শিল্পবিপ্লবের সূচনা: অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটেন কেন……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

শিল্পবিপ্লবের সূচনা: অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটেন কেন প্রথম শিল্পায়িত হয়েছিল?

সিরিজ: শিল্পবিপ্লবের ইতিহাস

শিল্পবিপ্লবের সূচনা: অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটেন কেন প্রথম শিল্পায়িত হয়েছিল?
কৃষিনির্ভর সমাজ থেকে যন্ত্রচালিত শিল্পসভ্যতার উত্থান

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ব্রিটেনের অধিকাংশ মানুষ তখনো কৃষি, গৃহভিত্তিক উৎপাদন ও ছোট কারিগরি পেশার সঙ্গে যুক্ত। কাপড় তৈরির কাজ ছড়িয়ে ছিল গ্রামের ঘরে ঘরে; পরিবহন চলত ঘোড়া, গাড়ি ও পালতোলা নৌকায়। কিন্তু কয়েক দশকের মধ্যে ইংল্যান্ডের কিছু অঞ্চলে বড় ভবনে যন্ত্র বসিয়ে শত শত শ্রমিককে একসঙ্গে কাজ করানো শুরু হলো। কয়লাখনি, লোহার কারখানা ও বস্ত্র উৎপাদনের মধ্যে তৈরি হলো নতুন সংযোগ। এই পরিবর্তনের কেন্দ্র ছিল উৎপাদনের ক্ষমতা, শক্তির উৎস এবং শ্রম সংগঠনের আমূল রূপান্তর। প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর অন্য সমৃদ্ধ অঞ্চলকে পেছনে ফেলে এই প্রক্রিয়া প্রথম ব্রিটেনেই কেন শুরু হয়েছিল?

সাধারণভাবে ব্রিটিশ শিল্পবিপ্লবের প্রথম পর্যায়কে আনুমানিক ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যে রাখা হয়। তবে এটি কোনো নির্দিষ্ট বছরে শুরু হওয়া ঘটনা নয়। এর প্রস্তুতি চলেছিল অনেক আগে থেকে, আর সব শিল্প একই গতিতে বদলায়নি। তুলার সুতা উৎপাদনে দ্রুত যান্ত্রিকীকরণ ঘটলেও তাঁত বোনা ও বহু কারিগরি কাজে দীর্ঘদিন মানুষের হাতই প্রধান ছিল। তাই শিল্পবিপ্লবকে একটি আকস্মিক আবিষ্কারের ফল ভাবলে ভুল হবে। এটি ছিল পরস্পরকে শক্তিশালী করা বহু অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রক্রিয়া।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয় কৃষিতে। ব্রিটেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ফসলের আবর্তন, পশুর বাছাইকৃত প্রজনন, জমির উন্নয়ন এবং বাজারের জন্য উৎপাদন বাড়ছিল। শালগম ও ক্লোভারের মতো ফসল পশুখাদ্য সরবরাহ এবং জমির উর্বরতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ায় ক্রমবর্ধমান শহরের জন্য খাদ্য জোগানো তুলনামূলক সহজ হয়। একই সঙ্গে কৃষকের আয় ও গ্রামীণ বাজারের সম্প্রসারণ কাপড়, সরঞ্জাম এবং অন্যান্য প্রস্তুত পণ্যের চাহিদা বাড়ায়।

তবে কৃষির পরিবর্তনের সামাজিক মূল্যও ছিল। জমি ঘের দেওয়ার প্রক্রিয়া বা এনক্লোজার অনেক এলাকায় যৌথ ব্যবহার ও প্রচলিত অধিকার সংকুচিত করে। কিছু ক্ষুদ্র চাষি ও ভূমিহীন পরিবার জীবিকার নিরাপত্তা হারায়। কিন্তু সবাই সরাসরি জমি ছেড়ে কারখানায় চলে গিয়েছিল—এমন সরল ব্যাখ্যা যথার্থ নয়। শহরমুখী শ্রমের প্রবাহে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, গ্রামীণ মজুরির অবস্থা এবং নতুন কাজের আকর্ষণও ভূমিকা রাখে। কৃষির উন্নতি ও গ্রামীণ বৈষম্য একই পরিবর্তনের পাশাপাশি চলা দুটি দিক ছিল।

