আল্পস পর্বতমালা কীভাবে তৈরি হয়েছিল? আট দেশের পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস
প্রাচীন সমুদ্রের শিলা, ভূত্বকের সংঘর্ষ ও হিমবাহের ক্ষয়ে গড়ে উঠেছে আল্পস।
আল্পসের উঁচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের ইতিহাস পড়া যায়। কোথাও সামুদ্রিক পলি থেকে তৈরি চুনাপাথর, কোথাও গভীরে চাপা পড়ে বদলে যাওয়া শিলা, আবার কোথাও অপেক্ষাকৃত নতুন শিলার ওপর বসে আছে অনেক পুরোনো শিলাস্তর। এই আপাত অস্বাভাবিক বিন্যাসই আল্পসের জন্মের প্রমাণ। আজকের তুষারঢাকা পর্বতমালা একসময়কার সমুদ্রতল, মহাদেশের প্রান্ত এবং গভীর ভূত্বকের বিভিন্ন অংশকে একত্র করেছে। দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে পাতের চলাচল পর্বত তুলেছে, আর নদী ও হিমবাহ সেই পর্বতের চেহারা বদলেছে।
আল্পস অঞ্চল ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, মোনাকো, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, লিশটেনস্টাইন ও স্লোভেনিয়া—এই আট দেশের সঙ্গে যুক্ত। তবে প্রতিটি দেশে এর বিস্তার সমান নয়; আটটি দেশের সর্বত্র একই ধরনের উঁচু শৃঙ্গ রয়েছে, এমনও নয়। মোনাকোর মতো ছোট রাষ্ট্র আল্পস অঞ্চলের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত। রাজনৈতিক সীমানা এই পর্বতমালাকে ভাগ করেছে অনেক পরে। পাহাড়গুলোর জন্ম বোঝার জন্য বর্তমান দেশের মানচিত্রের বদলে কয়েক কোটি বছর আগের সমুদ্র ও ভূত্বকীয় পাতের বিন্যাস দেখতে হয়।
পৃথিবীর বাইরের শক্ত আবরণ একটানা অখণ্ড খোলস নয়। ভূত্বক ও তার নিচের কঠিন ম্যান্টলের ওপরের অংশ মিলে তৈরি এই আবরণ কয়েকটি বড় ও ছোট পাতে বিভক্ত। পাতগুলো অত্যন্ত ধীরে চললেও কয়েক কোটি বছরে তাদের অবস্থান ব্যাপকভাবে বদলে যায়। আল্পস গঠনে ইউরোপীয় ভূখণ্ড এবং আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্কিত আদ্রিয়াটিক ক্ষুদ্রপাত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু ‘আফ্রিকা ইউরোপকে ধাক্কা দিয়েছে’ বলা মূল ধারণা বোঝায়, কিন্তু ঘটনাটির পুরো জটিলতা তুলে ধরে না।
পর্বত তৈরির আগে এই ভূখণ্ডগুলোর মাঝখানে টেথিস ব্যবস্থার অন্তর্গত সামুদ্রিক অববাহিকা ছিল। বৃহৎ মহাদেশ ভেঙে ভূখণ্ড আলাদা হওয়ার সময় সেখানে সমুদ্রতল তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সেই তলদেশ ও মহাদেশীয় প্রান্তে কাদা, বালি এবং সামুদ্রিক জীবের চুনযুক্ত অবশেষ জমতে থাকে। চাপা পড়ে এসব পলি শক্ত শিলায় পরিণত হয়। আজ আল্পসের বহু চুনাপাথরের দেয়াল তাই প্রাচীন সমুদ্রের পরিবেশের সাক্ষ্য বহন করে। পাহাড়ের শিলা এবং পাহাড়ের বর্তমান আকৃতি একই সময়ে তৈরি হয়নি।
