বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

তিমি কীভাবে কথা বলে? সমুদ্রজুড়ে ছড়িয়ে পড়া রহস্যময় গানের বিজ্ঞান

তিমি কীভাবে কথা বলে? সমুদ্রজুড়ে ছড়িয়ে পড়া রহস্যময় গানের বিজ্ঞান
নীল সমুদ্রের গভীরে শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগরত তিমির দল।

মানুষের কাছে সমুদ্রকে প্রায়ই নীরব এক জগৎ বলে মনে হয়। পানির নিচে কান পাতার সুযোগ আমাদের খুব কম, আর ডুব দিলে বাইরের শব্দও অস্বাভাবিকভাবে অস্পষ্ট শোনায়। কিন্তু তিমির অভিজ্ঞতায় মহাসাগর মোটেও নীরব নয়। সেখানে ঢেউয়ের গর্জন, বরফের ফাটল, বৃষ্টি, মাছের শব্দ, চিংড়ির ক্ষুদ্র বিস্ফোরণসদৃশ আওয়াজ এবং অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর ডাক মিলিয়ে এক বিশাল শব্দভূমি তৈরি হয়। এই শব্দময় জগতের অন্যতম শক্তিশালী ও জটিল অংশ হলো তিমির ডাক। কোনোটি দীর্ঘশ্বাসের মতো, কোনোটি গভীর গুঞ্জন, কোনোটি তীক্ষ্ণ শিস, আবার কোনোটি ছন্দবদ্ধ গান। এসব শব্দের সাহায্যে তিমি সঙ্গী খোঁজে, সন্তানকে ডাকে, দলের সদস্যদের অবস্থান জানায়, শিকার শনাক্ত করে এবং অন্ধকার পানির মধ্যে নিজের পথ নির্ধারণ করে।

সমুদ্রে শব্দের গুরুত্ব বোঝার জন্য প্রথমে পানি ও বাতাসের পার্থক্যটি জানা দরকার। পানিতে আলো খুব বেশি দূর যেতে পারে না। গভীরতা বাড়লে সূর্যালোক দ্রুত দুর্বল হয়ে যায় এবং কয়েক শ মিটার নিচে প্রায় সম্পূর্ণ অন্ধকার নেমে আসে। মেঘলা পানি, ভাসমান কণা কিংবা রাতের অন্ধকারে দৃষ্টির কার্যকারিতা আরও কমে যায়। অন্যদিকে শব্দ পানিতে বাতাসের তুলনায় প্রায় চার গুণ দ্রুত চলে এবং উপযুক্ত অবস্থায় অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ফলে দূরে থাকা কোনো তিমিকে দেখা সম্ভব না হলেও তার ডাক শোনা সম্ভব হতে পারে। তিমির কাছে শব্দ তাই কেবল কথোপকথনের মাধ্যম নয়; এটি যেন একই সঙ্গে চোখ, মানচিত্র ও সামাজিক বন্ধন।

সব তিমি একইভাবে শব্দ তৈরি বা ব্যবহার করে না। সাধারণভাবে তাদের দুটি বড় দলে ভাগ করা হয়—বেলিনযুক্ত তিমি এবং দাঁতওয়ালা তিমি। নীল তিমি, পাখনাওয়ালা তিমি, কুঁজপিঠ তিমি ও মেরু তিমি বেলিনযুক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত। এদের মুখে দাঁতের বদলে ঝালরের মতো বেলিন পাত থাকে, যার সাহায্যে পানি ছেঁকে ক্ষুদ্র প্রাণী ও মাছ ধরে। এই তিমিরা প্রধানত নিচু কম্পাঙ্কের গম্ভীর ডাক, গোঙানি, স্পন্দন এবং দীর্ঘ গান তৈরি করে। অপরদিকে শুক্রাণু তিমি, ঘাতক তিমি ও ঠোঁটওয়ালা তিমি দাঁতওয়ালা দলের সদস্য। তারা তুলনামূলক উঁচু কম্পাঙ্কের টিকটিক শব্দ, শিস ও স্পন্দিত ডাক তৈরি করতে পারে। এসব শব্দের কিছু যোগাযোগে এবং কিছু প্রতিধ্বনির সাহায্যে চারপাশ বোঝার কাজে ব্যবহৃত হয়।

তিমি মানুষের মতো মুখ দিয়ে কথা বলে না এবং তাদের শব্দ তৈরির অঙ্গও মানুষের কণ্ঠযন্ত্রের হুবহু প্রতিরূপ নয়। বেলিনযুক্ত তিমির গলার ভেতরে বিশেষায়িত নরম কলা, পেশি ও বায়ুথলি রয়েছে। ফুসফুস থেকে আসা বাতাস এই কাঠামোর মধ্য দিয়ে চলাচল করলে কম্পন সৃষ্টি হয়। তিমি সেই বাতাসকে শরীরের ভেতরেই পুনরায় ঘোরাতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় পানির নিচে থেকেও প্রতিটি ডাকের জন্য তাকে পানির ওপর উঠে নতুন করে শ্বাস নিতে হয় না। গলার বিশেষ অংশের আকার, টান এবং বাতাসের চাপ পরিবর্তনের মাধ্যমে সে শব্দের উচ্চতা, দৈর্ঘ্য ও প্রকৃতি বদলাতে পারে। এই ব্যবস্থা বিশাল দেহকে একটি জীবন্ত বাদ্যযন্ত্রের মতো কাজে লাগায়।

দাঁতওয়ালা তিমির শব্দ তৈরির প্রক্রিয়া ভিন্ন। তাদের মাথার ওপরের শ্বাসপথসংলগ্ন অঞ্চলে বিশেষ নাসিকাকলা থাকে। চাপযুক্ত বাতাস এসব কলার ফাঁক দিয়ে চালিত হলে দ্রুত টিকটিক শব্দ তৈরি হয়। মাথার সামনের নরম, চর্বিযুক্ত অংশ শব্দকে নির্দিষ্ট দিকে কেন্দ্রীভূত করে পানিতে পাঠায়। শব্দ কোনো মাছ, পাথর বা অন্য বস্তুর গায়ে লেগে ফিরে এলে নিচের চোয়ালের বিশেষ চর্বিযুক্ত পথ দিয়ে কানের কাছে পৌঁছায়। মস্তিষ্ক ফিরে আসা প্রতিধ্বনির সময়, তীব্রতা ও গঠন বিশ্লেষণ করে বস্তুটির দূরত্ব, আকার, অবস্থান এবং চলনের ধারণা পায়। এই প্রতিধ্বনি নির্ণয় এতটাই সূক্ষ্ম যে অন্ধকার পানিতেও একটি দাঁতওয়ালা তিমি দ্রুত চলমান শিকার অনুসরণ করতে পারে।

তবে প্রতিধ্বনি নির্ণয়কে সরাসরি কথোপকথন ভাবা ঠিক নয়। এটি প্রধানত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, চলাচল ও শিকার ধরার একটি সংবেদনপদ্ধতি। অবশ্য একই শব্দ আশপাশের অন্য তিমিও শুনতে পারে এবং কোনো সদস্য শিকার খুঁজছে কি না, দ্রুত এগোচ্ছে কি না কিংবা উত্তেজিত অবস্থায় আছে কি না, সে সম্পর্কে পরোক্ষ ধারণা পেতে পারে। যোগাযোগের জন্য দাঁতওয়ালা তিমি আলাদা শিস, স্পন্দিত ডাক এবং নির্দিষ্ট ছন্দের শব্দও ব্যবহার করে। অর্থাৎ তাদের শব্দজগতে একই সঙ্গে ব্যক্তিগত সংকেত, দলগত ডাক এবং চারপাশ পরিমাপের ধ্বনি রয়েছে।

তিমির যোগাযোগ নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ হলো পুরুষ কুঁজপিঠ তিমির গান। এটি কয়েকটি এলোমেলো ডাকের সমষ্টি নয়; এর মধ্যে বিস্ময়কর স্তরবিন্যাস থাকে। সবচেয়ে ছোট শব্দাংশগুলো একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসে মিলিত হয়ে বাক্যাংশের মতো অংশ তৈরি করে। একই ধরনের বাক্যাংশ কয়েকবার পুনরাবৃত্ত হয়ে একটি বিষয়াংশ গঠন করে। অনেকগুলো বিষয়াংশ নির্দিষ্ট ক্রমে সাজলে পূর্ণাঙ্গ গান তৈরি হয়। একটি গান দশ থেকে ত্রিশ মিনিট বা তারও বেশি সময় ধরে চলতে পারে এবং গায়ক সেটি বিরতি দিয়ে বহুবার পুনরাবৃত্তি করতে পারে।

একই অঞ্চলের পুরুষ কুঁজপিঠ তিমিরা সাধারণত একই সময়ে কাছাকাছি ধরনের গান গায়। কিন্তু সেই গান স্থির থাকে না। কোনো একটি শব্দাংশ ধীরে বদলাতে পারে, নতুন বিষয়াংশ যোগ হতে পারে কিংবা পুরোনো অংশ বাদ পড়তে পারে। অন্য তিমিরা সেই পরিবর্তিত ধরন শিখে নিলে কিছু সময় পর গোটা দলের গান পাল্টে যায়। কখনো একটি তিমিগোষ্ঠীর নতুন গান পাশের জনগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং পর্যায়ক্রমে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের অঞ্চলেও পৌঁছায়। এই শিক্ষিত পরিবর্তনকে প্রাণিজগতের সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হয়। এখানে সংস্কৃতি বলতে বংশগত বৈশিষ্ট্য নয়, বরং অন্য সদস্যের কাছ থেকে শেখা আচরণ বোঝানো হচ্ছে।

কুঁজপিঠ তিমির গানকে সাধারণভাবে প্রেমের গান বলা হলেও এর সুনির্দিষ্ট কাজ এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয়। প্রজননকালে মূলত পুরুষ তিমিই বিস্তৃত গান গায়, তাই স্ত্রী তিমিকে আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা থাকার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু গান পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে গায়কের উপস্থিতি, শারীরিক সক্ষমতা বা অবস্থানও প্রকাশ করতে পারে। কখনো পুরুষ তিমিরা গায়কের কাছে আসে, আবার কখনো গানের এলাকায় সামাজিক সমাবেশ দেখা যায়। তাই গানকে শুধু সঙ্গিনী ডাকার সংকেত বললে বিষয়টি অতিরিক্ত সরল হয়ে যায়। সম্ভবত এটি প্রজনন, প্রতিযোগিতা, দূরত্ব বজায় রাখা এবং সামাজিক পরিচয়ের একাধিক কাজ একসঙ্গে সম্পন্ন করে।

তিমির প্রতিটি শব্দ আবার গানও নয়। কুঁজপিঠ তিমি খাবারের এলাকায়, চলাচলের সময় কিংবা দলের ভেতর নানা ছোট সামাজিক ডাক দেয়। মা তিমি ও তার শাবক একে অপরকে খুঁজে রাখতে নরম ও অপেক্ষাকৃত শান্ত শব্দ ব্যবহার করতে পারে। শিকারি কাছাকাছি থাকলে কিংবা অতিরিক্ত দূরে শব্দ পাঠানোর প্রয়োজন না হলে নিচু স্বরে ডাক দেওয়া নিরাপদ। কিছু তিমি পানির ওপর লেজ আছড়ে, পাখনা চাপড়ে বা পুরো শরীর ফেলে প্রচণ্ড শব্দ তৈরি করে। এগুলো কণ্ঠ থেকে আসা শব্দ নয়, তবু সতর্কতা, উত্তেজনা, উপস্থিতি বা সামাজিক অবস্থার সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে।

নীল তিমি ও পাখনাওয়ালা তিমির গভীর ডাক মানুষের শ্রবণসীমার নিচের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। নিচু কম্পাঙ্কের শব্দে প্রতি সেকেন্ডে কম কম্পন ঘটে এবং সমুদ্রের পানিতে এর শক্তি তুলনামূলক ধীরে ক্ষয় হয়। এ কারণে উপযুক্ত গভীরতা, তাপমাত্রা ও জলস্তরের অবস্থায় ডাক শত শত কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারে। কখনো আরও দূর থেকেও বিশেষ যন্ত্রে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়। তবে একটি তিমি সত্যিই সমুদ্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের নির্দিষ্ট তিমির সঙ্গে কথোপকথন করছে—এমন দাবি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। শব্দ কত দূর যাবে তা নির্ভর করে উৎসের তীব্রতা, কম্পাঙ্ক, পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, গভীরতা, সমুদ্রতল, ঢেউ এবং পটভূমির শব্দের ওপর।

সমুদ্রে তাপমাত্রা ও চাপের পরিবর্তনের কারণে কিছু গভীরতায় এমন জলস্তর তৈরি হয় যেখানে শব্দ ওপর বা নিচে হারিয়ে না গিয়ে বাঁকা পথে দীর্ঘ দূরত্বে এগোতে পারে। একে সমুদ্রের প্রাকৃতিক শব্দপথ হিসেবে ভাবা যায়। কোনো তিমি উপযুক্ত গভীরতায় ডাকলে সেই শব্দ দূরবর্তী অঞ্চলে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়ে। তিমিরা সচেতনভাবে এই পথের সম্পূর্ণ ভৌতবিজ্ঞান বোঝে, এমন কথা বলা যাবে না। তবে দীর্ঘ বিবর্তনের মাধ্যমে তারা কোন গভীরতা, ঋতু ও পরিবেশে কোন ডাক কার্যকর হয়, সে সম্পর্কে আচরণগত দক্ষতা অর্জন করেছে বলে ধারণা করা যুক্তিসংগত।

শুক্রাণু তিমির যোগাযোগে ছন্দবদ্ধ টিকটিক শব্দের বিশেষ বিন্যাস দেখা যায়। কয়েকটি টিক নির্দিষ্ট বিরতিতে সাজিয়ে তৈরি এই ক্ষুদ্র ছন্দকে পরিচয়সূচক সংকেত হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। আলাদা সামাজিক গোষ্ঠীর ছন্দের ধরন আলাদা হতে পারে, অনেকটা আঞ্চলিক উচ্চারণের মতো। একই সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সদস্যরা বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকলেও মিলযুক্ত সংকেত ব্যবহার করতে পারে। কোনো ছন্দ দলীয় পরিচয় প্রকাশ করে, কোনোটি কাছাকাছি সামাজিক যোগাযোগে ব্যবহৃত হয়, আবার কোনো বিন্যাসে ব্যক্তিবিশেষের পরিচয়ের তথ্যও থাকতে পারে। গবেষকেরা এসব শব্দের বিন্যাসে সূক্ষ্ম পরিবর্তন, গতি ও পালাক্রম লক্ষ্য করে যোগাযোগের সম্ভাব্য নিয়ম খুঁজছেন।

ঘাতক তিমির পরিবারভিত্তিক দলেও নিজস্ব ডাকভান্ডার থাকে। দীর্ঘকাল একসঙ্গে থাকা সদস্যরা কিছু নির্দিষ্ট ডাক ভাগ করে এবং শাবকেরা বড়দের কাছ থেকে সেগুলো শেখে। কাছাকাছি বসবাসকারী দুটি দলের খাদ্যাভ্যাস ও চলাচল একই রকম হলেও তাদের ডাকের ধরন ভিন্ন হতে পারে। এই স্বতন্ত্র ধ্বনিকে শব্দগত উপভাষা বলা যায়। কোন দল কোথায় আছে, সদস্যরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কি না, শিকার ঘিরে ধরার সময় কার অবস্থান কোথায় হবে—এসব ক্ষেত্রে ডাক কার্যকর হতে পারে। সামাজিক বন্ধন যত দীর্ঘস্থায়ী, পরিচিত ডাকের মূল্যও তত বেশি।

মা ও শাবকের সম্পর্কেও শব্দ অপরিহার্য। জন্মের পর শাবককে নিয়মিত শ্বাস নিতে পানির ওপর উঠতে হয় এবং সাঁতার, চলাচলের পথ ও সামাজিক আচরণ শিখতে হয়। উত্তাল সমুদ্রে দৃষ্টিসীমা হারিয়ে গেলেও পরিচিত ডাক তাদের যোগাযোগ ধরে রাখে। মা তিমির ডাকের স্বর, ছন্দ ও পুনরাবৃত্তি শাবকের কাছে বিশেষ পরিচিত হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে শাবকের ক্ষুধা, অস্বস্তি কিংবা বিচ্ছিন্নতার অবস্থাও তার ডাকে প্রকাশ পেতে পারে। তবে গবেষকেরা মানুষের আবেগের নাম সরাসরি তিমির শব্দে বসাতে সতর্ক থাকেন; একই ডাক পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন কাজ করতে পারে।

তিমিরা কি মানুষের মতো ভাষায় কথা বলে—এ প্রশ্নটি আকর্ষণীয় হলেও এখনো নিশ্চিত উত্তর দেওয়া যায় না। তাদের শব্দে পুনরাবৃত্তি, পালাক্রম, সামাজিক পরিচয়, শিক্ষিত উপভাষা এবং স্তরভিত্তিক বিন্যাসের প্রমাণ রয়েছে। কিছু প্রজাতির সংকেতে তথ্যকে সংক্ষিপ্ত ও কার্যকরভাবে সাজানোর প্রবণতাও দেখা যায়। কিন্তু মানবভাষায় সীমিত সংখ্যক ধ্বনি ও নিয়ম ব্যবহার করে অসীম নতুন ধারণা, অতীত, ভবিষ্যৎ, কল্পনা এবং বিমূর্ত সম্পর্ক প্রকাশ করা যায়। তিমির যোগাযোগে এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ অর্থব্যবস্থা আছে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। তাই তাদের ডাককে নির্বিচারে মানুষের বাক্যের অনুবাদ দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

এই রহস্য সমাধানে গবেষকেরা সমুদ্রের বিভিন্ন স্থানে জলশ্রবণযন্ত্র বসান। এসব যন্ত্র দিনরাত পানির নিচের শব্দ ধারণ করতে পারে। একাধিক যন্ত্রের কাছে একই ডাক পৌঁছানোর সময়ের সামান্য পার্থক্য মেপে শব্দটির সম্ভাব্য উৎস নির্ণয় করা যায়। তিমির শরীরে সাময়িকভাবে লাগানো ক্ষুদ্র সংবেদক তার ডুবের গভীরতা, শরীরের বাঁক, সাঁতারের গতি এবং কাছাকাছি শব্দ ধারণ করে। ছবির মাধ্যমে আলাদা তিমিকে শনাক্ত করা, ওপর থেকে তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করা এবং একই সময়ের শব্দ মিলিয়ে দেখা হলে কোন পরিস্থিতিতে কোন ডাক হয়েছে তা বোঝা সহজ হয়।

শব্দের দৃশ্যমান মানচিত্রও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ। ধারণ করা শব্দকে সময়, কম্পাঙ্ক ও তীব্রতার ভিত্তিতে রঙিন রেখা ও নকশায় রূপান্তর করা হয়। এতে মানুষের কানে একই রকম শোনালেও দুটি ডাকে থাকা সূক্ষ্ম পার্থক্য চোখে ধরা পড়ে। বিপুলসংখ্যক ধারণকৃত শব্দ বিশ্লেষণে গণনাভিত্তিক শিক্ষণপদ্ধতি এখন সহায়তা করছে। এটি মিলযুক্ত ধ্বনি আলাদা করা, পুনরাবৃত্ত বিন্যাস খোঁজা এবং নির্দিষ্ট আচরণের সঙ্গে কোনো সংকেতের সম্পর্ক শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু যন্ত্র কোনো নকশা খুঁজে পেলেই তার অর্থ আবিষ্কৃত হয়েছে বলা যায় না। প্রকৃত অর্থ জানতে একই তিমি, তার সঙ্গী, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও পরবর্তী আচরণ দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করতে হয়।

তিমির শব্দজগৎ বোঝার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো মানুষের তৈরি সমুদ্রশব্দ। বাণিজ্যিক জাহাজের যন্ত্র ও পাখা, সামরিক শব্দসন্ধানী ব্যবস্থা, সমুদ্রতলের খনিজ অনুসন্ধান, নির্মাণকাজ এবং দ্রুতগামী নৌযান পানিতে প্রবল আওয়াজ ছড়ায়। নিচু কম্পাঙ্কের জাহাজের শব্দ বেলিনযুক্ত তিমির ডাকের পরিসরের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। তখন তিমির ডাক দূরে পৌঁছালেও গ্রাহক সেটি পরিষ্কার শুনতে পারে না। জনাকীর্ণ কক্ষে মানুষের কথা যেমন চাপা পড়ে, সমুদ্রেও তেমনি যোগাযোগের কার্যকর দূরত্ব সংকুচিত হয়। এই ঘটনাকে শব্দের আড়াল সৃষ্টি বলা যায়।

