বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ফ্লেমিঙ্গো গোলাপি হয় কেন? ধূসর ছানার রং বদলে যাওয়ার বিজ্ঞান

ফ্লেমিঙ্গো গোলাপি হয় কেন? ধূসর ছানার রং বদলে যাওয়ার বিজ্ঞান
খাবারেই লুকিয়ে গোলাপি রঙের রহস্য

জলাভূমির অগভীর পানিতে সারি বেঁধে দাঁড়ানো গোলাপি ফ্লেমিঙ্গো দেখলে মনে হয়, এই রং বুঝি তাদের জন্মগত পরিচয়। অথচ বাসায় সদ্য ফোটা একটি ফ্লেমিঙ্গো ছানার দিকে তাকালে দেখা যাবে ভিন্ন দৃশ্য। তার শরীর ঢাকা থাকে সাদা বা ধূসর নরম পালকে; পূর্ণবয়স্ক পাখির উজ্জ্বল গোলাপি রঙের ছাপ তখনো সেখানে নেই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছানাটি খাবার খেতে শেখে, পুরোনো পালকের জায়গায় নতুন পালক গজায় এবং ধীরে ধীরে তার দেহে গোলাপি আভা দেখা দেয়। এই পরিবর্তনের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে ফ্লেমিঙ্গোর খাদ্যে থাকা বিশেষ রঞ্জকে।

ফ্লেমিঙ্গোর গোলাপি রঙের জন্য প্রধানত দায়ী ক্যারোটিনয়েড নামের একদল প্রাকৃতিক রঞ্জক। উদ্ভিদ, শৈবাল এবং কিছু অণুজীব এসব রঞ্জক তৈরি করে। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে রঞ্জক ক্ষুদ্র জলজ প্রাণীর শরীরেও পৌঁছে যায়। ফ্লেমিঙ্গো যখন রঞ্জকসমৃদ্ধ শৈবাল বা ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী খায়, তখন তার পরিপাকতন্ত্র খাদ্য থেকে এসব উপাদান শোষণ করে। পরে শরীরের নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রঞ্জক ত্বক ও নতুন গজানো পালকে জমা হতে পারে। তাই ফ্লেমিঙ্গোর রং শুধু তার বংশগত বৈশিষ্ট্যের ফল নয়; সে কী খাচ্ছে, সেটিও রঙের তীব্রতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

এই বিষয়টি বুঝতে ফ্লেমিঙ্গো কীভাবে খাবার সংগ্রহ করে, তা দেখা দরকার। দীর্ঘ পা নিয়ে পাখিটি অগভীর পানিতে হেঁটে বেড়ায় এবং বাঁকানো ঠোঁট পানিতে ডুবিয়ে মাথা অনেক সময় উল্টো করে ধরে। ঠোঁট ও জিহ্বার বিশেষ গঠন দিয়ে সে পানি ও কাদা ছেঁকে খাবারের কণা আলাদা করে। কোন প্রজাতি কোথায় বাস করে, তার ওপর নির্ভর করে খাদ্যের ধরন বদলে যায়। কেউ বেশি শৈবাল ও অণুজীব খায়, কেউ ক্ষুদ্র চিংড়িসদৃশ প্রাণী, পোকামাকড়ের লার্ভা বা অন্যান্য ছোট জলজ প্রাণী সংগ্রহ করে। সব ফ্লেমিঙ্গো একই খাবার খায় না, ফলে তাদের রঙেও স্বাভাবিক পার্থক্য দেখা যায়।

ক্ষুদ্র জলজ চিংড়িসদৃশ প্রাণী ফ্লেমিঙ্গোর গোলাপি রঙের আলোচনায় প্রায়ই আসে। এরা নিজেরাও খাদ্যের মাধ্যমে ক্যারোটিনয়েড পায়। ফ্লেমিঙ্গো যখন এদের খায়, রঞ্জক তার শরীরে প্রবেশ করে। তবে শুধু চিংড়ি খেলেই সব ফ্লেমিঙ্গো গোলাপি হয়—এ কথা ঠিক নয়। কিছু প্রজাতির খাদ্যে শৈবাল ও অন্যান্য অণুজীবের গুরুত্ব বেশি। মূল বিষয় হলো খাদ্য থেকে পর্যাপ্ত উপযুক্ত রঞ্জক পাওয়া এবং পাখিটির শরীর সেই রঞ্জক শোষণ ও ব্যবহার করতে পারা। খাদ্যের উৎস আলাদা হলেও এই জৈবিক সম্পর্কটি একই থাকে।

খাদ্য থেকে পাওয়া ক্যারোটিনয়েড সরাসরি প্রতিটি পালকে একইভাবে লেগে যায় না। রঞ্জক প্রথমে পরিপাকতন্ত্রে শোষিত হয়, তারপর রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছায়। শরীর কিছু রঞ্জককে অন্য রূপে বদলাতেও পারে। পালক তৈরির সময় রঞ্জক নতুন পালকের গঠনে অন্তর্ভুক্ত হলে সেখানে গোলাপি, কমলা বা লালচে আভা ফুটে ওঠে। এই কারণে একটি ধূসর ছানাকে গোলাপি হতে সময় দিতে হয়। আজ রঞ্জকসমৃদ্ধ খাবার খেলেই আগামীকাল তার পুরোনো ধূসর পালক উজ্জ্বল গোলাপি হয়ে যাবে না; নতুন পালক গজানো ও শরীরের পরিপক্বতা এই পরিবর্তনের অংশ।

পালক জীবন্ত ত্বকের মতো প্রতিদিন ভেতর থেকে নতুন রঞ্জক পেয়ে রং বদলায় না। একটি পালক গজিয়ে পূর্ণ হওয়ার পর তার গঠন অনেকটাই স্থির থাকে। ফ্লেমিঙ্গো পুরোনো পালক ঝরিয়ে নতুন পালক তৈরি করার সময় খাদ্য থেকে পাওয়া রঞ্জক নতুন পালকে জমা হতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্যে পর্যাপ্ত ক্যারোটিনয়েড না থাকলে পরবর্তী পালক আগের তুলনায় ফ্যাকাশে দেখা যেতে পারে। সূর্যালোক ও পালকের ক্ষয়ের কারণেও পুরোনো পালকের রং সময়ের সঙ্গে কিছুটা ম্লান হতে পারে। ফ্লেমিঙ্গোর গোলাপি রং তাই একবার অর্জন করলেই সারাজীবন অপরিবর্তিত থাকে না।

জন্মের সময় ছানার ধূসর বা সাদাটে রং এই ধীর পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করে। ডিম ফুটে বেরোনোর পর ছানার দেহে থাকে নরম পালকের আবরণ। তার ঠোঁটও পূর্ণবয়স্ক ফ্লেমিঙ্গোর মতো বাঁকানো ও ছেঁকে খাওয়ার উপযোগী থাকে না। প্রথম দিকে সে নিজে জলাভূমি থেকে খাদ্য ছেঁকে সংগ্রহ করতে পারে না। বাবা ও মা উভয়েই তাকে নিজেদের শরীরে উৎপন্ন পুষ্টিসমৃদ্ধ তরল খাবার খাওয়াতে পারে। ছানা বড় হওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজে খাবার সংগ্রহের ক্ষমতা অর্জন করে। খাদ্যাভ্যাস, শরীরের বৃদ্ধি ও পালক বদলের সঙ্গে তার রংও পরিণত হতে থাকে।

ছানাকে খাওয়ানো সেই তরল খাবারকে প্রায়ই ‘ক্রপ মিল্ক’ বলা হয়। নামের মধ্যে দুধ থাকলেও এটি স্তন্যপায়ী প্রাণীর দুধ নয়। ফ্লেমিঙ্গোর খাদ্যনালির বিশেষ অংশ থেকে বাবা ও মা এই পুষ্টিকর খাবার তৈরি করে। এতে ছানার বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান থাকে এবং ক্যারোটিনয়েডের কারণে এর রং লালচেও হতে পারে। লাল তরল খাবার খাচ্ছে বলেই ছানার নরম পালক সঙ্গে সঙ্গে গোলাপি হয়ে যায় না। ছানার দৃশ্যমান রং নির্ভর করে তার বিকাশ, রঞ্জকের ব্যবহার এবং পরবর্তী সময়ে নতুন পালক গজানোর ওপর।

সব ফ্লেমিঙ্গো একই বয়সে একই রকম গোলাপি হয়ে ওঠে না। কোনো প্রজাতির অল্পবয়সী পাখির পালকে দ্রুত হালকা গোলাপি আভা দেখা দিতে পারে, আবার অন্য প্রজাতিতে ধূসর ও বাদামি রং অনেক দিন থাকে। পূর্ণবয়স্ক অবস্থাতেও রঙের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। কিছু ফ্লেমিঙ্গো গাঢ় লালচে গোলাপি, কিছু হালকা গোলাপি, আর কিছু প্রায় সাদাটে দেখায়, যদিও ডানা মেললে উজ্জ্বল রঙের অংশ চোখে পড়ে। প্রজাতির শারীরিক বৈশিষ্ট্য, বাসস্থান এবং সেখানকার খাদ্যভাণ্ডার মিলেই এই পার্থক্য তৈরি করে।

একই প্রজাতির দুটি পাখির রংও সমান নাও হতে পারে। একটির খাদ্যে রঞ্জকসমৃদ্ধ উপাদান বেশি, অন্যটি কম পেতে পারে। শরীরের অবস্থা, প্রজননের সময়কার শারীরিক চাহিদা এবং পালক বদলের পর্যায় রঙের দৃশ্যমান তীব্রতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শুধু রং দেখে কোনো নির্দিষ্ট ফ্লেমিঙ্গোর স্বাস্থ্য ভালো না খারাপ, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। হালকা রং একটি প্রজাতির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যও হতে পারে। তাই বিভিন্ন প্রজাতির ছবি পাশাপাশি রেখে ‘যেটি সবচেয়ে গোলাপি, সেটিই সবচেয়ে সুস্থ’—এমন সিদ্ধান্ত বিভ্রান্তিকর।

চিড়িয়াখানায় থাকা ফ্লেমিঙ্গোর রং এই খাদ্যনির্ভর সম্পর্কটি বুঝতে সাহায্য করে। তাদের খাবারে উপযুক্ত রঞ্জক দীর্ঘদিন কম থাকলে নতুন পালক ফ্যাকাশে হতে পারে। সে কারণে পরিচর্যাকারীরা প্রজাতির পুষ্টির চাহিদা বিবেচনা করে এমন খাদ্য দেন, যাতে প্রয়োজনীয় রঞ্জকও থাকে। এটিকে পাখির গায়ে বাইরে থেকে গোলাপি রং লাগানো ভেবে ভুল করা উচিত নয়। খাদ্যের উপাদান শরীরে শোষিত হয়ে পালক তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। তবে পাখির সুস্থতার জন্য শুধু রং বজায় রাখা যথেষ্ট নয়; পূর্ণ পুষ্টি, উপযুক্ত আবাস এবং নিয়মিত পরিচর্যাও জরুরি।

ফ্লেমিঙ্গোর রঙের গল্পে আরও একটি সূক্ষ্ম দিক আছে। কিছু ফ্লেমিঙ্গো লেজের গোড়ার কাছের একটি গ্রন্থি থেকে তৈলাক্ত পদার্থ নিয়ে ঠোঁটের সাহায্যে পালকে ছড়ায়। এটি পালক পরিচর্যার স্বাভাবিক আচরণ। কিছু প্রজাতিতে ওই পদার্থে ক্যারোটিনয়েড রঞ্জক থাকায় পালকের ওপরের রং আরও উজ্জ্বল বা লালচে দেখাতে পারে। অর্থাৎ পালকের ভেতরে গজানোর সময় জমা রঞ্জকের পাশাপাশি পালকের বাইরের পরিচর্যাও দৃশ্যমান রঙে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সব প্রজাতির রঙের ব্যাখ্যায় এই বাইরের প্রলেপকে একই গুরুত্ব দেওয়া ঠিক হবে না।