পরবর্তী পর্যায়ে পাতগুলোর আপেক্ষিক চলাচল বদলে সমুদ্র সংকুচিত হতে শুরু করে। সমুদ্রীয় ভূত্বকসহ ঘন শিলামণ্ডলের অংশ অন্য পাতের নিচে প্রবেশ করে পৃথিবীর গভীরে নামতে থাকে। এই প্রক্রিয়ার নাম অধোগমন। সমুদ্রের তলদেশের বড় অংশ নিচে চলে গেলেও কিছু শিলা ও পলি ওপরের ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। ফলে সমুদ্র হারিয়ে যাওয়ার অর্থ তার প্রতিটি চিহ্ন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া নয়। সেই প্রাচীন পরিবেশের অংশবিশেষ পরবর্তী পর্বতমালার মধ্যে সংরক্ষিত থাকে।
সমুদ্রীয় অঞ্চল যথেষ্ট সংকুচিত হওয়ার পর ইউরোপীয় ও আদ্রিয়াটিক মহাদেশীয় অংশ মুখোমুখি হয়। প্রায় সাড়ে তিন কোটি থেকে তিন কোটি বছর আগের সময়টি আল্পসের মহাদেশীয় সংঘর্ষের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। তবে পুরো পর্বতমালায় সব ঘটনা একই দিনে কিংবা একই ক্রমে ঘটেনি। পশ্চিম, মধ্য ও পূর্ব আল্পসের ইতিহাসে পার্থক্য রয়েছে। মহাদেশীয় ভূত্বক তুলনামূলক হালকা হওয়ায় সমুদ্রীয় অংশের মতো সহজে সম্পূর্ণ নিচে ডুবে যায় না। তার পরিবর্তে ভূত্বক বিকৃত, সংক্ষিপ্ত ও পুরু হতে থাকে।
এই বিকৃতির মধ্যে শিলাস্তর ভাঁজ খায়, ভাঙে এবং বড় চ্যুতি বরাবর এক অংশ অন্য অংশের ওপর উঠে যায়। বিশাল শিলাপুঞ্জ কখনো জন্মস্থল থেকে বহু দূর সরে আসে। এমন স্থানান্তরিত শিলাপুঞ্জকে ভূতত্ত্বে ন্যাপ বলা হয়। ফলে আল্পসকে শুধু কুঁচকে যাওয়া একটি সমতল শিলাচাদর হিসেবে ভাবলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে। এর গঠনে ভাঁজের পাশাপাশি শিলাস্তরের বড় পরিসরের স্থানান্তর ও স্তূপীকরণ অপরিহার্য। বর্তমান পাহাড়ের ভেতরে তাই বিভিন্ন উৎস ও বয়সের শিলা পাশাপাশি থাকতে পারে।
সুইজারল্যান্ডের সারডোনা অঞ্চলে এই স্থানান্তরের অসাধারণ প্রমাণ দেখা যায়। গ্লারুস অধিচ্যুতি বরাবর প্রায় পঁচিশ থেকে ত্রিশ কোটি বছরের পুরোনো শিলা অপেক্ষাকৃত নবীন, প্রায় সাড়ে তিন থেকে পাঁচ কোটি বছরের শিলার ওপর রয়েছে। স্বাভাবিক পলি সঞ্চয়ে সাধারণত পুরোনো স্তরের ওপর নতুন স্তর জমে। এখানে তার উল্টো বিন্যাস দেখায় যে শিলাগুলো পরে সরেছে। ভূবিজ্ঞানীরা দৃশ্যমান সংযোগরেখা, শিলার বয়স ও গঠন বিশ্লেষণ করে সেই স্থানান্তরের ইতিহাস পুনর্গঠন করতে পারেন।
গভীরে চাপা পড়া শিলায় আরেক ধরনের পরিবর্তন ঘটে। তাপমাত্রা ও চাপ বাড়লে শিলা সম্পূর্ণ গলে না গিয়েও তার খনিজ ও বুনট বদলাতে পারে। একে রূপান্তর বলে। আল্পসের কিছু শিলা এমন গভীর পরিবেশের সাক্ষ্য দেয়, যেখানে তারা বর্তমান অবস্থানের অনেক নিচে ছিল। পরে ভূত্বকের চলাচল, উত্থান এবং ওপরের শিলার ক্ষয়ের ফলে সেগুলো পৃষ্ঠের কাছে এসেছে। পর্বতে পাওয়া বিভিন্ন খনিজ তাই শুধু উপাদানের পরিচয় দেয় না; শিলা কত গভীরে গিয়েছিল, তারও সূত্র দেয়।
