বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ভাস্কো দা গামার ভারত অভিযান: ১৪৯৮ সালে কালিকটে পৌঁছানোর ইতিহাস

সিরিজ: আবিষ্কারের যুগ: সমুদ্র অভিযান ও নতুন বিশ্বের সন্ধান

ভাস্কো দা গামার ভারত অভিযান: ১৪৯৮ সালে কালিকটে পৌঁছানোর ইতিহাস
কালিকটে দা গামার আগমন ইউরোপ-এশিয়ার সমুদ্রবাণিজ্যে নতুন সংযোগ ও সংঘাতের সূচনা করে।

টরডেসিলাসের চুক্তিপত্রে সমুদ্রপারের দাবির সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল, কিন্তু ভারতের বন্দরে পৌঁছানোর কাজ তখনও বাকি। বার্তোলোমেউ দিয়াশ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে পথের সম্ভাবনা দেখিয়েছিলেন; এবার সেই পথ ধরে আরও উত্তরে, তারপর বিশাল সমুদ্র পেরিয়ে ভারত যেতে হবে। ৮ জুলাই ১৪৯৭ সালে ভাস্কো দা গামার নেতৃত্বে চারটি জাহাজ লিসবন ছাড়ে। পর্তুগালের কয়েক দশকের উপকূল অনুসন্ধান এবার এমন এক অভিযানে রূপ নেয়, যার লক্ষ্য ছিল এশিয়ার মসলার বাজারে সরাসরি প্রবেশ।

এই উদ্যোগের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন রাজা প্রথম মানুয়েল। দ্বিতীয় জোয়াওয়ের আমলে গড়ে ওঠা পরিকল্পনা তিনি এগিয়ে নেন। উদ্দেশ্য শুধু ভারত দেখা নয়; বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন, সম্ভাব্য খ্রিস্টান মিত্র খোঁজা এবং পর্তুগালের মর্যাদা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে দা গামা ভারত আবিষ্কার করেননি। ভারত ইউরোপীয়দের কাছে পরিচিত ছিল, আর ভারত মহাসাগরে বহু শতাব্দী ধরে বাণিজ্য চলছিল। তাঁর সাফল্য ছিল পশ্চিম ইউরোপ থেকে আফ্রিকা ঘুরে ভারতে পৌঁছানো এবং ফিরে আসার সমুদ্রপথ বাস্তবে সম্পন্ন করা।

বহরের প্রধান জাহাজ ছিল সাঁও গাব্রিয়েল; সঙ্গে ছিল সাঁও রাফায়েল, ছোট ক্যারাভেল বেরিও এবং একটি রসদবাহী জাহাজ। দা গামার ভাই পাওলো সাঁও রাফায়েলের নেতৃত্বে ছিলেন। আগের উপকূল অনুসন্ধানের তুলনায় এবার দীর্ঘ যাত্রা ও বেশি রসদ বহনের প্রয়োজন ছিল। তাই বহরের বড় জাহাজগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়। অভিযানটি একজন অধিনায়কের সাহসের পাশাপাশি অভিজ্ঞ নৌপরিচালক, জাহাজনির্মাতা এবং রাজকীয় প্রস্তুতির সম্মিলিত ফল।

কেপ ভার্দে অঞ্চলের পর বহর আফ্রিকার তীর ঘেঁষে দক্ষিণে যাওয়ার বদলে আটলান্টিকের অনেকটা ভেতর দিয়ে ঘুরে এগোয়। উদ্দেশ্য ছিল উপকূলীয় প্রতিকূল বাতাস এড়িয়ে দক্ষিণের অনুকূল বায়ুপ্রবাহ ধরা। এই পথ দেখতে দীর্ঘ হলেও নৌচলাচলে কার্যকর ছিল। ‘ভোল্তা দু মার’ কৌশল ও আটলান্টিকের বাতাস সম্পর্কে সঞ্চিত জ্ঞান অভিযানে কাজে লাগে। দীর্ঘ সময় স্থলভাগ না দেখে চলা অবশ্য নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক সহনশীলতার কঠিন পরীক্ষা নেয়।

