এলবা থেকে প্রত্যাবর্তন ও হান্ড্রেড ডেজ: নেপোলিয়নের আবার ক্ষমতা দখল
সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন
এলবার নির্বাসন থেকে প্যারিসের সিংহাসনে ফিরতে নেপোলিয়নের লেগেছিল কয়েক সপ্তাহ।
এলবায় নির্বাসন নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যিক শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়েছিল, কিন্তু ফ্রান্সের রাজনীতি থেকে তাঁর উপস্থিতি মুছে দেয়নি। দ্বীপে তিনি ছোট প্রশাসন, খনি, রাস্তা ও সৈন্যদের নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও মূল ভূখণ্ডের সংবাদ অনুসরণ করছিলেন। ফন্তেনব্লোর চুক্তিতে প্রতিশ্রুত অর্থ নিয়মিত পৌঁছায়নি, স্ত্রী মারি লুইজ ও পুত্রও তাঁর সঙ্গে যোগ দেননি। তাঁকে আরও দূরে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ফ্রান্সে বুরবোঁ রাজতন্ত্রের প্রতি অসন্তোষের খবর। নেপোলিয়ন বুঝতে পারেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ একই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত দাবি করছে।
অষ্টাদশ লুইয়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠিত সরকার পুরোনো ব্যবস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনেনি। ১৮১৪ সালের সনদে আইনগত সমতা, সম্পত্তির অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের কিছু কাঠামো স্বীকৃত ছিল। কিন্তু রাজদরবারের ভাষা, ফিরে আসা অভিজাতদের আচরণ এবং শ্বেত পতাকার পুনর্ব্যবহার বহু সৈন্য ও বিপ্লবসমর্থকের কাছে পরাজয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিপ্লবের সময় কেনা জমি ফেরত দিতে হবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ ছিল। সরকার সব উদ্বেগের সমর্থনে ব্যবস্থা না নিলেও সন্দেহ ও গুজব তার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করছিল।
সেনাবাহিনীর অসন্তোষ ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ যুদ্ধশেষে বাহিনী ছোট করা হয়; বহু কর্মকর্তা অর্ধবেতনে বা কার্যত কর্মহীন অবস্থায় পড়েন। নেপোলিয়নের অধীনে অর্জিত মর্যাদা ও উন্নতির সুযোগ হারানোর অনুভূতি তাঁদের ক্ষুব্ধ করে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অনেকে শান্তি চেয়েছিলেন এবং নতুন যুদ্ধের আশঙ্কায় সম্রাটের প্রত্যাবর্তন নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ফলে ফ্রান্স সর্বসম্মতভাবে তাঁকে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় ছিল না। তাঁর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল রাজতন্ত্রের সীমিত সামাজিক ভিত্তি এবং সেনাবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের আবেগপূর্ণ আনুগত্য থেকে।
১৮১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নেপোলিয়ন প্রায় এক হাজার অনুসারী নিয়ে এলবা ছাড়েন। ছোট জাহাজ ইনকোঁস্তাঁসহ কয়েকটি নৌযানে অভিযানটি পরিচালিত হয়। দ্বীপ পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ব্রিটিশ কর্মকর্তা নীল ক্যাম্পবেল তখন অনুপস্থিত ছিলেন, যা সুযোগ তৈরি করে। এটি সুরক্ষিত কারাগারের দেয়াল ভেঙে পালানো ছিল না; সীমিত স্বাধীনতা ও নিজস্ব রক্ষীবাহিনী থাকা একজন নির্বাসিত শাসক নিজের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙে ফ্রান্সে ফিরছিলেন। ঝুঁকি ছিল বিপুল: উপকূলে আটক হলে তাঁর ছোট বাহিনী দীর্ঘ প্রতিরোধ করতে পারত না।
