বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বার্তোলোমেউ দিয়াশের অভিযান: ১৪৮৮ সালে উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম

সিরিজ: আবিষ্কারের যুগ: সমুদ্র অভিযান ও নতুন বিশ্বের সন্ধান

বার্তোলোমেউ দিয়াশের অভিযান: ১৪৮৮ সালে উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম
আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত পেরিয়ে দিয়াশ উন্মোচন করেন ভারতমুখী সমুদ্রপথের সম্ভাবনা।

দিয়োগো কাঁওয়ের অভিযানের পর পর্তুগিজদের কাছে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল আর আগের মতো অপরিচিত ছিল না। কিন্তু দীর্ঘ তীররেখা কোথায় শেষ হয়েছে, মহাদেশটি ঘুরে পূর্বের সমুদ্রে যাওয়া সম্ভব কি না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তখনও মেলেনি। দক্ষিণ আটলান্টিকের ঝড়ের মধ্যে বার্তোলোমেউ দিয়াশের জাহাজগুলো সেই উত্তর খুঁজতে এগিয়ে যায়। ১৪৮৮ সালে তাঁর অভিযান প্রথম নথিভুক্ত ইউরোপীয় সমুদ্রযাত্রা হিসেবে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগরের জলভাগে পৌঁছায়। ভারতে পৌঁছানো তখনও বাকি, কিন্তু একটি মৌলিক ভৌগোলিক বাধা অতিক্রান্ত হয়।

এই অভিযানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন পর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় জোয়াও। তাঁর শাসনে আফ্রিকা অনুসন্ধান শুধু নতুন উপকূল চেনার উদ্যোগ ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল এশিয়ার বাণিজ্যে প্রবেশের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। পশ্চিম আফ্রিকার সোনা থেকে আয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভারতীয় মসলা ও পূর্বের বাজারের আকর্ষণ ছিল আরও বিস্তৃত। আফ্রিকাকে ঘুরে সেখানে পৌঁছানো গেলে পর্তুগাল ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠিত মধ্যস্থতাকারীদের পাশ কাটিয়ে সরাসরি যোগাযোগ গড়তে পারত।

দ্বিতীয় জোয়াও একই সময়ে স্থলপথেও তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। ১৪৮৭ সালে পেরো দা কোভিলিয়াঁ ও আফোঁসো দে পাইভাকে পূর্বদেশ ও সম্ভাব্য খ্রিস্টান মিত্রদের সম্পর্কে অনুসন্ধানে পাঠানো হয়। কোভিলিয়াঁ পরে ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যজগতের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এই সমান্তরাল উদ্যোগ দেখায়, রাজদরবার শুধু নাবিকের সাহসের ওপর নির্ভর করছিল না। স্থলপথের বাণিজ্যসংক্রান্ত সংবাদ ও সমুদ্রপথের অনুসন্ধান মিলিয়ে একটি কার্যকর ভারতমুখী পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছিল।

দিয়াশের ব্যক্তিগত জীবনের প্রথম পর্ব সম্পর্কে তথ্য সীমিত। তবে গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের নেতৃত্ব পাওয়া থেকে বোঝা যায়, রাজদরবার তাঁর সামুদ্রিক দক্ষতার ওপর আস্থা রেখেছিল। ১৪৮৭ সালে তিনি পর্তুগাল থেকে যাত্রা শুরু করেন। বহরে ছিল দুটি অনুসন্ধানী জাহাজ এবং একটি রসদবাহী জাহাজ। ছোট বহর হওয়ায় পরিচালনা তুলনামূলক সহজ হলেও বিপদে বিকল্প সীমিত ছিল। জাহাজ হারানো, খাদ্য নষ্ট হওয়া কিংবা দক্ষ নাবিক অসুস্থ হয়ে পড়া পুরো অভিযান বিপন্ন করতে পারত।

