বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

পিঁপড়ারা কীভাবে বিশাল উপনিবেশ পরিচালনা করে? ক্ষুদ্র প্রাণীদের অবিশ্বাস্য সামাজিক ব্যবস্থা

পিঁপড়ারা কীভাবে বিশাল উপনিবেশ পরিচালনা করে? ক্ষুদ্র প্রাণীদের অবিশ্বাস্য সামাজিক ব্যবস্থা
ক্ষুদ্র দেহে বিশাল সমাজ

পিঁপড়ার একটি সারি যখন মাটির ওপর দিয়ে এগিয়ে যায়, তখন দূর থেকে মনে হয় যেন তারা এক অদৃশ্য নির্দেশ মেনে চলছে। কেউ খাবার বহন করছে, কেউ সামনে এগিয়ে পথ খুঁজছে, আবার কেউ বাসার দিকে ফিরছে। তাদের মধ্যে কোনো দৃশ্যমান নেতা নেই, নেই সভাকক্ষ বা লিখিত নিয়ম। তবু একটি পিঁপড়ার বাসায় হাজার হাজার, কখনো লাখ লাখ সদস্য খাবার সংগ্রহ, সন্তান লালন, বাসা নির্মাণ এবং বিপদ মোকাবিলার কাজ করে। এই বিশাল সমাজের শক্তি কোনো একক পিঁপড়ার বুদ্ধিতে নয়; বরং অসংখ্য ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তের সমন্বয়ে।

পিঁপড়ারা সামাজিক পতঙ্গ। তাদের সমাজকে বলা হয় উপনিবেশ বা কলোনি। উপনিবেশে সাধারণত প্রজননক্ষম রানি, পুরুষ পিঁপড়া এবং নানা কাজ করা শ্রমিক পিঁপড়া থাকে। তবে সব প্রজাতির উপনিবেশ একই রকম নয়। কোথাও একটিমাত্র রানি থাকে, কোথাও একাধিক রানি একই বাসায় ডিম পাড়ে। আবার কোনো কোনো প্রজাতির বড় উপনিবেশে সদস্যসংখ্যা এত বেশি যে একে একটি বাসার বদলে বিস্তৃত সামাজিক জাল বলা যায়। এই বৈচিত্র্য মনে করিয়ে দেয়, পিঁপড়াদের সমাজের কোনো একটিমাত্র ছক নেই।

রানিকে প্রায়ই উপনিবেশের শাসক হিসেবে কল্পনা করা হয়। বাস্তবে তিনি শ্রমিকদের নির্দেশ দেন না। তাঁর প্রধান কাজ ডিম পাড়া। প্রজাতি ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে একটি রানি প্রতিদিন অল্প কয়েকটি থেকে বহু ডিম দিতে পারেন। উপনিবেশের সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর জন্য তাঁর প্রজননক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু খাবার কোথায় খুঁজতে হবে বা বাসার কোন অংশ মেরামত করতে হবে—এসব বিষয়ে রানি কোনো আদেশ পাঠান না। শ্রমিকেরা নিজেদের পরিস্থিতি বুঝে কাজ করে।

পুরুষ পিঁপড়াদের ভূমিকা সাধারণত আরও সীমিত। তাদের প্রধান কাজ হলো প্রজননকালীন উড়ানে রানি পিঁপড়ার সঙ্গে মিলিত হওয়া। মিলনের পর অনেক প্রজাতিতে পুরুষেরা অল্প সময়ের মধ্যে মারা যায়। নতুন রানি পিঁপড়া তার দেহে সংরক্ষিত শুক্রাণু ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে নিষিক্ত ডিম পাড়তে পারেন। তিনি নতুন বাসা শুরু করলে প্রথম দিকে নিজেই ডিম ও সদ্য জন্মানো শূককীটের যত্ন নেন। প্রথম শ্রমিকেরা পূর্ণবয়স্ক হলে তারাই খাবার সংগ্রহ ও বাসার অন্যান্য কাজের দায়িত্ব নেয়।

একটি উপনিবেশের দৈনন্দিন কাজের বড় অংশ সামলায় শ্রমিক পিঁপড়ারা। তারা সাধারণত স্ত্রী, কিন্তু অধিকাংশ প্রজাতিতে প্রজননক্ষম নয়। শ্রমিকদের কাজের মধ্যে রয়েছে ডিম ও শূককীটের পরিচর্যা, বাসা পরিষ্কার করা, খাদ্য সংগ্রহ, সুড়ঙ্গ খোঁড়া, শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা এবং রানি ও উপনিবেশের সদস্যদের খাওয়ানো। অনেক প্রজাতিতে শ্রমিকদের আকার ও গড়ন এক রকম নয়। বড় মাথা বা শক্ত চোয়ালওয়ালা শ্রমিকেরা বীজ ভাঙতে কিংবা বাসা রক্ষা করতে পারে। ছোট শ্রমিকেরা সূক্ষ্ম পরিচর্যার কাজ করে। কাজের এই বণ্টনকে শ্রমবিভাজন বলা যায়।

তবে পিঁপড়াদের কাজ সব সময় জন্মগত পদ অনুযায়ী নির্ধারিত থাকে না। কোনো কোনো প্রজাতিতে বয়সের সঙ্গে কাজ বদলায়। তুলনামূলক কমবয়সী শ্রমিকেরা বাসার ভেতরে ডিম ও শূককীটের যত্ন নেয়। বয়স বাড়লে তারা বাসার বাইরে খাবার সংগ্রহ বা পাহারার কাজে যেতে পারে। এর একটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো, অভিজ্ঞ ও বয়সে বড় পিঁপড়ারা বাইরে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে গেলে তাদের মৃত্যুতে উপনিবেশের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ পরিচর্যার কাজ কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবশ্য এই বয়সভিত্তিক কাজের ধারা সব প্রজাতিতে একই নয়; পরিবেশের প্রয়োজন হলে শ্রমিকেরা কাজ বদলাতেও পারে।

পিঁপড়ার যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম রাসায়নিক সংকেত। তাদের শরীরের বিশেষ গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত গন্ধযুক্ত পদার্থকে ফেরোমোন বলা হয়। খাবার পেলে কোনো শ্রমিক বাসার দিকে ফেরার পথে মাটিতে ফেরোমোনের রেখা রেখে যেতে পারে। অন্য শ্রমিকেরা শুঁড় দিয়ে সেই গন্ধ বুঝে পথ অনুসরণ করে। পথে খাবার যত বেশি বা সহজে পাওয়া যায়, ফেরোমোনের সংকেত তত জোরালো হতে পারে। ফলে একই পথে আরও পিঁপড়া আসে এবং তারা ফেরার সময় পথটিকে আরও সুস্পষ্ট করে। খাদ্যের উৎস শেষ হয়ে গেলে সংকেত দুর্বল হতে থাকে, তখন দলটি অন্য পথ খুঁজতে শুরু করতে পারে।

এই প্রক্রিয়ায় কোনো পিঁপড়াকে পুরো এলাকার মানচিত্র জানতে হয় না। তার কাছে থাকে স্থানীয় তথ্য—কোন দিকে গন্ধ আছে, সামনে বাধা আছে কি না, খাবার পাওয়া যাচ্ছে কি না। অনেক পিঁপড়ার এমন ছোট ছোট প্রতিক্রিয়া একসঙ্গে মিলেই কার্যকর পথ তৈরি করে। গবেষকেরা এই ধরনের সমন্বয়কে দলগত বা উদ্ভূত আচরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন: একটি কেন্দ্রীয় পরিচালক ছাড়াই বহু সদস্যের সহজ নিয়ম থেকে জটিল সামষ্টিক ফল তৈরি হয়। পথের সাফল্য তাই কোনো এক পিঁপড়ার পরিকল্পনার ফল নয়; পরিবেশ থেকে পাওয়া সংকেতে সাড়া দেওয়া অনেক শ্রমিকের সম্মিলিত প্রভাব।

পিঁপড়ারা কেবল গন্ধ দিয়েই যোগাযোগ করে না। তারা শুঁড় দিয়ে একে অপরকে স্পর্শ করে, দেহের ভঙ্গি বদলায় এবং কিছু প্রজাতিতে শরীরের কম্পনও কাজে লাগায়। খাবার ভাগ করে নেওয়ার সময় এক পিঁপড়া অন্যটির মুখে তরল খাবার পৌঁছে দিতে পারে। এই আদান-প্রদান শুধু পুষ্টি ভাগ করে না; খাদ্যের অবস্থা ও উপনিবেশের প্রয়োজন সম্পর্কেও তথ্য ছড়াতে সাহায্য করে। রানি, শূককীট ও শ্রমিকদের মধ্যে এমন খাদ্য বিনিময় উপনিবেশের সদস্যদের একে অপরের সঙ্গে যুক্ত রাখে।

উপনিবেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে পরবর্তী প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখার ওপর। রানি ডিম পাড়ার পর শ্রমিকেরা ডিমগুলোকে সুরক্ষিত কক্ষে রাখে। ডিম ফুটে শূককীট বের হলে তাদের নিয়মিত খাবার দিতে হয়; শূককীট নিজেরা খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে না। শ্রমিকেরা তাদের স্থানান্তর করে, পরিষ্কার রাখে এবং তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার উপযোগী জায়গায় রাখে। পরে শূককীট পুত্তলি অবস্থায় যায়, তারপর পূর্ণবয়স্ক পিঁপড়া বের হয়। পিঁপড়ার এই জীবনচক্রের প্রতিটি ধাপ সামলাতে উপনিবেশের শ্রমিকদের ধারাবাহিক পরিচর্যা লাগে।

বাসা নির্মাণও তাদের সামাজিক ব্যবস্থার একটি বিস্ময়কর দিক। মাটির নিচের বাসায় প্রায়ই অনেক কক্ষ ও সংযোগকারী সুড়ঙ্গ থাকে। প্রতিটি কক্ষের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও ব্যবহার আলাদা হতে পারে। ডিম ও শূককীট রাখার কক্ষ, খাবার সংরক্ষণের জায়গা এবং চলাচলের পথ একত্রে একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করে। শ্রমিকেরা মাটি সরিয়ে, ছোট কণা বহন করে এবং বাসার ভেতরের পরিবেশ বদলে এই কাঠামো গড়ে তোলে। তাদের কাজের ফল কোনো স্থপতির একক নকশা নয়; বরং বারবার করা ক্ষুদ্র পরিবর্তনের সমষ্টি।

কিছু প্রজাতির বাসা মাটির ঢিবি বা গাছের ভেতরে তৈরি হয়। পাতাকাটা পিঁপড়ারা পাতা কেটে বাসায় নিয়ে যায়, তবে সেই পাতা সাধারণত সরাসরি খায় না। তারা পাতার টুকরো দিয়ে ছত্রাক চাষের বাগান তৈরি করে এবং সেই ছত্রাক থেকে খাদ্য পায়। শ্রমিকেরা ছত্রাকের বাগান পরিষ্কার রাখে, অনুপযুক্ত অংশ সরায় এবং নতুন পাতা যোগ করে। তাদের উপনিবেশে খাদ্য উৎপাদন ও পরিচর্যার কাজ এতটাই জটিল যে একে কৃষিকাজের সঙ্গে তুলনা করা হয়। আবার কিছু প্রজাতি অন্য পোকামাকড় থেকে মিষ্টি তরল সংগ্রহ করে, আর বিনিময়ে সেগুলোকে শিকারির হাত থেকে রক্ষা করে।

খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি উপনিবেশকে শত্রুর হাত থেকেও বাঁচতে হয়। পাখি, টিকটিকি, মাকড়সা এবং অন্যান্য পোকামাকড় পিঁপড়া শিকার করে। অনেক প্রজাতিতে পাহারাদার শ্রমিকেরা বাসার প্রবেশপথে অবস্থান নেয়। বিপদ দেখা দিলে রাসায়নিক সতর্কসংকেত ছড়িয়ে পড়ে এবং কাছের পিঁপড়ারা প্রতিরক্ষায় যোগ দিতে পারে। কোনো কোনো প্রজাতির শক্ত চোয়াল শত্রুকে কামড়াতে কাজে লাগে; অন্যরা দলবদ্ধভাবে আক্রমণকারীকে ঘিরে ফেলে। তবে পিঁপড়াদের প্রতিরক্ষা সব সময় লড়াইয়ের ওপর নির্ভর করে না। বাসার গোপন প্রবেশপথ, গভীর সুড়ঙ্গ বা দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও তাদের রক্ষা করতে পারে।

পরিবেশ বদলালে উপনিবেশের আচরণও বদলাতে হয়। দীর্ঘ বৃষ্টি হলে বাসার নিচু অংশ প্লাবিত হতে পারে; অতিরিক্ত গরমে ডিম ও শূককীট ঝুঁকিতে পড়ে। তখন শ্রমিকেরা সন্তানদের নিরাপদ কক্ষে সরিয়ে নিতে পারে, বাসার প্রবেশপথ বন্ধ করতে পারে অথবা নতুন জায়গায় খাবার খুঁজতে পারে। খাদ্যের অভাব দেখা দিলে কম লাভজনক পথে কম পিঁপড়া যায়, আর সহজে খাবার পাওয়া গেলে সফল পথটি বেশি ব্যবহৃত হয়। এভাবে পরিবেশের পরিবর্তন উপনিবেশের সমষ্টিগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

সব পিঁপড়ার উপনিবেশ একটি ছোট বাসাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কিছু প্রজাতি অনেকগুলো বাসাকে রাসায়নিক ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যুক্ত করে বিশাল বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের বিস্তৃত ব্যবস্থাকে কখনো সুপারকলোনি বলা হয়। এমন উপনিবেশে বিভিন্ন বাসার পিঁপড়ারা একই সামাজিক গোষ্ঠীর অংশ হিসেবে চলাফেরা করতে পারে। তবে এই ব্যবস্থা সব পিঁপড়ার বৈশিষ্ট্য নয়; বিশেষ কিছু প্রজাতি ও পরিবেশে এটি দেখা যায়। একটি অঞ্চলে তাদের বিস্তার খাদ্য ও বাসার প্রতিযোগিতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

পিঁপড়াদের সামাজিক সাফল্য তাদের একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করার ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটি শ্রমিক হয়তো কেবল খাবারের গন্ধ অনুসরণ করছে, অন্যটি শূককীটকে সরিয়ে নিরাপদ কক্ষে রাখছে, আরেকটি বাসার ফাটল বন্ধ করছে। প্রত্যেকের কাজ সীমিত হলেও তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উপনিবেশ খাবার পায়, নতুন সদস্য বড় করে এবং বিপদের মুখে টিকে থাকে। তাই পিঁপড়ার সমাজকে বোঝার জন্য শুধু রানির দিকে তাকালে চলে না; দেখতে হয় শ্রমিকের চলার পথ, ফেরোমোনের রেখা, বাসার কক্ষ আর সদস্যদের পারস্পরিক নির্ভরতা।

পিঁপড়ারা মানুষের মতো পরিকল্পনা করে না, সভা করে সিদ্ধান্ত নেয় না, কিংবা একজন নেতার নির্দেশে কাজ করে না। তবু তাদের উপনিবেশে এমন সমন্বয় দেখা যায়, যা দূর থেকে সুপরিকল্পিত মনে হয়। এর পেছনে আছে বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস, সহজ সংকেতের ব্যবহার এবং কাজ ভাগ করে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা। ক্ষুদ্র দেহের এই প্রাণীরা দেখায়, জটিল সমাজ গড়তে সব সময় একজন সর্বজ্ঞ পরিচালকের প্রয়োজন হয় না। অনেক সদস্য যদি পরিবেশের সংকেত বুঝে স্থানীয়ভাবে সাড়া দেয়, তবে তাদের একত্রিত কাজেই গড়ে উঠতে পারে বিস্ময়কর এক জীবন্ত সংগঠন।


আপনার পছন্দ হতে পারে