১ মার্চ তাঁরা দক্ষিণ ফ্রান্সের গলফ-জুয়ানে অবতরণ করেন। নেপোলিয়ন উপকূলের শক্ত রাজতন্ত্রী এলাকাগুলো এড়িয়ে পাহাড়ি পথ ধরে উত্তরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আঁতিবে তাঁর পাঠানো একটি ছোট দল আটক হয়, যা দেখায় প্রত্যাবর্তন সর্বত্র বাধাহীন ছিল না। তিনি গ্রাস, দিন ও গাপের দিক দিয়ে এগিয়ে গ্রেনোবলের পথ ধরেন। এই যাত্রায় সামরিক শক্তির চেয়ে রাজনৈতিক গতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সরকার বড় বাহিনী সংগঠিত করার আগেই নিজের উপস্থিতিকে সৈন্য ও জনতার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলাই ছিল তাঁর প্রধান কৌশল।
৭ মার্চ লাফ্রের কাছে তাঁকে থামাতে পাঠানো সৈন্যদের সঙ্গে বিখ্যাত মুখোমুখি অবস্থান ঘটে। নেপোলিয়ন সামনে এগিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে তাদের আনুগত্যের আবেদন জানান। তাঁর কোট খুলে বুক দেখানো এবং তাঁকে গুলি করার আহ্বানের নাটকীয় বিবরণ বিভিন্ন স্মৃতিচারণে কিছুটা ভিন্নভাবে এসেছে। নিশ্চিত বিষয় হলো, সৈন্যরা তাঁর বিরুদ্ধে গুলি চালায়নি এবং তাঁর সঙ্গে যোগ দেয়। ব্যক্তিগত উপস্থিতি, পুরোনো সামরিক স্মৃতি ও নেতৃত্বের দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করেছিল। সরকার যে অস্ত্র দিয়ে তাঁকে আটকাতে চেয়েছিল, সেই অস্ত্রই তাঁর শক্তি বাড়ায়।
গ্রেনোবলে প্রবেশের সঙ্গে প্রত্যাবর্তন নতুন গতি পায়। কর্নেল লাবেদোয়াইয়েরের নেতৃত্বে সপ্তম পদাতিক রেজিমেন্ট তাঁর পক্ষে আসে। এরপর লিয়োঁতেও কার্যকর প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। প্রতিটি সফল অগ্রযাত্রা পরের অবস্থানের সৈন্যদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছিল। রাজকীয় সরকারের নির্দেশ মানার ঝুঁকি বাড়ছিল, কারণ আশপাশের ইউনিটগুলো সম্রাটের দিকে চলে যাচ্ছিল। এই ঘটনাপ্রবাহকে নিছক ব্যক্তিগত জাদু হিসেবে দেখলে সংগঠনগত সংকট আড়াল হয়: সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা দুর্বল হলে সেনাবাহিনীর আনুগত্যও দ্রুত বদলাতে পারে।
মার্শাল নে প্রথমে রাজতন্ত্রের পক্ষে নেপোলিয়নকে আটকাতে বের হন। পরে পরিস্থিতি ও সৈন্যদের মনোভাব দেখে ১৪ মার্চ তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। এই পক্ষ পরিবর্তন রাজকীয় প্রতিরোধের জন্য বড় আঘাত ছিল। অষ্টাদশ লুইয়ের সরকার এখন বুঝতে পারে, রাজধানীর দিকে এগিয়ে আসা বাহিনীকে নির্ভরযোগ্যভাবে থামানোর শক্তি তার হাতে নেই। ১৯ মার্চ রাতে রাজা প্যারিস ত্যাগ করেন। পরদিন সন্ধ্যায় নেপোলিয়ন তুইলেরি প্রাসাদে প্রবেশ করেন। একটি বড় যুদ্ধ ছাড়াই তিনি ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা পুনর্দখল করেন।
তবে প্যারিসে প্রবেশ মানেই দেশ ও ইউরোপে তাঁর কর্তৃত্ব নিরাপদ হওয়া নয়। পশ্চিম ফ্রান্সে রাজতন্ত্রী প্রতিরোধ ছিল, রাজনৈতিক অভিজাতদের অনেকেই সন্দিহান ছিলেন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধভীতি প্রবল ছিল। ‘হান্ড্রেড ডেজ’ বা ‘শত দিবস’ সাধারণত ২০ মার্চ তাঁর প্যারিসে প্রত্যাবর্তন থেকে ৮ জুলাই অষ্টাদশ লুইয়ের দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তনের মধ্যবর্তী সময়কে বোঝায়; নামটি আক্ষরিক একশ দিনের নির্ভুল হিসাব নয়। এই সময়ে নেপোলিয়নের প্রধান সমস্যা ছিল ক্ষমতা পাওয়ার চেয়ে সেই ক্ষমতার গ্রহণযোগ্যতা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা।
