বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

টরডেসিলাস চুক্তি ১৪৯৪: স্পেন ও পর্তুগালের বিশ্ব ভাগের ইতিহাস

সিরিজ: আবিষ্কারের যুগ: সমুদ্র অভিযান ও নতুন বিশ্বের সন্ধান

টরডেসিলাস চুক্তি ১৪৯৪: স্পেন ও পর্তুগালের বিশ্ব ভাগের ইতিহাস
মানচিত্রের কাল্পনিক রেখায় ভাগ হয়েছিল দুই রাজশক্তির দাবি, মানুষের সম্মতি নয়।

কলম্বাসের আটলান্টিক অভিযান শেষে প্রশ্ন উঠেছিল, সমুদ্রের ওপারে পাওয়া ভূখণ্ড দাবি করার অধিকার কার? কাস্তিলের রাজদরবার তাঁর সাফল্য উদ্‌যাপন করলেও পর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় জোয়াও বিষয়টিকে নিজের সামুদ্রিক স্বার্থের জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখেছিলেন। আফ্রিকার উপকূল ধরে কয়েক দশকের অভিযানে পর্তুগাল যে অবস্থান তৈরি করেছিল, পশ্চিমমুখী একটি যাত্রা তার সীমা বদলে দিতে পারত। এই বিরোধ থেকেই জন্ম নেয় ৭ জুন ১৪৯৪ সালের টরডেসিলাস চুক্তি—সমুদ্রের ওপর কাল্পনিক রেখা টেনে দুই রাজশক্তির দাবি পৃথক করার সমঝোতা।

তবে শিরোনামের ‘বিশ্ব ভাগ’ কথাটির অর্থ পরিষ্কার করা জরুরি। চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী স্পেন ও পর্তুগালের বাস্তব দখলে চলে যায়নি। তারা নিজেদের মধ্যে নির্ধারণ করেছিল, সমুদ্রপারের কোন অঞ্চলে কার অনুসন্ধান ও ভূখণ্ড দাবিকে অন্য পক্ষ স্বীকার করবে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অধিবাসী, শাসক কিংবা অন্য ইউরোপীয় শক্তি এই আলোচনায় অংশ নেয়নি। এটি ছিল দুই রাজতন্ত্রের পারস্পরিক অধিকার নির্ধারণের প্রচেষ্টা, সর্বজনস্বীকৃত বৈশ্বিক বন্দোবস্ত নয়।

বিরোধের শিকড় কলম্বাসের আগেও ছিল। ১৪৭৯ সালের আলকাসোভাস চুক্তি কাস্তিল ও পর্তুগালের রাজবংশীয় সংঘাত মেটানোর পাশাপাশি আটলান্টিকের দ্বীপ ও আফ্রিকামুখী সম্প্রসারণে দুই পক্ষের অবস্থান নির্ধারণ করেছিল। ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ কাস্তিলের অধীনে থাকলেও আফ্রিকাসংলগ্ন বিভিন্ন দ্বীপ ও গিনির বাণিজ্যে পর্তুগালের স্বার্থ স্বীকৃতি পায়। কিন্তু পশ্চিম আটলান্টিকে কলম্বাসের পৌঁছানো অঞ্চলগুলো এই পুরোনো ব্যবস্থার কোথায় পড়বে, তা নিয়ে নতুন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়।

১৪৯৩ সালে দেশে ফেরার পথে কলম্বাস পর্তুগালে পৌঁছালে দ্বিতীয় জোয়াও তাঁর অভিযানের সংবাদ পান। পর্তুগিজ রাজা মনে করতেন, পূর্ববর্তী সমঝোতার ভিত্তিতে নতুন ভূখণ্ডের ওপর তাঁরও দাবি থাকতে পারে। অন্যদিকে কাস্তিলের রানি ইসাবেলা ও আরাগনের রাজা ফার্দিনান্দ নিজেদের অর্থায়নে পরিচালিত অভিযানের ফল ছাড়তে প্রস্তুত ছিলেন না। এখানে ‘স্পেন’ পরিচয়টি সুবিধাজনক হলেও আমেরিকামুখী সম্প্রসারণের প্রধান রাজকীয় ভিত্তি ছিল কাস্তিলের মুকুট।