ব্রিটেনের আরেকটি বড় সুবিধা ছিল কয়লা। কাঠ ও কাঠকয়লার ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিতে জ্বালানির সরবরাহ বাড়াতে বিপুল জমি দরকার হতো। কয়লা সেই সীমা অতিক্রম করার সুযোগ দেয়। উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ড, মিডল্যান্ডস এবং অন্যান্য অঞ্চলে কয়লার মজুত উৎপাদনকেন্দ্র ও পরিবহনপথের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। কয়লা শুধু ঘর গরম করার জ্বালানি থাকেনি; খনি, ধাতুশিল্প ও পরবর্তী সময়ে বাষ্পচালিত উৎপাদনের ভিত্তি হয়ে ওঠে। তবে কয়লা থাকলেই শিল্পবিপ্লব হতো না—তা উত্তোলন ও ব্যবহারের উপযোগী প্রযুক্তিও প্রয়োজন ছিল।

খনির গভীরে জমে থাকা পানি সরানোর প্রয়োজন সেই প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। টমাস নিউকোমেনের বায়ুমণ্ডলীয় ইঞ্জিন ১৭১২ সালে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়। প্রচুর জ্বালানি খরচ হলেও কয়লাখনির কাছে এটি উপযোগী ছিল। পরে জেমস ওয়াট পৃথক কনডেনসারের মাধ্যমে বাষ্প ইঞ্জিনের জ্বালানি সাশ্রয়ের পথ তৈরি করেন এবং ১৭৬৯ সালে সংশ্লিষ্ট পেটেন্ট নেন। ম্যাথিউ বোল্টনের সঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব প্রযুক্তির বিস্তার ঘটায়। ওয়াট বাষ্প ইঞ্জিনের প্রথম উদ্ভাবক ছিলেন না; তাঁর অবদান ছিল বিদ্যমান প্রযুক্তিকে অনেক বেশি কার্যকর ও ব্যবহারযোগ্য করে তোলা।

লোহা উৎপাদনেও পরিবর্তন ঘটছিল। ১৭০৯ সালে কোলব্রুকডেলে আব্রাহাম ডার্বি আকরিক গলাতে কোক ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পান। কয়লা থেকে প্রস্তুত কোক কাঠকয়লার বিকল্প হিসেবে লোহা উৎপাদনের সম্প্রসারণে সহায়তা করে। পরে চুল্লি, বায়ু সরবরাহ ও লোহা পরিশোধনের পদ্ধতিতে আরও উন্নতি আসে। বেশি লোহা মানে উন্নত যন্ত্রাংশ, খনির সরঞ্জাম এবং শক্তপোক্ত কাঠামো তৈরির সুযোগ। এভাবে কয়লা ও লোহা শিল্প একে অন্যের বাজার ও প্রযুক্তিগত চাহিদা বাড়াতে থাকে।

তবে শিল্পবিপ্লবের প্রথম দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটে তুলাবস্ত্রে। ব্রিটেনের উলশিল্প পুরোনো হলেও তুলার কাপড়ের বাজার দ্রুত বাড়ছিল। ভারতীয় সুতিবস্ত্রের সূক্ষ্মতা, রং ও নকশা ইউরোপীয় ক্রেতাদের আকৃষ্ট করেছিল। ব্রিটিশ উৎপাদকদের সামনে তাই ছিল প্রতিষ্ঠিত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার চাপ। ১৭৩৩ সালে জন কের ফ্লাইং শাটল তাঁত বোনার গতি বাড়ালে সুতার চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। উৎপাদনের একটি ধাপের উন্নতি অন্য ধাপের সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

এই চাপের মধ্যে ১৭৬০-এর দশকে জেমস হারগ্রিভসের স্পিনিং জেনি একসঙ্গে একাধিক সুতা কাটার সুযোগ দেয়। রিচার্ড আর্করাইটের ওয়াটার ফ্রেম শক্ত সুতা উৎপাদনে এবং স্যামুয়েল ক্রম্পটনের ১৭৭৯ সালের স্পিনিং মিউল সূক্ষ্ম সুতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়। জলশক্তিচালিত বড় যন্ত্র স্থাপনের জন্য উপযুক্ত ভবন, বিনিয়োগ ও সংগঠিত শ্রম দরকার পড়ে। ১৭৭১ সালে আর্করাইটের ক্রমফোর্ড কারখানা এই পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রথম দিকের অনেক সুতা কারখানার চালিকাশক্তি ছিল পানি; বাষ্পশক্তির প্রাধান্য ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়।

এত যন্ত্র, ভবন ও কাঁচামালের অর্থ কোথা থেকে এল? বাণিজ্য, কৃষিজ সম্পদ, স্থানীয় ঋণব্যবস্থা এবং ব্যবসার মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ব্যাংক, বিনিময় বিল ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ অর্থ লেনদেন সহজ করত। তবে সব উদ্যোক্তা লন্ডনের বড় ব্যাংক থেকে টাকা পাননি। পারিবারিক সঞ্চয়, অংশীদারত্ব এবং আঞ্চলিক ব্যবসায়িক সম্পর্কও শিল্প প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখে। প্রযুক্তিগত ধারণাকে লাভজনক উৎপাদনে পরিণত করার জন্য এই অর্থনৈতিক সংযোগ অত্যন্ত জরুরি ছিল।