১৪৯৭ সালের নভেম্বরে বহর উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে আফ্রিকার দক্ষিণ উপকূল ধরে এগোয়। দিয়াশের অভিজ্ঞতা এখন পথনির্দেশের ভিত্তি, কিন্তু তাঁর ফেরার সীমা অতিক্রম করার পর নতুন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছিল। জাহাজ মেরামত, পানীয় জল সংগ্রহ এবং অসুস্থ নাবিকদের সামলাতে বিরতি দরকার হতো। দীর্ঘদিন সংরক্ষিত খাবারের ওপর নির্ভরতা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। পরে যে রোগ স্কার্ভি হিসেবে শনাক্ত হবে, তার ভয়াবহ লক্ষণ অভিযাত্রীদের দুর্বল করে তোলে।

পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে পৌঁছে পর্তুগিজরা এক সুপ্রতিষ্ঠিত সামুদ্রিক জগতের মুখোমুখি হয়। মোজাম্বিক, মোম্বাসা ও মালিন্দির মতো বন্দর আরব, পারস্য ও ভারতের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এখানকার বণিকেরা পণ্য, সংবাদ এবং নৌজ্ঞান আদান-প্রদান করতেন। ফলে দা গামার বহর কোনো বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে সভ্যতার প্রথম যোগাযোগ আনেনি। তারা এমন এক বাণিজ্যব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল, যার নিয়ম ও রাজনৈতিক সম্পর্ক তাদের কাছে অপরিচিত ছিল।

মোজাম্বিক ও মোম্বাসায় সম্পর্ক সন্দেহ এবং উত্তেজনায় জটিল হয়। পরিচয়, ধর্ম ও উদ্দেশ্য নিয়ে ভুল বোঝাবুঝিও ছিল। মালিন্দিতে তুলনামূলক সহযোগিতা পাওয়া যায়; স্থানীয় শাসকের নিজস্ব আঞ্চলিক স্বার্থও এর পেছনে কাজ করেছিল। সেখান থেকে বহর ভারতযাত্রার জন্য একজন দক্ষ পথপ্রদর্শক পায়। তাঁকে বিখ্যাত আরব নাবিক আহমদ ইবন মাজিদ বলে চিহ্নিত করার জনপ্রিয় কাহিনি নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য নয়; তাঁর পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন বিবরণ রয়েছে।

এই পথপ্রদর্শকের সহায়তা ছিল নির্ণায়ক। আরব সাগর পার হওয়ার জন্য শুধু পূর্বদিকে জাহাজ চালালেই চলত না; মৌসুমি বাতাস, সমুদ্রের অবস্থা এবং গন্তব্য উপকূল সম্পর্কে জ্ঞান দরকার ছিল। এপ্রিলের শেষদিকে মালিন্দি ছেড়ে বহর অনুকূল মৌসুমি বায়ু কাজে লাগিয়ে এগোয়। পর্তুগিজদের আটলান্টিক অভিজ্ঞতা এবং ভারত মহাসাগরীয় নাবিকদের স্থানীয় জ্ঞানের মিলনেই এই পর্যায়ের যাত্রা সফল হয়। অভিযানকে কেবল ইউরোপীয় প্রযুক্তির একক বিজয় বলা তাই অসম্পূর্ণ।

২০ মে ১৪৯৮ সালে বহর কালিকটের কাছে ভারতীয় উপকূলে পৌঁছায়। বর্তমান কেরালার কোঝিকোড় তখন মালাবারের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র। গোলমরিচসহ বিভিন্ন পণ্য সেখানে কেনাবেচা হতো; দেশীয় ও বিদেশি বণিকের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। ইউরোপীয় জাহাজের আগমন তাই স্থানীয় বাণিজ্যের সূচনা নয়। পরিবর্তনটি ছিল, আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে আসা একটি নতুন রাজকীয় বাণিজ্যিক শক্তি এই প্রতিষ্ঠিত বাজারে প্রবেশ করতে চাইছিল।

কালিকটের শাসককে পর্তুগিজরা জামোরিন নামে চিনত; স্থানীয় উপাধি ছিল সামূতিরি। দা গামা তাঁর দরবারে বাণিজ্যের সুযোগ চান। কিন্তু সঙ্গে আনা সাধারণ কাপড়, টুপি, চিনি ও অন্যান্য সামগ্রী সমৃদ্ধ ভারত মহাসাগরীয় বাজারের মান অনুযায়ী বিশেষ আকর্ষণীয় ছিল না। রাজকীয় প্রতিনিধিদলের উপহার হিসেবেও সেগুলো যথেষ্ট মর্যাদাপূর্ণ মনে হয়নি। এই অস্বস্তি দেখায়, সম্ভাব্য বাজারের সম্পদ সম্পর্কে পর্তুগিজদের ধারণা থাকলেও তার ক্রয়ক্ষমতা ও দরবারি প্রত্যাশা সম্পর্কে প্রস্তুতি সীমিত ছিল।

