদ্ধতিকে জেটচালিত চলাচলের সঙ্গে তুলনা করা যায়।

কিন্তু এই দ্রুত চলাচল শারীরিকভাবে ব্যয়বহুল। জেটচালিত সাঁতারের সময় কেন্দ্রীয় হৃদয়ের স্বাভাবিক রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় এভাবে চলা অক্টোপাসের জন্য সুবিধাজনক নয়। এই কারণেই অনেক অক্টোপাস সুযোগ থাকলে সাঁতারের বদলে সমুদ্রতল ধরে বাহুর সাহায্যে চলতে পছন্দ করে। তার তিনটি হৃদয় আছে বলে সে তিন গুণ বেশি শক্তিশালী—এমন ধারণা তাই সম্পূর্ণ ভুল। বরং তিন হৃদয়ের বিশেষ বিন্যাস তার অস্বাভাবিক শ্বাস ও রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া বিবর্তনীয় সমাধান।

অক্টোপাসের শরীরের আরেকটি বিস্ময় তার আটটি বাহু। সাধারণ চোখে এগুলো কেবল চলাচল ও শিকার ধরার অঙ্গ বলে মনে হলেও বাস্তবে প্রতিটি বাহু অত্যন্ত জটিল সংবেদন ও স্নায়ুপ্রক্রিয়ার কেন্দ্র। অক্টোপাসের বিপুলসংখ্যক স্নায়ুকোষের একটি বড় অংশ কেন্দ্রীয় মস্তিষ্কের বাইরে, বিশেষ করে বাহুগুলোতে অবস্থান করে। ফলে বাহুগুলো পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ ও বহু স্থানীয় কাজ পরিচালনায় অসাধারণ স্বাধীনতা দেখাতে পারে।

এই বিকেন্দ্রীভূত স্নায়ুতন্ত্রের সুবিধা বিশাল। একটি অক্টোপাস যখন পাথরের ফাটলের মধ্যে বাহু ঢুকিয়ে খাবার খুঁজছে, তখন কেন্দ্রীয় মস্তিষ্ককে প্রতিটি পেশির প্রতিটি ক্ষুদ্র নড়াচড়া আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না। বাহুর স্থানীয় স্নায়ুব্যবস্থা স্পর্শ ও রাসায়নিক সংকেত গ্রহণ করে জটিল গতিবিধি সমন্বয় করতে পারে। কেন্দ্রীয় মস্তিষ্ক বৃহত্তর লক্ষ্য নির্ধারণ করে, আর বাহুগুলো সেই লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় পর্যায়ে কাজ সম্পন্ন করে। এটি প্রকৃতির এক অসাধারণ বিকেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।

অক্টোপাসের বাহুর নিচের দিকে থাকা অসংখ্য চোষকও নিছক আঁকড়ে ধরার যন্ত্র নয়। এগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। কোনো বস্তু স্পর্শ করার সময় অক্টোপাস তার আকার, পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য এবং রাসায়নিক সংকেত সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে দেখা এবং স্বাদ গ্রহণ সম্পূর্ণ ভিন্ন ইন্দ্রিয়ের কাজ হলেও অক্টোপাসের বাহু পরিবেশকে স্পর্শ করার পাশাপাশি রাসায়নিকভাবেও পরীক্ষা করতে পারে। তাই তার কাছে একটি পাথর স্পর্শ করা মানে শুধু পাথরটির আকৃতি বোঝা নয়; বরং সেটির রাসায়নিক পরিচয় সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া।

এর কেন্দ্রীয় মস্তিষ্কও অত্যন্ত উন্নত। অক্টোপাস গোলকধাঁধার মতো সমস্যা সমাধান করতে পারে, নির্দিষ্ট বস্তু মনে রাখতে পারে, আশ্রয়ের অবস্থান শিখতে পারে এবং খাবারে পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করতে পারে। বন্দী অবস্থায় পর্যবেক্ষিত অক্টোপাসের মধ্যে পাত্র খুলে খাবার বের করা, জটিল বাধা অতিক্রম করা এবং পরিবেশের বিভিন্ন বস্তু অনুসন্ধান করার আচরণ দেখা গেছে। তবে মানুষের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করলে ভুল হবে। অক্টোপাসের বুদ্ধিমত্তা এমন একটি বিবর্তনীয় পথে গড়ে উঠেছে, যা মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মস্তিষ্কের বিকাশের পথ থেকে অত্যন্ত ভিন্ন।

এই পার্থক্যের কারণ তার বিবর্তনীয় ইতিহাসে লুকিয়ে আছে। মানুষ, পাখি ও অন্যান্য বুদ্ধিমান মেরুদণ্ডী প্রাণীর পূর্বপুরুষ এবং অক্টোপাসের পূর্বপুরুষ বহু শত কোটি নয়, বরং কয়েক শ কোটি বছরেরও কম হলেও অত্যন্ত প্রাচীন সময়ে আলাদা বিবর্তনীয় পথে চলে গেছে। ফলে জটিল আচরণ ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা অক্টোপাসের বংশে অনেকটাই স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়েছে। তাই বিজ্ঞানীদের কাছে অক্টোপাস বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—কারণ এটি দেখায় যে উন্নত বুদ্ধিমত্তা তৈরির জন্য প্রকৃতির কাছে মাত্র একটি শারীরিক নকশা নেই।

অক্টোপাসের শরীরে শক্ত হাড় নেই। এমনকি অধিকাংশ শরীরকে রক্ষা করার জন্য বাইরের শক্ত খোলসও নেই। তার নিকটাত্মীয় অনেক মোলাস্কের খোলস থাকলেও আধুনিক অক্টোপাসের দেহ অত্যন্ত নরম। প্রথম দৃষ্টিতে এটি দুর্বলতা মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এই নমনীয়তাই তার অন্যতম বড় অস্ত্র। শরীরের তুলনায় অবিশ্বাস্যভাবে সরু ফাঁক দিয়ে সে প্রবেশ করতে পারে, কারণ তার শরীরের অধিকাংশ অংশে কঠিন কঙ্কাল নেই। তবে তার ঠোঁটের মতো শক্ত মুখাংশটি যে ফাঁক দিয়ে যেতে পারবে না, পুরো শরীরও সাধারণত সেই ফাঁক দিয়ে যেতে পারে না।

শক্ত বর্মের অভাব পূরণ করতে অক্টোপাস বিকশিত করেছে পৃথিবীর অন্যতম উন্নত ছদ্মবেশ ব্যবস্থা। তার ত্বকে বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত কোষ ও প্রতিফলক গঠন রয়েছে। এর মধ্যে রঞ্জকপূর্ণ ক্রোমাটোফোর প্রসারিত বা সংকুচিত হয়ে ত্বকের দৃশ্যমান রং দ্রুত বদলাতে সাহায্য করে। অন্যান্য প্রতিফলক স্তর আলোকে ভিন্নভাবে প্রতিফলিত করে দেহে জটিল বর্ণ ও ঔজ্জ্বল্যের প্রভাব তৈরি করতে পারে।

কিন্তু শুধু রং বদলালেই তো পাথর হয়ে যাওয়া যায় না। মসৃণ শরীরের ওপর বাদামি রং ধরলেও পাশের অসমতল প্রবালের সঙ্গে তার পার্থক্য ধরা পড়বে। এখানেই আসে আরও বিস্ময়কর ক্ষমতা। অক্টোপাস তার ত্বকের বিশেষ পেশিনিয়ন্ত্রিত গঠন ব্যবহার করে শরীরের পৃষ্ঠকে কখনো মসৃণ, কখনো খসখসে বা কাঁটাযুক্ত দেখাতে পারে। অর্থাৎ সে শুধু পরিবেশের রং নকল করে না, পরিবেশের দৃশ্যমান গঠনও অনুকরণ করতে পারে। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে একই প্রাণীকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বস্তু বলে মনে হতে পারে।

এই পরিবর্তন আবার শুধু আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয় না। রং ও দেহভঙ্গির পরিবর্তন অন্য অক্টোপাসের সঙ্গে যোগাযোগ, হুমকি প্রদর্শন, শিকার এবং উত্তেজনার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। তার ত্বক যেন একই সঙ্গে পোশাক, পর্দা, সতর্কবার্তা এবং ছদ্মবেশের যন্ত্র হিসেবে কাজ করে।

অক্টোপাসের চোখও বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। এর চোখে ক্যামেরার মতো একটি গঠন রয়েছে—লেন্স, রেটিনা এবং আলো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা মিলিয়ে এটি অত্যন্ত কার্যকর দৃষ্টিশক্তি প্রদান করে। মজার বিষয় হলো, মেরুদণ্ডী প্রাণী ও অক্টোপাসের চোখের জটিলতা অনেক ক্ষেত্রে দেখতে কাছাকাছি হলেও এগুলো দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসে স্বাধীনভাবে গড়ে উঠেছে। এটি সমান্তরাল বা অভিসারী বিবর্তনের অসাধারণ উদাহরণ, যেখানে ভিন্ন বংশের প্রাণী একই ধরনের সমস্যার জন্য কাছাকাছি কার্যকর সমাধান তৈরি করেছে।

শিকার ধরার ক্ষেত্রেও অক্টোপাসের পুরো শরীর যেন সমন্বিত একটি যন্ত্র। দৃষ্টিশক্তি দিয়ে শিকার শনাক্ত করার পর বাহুগুলো দ্রুত তাকে ঘিরে ফেলতে পারে। চোষকগুলো শিকারকে শক্তভাবে ধরে রাখে। এরপর মুখের কেন্দ্রে থাকা শক্ত ঠোঁট শিকারের শক্ত অংশ ভাঙতে সাহায্য করে। অনেক প্রজাতি শিকারকে দুর্বল করতে লালার সঙ্গে কার্যকর রাসায়নিক পদার্থও ব্যবহার করে। কাঁকড়া, ঝিনুক ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী তার খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

বিপদ এলে ছদ্মবেশ ব্যর্থ হলেও তার হাতে আরও কৌশল রয়েছে। অনেক অক্টোপাস কালি ছুড়ে পানিতে একটি অন্ধকার মেঘ তৈরি করতে পারে। এতে শিকারি প্রাণীর দৃষ্টি বিভ্রান্ত হয় এবং অক্টোপাস পালানোর সময় পায়। একই সময়ে দ্রুত রং পরিবর্তন এবং জেটচালিত চলাচল ব্যবহার করলে শিকারির পক্ষে তাকে অনুসরণ করা আরও কঠিন হয়ে যায়। অর্থাৎ প্রতিরক্ষার জন্য অক্টোপাস একটি মাত্র পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে না; ছদ্মবেশ, আচরণ, কালি, নমনীয় শরীর এবং দ্রুত চলাচল—সব মিলিয়ে বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।

তার শরীরের পুনর্গঠনক্ষমতাও উল্লেখযোগ্য। কোনো বাহু গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা বিচ্ছিন্ন হলে অনেক ক্ষেত্রে অক্টোপাস ধীরে ধীরে সেটি পুনরায় তৈরি করতে পারে। নতুন বাহুর সঙ্গে শুধু পেশি নয়, চোষক ও স্নায়বিক সংযোগের মতো জটিল গঠনও পুনর্গঠিত হতে হয়। এমন জটিল অঙ্গ পুনর্গঠনের ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের কাছে কোষীয় পুনর্জন্ম এবং স্নায়ুতন্ত্রের পুনর্গঠন বোঝার জন্য বিশেষ আগ্রহের বিষয়।

এত উন্নত শারীরিক ও স্নায়বিক ক্ষমতার পরও অক্টোপাসের জীবনের একটি বিস্ময়কর বৈপরীত্য রয়েছে—অনেক প্রজাতির জীবনকাল তুলনামূলকভাবে ছোট। প্রজননের পর স্ত্রী অক্টোপাস সাধারণত ডিমের যত্নে বিপুল সময় ও শক্তি ব্যয় করে। সে ডিম পরিষ্কার রাখে, পানি প্রবাহ বজায় রাখে এবং শিকারিদের হাত থেকে রক্ষা করে। এই সময় অনেক স্ত্রী খুব কম খাবার গ্রহণ করে বা খাওয়া প্রায় বন্ধ করে দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর তার শারীরিক অবনতি দ্রুত হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত সে মারা যায়।