ব্রিটেনের সামুদ্রিক বাণিজ্য ও ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণও এই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিদেশি বাজার প্রস্তুত পণ্য বিক্রির সুযোগ দেয়, আর সাম্রাজ্যিক ক্ষমতা বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জনে সাহায্য করে। আটলান্টিক অর্থনীতির দাসশ্রম, আবাদভিত্তিক উৎপাদন ও বাণিজ্য থেকে ব্রিটিশ ব্যবসার বিভিন্ন অংশ লাভবান হয়। আঠারো শতকের শেষ ও উনিশ শতকে দাসশ্রমে উৎপাদিত তুলা ব্রিটিশ কারখানার গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হয়ে ওঠে। তবে দাসবাণিজ্যের মুনাফাকেই শিল্পবিপ্লবের একমাত্র অর্থের উৎস বলা যেমন ভুল, এই শোষণমূলক সম্পর্ককে বাদ দেওয়াও তেমনি বিভ্রান্তিকর।

দেশের ভেতরের বাজারও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ব্রিটেনের তুলনামূলক সংযুক্ত বাজারে বড় পরিমাণ পণ্য বিক্রির সুযোগ ছিল। উপকূলীয় নৌপরিবহন, নদীপথ, উন্নত সড়ক ও খাল ভারী মাল বহনের খরচ কমায়। ১৭৬১ সালে ব্রিজওয়াটার খালের প্রথম অংশ চালু হয়ে ওয়ার্সলির কয়লাখনিকে ম্যানচেস্টারের সঙ্গে যুক্ত করে। সস্তায় কয়লা পৌঁছানো শহরের জ্বালানি সরবরাহ সহজ করে। শিল্পের বৃদ্ধি তাই শুধু কারখানার ভেতরের যন্ত্রের ওপর নির্ভর করেনি; কাঁচামাল আনা ও তৈরি পণ্য পাঠানোর ব্যবস্থাও বদলাতে হয়েছে।

প্রযুক্তি কাজে লাগানোর মতো দক্ষ মানুষের উপস্থিতিও ছিল জরুরি। ঘড়িনির্মাতা, ধাতুকর্মী, মিল নির্মাতা ও যন্ত্রকারিগরেরা সূক্ষ্ম অংশ তৈরি এবং যন্ত্র মেরামতে অভিজ্ঞ ছিলেন। ব্যবহারিক জ্ঞান কর্মশালা, শিক্ষানবিশি ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়াত। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও পরীক্ষার সংস্কৃতি সহায়ক হলেও অধিকাংশ প্রাথমিক যন্ত্র সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার থেকে আসেনি। পেটেন্ট উদ্ভাবনের ব্যবসায়িক মূল্য বাড়িয়েছিল, যদিও কখনো বিরোধ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের বাধাও সৃষ্টি করে। উদ্ভাবনের পাশাপাশি তা সংশোধন, চালানো ও মেরামত করার সামর্থ্যই শিল্পায়নকে টেকসই করেছিল।

কিছু অর্থনৈতিক ব্যাখ্যায় ব্রিটেনের তুলনামূলক উঁচু মজুরি ও সস্তা কয়লাকে শ্রম সাশ্রয়কারী যন্ত্রে বিনিয়োগের প্রণোদনা হিসেবে দেখা হয়। এই যুক্তির গুরুত্ব থাকলেও সব অঞ্চল ও শিল্পে তা সমানভাবে প্রযোজ্য ছিল না। চীন, ভারত ও নেদারল্যান্ডসেরও উন্নত উৎপাদন, বাজার ও কারিগরি দক্ষতা ছিল। ব্রিটেনের বিশেষত্ব ছিল কয়লা, বাজার, পুঁজি, দক্ষতা ও সাম্রাজ্যিক সুবিধার একটি কার্যকর সমন্বয়। সেই সমন্বয়ের মধ্যে মানুষ যখন ঘরের চরকা ছেড়ে কারখানার যন্ত্রের সামনে দাঁড়াল, তখন উৎপাদনের সঙ্গে সময়, পরিবার ও জীবিকার সম্পর্কও বদলাতে শুরু করল—শিল্পবিপ্লবের পরবর্তী ইতিহাস গড়ে উঠবে সেই পরিবর্তনকে ঘিরেই।


আপনার পছন্দ হতে পারে