প্রথম দিকে বহর পরিচিত আফ্রিকান উপকূল ধরে এগোয়। পূর্ববর্তী অভিযানের তথ্য, উপকূলের চিহ্ন এবং নাবিকদের অভিজ্ঞতা কাজে আসে। কিন্তু যত দক্ষিণে যাওয়া হয়, তত বাড়ে অপরিচিত পরিস্থিতি। বর্তমান নামিবিয়ার উপকূলের শুষ্ক ভূপ্রকৃতি সহজে পানি বা খাদ্য সংগ্রহের নিশ্চয়তা দিত না। অভিযানের জন্য তাই রসদ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একপর্যায়ে রসদবাহী জাহাজ পেছনে রেখে মূল অনুসন্ধানী জাহাজগুলো আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়।

এই যাত্রায় ক্যারাভেলের সুবিধা ছিল নিয়ন্ত্রণের নমনীয়তায়। লাতিন পাল বাতাসের সঙ্গে কোণ করে চলতে সাহায্য করত, আর তুলনামূলক ছোট জাহাজ উপকূল পর্যবেক্ষণে কার্যকর ছিল। কিন্তু এমন নৌযানও দক্ষিণ আটলান্টিকের ঝড়কে সহজ করে দেয়নি। ঢেউ, প্রতিকূল বাতাস এবং দীর্ঘ সময় ভেজা অবস্থায় কাজ করা নাবিকদের দুর্বল করে তুলত। প্রযুক্তি অভিযান সম্ভব করেছিল, কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি।

আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের কাছে প্রতিকূল আবহাওয়ায় দিয়াশের জাহাজগুলো তীর থেকে দূরে সরে যায়। প্রচলিত বিবরণে দীর্ঘ ঝড়ের কথা পাওয়া যায়। এই পর্যায়ের প্রতিটি গতিপথ নিশ্চিতভাবে পুনর্গঠন করা কঠিন, কারণ অভিযানের পূর্ণাঙ্গ সমকালীন নৌদিনপঞ্জি সংরক্ষিত নেই। তবে ফলটি স্পষ্ট: বহর দক্ষিণে এত দূর চলে গিয়েছিল যে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত তাদের উত্তরে পড়ে থাকে। অন্তরীপ চোখে না দেখেই তারা সেটি অতিক্রম করে ফেলে।

আবহাওয়া অনুকূল হলে দিয়াশ পূর্বদিকে অগ্রসর হন, কিন্তু প্রত্যাশিত স্থলভাগ দেখতে পান না। এরপর উত্তরে ঘুরলে আবার আফ্রিকার উপকূলের দেখা মেলে। ১৪৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বহর বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকার মসেল বে অঞ্চলে পৌঁছায়। গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ছিল উপকূলের অবস্থানে: আফ্রিকার পশ্চিম তীর আর তাদের পূর্বদিকে নেই; তারা মহাদেশটির দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে অন্য পাশে এসেছে। মানচিত্রের বহুদিনের অজানা অংশ এখন বাস্তব যাত্রার অভিজ্ঞতায় বদলে যাচ্ছে।

মসেল বে অঞ্চলে স্থানীয় পশুপালক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পর্তুগিজদের সাক্ষাৎ হয়। যোগাযোগ দ্রুত উত্তেজনায় রূপ নেয় এবং সংঘর্ষ ঘটে। এই ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দেয়, ইউরোপীয় নাবিকেরা কোনো জনশূন্য ভূখণ্ডে পৌঁছাননি। সেখানে মানুষের বসতি, জীবিকা এবং নিজস্ব অধিকার ছিল। পর্তুগিজদের জন্য ভৌগোলিক সাফল্যের মুহূর্ত স্থানীয় মানুষের কাছে সশস্ত্র বহিরাগতদের আগমনও ছিল। অভিযানের ইতিহাসে এই দুই অভিজ্ঞতাকে পাশাপাশি দেখা জরুরি।

বহর এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূল ধরে পূর্বদিকে এগিয়ে যায়। অভিযানের সর্বশেষ সীমা সাধারণত বর্তমান গ্রেট ফিশ নদীর আশপাশের সঙ্গে চিহ্নিত করা হয়। তীররেখা ক্রমে উত্তর-পূর্বমুখী হওয়ায় বোঝা যাচ্ছিল, আফ্রিকাকে ঘুরে আরও উত্তরে যাওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু সামনে কত দূর পথ, কোথায় নির্ভরযোগ্য রসদ মিলবে এবং ভারতে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে—এসব প্রশ্নের উত্তর তাঁদের জানা ছিল না।

দিয়াশ আরও এগোতে চাইলেও নাবিকদের মধ্যে ফিরে যাওয়ার দাবি জোরালো হয়। খাদ্য ও পানির সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি এবং অজানা দূরত্ব তাঁদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ঘটনাটিকে সরাসরি নাটকীয় বিদ্রোহ হিসেবে উপস্থাপন করা সতর্কতার দাবি রাখে। মূল বিষয় হলো, অভিযানের সক্ষমতার সীমা এসে গিয়েছিল। নতুন পথের প্রমাণ নিয়ে জীবিত ফিরে যাওয়াও ছিল সাফল্যের অপরিহার্য অংশ।

ফেরার সময় দিয়াশ সেই পাথুরে অন্তরীপটি দেখতে পান, যা বহর আগে সমুদ্রের দিক দিয়ে অতিক্রম করেছিল। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়, তিনি এর নাম দেন ‘কাবু দাস তোরমেন্তাস’ বা ‘ঝড়ের অন্তরীপ’; পরে দ্বিতীয় জোয়াও নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘কাবু দা বোয়া এস্পেরান্সা’—উত্তমাশা অন্তরীপ। নামকরণের বিস্তারিত কাহিনি পরবর্তী বিবরণের মাধ্যমে পরিচিত হলেও নতুন নামটির রাজনৈতিক অর্থ পরিষ্কার: ভারতের দিকে পৌঁছানোর আশা এখন বাস্তব ভিত্তি পেয়েছে।

এখানে একটি ভৌগোলিক পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। উত্তমাশা অন্তরীপ আফ্রিকার সর্বদক্ষিণ বিন্দু নয়। সেই অবস্থানে রয়েছে আরও দক্ষিণ-পূর্বের আগুলহাস অন্তরীপ। দিয়াশের সাফল্য তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট পাথুরে বিন্দু ঘুরে আসায় সীমিত ছিল না। তিনি সমুদ্রপথে মহাদেশটির দক্ষিণ প্রান্ত অতিক্রম করে পূর্ব উপকূলে পৌঁছেছিলেন। এর ফলে আফ্রিকাকে ঘিরে আটলান্টিক থেকে ভারত মহাসাগরে যাওয়ার কার্যকর সম্ভাবনা প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৪৮৮ সালের শেষদিকে দিয়াশ পর্তুগালে ফেরেন। তাঁর সংবাদ রাজদরবারকে জানায়, এশিয়ামুখী সামুদ্রিক উদ্যোগ আর নিছক অনুমান নয়। কিন্তু নিয়মিত বাণিজ্য চালানোর জন্য আরও বড় প্রস্তুতি দরকার ছিল। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার উপযোগী জাহাজ, পর্যাপ্ত রসদ, দক্ষ নৌপরিচালনা এবং পূর্ব আফ্রিকার বন্দর ও মৌসুমি বাতাস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হতো। দিয়াশ পথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাধাগুলোর একটি সরিয়েছিলেন; সম্পূর্ণ পথটি তখনও পর্তুগিজদের অজানা।

এই অভিযানের তাৎপর্য তাই ভারত আবিষ্কার কিংবা ভারত মহাসাগরে প্রথম নৌচলাচল নয়। ওই মহাসাগরে বহু শতাব্দী ধরে সমৃদ্ধ বাণিজ্য চলছিল। দিয়াশ প্রমাণ করেছিলেন, পশ্চিম ইউরোপ থেকে আফ্রিকা ঘুরে সেই প্রতিষ্ঠিত জগতে প্রবেশ সম্ভব। প্রায় এক দশক পরে সেই প্রমাণকে পূর্ণ যাত্রায় রূপ দেওয়ার দায়িত্ব পাবেন ভাস্কো দা গামা। দিয়াশের জাহাজ যেখানে ফিরে গিয়েছিল, পরবর্তী বহর সেখান থেকে আরও উত্তরে এগিয়ে ভারতীয় উপকূলের সন্ধান করবে।