ধর্মীয় বোঝাপড়াতেও বিভ্রান্তি দেখা দেয়। খ্রিস্টান মিত্র খোঁজার প্রত্যাশা থেকে পর্তুগিজরা হিন্দু আচার ও উপাসনালয়কে কখনো খ্রিস্টীয় ধারণার সঙ্গে মিলিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম বণিকদের একটি অংশ নতুন প্রতিযোগীদের সন্দেহের চোখে দেখছিল। তবে বিরোধকে শুধু ধর্মীয় শত্রুতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বন্দরশুল্ক, বাণিজ্যিক স্বার্থ, উপহারের মান এবং দা গামার আচরণের ভূমিকা আড়াল হয়। স্থানীয় শাসকও নিজের বন্দর ও আয়ের স্বার্থ রক্ষা করতে চাইছিলেন।

আলোচনা থেকে পর্তুগিজদের প্রত্যাশিত দৃঢ় বাণিজ্যিক ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। শুল্ক ও পণ্য নিয়ে বিরোধ, লোক আটকে রাখা এবং পাল্টা জিম্মি করার ঘটনা সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। কিছু মসলা সংগ্রহ করা গেলেও প্রথম অভিযানকে নির্বিঘ্ন বাণিজ্যিক বিজয় বলা যায় না। দা গামা বুঝেছিলেন যে এশীয় বাজারে পৌঁছানো এবং সেখানে সুবিধাজনক অবস্থান অর্জন এক বিষয় নয়। কালিকটের ব্যবসায়ীদের পর্তুগিজদের প্রয়োজন ছিল অনেক কম, পর্তুগিজদের মসলার প্রয়োজনের তুলনায়।

ফেরার যাত্রা আরও কঠিন হয়। অনুকূল মৌসুমের সুবিধা না পাওয়ায় আরব সাগর অতিক্রমে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগে। স্কার্ভি ও অন্যান্য দুর্ভোগে বহু নাবিক মারা যান। জনবল এত কমে যায় যে পূর্ব আফ্রিকায় সাঁও রাফায়েল পরিত্যাগ করে ধ্বংস করতে হয়। বহরের অবশিষ্ট জাহাজগুলো পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পর্তুগালে ফেরে। ১৪৯৯ সালে দা গামা নিজেও দেশে পৌঁছান; পথে তাঁর ভাই পাওলোর মৃত্যু অভিযানের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে আরও গভীর করে।

রাজা মানুয়েলের কাছে অবশ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছিল পথটির কার্যকারিতা। ভারতীয় বাজারে পৌঁছানো যায় এবং সেখান থেকে পণ্য নিয়ে ফেরা সম্ভব—এটি এখন প্রমাণিত। এরপর নিয়মিত বহর পাঠানো, বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন এবং নৌসামরিক শক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ বাড়ে। ১৪৯৮ সালে পুরোনো লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্য হঠাৎ বন্ধ হয়নি, কিন্তু তার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী কেপ-পথ প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। পরিবর্তনটি ছিল দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সূচনা।

দা গামার প্রথম যাত্রা তাই একই সঙ্গে নৌসাফল্য এবং অসম্পূর্ণ বাণিজ্যিক সমঝোতার ইতিহাস। ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগ ঘনিষ্ঠ হলেও পরবর্তী পর্তুগিজ অভিযানে জোরপূর্বক বাণিজ্য, নৌযুদ্ধ ও সহিংসতা বাড়বে। কালিকটে পৌঁছানো জাহাজগুলো নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি নতুন সংঘাতও এনেছিল। এবার লিসবনের সামনে প্রশ্ন, এই সমুদ্রপথে শুধু পণ্য আদান-প্রদান হবে, নাকি কামানের শক্তিতে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা হবে? পরবর্তী বহরগুলোর অভিযানেই তার উত্তর স্পষ্ট হতে থাকবে।