নিজেদের দাবি শক্তিশালী করতে রাজদম্পতি পোপ ষষ্ঠ আলেকজান্ডারের সমর্থন চান। ১৪৯৩ সালের পোপীয় নির্দেশনাগুলোর মধ্যে ইন্টার কায়েতেরা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এতে আজোরেস ও কেপ ভার্দে দ্বীপপুঞ্জের পশ্চিমে প্রায় একশ লিগ দূরে একটি বিভাজনরেখার ধারণা দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট শর্তে রেখার পশ্চিমের নতুন ভূখণ্ডে কাস্তিলের দাবিকে সমর্থন করা হয়। খ্রিস্টধর্ম প্রচারের কর্তব্যও এই অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যা সম্প্রসারণকে ধর্মীয় বৈধতার ভাষা দেয়।

পর্তুগাল এই ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট হয়নি। পোপের নির্দেশকে চূড়ান্ত মেনে নেওয়ার বদলে দ্বিতীয় জোয়াও সরাসরি আলোচনার পথ বেছে নেন। তাঁর উদ্বেগ ছিল আফ্রিকামুখী নৌপথ, আটলান্টিকে চলাচলের সুযোগ এবং ভবিষ্যতে পশ্চিমে পাওয়া ভূখণ্ডে সম্ভাব্য অধিকার নিয়ে। সমুদ্র অভিযানের প্রতিযোগিতা এখন কূটনীতির টেবিলে পৌঁছেছিল। মানচিত্রকারের অনুমান, নাবিকের অভিজ্ঞতা এবং দূতদের দর-কষাকষি একই বিরোধের অংশ হয়ে ওঠে।

কাস্তিলের টরডেসিলাস শহরে দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা সমঝোতায় পৌঁছান। চুক্তি অনুযায়ী, কেপ ভার্দে দ্বীপপুঞ্জের ৩৭০ লিগ পশ্চিমে উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত একটি রেখা কল্পনা করা হবে। সেই রেখার পূর্বের সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান ও ভূখণ্ড দাবির ক্ষেত্র থাকবে পর্তুগালের জন্য, পশ্চিমের ক্ষেত্র কাস্তিলের জন্য। পোপের আগের নির্দেশের তুলনায় সীমানা পশ্চিমে সরে যাওয়ায় পর্তুগালের জন্য আরও বিস্তৃত এলাকা উন্মুক্ত হয়।

এই রেখা আধুনিক সীমান্তের মতো নির্ভুল ছিল না। ‘লিগ’ তখন সর্বত্র একই দৈর্ঘ্যের একক ছিল না। আবার কেপ ভার্দে একটি দ্বীপপুঞ্জ; কোন অবস্থান থেকে মাপ শুরু করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রেখাটিকে একটি নির্দিষ্ট আধুনিক দ্রাঘিমার সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন ধরে নেওয়া বিভ্রান্তিকর। কাগজে সীমানা নির্ধারণ করা সহজ হলেও সমুদ্রে তার অবস্থান নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা ছিল কঠিন।

সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বাধা ছিল দ্রাঘিমাংশ নির্ণয়। নাবিকেরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করে অক্ষাংশের ধারণা পেতে পারতেন, কিন্তু খোলা সমুদ্রে পূর্ব-পশ্চিম অবস্থান নির্ভুলভাবে জানা অনেক কঠিন ছিল। চুক্তিতে যৌথভাবে জাহাজ, নাবিক ও বিশেষজ্ঞ পাঠিয়ে রেখার অবস্থান নির্ধারণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এই পরিকল্পনাই দেখায়, দূতেরা সমস্যাটি বুঝতেন। কিন্তু কূটনৈতিক সমঝোতা নৌপরিমাপের সীমাবদ্ধতা দূর করতে পারেনি; ভবিষ্যৎ বিরোধের সুযোগ থেকে যায়।

পর্তুগালের জন্য পশ্চিমে সরানো রেখার সবচেয়ে পরিচিত ফল দেখা যায় ব্রাজিলে। ১৫০০ সালে পেদ্রো আলভারেস কাবরালের বহর বর্তমান ব্রাজিলের উপকূলে পৌঁছায়। দক্ষিণ আমেরিকার পূর্বাংশ চুক্তির পর্তুগিজ দাবিক্ষেত্রের মধ্যে পড়ায় লিসবন নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার যুক্তি পায়। তবে ১৪৯৪ সালেই পর্তুগিজরা ব্রাজিলের অবস্থান নিশ্চিতভাবে জানত এবং কেবল সেটি পাওয়ার জন্য রেখা সরিয়েছিল—এমন দাবি প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়।

ব্রাজিলের বর্তমান বিশাল ভূখণ্ডও চুক্তির সরাসরি ফল নয়। প্রাথমিক পর্তুগিজ দাবির তুলনায় পরবর্তী বসতি, অভ্যন্তরভাগে অভিযান এবং সীমান্তসংঘাত অনেক দূর বিস্তৃত হয়। আদিবাসী মানুষের ওপর আক্রমণ, দাস সংগ্রহ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সেই সম্প্রসারণের অংশ ছিল। পরে নতুন চুক্তির মাধ্যমে ভূখণ্ডের বাস্তব দখলকে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। টরডেসিলাস ব্রাজিলের পর্তুগিজ পরিচয়ের ভিত্তি তৈরি করেছিল, তার আধুনিক সীমানা এঁকে দেয়নি।

কাস্তিলের জন্য চুক্তি পশ্চিমমুখী উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়ার সুবিধা দেয়। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং পরবর্তী সময়ে আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে স্প্যানিশ দাবি গড়ে ওঠে। কিন্তু তখনও ইউরোপীয়রা আমেরিকার সম্পূর্ণ আকৃতি, প্রশান্ত মহাসাগরের ব্যাপ্তি কিংবা এশিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক জানত না। যে ভূগোল পুরোপুরি পরিচিত ছিল না, তার ওপরই ভবিষ্যৎ অধিকার নির্ধারণ করা হচ্ছিল। অনুসন্ধান তাই জ্ঞান সংগ্রহের পাশাপাশি মালিকানা দাবির উপায় হয়ে ওঠে।

এই ব্যবস্থার গভীরতম সীমাবদ্ধতা ছিল আদিবাসী অধিকার উপেক্ষা করা। আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার মানুষের নিজস্ব সমাজ ও শাসনব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দুই খ্রিস্টান রাজতন্ত্র তাদের ভূখণ্ডকে ভবিষ্যৎ দাবির বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছিল। পোপীয় অনুমোদন ও ধর্মপ্রচারের দায়িত্ব সেই দাবিকে সমর্থনের ভাষা দেয়। দুই রাজশক্তির মধ্যে সংঘর্ষ এড়ানোর সমঝোতা তাই অন্য জনগোষ্ঠীর ওপর শান্তিপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করেনি; বরং উপনিবেশ স্থাপনের কাঠামোকে শক্তিশালী করেছিল।

ইউরোপের অন্য শক্তিগুলোও এই ভাগাভাগি স্থায়ীভাবে মেনে নেয়নি। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং পরে ডাচরা নিজেদের সমুদ্র অভিযান ও উপনিবেশ বিস্তার শুরু করে। অন্যদিকে পৃথিবীর বিপরীত দিকে মসলার দ্বীপপুঞ্জ ঘিরে স্পেন-পর্তুগাল বিরোধ দেখা দেয়; ১৫২৯ সালের সারাগোসা চুক্তিতে নতুন সমঝোতার চেষ্টা হয়। এতে বোঝা যায়, টরডেসিলাস সমুদ্রবিস্তারকে নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা ছিল, চিরস্থায়ী বিশ্বসীমা নয়।

চুক্তি দুই প্রতিবেশী রাজশক্তিকে সাময়িকভাবে প্রতিযোগিতার নিয়ম ঠিক করে দেয়। পশ্চিমে কাস্তিলের অভিযান চলতে থাকে, আর পর্তুগাল আফ্রিকা ঘুরে এশিয়ায় পৌঁছানোর পরিকল্পনায় মনোযোগ ধরে রাখে। কিন্তু পার্চমেন্টে দাবি লেখা আর ভারতের বন্দরে জাহাজ পৌঁছানো সম্পূর্ণ আলাদা কাজ। দিয়াশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার সেই দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ১৪৯৭ সালে ভাস্কো দা গামার বহর লিসবন ছাড়বে, মানচিত্রের দাবিকে বাস্তব বাণিজ্যিক সংযোগে রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে।