অ্যাপোম্যাটক্সে লির আত্মসমর্পণ ও লিংকন হত্যাকাণ্ড: ১৮৬৫…

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অ্যাপোম্যাটক্সে লির আত্মসমর্পণ ও লিংকন হত্যাকাণ্ড: ১৮৬৫

সিরিজ: আমেরিকার গৃহযুদ্ধ

অ্যাপোম্যাটক্সে লির আত্মসমর্পণ ও লিংকন হত্যাকাণ্ড: ১৮৬৫
আত্মসমর্পণের স্বস্তি থেকে প্রেসিডেন্ট হত্যার শোক

শেরম্যানের বাহিনী সাভানা থেকে ক্যারোলাইনাসের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় পূর্বে লির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শেষ পরীক্ষার মুখে পড়ছিল। ১৮৬৫ সালের বসন্তে কনফেডারেসির সামনে খাদ্যসংকট, ক্ষয়প্রাপ্ত রেলযোগাযোগ, সৈন্যের ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান দলত্যাগ একসঙ্গে উপস্থিত হয়। পিটার্সবার্গ ও রিচমন্ড ধরে রাখা যত কঠিন হচ্ছিল, লির স্বাধীনভাবে অভিযান চালানোর সুযোগও তত কমছিল। তবু দক্ষিণের প্রধান বাহিনীগুলো অস্ত্র নামায়নি; যুদ্ধের শেষ পর্যায়েও বড় সংঘর্ষ বাকি ছিল।

লি বুঝতে পারছিলেন, দীর্ঘদিন একই প্রতিরক্ষারেখায় থাকলে তাঁর বাহিনী আরও দুর্বল হবে। তিনি দক্ষিণে সরে নর্থ ক্যারোলাইনায় জোসেফ ই. জনস্টনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করছিলেন। কিন্তু তার জন্য গ্রান্টের চাপ থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং খাদ্য ও চলাচলের পথ নিশ্চিত করা দরকার ছিল। ২৫ মার্চ ফোর্ট স্টেডম্যানে কনফেডারেট আক্রমণ সাময়িক সাফল্যের পর ব্যর্থ হলে সেই সুযোগ আরও সংকুচিত হয়।

১ এপ্রিল ফাইভ ফর্কসের যুদ্ধে ফিলিপ শেরিডানের নেতৃত্বাধীন ইউনিয়ন বাহিনী কনফেডারেট অবস্থান ভেঙে দেয়। এতে পিটার্সবার্গের পশ্চিমের প্রতিরক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ রেলসংযোগ বিপন্ন হয়। পরদিন গ্রান্টের বড় আক্রমণে মূল প্রতিরক্ষারেখাও ভাঙে। লি সরকারকে জানান, পিটার্সবার্গ ও রিচমন্ড ছাড়তে হবে। বহু মাসের পরিখাযুদ্ধের পর এবার কনফেডারেট রাজধানী রক্ষার সামরিক ভিত্তি হারিয়ে যাচ্ছিল।

২ এপ্রিল রাতে কনফেডারেট সরকার ও সেনাবাহিনী রিচমন্ড ত্যাগ করে। সামরিক গুদাম ও সরঞ্জাম ধ্বংস করার আগুন শহরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ৩ এপ্রিল ইউনিয়ন সৈন্যরা রিচমন্ড ও পিটার্সবার্গে প্রবেশ করে। রাজধানীর পতন ছিল বিরাট রাজনৈতিক আঘাত, কিন্তু লির বাহিনী তখনও চলমান। গ্রান্টের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তাদের পুনর্গঠিত হওয়া বা জনস্টনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগেই পথ বন্ধ করা।

লির সৈন্যরা পশ্চিমে সরে অ্যামেলিয়া কোর্ট হাউসে পৌঁছান। সেখানে প্রত্যাশিত পর্যাপ্ত খাদ্য না পাওয়ায় ক্ষুধার্ত বাহিনীকে আশপাশে খাবার খুঁজতে হয়। বিলম্বের মধ্যে ইউনিয়ন বাহিনী দক্ষিণের পথ আটকে দেয়। এরপর লি আরও পশ্চিমে এগোতে বাধ্য হন। ক্লান্ত সৈন্য, পশু ও রসদগাড়ির দীর্ঘ সারি দ্রুত চলতে পারছিল না; পিছিয়ে পড়া ইউনিটগুলো বারবার আক্রমণের মুখে পড়ছিল।

৬ এপ্রিল সেলার্স ক্রিকে কনফেডারেট বাহিনীর বড় অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পরাজিত হয় এবং বহু হাজার সৈন্য বন্দি হন। এটি লির অবশিষ্ট শক্তিকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। গ্রান্ট ৭ এপ্রিল থেকে চিঠির মাধ্যমে আত্মসমর্পণের আলোচনা শুরু করেন। লি প্রথমে আরও প্রতিরোধের সুযোগ খুঁজলেও ৮ এপ্রিল অ্যাপোম্যাটক্স স্টেশনে ইউনিয়ন অশ্বারোহীরা সরবরাহবাহী ট্রেন দখল করলে খাদ্য পাওয়ার আরেকটি সম্ভাবনা শেষ হয়।

৯ এপ্রিল সকালে কনফেডারেট সৈন্যরা সামনে থাকা ইউনিয়ন অশ্বারোহী অবস্থান ভেঙে বেরোনোর চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের পেছনে বিপুল ইউনিয়ন পদাতিক এসে পৌঁছেছিল। পূর্বদিক থেকেও চাপ ছিল। ঘেরাও ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার বাস্তব সুযোগ আর নেই—এটি স্পষ্ট হওয়ায় লি যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেন। আরও লড়াই কেবল ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত সৈন্যদের প্রাণহানি বাড়াবে।

সেদিন বিকেলে দুই সেনাপতি অ্যাপোম্যাটক্স কোর্ট হাউস গ্রামের উইলমার ম্যাকলিনের বাড়িতে মিলিত হন। নামের কারণে অনেকেই ঘটনাটি আদালত ভবনে ঘটেছিল বলে মনে করেন; আসলে আলোচনাটি হয় ব্যক্তিগত বাড়ির বসার ঘরে। লি আনুষ্ঠানিক পোশাকে এসেছিলেন, গ্রান্ট ছিলেন তুলনামূলক সাধারণ সামরিক পোশাকে। তাঁদের সাক্ষাৎ কনফেডারেসির সবচেয়ে পরিচিত সেনাবাহিনীর সংগঠিত প্রতিরোধের অবসান ঘটায়।

গ্রান্টের শর্তে সৈন্যদের অস্ত্র ও সরকারি সামরিক সম্পদ জমা দিতে হবে এবং যথাযথ বিনিময় না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র না ধরার অঙ্গীকার করতে হবে। শর্ত মেনে চললে তাঁরা বাড়ি ফিরতে পারবেন। কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত পার্শ্বাস্ত্র রাখতে পারবেন। পরে গ্রান্ট ব্যক্তিগত ঘোড়া ও খচ্চরের মালিক সাধারণ সৈন্যদেরও সেগুলো নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন, যাতে বাড়ি ফিরে কৃষিকাজ করতে পারেন।

ক্ষুধার্ত কনফেডারেট সৈন্যদের জন্য খাদ্য দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়। প্রায় ২৮ হাজার সৈন্য ও কর্মকর্তার আত্মসমর্পণ নথিভুক্ত হয়, যদিও তাঁদের সবাই তখন কার্যকর যুদ্ধসৈন্য ছিলেন না। ১২ এপ্রিল পদাতিক বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র জমা দেয়। এই তুলনামূলক সংযত ব্যবস্থা পরবর্তী আত্মসমর্পণগুলোর নজির তৈরি করে। তবে এটি ছিল সামরিক সমঝোতা; দাসমুক্ত মানুষের নাগরিক অধিকার বা দক্ষিণের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের নিষ্পত্তি এতে হয়নি।

লির আত্মসমর্পণের সংবাদ উত্তরে স্বস্তি ও আনন্দ নিয়ে আসে। লিংকন ইতোমধ্যে দ্বিতীয় অভিষেক ভাষণে প্রতিশোধের পরিবর্তে জাতির ক্ষত সারানোর কথা বলেছিলেন। ১১ এপ্রিলের বক্তব্যে তিনি কিছু কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষের ভোটাধিকারের পক্ষে মত দেন—বিশেষ করে শিক্ষিত ব্যক্তি ও ইউনিয়নের হয়ে যুদ্ধ করা সৈন্যদের জন্য। যুদ্ধের অবসানের সঙ্গে নতুন নাগরিক ব্যবস্থার প্রশ্ন সামনে আসছিল।

এই পরিবর্তনের তীব্র বিরোধী ছিলেন অভিনেতা জন উইলকস বুথ। কনফেডারেসির সমর্থক ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী বুথ আগে লিংকনকে অপহরণের পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন। দক্ষিণের সামরিক পতনের মধ্যে তাঁর পরিকল্পনা হত্যায় রূপ নেয়। তিনি এবং সহযোগীরা প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর হামলা করে সরকারের নেতৃত্বে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন।