পুরুষ অক্টোপাসের জীবনও প্রজননের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। অনেক প্রজাতিতে প্রজননের পর পুরুষের শরীরেও ধীরে ধীরে অবক্ষয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, স্মৃতি ও অভিযোজনক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ অক্টোপাস মানুষের মতো দীর্ঘ জীবন ধরে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারে না। একটি অত্যন্ত উন্নত স্নায়ুতন্ত্র এমন একটি প্রাণীর শরীরে বিকশিত হয়েছে যার জীবন অনেক ক্ষেত্রেই মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ—এটি অক্টোপাস জীববিজ্ঞানের অন্যতম আকর্ষণীয় বৈপরীত্য।

তিনটি হৃদয়ের প্রশ্নে ফিরে এলে এখন পুরো ব্যবস্থাটি আরও পরিষ্কার হয়। অক্টোপাস এমন একটি প্রাণী যার শরীরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য অন্য বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তার নীলাভ রক্ত অক্সিজেন বহন করে বিশেষ তামাভিত্তিক অণুর সাহায্যে। ফুলকায় রক্ত পাঠাতে দুটি বিশেষ হৃদয় কাজ করে। অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সারা শরীরে ছড়িয়ে দিতে আরেকটি কেন্দ্রীয় হৃদয় রয়েছে। এই রক্তকে শক্তি জোগাতে হয় অসংখ্য পেশি, অত্যন্ত সক্রিয় বাহু, জটিল স্নায়ুতন্ত্র এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ত্বককে।

অক্টোপাসকে তাই শুধু ‘তিন হৃদয়ের প্রাণী’ বললে তার প্রকৃত বিস্ময়ের খুব সামান্য অংশই বলা হয়। তার শরীর মূলত একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের জৈবিক নকশার সফল উদাহরণ। আমাদের মতো হাড় নেই, রক্ত লাল নয়, একটি হৃদয় নয়, আটটি বাহুর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি কেন্দ্রীয় মস্তিষ্কের ওপর নির্ভরশীল নয়, আর আত্মরক্ষার জন্য শক্ত বর্মের পরিবর্তে সে নিজের চেহারাই মুহূর্তে বদলে ফেলতে পারে।

সমুদ্রের বিবর্তন অক্টোপাসকে এমনভাবে তৈরি করেছে যে তার দুর্বলতাই অনেক ক্ষেত্রে শক্তিতে পরিণত হয়েছে। শক্ত কঙ্কাল না থাকায় সে সংকীর্ণ ফাঁকে ঢুকতে পারে। বর্ম না থাকায় তৈরি হয়েছে অসাধারণ ছদ্মবেশ। জটিল বাহু নিয়ন্ত্রণের সমস্যার সমাধানে গড়ে উঠেছে বিস্তৃত স্নায়ুতন্ত্র। আর বিশেষ ধরনের রক্ত ও ফুলকাভিত্তিক শ্বাসপ্রশ্বাসকে কার্যকর রাখতে বিকশিত হয়েছে তিনটি হৃদয়ের সমন্বিত ব্যবস্থা।

অক্টোপাসের তিনটি হৃদয় তাই প্রকৃতির কোনো অপ্রয়োজনীয় অতিরঞ্জন নয়; এটি তার সমগ্র জীবনব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি বিবর্তনীয় সমাধান। নীল রক্ত, তিন হৃদয়, আট বুদ্ধিমান বাহু, পরিবর্তনশীল ত্বক, উন্নত চোখ, অসাধারণ স্মৃতি ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা—সব মিলিয়ে অক্টোপাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জটিল জীবন ও বুদ্ধিমত্তা তৈরির জন্য প্রকৃতি একটিমাত্র নকশা অনুসরণ করে না। পৃথিবীর একই জীবজগতের মধ্যেই বিবর্তন এমন এক প্রাণী তৈরি করেছে, যার শরীরকে যত গভীরভাবে জানা যায়, ততই মনে হয় সমুদ্রের অন্ধকারে এখনো আমাদের পরিচিত জীবনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জৈবিক জগত লুকিয়ে আছে।