নতুন সমর্থন পেতে তিনি আগের একচ্ছত্র শাসন থেকে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেন। উদারপন্থী চিন্তাবিদ বঁজামাঁ কঁস্তাঁর সহযোগিতায় এপ্রিলের অতিরিক্ত সাংবিধানিক আইন প্রস্তুত হয়। এতে দুই কক্ষের আইনসভা, নাগরিক অধিকারের স্বীকৃতি এবং মন্ত্রীদের দায়বদ্ধতার কিছু বিধান রাখা হয়। কিন্তু সম্রাট গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ধরে রাখেন এবং ভোটাধিকারের সীমাও ছিল। গণভোটে অনুমোদন এলেও অংশগ্রহণ কম হয়। অনেকে তাঁর পরিবর্তনের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ করছিলেন। পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের উদারপন্থী প্রতিশ্রুতি তাই সহজে বিশ্বাস অর্জন করতে পারেনি।
ইউরোপীয় শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল আরও কঠোর। ভিয়েনায় সমবেত প্রতিনিধিরা ১৩ মার্চ নেপোলিয়নকে ইউরোপীয় শান্তির জন্য হুমকি ঘোষণা করেন। ২৫ মার্চ ব্রিটেন, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া ও প্রুশিয়া নতুন সামরিক অঙ্গীকার করে। নেপোলিয়ন শান্তির বার্তা পাঠিয়ে বিদ্যমান সীমান্ত মেনে নেওয়ার ইচ্ছা জানালেও প্রতিপক্ষ তাঁর ব্যক্তিগত শাসনকে গ্রহণ করতে রাজি ছিল না। আগের অভিজ্ঞতায় তারা মনে করছিল, তাঁর ক্ষমতায় থাকা মানেই ভবিষ্যতে নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি। ফ্রান্সে দ্রুত সাফল্য তাই আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা দূর করতে পারেনি।
সামরিক প্রস্তুতিও সহজ ছিল না। নেপোলিয়ন পুরোনো সৈন্য ফিরিয়ে আনেন, নিয়োগ ও অস্ত্রসংগ্রহ বাড়ান এবং উত্তরাঞ্চলে প্রধান বাহিনী গড়েন। কিন্তু সময় কম, অর্থ সীমিত এবং সব সীমান্তে প্রতিপক্ষ জমায়েত হচ্ছিল। পশ্চিমের বিদ্রোহ দমনেও সৈন্য রাখতে হয়। মিত্রদের সম্পূর্ণ বাহিনী একত্র হওয়ার আগে আঘাত করাই তাঁর কাছে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পথ মনে হয়। বেলজিয়ামে ওয়েলিংটনের বহুজাতিক বাহিনী এবং ব্ল্যুশারের প্রুশীয় বাহিনীকে আলাদা করে পরাজিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পর এবার পুরোনো সামরিক পদ্ধতির ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছিল।
এলবা থেকে প্যারিসের যাত্রা নেপোলিয়নের ব্যক্তিগত আকর্ষণ ও বুরবোঁ সরকারের দুর্বলতার অসাধারণ প্রকাশ। কিন্তু সেই যাত্রা ফ্রান্সের সব বিভাজন দূর করেনি, কিংবা মিত্রদের যুদ্ধের প্রস্তুতি থামায়নি। সৈন্যদের আনুগত্য তাঁকে রাজধানীতে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিল; ইউরোপকে তাঁর শাসন মেনে নিতে বাধ্য করার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। জুনে তিনি উত্তর সীমান্ত অতিক্রম করবেন, আশা করবেন দ্রুত বিজয়ে পরিস্থিতি বদলানোর। লিনিয়ের সাফল্য ও কাত্র ব্রার লড়াই পেরিয়ে সেই শেষ চেষ্টা পৌঁছাবে ওয়াটারলুর মাঠে—যেখানে তাঁর পুনরুদ্ধার করা ক্ষমতার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।
বার্তোলোমেউ দিয়াশের অভিযান: ১৪৮৮ সালে উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম
পর্তুগালের সমুদ্র অভিযান: প্রিন্স হেনরি ও আফ্রিকার উপকূল অনুসন্ধান
আবিষ্কারের যুগের সূচনা: ইউরোপীয়রা কেন নতুন সমুদ্রপথ খুঁজেছিল?
লাইপজিগের যুদ্ধ: ‘ব্যাটল অব দ্য নেশনস’-এ যেভাবে ভাঙে নেপোলিয়নের আধিপত্য
নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান: বোরোদিনো, মস্কোর আগুন ও গ্র্যান্ড আর্মির ধ্বংস
ওয়াগ্রামের যুদ্ধ ও নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যের শিখর: ১৮০৯–১১ সালের ইউরোপ