১৪ এপ্রিল রাতে লিংকন স্ত্রী মেরির সঙ্গে ওয়াশিংটনের ফোর্ডস থিয়েটারে নাটক দেখতে যান। রাত প্রায় সোয়া দশটায় বুথ প্রেসিডেন্টের বক্সে ঢুকে তাঁর মাথার পেছনে গুলি করেন। উপস্থিত মেজর হেনরি র‍্যাথবোন বাধা দিতে গেলে বুথ তাঁকেও ছুরিকাঘাত করেন এবং পালিয়ে যান। গুরুতর আহত লিংকনকে থিয়েটারের বিপরীতে পিটারসেনের বাড়িতে নেওয়া হয়।

একই রাতে লুইস পাওয়েল পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম এইচ. সিওয়ার্ডের বাড়িতে ঢুকে তাঁকে ছুরিকাঘাত করেন। সিওয়ার্ড গুরুতর আহত হলেও বেঁচে যান। ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনকে হত্যার দায়িত্ব পাওয়া জর্জ অ্যাটজেরোড্ট হামলা চালাননি। ফলে ষড়যন্ত্রকারীরা পুরো নেতৃত্ব ধ্বংস করতে পারেনি, কিন্তু প্রেসিডেন্টকে বাঁচানো যায়নি। ১৫ এপ্রিল সকাল ৭টা ২২ মিনিটে লিংকন মারা যান।

অ্যান্ড্রু জনসন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। বিজয়ের উৎসব জাতীয় শোকে পরিণত হয় এবং দক্ষিণের প্রতি প্রতিশোধের দাবি জোরদার হয়। বুথকে ধরতে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়; ২৬ এপ্রিল ভার্জিনিয়ার একটি খামারের গোলাঘরে ঘেরাওয়ের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মারা যান। হত্যাকাণ্ড কনফেডারেসিকে রক্ষা করেনি, তবে যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলে দেয়।

এদিকে ৯ এপ্রিলেই পুরো গৃহযুদ্ধ শেষ হয়নি। লি শুধু তাঁর আর্মি অব নর্দার্ন ভার্জিনিয়ার আত্মসমর্পণ করেছিলেন। নর্থ ক্যারোলাইনায় জনস্টনের সঙ্গে শেরম্যানের আলোচনা চলছিল। প্রথম সমঝোতায় সামরিক বিষয়ের সঙ্গে বিস্তৃত রাজনৈতিক শর্ত যুক্ত হওয়ায় ওয়াশিংটন তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপর ২৬ এপ্রিল বেনেট প্লেসে সংশোধিত সামরিক শর্তে জনস্টন আত্মসমর্পণ করেন।

অন্য অঞ্চলগুলোতেও অস্ত্রত্যাগ ধাপে ধাপে ঘটে। ৪ মে রিচার্ড টেইলর আলাবামা, মিসিসিপি ও পূর্ব লুইজিয়ানার অধীন বাহিনী সমর্পণ করেন। ১০ মে জেফারসন ডেভিস জর্জিয়ায় বন্দি হন। মিসিসিপির পশ্চিমের বাহিনীর আত্মসমর্পণের শর্ত ২৬ মে নির্ধারিত হয় এবং এডমন্ড কারবি স্মিথ ২ জুন তা অনুমোদন করেন। ২৩ জুন স্ট্যান্ড ওয়াটির নেতৃত্বাধীন কনফেডারেট আদিবাসী বাহিনীও আত্মসমর্পণ করে।

এই ধারাবাহিকতায় কিছু সংঘর্ষ আরও চলেছিল; টেক্সাসের পালমিটো র‍্যাঞ্চে মে মাসেও যুদ্ধ হয়। তাই যুদ্ধের প্রধান সামরিক সমাপ্তি, শেষ বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ এবং আনুষ্ঠানিক আইনগত অবসানকে একই তারিখে রাখা যায় না। অ্যাপোম্যাটক্স ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক এবং একটি নির্ণায়ক সামরিক ঘটনা, যার পরে কনফেডারেসির সংগঠিত প্রতিরোধ দ্রুত ভেঙে পড়ে।

লির অস্ত্রত্যাগ প্রমাণ করে, বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সামরিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। লিংকনের মৃত্যু দেখায়, যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয় রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান নিশ্চিত করে না। ইউনিয়ন রক্ষা পেলেও ন্যায়ভিত্তিক শান্তি নির্মাণের কাজ তখনও বাকি। দাসপ্রথার স্থায়ী বিলোপ, মুক্ত মানুষের অধিকার, বিধ্বস্ত দক্ষিণের পুনর্গঠন এবং সাবেক বিদ্রোহী রাজ্যগুলোর ভবিষ্যৎ—এবার আমেরিকার সংগ্রাম সেই প্রশ্নগুলোকে কেন্দ্র করে এগোবে।