আওয়াজ বেড়ে গেলে তিমি আরও জোরে ডাকতে, স্বরের উচ্চতা বদলাতে, ডাকের সময় পাল্টাতে কিংবা এলাকা ছেড়ে যেতে পারে। এসব পরিবর্তনের জন্য বাড়তি শক্তি ব্যয় হয় এবং খাবার সংগ্রহ, বিশ্রাম, প্রজনন বা শাবকের যত্ন ব্যাহত হতে পারে। খুব তীব্র শব্দ কাছাকাছি হলে শ্রবণক্ষমতার ক্ষতি, আতঙ্ক বা অস্বাভাবিক আচরণের ঝুঁকিও থাকে। বিশেষ পরিস্থিতিতে শক্তিশালী সামরিক শব্দসন্ধানী ব্যবস্থার সঙ্গে কিছু গভীর ডুবুরি তিমির দিকভ্রান্ত হওয়া ও উপকূলে আটকে পড়ার ঘটনার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে সব শব্দ, সব তিমি ও সব পরিবেশে প্রভাব একই নয়; কম্পাঙ্ক, দূরত্ব, স্থায়িত্ব এবং প্রাণীর আচরণগত অবস্থা ফল নির্ধারণ করে।

এই ক্ষতি কমানোর বাস্তব উপায়ও রয়েছে। জাহাজের গতি কমালে অনেক ক্ষেত্রে যন্ত্র ও পাখার আওয়াজ কমে। উন্নত নকশার পাখা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং শান্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যায়। তিমির প্রজনন বা অভিবাসনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নির্দিষ্ট এলাকায় উচ্চশব্দের কাজ সীমিত করা যেতে পারে। নির্মাণের আগে জলশ্রবণযন্ত্র দিয়ে তিমির উপস্থিতি যাচাই এবং কাছাকাছি প্রাণী শনাক্ত হলে কাজ স্থগিত রাখাও কার্যকর ব্যবস্থা। সমুদ্রকে সম্পূর্ণ নীরব করা সম্ভব নয়, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় শব্দ কমিয়ে তিমির জন্য যোগাযোগের প্রয়োজনীয় পরিসর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।

শেষ পর্যন্ত তিমির গান কোনো অতিপ্রাকৃত রহস্য নয়; এটি শরীরবিদ্যা, পানির ভৌতবিজ্ঞান, বিবর্তন এবং সামাজিক শিক্ষার অসাধারণ সমন্বয়। তবু রহস্যের বড় অংশ এখনো রয়ে গেছে। একটি দীর্ঘ গানে ঠিক কতখানি ব্যক্তিগত পরিচয় থাকে, স্ত্রী তিমি কোন বৈশিষ্ট্যের প্রতি সাড়া দেয়, ছন্দবদ্ধ টিকের বিন্যাসে নির্দিষ্ট অর্থ আছে কি না এবং দূরের শ্রোতা কীভাবে বার্তার প্রাসঙ্গিকতা বোঝে—এসব প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর এখনো মেলেনি। আমরা আপাতত তাদের শব্দের নকশা পড়তে শিখছি, কিন্তু তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে সমুদ্রকে শোনা শেখার পথ অনেক দীর্ঘ।

রাতে কোনো গভীর সমুদ্রের ওপর ভেসে থাকা নৌকা থেকে চারদিকে তাকালে শুধু অন্ধকার জল দেখা যায়। অথচ সেই অন্ধকারের নিচে হয়তো এক তিমি তার দলকে অবস্থান জানাচ্ছে, এক মা শাবককে কাছে ডাকছে, এক পুরুষ বারবার বদলে যাওয়া গান গাইছে এবং এক শিকারি তিমি ক্ষুদ্র প্রতিধ্বনি থেকে মাছের চলন বুঝে নিচ্ছে। আমাদের চোখে বিচ্ছিন্ন মনে হওয়া বিশাল সমুদ্র তাদের কাছে শব্দে যুক্ত একটি জীবন্ত পরিসর। সেই কারণেই তিমির গান শুধু সুন্দর প্রাকৃতিক সুর নয়; এটি মহাসাগরে বেঁচে থাকা, সম্পর্ক গড়া এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শেখা সংস্কৃতির শ্রাব্য ইতিহাস।


আপনার পছন্দ হতে পারে