উঁচু পর্বত তৈরি হওয়াকে কেবল পাশ থেকে ঠেলে শিলা স্তূপ করার ফল বললেও ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ থাকে। ভূত্বকের পুরু হওয়া, হালকা ভূত্বকের ভাসমানতা এবং নিচে ডুবে যাওয়া ঘন শিলামণ্ডলের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত মধ্য আল্পসের উত্থানে গভীরের বিভিন্ন অংশ আলাদা হওয়া ও সরে যাওয়ার ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। এই প্রক্রিয়াগুলোর আপেক্ষিক গুরুত্ব অঞ্চলভেদে বদলায়। তাই আল্পসের একটি অংশের ব্যাখ্যাকে পুরো পর্বতমালার জন্য হুবহু প্রয়োগ করা যায় না।
পর্বত ওপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ও শুরু হয়েছে। বৃষ্টি, নদী, তুষার, বরফ ও ভূমিধস শিলা সরিয়ে নিচু অঞ্চলে নিয়ে গেছে। বরফযুগগুলোতে বিশাল হিমবাহ উপত্যকা দিয়ে ধীরে প্রবাহিত হয়েছে। বরফের সঙ্গে থাকা পাথর তলদেশ ঘষেছে এবং কোথাও শিলা উপড়ে নিয়েছে। এতে বহু উপত্যকা চওড়া ও গভীর হয়েছে, কোথাও ইংরেজি অক্ষরের মতো প্রশস্ত তলবিশিষ্ট আকৃতি পেয়েছে। তীক্ষ্ণ শৃঙ্গ ও ধারালো পর্বতশিরা গঠনে একাধিক দিক থেকে হিমবাহের ক্ষয়ও ভূমিকা রেখেছে।
ক্ষয়ে সরিয়ে নেওয়া পদার্থ হারিয়ে যায়নি। আল্পসের উত্তরের অববাহিকায় এবং দক্ষিণের পো সমভূমির নিচে বিপুল পলি জমেছে। পাহাড়ের শিলা থেকে তৈরি এসব পলি উত্থান ও ক্ষয়ের ইতিহাস সংরক্ষণ করে। ক্ষয়ে ওপরের ভার কমলে ভূত্বক ভাসমান ভারসাম্য পুনঃস্থাপনের অংশ হিসেবে আরও উঠতে পারে। ফলে ক্ষয় শুধু পাহাড় নিচু করার প্রক্রিয়া নয়; কিছু পরিস্থিতিতে এটি ভূত্বকের প্রতিক্রিয়ামূলক উত্থানের সঙ্গেও যুক্ত থাকে।
আল্পস এখনো পরিবর্তনশীল। কোথাও ভূমির উচ্চতা বাড়ছে, একই সঙ্গে ক্ষয় ও ভূমিধসে পদার্থ সরে যাচ্ছে। নিচের শিলায় সঞ্চিত চাপ মুক্ত হলে ভূমিকম্পও ঘটে। তাই ভূত্বকের উত্থানের হার এবং চূড়ার প্রকৃত উচ্চতা বৃদ্ধির হার এক বিষয় নয়। আজকের আল্পসকে বুঝতে তিনটি ইতিহাস একসঙ্গে পড়তে হয়: প্রাচীন সমুদ্রে শিলা তৈরির ইতিহাস, পাতের চলাচলে সেই শিলাকে ওপরে তোলার ইতিহাস এবং বরফ ও পানির হাতে বর্তমান ভূদৃশ্য গড়ে ওঠার ইতিহাস।
ফরাসি বিপ্লবের সন্ত্রাসের রাজত্ব: রোবসপিয়ের, ভঁদে বিদ্রোহ ও গিলোটিন
জ্যাকোবিন ও জিরোন্দিনদের দ্বন্দ্ব: দান্তোঁ, মারা ও রোবসপিয়েরের ভূমিকা
ষোড়শ লুই ও মেরি আঁতোয়ানেতের মৃত্যুদণ্ড: বিচার ও গিলোটিনের ইতিহাস
ফরাসি বিপ্লবের যুদ্ধ ও রাজতন্ত্রের পতন: ১৭৯২ সালে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা
ফরাসি বিপ্লবে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র: গির্জার সংস্কার, ভারেন ও ১৭৯১ সালের সংবিধান
গ্রেট ব্লু হোল: বেলিজের সমুদ্রে বিশাল নীল গর্তটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল?