বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মোনার্ক প্রজাপতি কীভাবে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ চিনে মেক্সিকোয় পৌঁছায়?

মোনার্ক প্রজাপতি কীভাবে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ চিনে মেক্সিকোয় পৌঁছায়?
ক্ষুদ্র ডানায় মহাদেশ পেরোনোর বিস্ময়

একটি প্রজাপতি হাতে ধরলে তার ডানা কত পাতলা, শরীর কত হালকা—তা সহজেই বোঝা যায়। অথচ উত্তর আমেরিকার মোনার্ক প্রজাপতিদের একটি অংশ প্রতি শরতে দক্ষিণ কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোর পাহাড়ি বনাঞ্চলের দিকে যাত্রা শুরু করে। জন্মের স্থানভেদে তাদের পাড়ি দিতে হয় হাজার হাজার কিলোমিটার। পথে বদলে যায় আবহাওয়া, সূর্যের অবস্থান, গাছপালা ও ভূদৃশ্য। তার পরও বহু প্রজাপতি শীত কাটানোর উপযুক্ত বনাঞ্চলে পৌঁছে যায়। এই যাত্রা দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে: আগে কখনো সেখানে না যাওয়া একটি প্রজাপতি পথ চিনে কীভাবে?

উত্তরটি বুঝতে প্রথমে মোনার্কদের অভিবাসনের মানচিত্রটি দেখতে হয়। উত্তর আমেরিকার পূর্বাঞ্চলের মোনার্করা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও পূর্ব অংশ পেরিয়ে মধ্য মেক্সিকোর পাহাড়ি অঞ্চলে শীত কাটায়। সেখানে বিশেষ ধরনের দেবদারুসম বৃক্ষের বন তাদের আশ্রয় দেয়। অন্যদিকে উত্তর আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলের অনেক মোনার্ক ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলীয় এলাকায় শীত কাটায়। সব মোনার্ক একই পথ ধরে মেক্সিকোয় যায়—এমন ধারণা তাই ভুল। তবে দীর্ঘ দূরত্ব, নির্দিষ্ট মৌসুম এবং বহু প্রজন্ম ধরে চলা যাত্রার কারণে পূর্বাঞ্চলের মেক্সিকোগামী অভিবাসনটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত।

শরতের যাত্রায় একটি বিষয় বিশেষভাবে বিস্ময়কর। মেক্সিকোর দিকে উড়ে যাওয়া অধিকাংশ প্রজাপতি জীবনে আগে সেখানে যায়নি। তাদের মা-বাবাও অনেক ক্ষেত্রে সেই শীতকালীন বনে যায়নি। বসন্ত ও গ্রীষ্মে উত্তর দিকে বিস্তারের সময় কয়েক প্রজন্মের মোনার্ক জন্মায়, প্রজনন করে এবং জীবন শেষ করে। শরতে জন্মানো প্রজন্মটি ভিন্ন আচরণ দেখায়: তারা দীর্ঘ পথ দক্ষিণে যায়, শীত কাটায় এবং পরবর্তী সময়ে উত্তরের পথে ফেরার যাত্রা শুরু করে। অর্থাৎ একটি প্রজাপতি তার বড়দের পেছনে উড়ে উড়ে পথ শেখে না। দিকনির্দেশের ক্ষমতা তার নিজের স্নায়ুতন্ত্র ও পরিবেশ থেকে সংকেত নেওয়ার ব্যবস্থার মধ্যেই কাজ করে।

মোনার্কের সবচেয়ে ভালোভাবে অধ্যয়ন করা দিকনির্দেশ পদ্ধতি হলো সূর্যকে ব্যবহার করা। আকাশে সূর্যের অবস্থান দেখে প্রজাপতি নিজের উড়ানের দিক ঠিক রাখতে পারে। কিন্তু এতে সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি সমস্যা তৈরি হয়। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সূর্য আকাশের এক জায়গায় থাকে না। কেবল সূর্যকে ডান পাশে বা বাঁ পাশে রাখার নিয়ম অনুসরণ করলে দিনের বিভিন্ন সময়ে প্রজাপতির দিক বদলে যাওয়ার কথা। দীর্ঘ অভিবাসনের জন্য তাই সূর্যের অবস্থানের পাশাপাশি সময় সম্পর্কেও শরীরের ভেতর থেকে তথ্য পাওয়া প্রয়োজন।

সেই কাজে সাহায্য করে মোনার্কের দেহঘড়ি। মানুষের মতো প্রজাপতির শরীরেও দিন ও রাতের ছন্দ অনুসরণকারী জৈবিক ব্যবস্থা আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মোনার্কের শুঁড়ে সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘড়ি কাজ করে। শুঁড় আলো থেকে সংকেত পায় এবং সেই তথ্য সূর্য দেখে দিক নির্ধারণের ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে। সহজভাবে বললে, প্রজাপতি শুধু আকাশে সূর্য কোথায় আছে তা দেখে না; দিনের কোন সময়ে সূর্যকে ওই জায়গায় দেখছে, সেটিও তার দিক ঠিক রাখার ক্ষেত্রে জরুরি। এই দুই ধরনের তথ্য মিলেই সূর্যভিত্তিক দিকনির্দেশ সম্ভব হয়।

বিষয়টি একটি পরিচিত অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝা যায়। আপনি যদি জানেন সূর্য পূর্বদিকে ওঠে, তবে সকালের সূর্য দেখে দিকের একটি ধারণা পাবেন। কিন্তু বিকেলে একই নিয়ম ব্যবহার করলে ভুল হবে, কারণ সূর্যের অবস্থান বদলে গেছে। মোনার্কের ক্ষেত্রেও সময় অনুযায়ী সূর্যের অবস্থান বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষায় প্রজাপতির দেহঘড়ির ছন্দ বদলে দেখেছেন, তাতে তাদের উড়ানের দিকও বদলাতে পারে। আবার শুঁড়ের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত করলে দিকনির্দেশে সমস্যা দেখা যায়। এসব ফল থেকে বোঝা যায়, ক্ষুদ্র শুঁড়টি কেবল গন্ধ বা স্পর্শ নেওয়ার অঙ্গ নয়; দীর্ঘ যাত্রার সময় হিসাব রাখার ব্যবস্থাতেও তার ভূমিকা আছে।

সূর্যের এই ব্যবস্থা কার্যকর হলেও আকাশ প্রতিদিন পরিষ্কার থাকে না। মেঘ, বৃষ্টি কিংবা কুয়াশায় সূর্য আড়াল হতে পারে। মোনার্ক পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের তথ্যও ব্যবহার করতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। কিছু পরীক্ষায় এমন ক্ষমতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, বিশেষ করে নির্দিষ্ট আলোর পরিবেশে। তবে প্রাকৃতিক অভিবাসনে এই সংকেত ঠিক কখন এবং কতটা কাজে লাগে, তা সূর্যভিত্তিক দিকনির্দেশের মতো পরিষ্কারভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই ‘মোনার্কের শরীরে নিখুঁত চুম্বক বসানো আছে’ বলা যেমন ভুল, তেমনি সূর্য আড়াল হলেই তারা সম্পূর্ণ দিকহারা হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্তও তাড়াহুড়ো হবে।

দিক জানা আর হাজার হাজার কিলোমিটার উড়তে পারা একই ব্যাপার নয়। এত দীর্ঘ যাত্রার জন্য শক্তি বাঁচানো জরুরি। মোনার্করা উপযুক্ত বাতাস ও ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহের সুবিধা নিতে পারে। অনুকূল পরিস্থিতিতে ডানা নেড়ে এগোনোর পাশাপাশি বাতাসে ভেসে কিছু দূর অতিক্রম করলে শক্তির খরচ কমে। তবে বাতাস সব সময় সহায়ক নয়। প্রবল প্রতিকূল হাওয়া তাদের গতি কমাতে পারে বা পথ থেকে সরিয়ে দিতে পারে। ঝড়, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিও বিপদ তৈরি করে। যাত্রাটি তাই আগে থেকে আঁকা নিখুঁত রেখা ধরে প্রতিদিন সমান দূরত্বে উড়ে যাওয়ার ঘটনা নয়।

পথে খাবার পাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্তবয়স্ক মোনার্ক বিভিন্ন ফুলের মধুরস পান করে শক্তি সংগ্রহ করে। শরতের পথে ফুল না থাকলে কিংবা ফুল ফোটার সময় বদলে গেলে দীর্ঘ যাত্রা কঠিন হয়ে যায়। অনেকে মনে করেন, মোনার্ক কেবল মিল্কউইড গাছেই খাবার খায়। আসলে মিল্কউইড মূলত তাদের বংশবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য: স্ত্রী মোনার্ক এই গাছে ডিম পাড়ে এবং শূককীট গাছটির পাতা খায়। প্রাপ্তবয়স্ক প্রজাপতির যাত্রাপথে মধুরসের উপযোগী নানা ফুলও দরকার। বংশবৃদ্ধির গাছ আর উড়ানের জ্বালানি—দুটোর কাজ আলাদা।

শরতে জন্মানো অভিবাসী প্রজন্মের জীবনযাপন গ্রীষ্মের অনেক মোনার্কের চেয়ে ভিন্ন। গ্রীষ্মে জন্মানো প্রজাপতিরা তুলনামূলক দ্রুত প্রজনন করে এবং সাধারণত অল্প সময় বাঁচে। অভিবাসী প্রজন্ম শরতে সঙ্গে সঙ্গে প্রজননে শক্তি ব্যয় না করে দক্ষিণে যাওয়া এবং শীত কাটানোর জন্য প্রস্তুত হয়। দীর্ঘ জীবন ও জমিয়ে রাখা শক্তি তাদের বহু দিনের পথ পাড়ি দিতে সাহায্য করে। এদের কখনো দীর্ঘজীবী প্রজন্মও বলা হয়। তবে দীর্ঘ জীবন পেলেই গন্তব্য নিশ্চিত হয় না; পথের আবহাওয়া ও আশ্রয়ের অবস্থার ওপর টিকে থাকা নির্ভর করে।

মধ্য মেক্সিকোয় পৌঁছে প্রজাপতিরা পাহাড়ি বনের গাছে ঘন হয়ে বসে থাকে। দূর থেকে দেখলে ডালে শুকনো পাতার স্তূপ মনে হতে পারে; কাছে গেলে বোঝা যায় অসংখ্য মোনার্ক সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। বন তাদের শীতের সময় এমন একটি পরিবেশ দেয়, যেখানে অতিরিক্ত ঠান্ডা, তীব্র রোদ বা পানিশূন্যতার ঝুঁকি কিছুটা সামলানো সম্ভব। এই আশ্রয়ের মান খুব গুরুত্বপূর্ণ। গাছ কমে গেলে বা বনের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক অবস্থা বদলালে প্রজাপতিদের শীত পার করার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শুধু মেক্সিকো পর্যন্ত পৌঁছানোই তাদের সাফল্যের শেষ ধাপ নয়; সেখানে কয়েক মাস বেঁচে থাকাও জরুরি।

বসন্ত ঘনালে শীত কাটানো মোনার্করা উত্তরের দিকে যাত্রা শুরু করে। পথে তারা ডিম পাড়ে। সেই ডিম থেকে জন্মানো শূককীট বড় হয়ে নতুন প্রজাপতি হয়, যারা উত্তরমুখী বিস্তার এগিয়ে নিয়ে যায়। পরবর্তী গ্রীষ্মে আরও প্রজন্ম জন্মায়। ফলে মেক্সিকো থেকে অনেক দূরের উত্তরাঞ্চলে যে প্রজাপতি দেখা যায়, সেটি সাধারণত আগের শরতে দক্ষিণে যাওয়া একই প্রজাপতি নয়। এই পার্থক্যটি মোনার্কের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি: দক্ষিণে দীর্ঘ যাত্রা করা একটি প্রজন্মের পর উত্তরমুখী বিস্তার সম্পন্ন হয় একাধিক নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে।

তাহলে শরতের নতুন প্রজন্ম মেক্সিকোর শীতকালীন বন সম্পর্কে জানে কীভাবে? প্রশ্নটির সম্পূর্ণ উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনো জানেন না। সূর্য, দেহঘড়ি ও অন্যান্য পরিবেশগত সংকেত ব্যবহার করে উপযুক্ত দিকে যাত্রা করার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কিন্তু কোনো একটি প্রজাপতি কেন নির্দিষ্ট বনাঞ্চলের কাছে পৌঁছে থামে, সেই সিদ্ধান্তের সব ধাপ এখনো পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়নি। তাই ‘পূর্বপুরুষেরা ঠিকানা শিখিয়ে দেয়’ বা ‘প্রতিটি প্রজাপতির মাথায় সম্পূর্ণ মানচিত্র আঁকা আছে’—এ ধরনের কথা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নয়। নিশ্চিতভাবে জানা অংশ এবং এখনো অনুসন্ধানাধীন অংশ আলাদা রাখলেই মোনার্কের ক্ষমতাকে ঠিকভাবে বোঝা যায়।

এই যাত্রাপথে একটি এলাকাকে রক্ষা করলেই পুরো অভিবাসন নিরাপদ হয় না। উত্তর দিকে ডিম পাড়ার জন্য মিল্কউইড, দক্ষিণমুখী পথে শক্তি জোগানোর জন্য ফুল, বিশ্রামের উপযুক্ত পরিবেশ এবং শীতকালীন বন—সবকিছুই দরকার। কৃষিজমি ও বসতির বিস্তার, উপযুক্ত গাছপালা হারিয়ে যাওয়া, আবহাওয়ার চরম পরিবর্তন এবং শীতের আশ্রয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মোনার্কদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। হাজার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ পথের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ দুর্বল হলে তার প্রভাব পরে অনেক দূরে গিয়ে দেখা যায়।

মোনার্ক প্রজাপতি পথ চিনে উড়ে যায় বলে তার যাত্রাকে অলৌকিক ভাবার প্রয়োজন নেই। আরও বিস্ময়কর হলো, ছোট্ট শরীরে সূর্যের অবস্থান, দিনের সময়, পরিবেশের অবস্থা ও শক্তির ব্যবহার মিলিয়ে এমন একটি অভিবাসন সম্ভব হয়। একটি প্রজন্ম দক্ষিণে শীতের আশ্রয়ে পৌঁছায়; পরের প্রজন্মগুলো আবার উত্তর দিকে বিস্তার ঘটায়। তাদের প্রত্যেকে একই পথের সবটুকু নিজের চোখে দেখে না, তবু প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই যাত্রা চলতে থাকে। মোনার্কের ডানায় তাই শুধু দূরত্ব জয়ের গল্প নেই; আছে সময় বুঝে পথ চলার এবং পুরো মহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রকৃতির ওপর নির্ভর করার গল্প।


আপনার পছন্দ হতে পারে