এই রং কেবল মানুষের চোখে সুন্দর লাগার বিষয়ও নয়। পাখিদের সামাজিক ও প্রজনন আচরণে পালকের চেহারা ভূমিকা রাখতে পারে। উজ্জ্বল রং কখনো খাদ্য সংগ্রহের সাফল্য বা শরীরের অবস্থার একটি সংকেত হতে পারে, যদিও একটি পাখির স্বাস্থ্য নির্ধারণে রং একমাত্র মানদণ্ড নয়। ফ্লেমিঙ্গোরা দলবদ্ধভাবে থাকে, একসঙ্গে বিভিন্ন ভঙ্গি প্রদর্শন করে এবং সঙ্গী নির্বাচনের সময় দেহের চেহারাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। খাদ্য থেকে আসা একটি রঞ্জক এভাবে শরীরের বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি সামাজিক আচরণের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তোলে।

ক্যারোটিনয়েড নিয়ে একটি পরিচিত প্রশ্ন হলো, মানুষ প্রচুর গাজর খেলে কি ফ্লেমিঙ্গোর মতো গোলাপি হবে? মানুষের শরীরও খাদ্য থেকে ক্যারোটিনয়েড পায়, কিন্তু ফ্লেমিঙ্গোর মতো পালক তৈরি করে না এবং রঞ্জক ব্যবহার করার পদ্ধতিও আলাদা। অতিরিক্ত ক্যারোটিনসমৃদ্ধ খাবারে মানুষের ত্বকে কখনো হলদে বা কমলাটে আভা দেখা দিতে পারে, গোলাপি পালক নয়। একই রঞ্জকদলের উপাদান ভিন্ন প্রাণীর শরীরে ভিন্ন ফল তৈরি করে—ফ্লেমিঙ্গোর রং তার একটি চোখে পড়ার মতো উদাহরণ।

ফ্লেমিঙ্গোর বাসস্থান বদলে গেলে তার রঙের পেছনের খাদ্যশৃঙ্খলও প্রভাবিত হতে পারে। জলাভূমির লবণাক্ততা, পানির গভীরতা ও সেখানে জন্মানো অণুজীবের ধরন বদলালে খাদ্যের প্রাপ্যতা পাল্টায়। একটি সুস্থ জলাভূমি ফ্লেমিঙ্গোর জন্য শুধু দাঁড়িয়ে থাকার সুন্দর পটভূমি নয়; সেখানেই তার খাদ্য, ছানা বড় করার পরিবেশ এবং স্বাভাবিক জীবনচক্রের ভিত্তি। ফলে গোলাপি পালকের ব্যাখ্যা শেষ পর্যন্ত পাখিটির শরীর থেকে জলাভূমির অদৃশ্য ক্ষুদ্র প্রাণী পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

জন্মের সময় ধূসর ফ্লেমিঙ্গোর ধীরে ধীরে গোলাপি হয়ে ওঠা তাই কোনো আকস্মিক রূপান্তর নয়। অণুজীব ও ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী থেকে রঞ্জক খাদ্যে আসে, খাদ্য থেকে পাখির শরীরে পৌঁছায়, তারপর নতুন পালক ও ত্বকের দৃশ্যমান রঙে প্রকাশ পায়। প্রজাতি, বয়স, পালক বদল এবং পরিচর্যা সেই রংকে আরও বদলে দেয়। জলাভূমিতে দাঁড়ানো একটি গোলাপি ফ্লেমিঙ্গোকে দেখলে আমরা আসলে তার দীর্ঘ বেড়ে ওঠার ইতিহাস এবং সে যে পরিবেশে খাবার পেয়েছে, তারও একটি দৃশ্যমান চিহ্ন দেখি।


আপনার পছন্দ হতে পারে