নেপোলিয়নের প্রথম পতন: ১৮১৪ সালে ফ্রান্স আক্রমণ, সিংহাসনত্যাগ ও এলবা নির্বাসন
সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন
প্যারিস হারিয়ে সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন ভেঙে পড়লে এলবায় যেতে হয় নেপোলিয়নকে।
লাইপজিগের পরাজয়ের পর নেপোলিয়ন রাইনের দিকে সরে এসে যে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন, তা এবার ফ্রান্সের নিজের ভূখণ্ডে শুরু হয়। জার্মানিতে তাঁর কর্তৃত্ব ভেঙে পড়েছে, বহু সহযোগী পক্ষ বদলেছে এবং অভিজ্ঞ সৈন্যদের বড় অংশ হারিয়ে গেছে। তবু ১৮১৪ সালের শুরুতে তিনি পরাজয় মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। নতুন সৈন্য, অবশিষ্ট রক্ষীবাহিনী এবং নিজের দ্রুত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে তিনি আশা করছিলেন, মিত্রদের কয়েকটি পরাজয় দিলে সমঝোতার সুযোগ ফিরবে। কিন্তু এবার যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যের পাশাপাশি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আস্থা ও যুদ্ধ চালানোর সামর্থ্যও ফুরিয়ে আসছিল।
মিত্রবাহিনী সংখ্যায় শক্তিশালী হলেও তাদের উদ্দেশ্য শুরু থেকেই পুরোপুরি এক ছিল না। অস্ট্রিয়া ইউরোপে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে চাইছিল, রাশিয়ার সম্রাট প্রথম আলেকজান্ডার প্যারিস পর্যন্ত অগ্রসর হতে আগ্রহী ছিলেন, আর প্রুশিয়া ফরাসি আধিপত্যের বিরুদ্ধে কঠোর নিষ্পত্তি চাইছিল। ব্রিটেন জোটকে অর্থসহায়তা দিচ্ছিল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে ওয়েলিংটনের বাহিনী ফ্রান্সের দিকে এগোচ্ছিল। নেপোলিয়ন এই মতভেদ কাজে লাগানোর আশা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা মিত্রদের একত্র থাকার প্রয়োজনও শিখিয়েছিল।
১৮১৩ সালের শেষদিকে ও ১৮১৪ সালের শুরুতে মিত্ররা রাইন অতিক্রম করে। শোয়ারৎসেনবের্গের প্রধান বাহিনী দক্ষিণ-পূর্ব দিক দিয়ে এবং ব্ল্যুশারের বাহিনী আরও উত্তরে অগ্রসর হয়। নেপোলিয়নের সমস্যা ছিল, সব দিক একসঙ্গে রক্ষা করার মতো সৈন্য তাঁর হাতে ছিল না। স্পেন, ইতালি এবং বিভিন্ন দুর্গেও ফরাসি শক্তি ছড়িয়ে ছিল। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রশিক্ষণ অসম্পূর্ণ, অশ্বারোহী বাহিনী দুর্বল এবং ঘোড়া ও সরঞ্জামের ঘাটতি প্রকট ছিল। আগের অভিযানের ক্ষতি কেবল জনবল সংগ্রহ করে পূরণ করা যাচ্ছিল না।
জানুয়ারির শেষে নেপোলিয়ন নিজে অভিযানে নামেন। ব্রিয়েনের সংঘর্ষের পর ১ ফেব্রুয়ারি লা রোতিয়েরে তাঁকে পিছু হটতে হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তিনি অসাধারণ দ্রুততায় পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেন। শঁপোবের, মোঁমিরাই, শাতো-তিয়েরি ও ভোশঁর লড়াইয়ে ব্ল্যুশারের বিচ্ছিন্ন বাহিনীগুলোর ওপর আঘাত করেন। ‘ছয় দিনের অভিযান’ নামে পরিচিত এই সাফল্য দেখায়, তাঁর সামরিক দক্ষতা তখনো কার্যকর ছিল। অল্প সৈন্য নিয়ে স্থানীয় সংখ্যাধিক্য তৈরি করে ধারাবাহিক আক্রমণ চালানোর পুরোনো ক্ষমতা আবার প্রকাশ পায়।
এরপর মোঁত্রোতেও সাফল্য আসে। কিন্তু এসব বিজয় প্রতিপক্ষের সামগ্রিক শক্তি ধ্বংস করেনি। মিত্ররা পিছু হটে আবার সংগঠিত হতে পারত, আর অন্য বাহিনী অগ্রসর হতে থাকত। নেপোলিয়ন কয়েকটি যুদ্ধ জিতছিলেন, কিন্তু পুরো যুদ্ধ জেতার জন্য প্রয়োজনীয় সৈন্য, সময় ও রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে পারছিলেন না। গ্রামাঞ্চলে সেনাবাহিনীর চলাচল, খাদ্য সংগ্রহ ও সংঘর্ষ সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে। স্থানীয় প্রতিরোধ কোথাও গড়ে উঠলেও তা পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার মতো সর্বজনীন গণযুদ্ধে পরিণত হয়নি।
এই সময় কূটনীতির দরজাও পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। শাতিয়োঁর আলোচনায় ফ্রান্সকে মোটামুটি ১৭৯২ সালের সীমান্তে ফিরিয়ে নেওয়ার ভিত্তিতে শান্তির প্রস্তাব ওঠে। আগের ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রস্তাবে তুলনামূলক সুবিধাজনক সীমার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু সামরিক পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে শর্ত কঠোর হয়। নেপোলিয়ন সাম্রাজ্যের মর্যাদা ও অর্জিত অবস্থান হারাতে অনিচ্ছুক ছিলেন। সাময়িক বিজয় তাঁকে ভালো শর্ত পাওয়ার আশা দিচ্ছিল। তাঁর প্রতিনিধি কোলাঁকুর সমঝোতার প্রয়োজন বুঝলেও আলোচনার সুযোগ শেষ পর্যন্ত কাজে লাগানো যায়নি।
মার্চে মিত্রদের শোমোঁ চুক্তি জোটকে আরও দৃঢ় করে। পৃথকভাবে শান্তি না করার অঙ্গীকার নেপোলিয়নের বিভেদ সৃষ্টির সম্ভাবনা কমায়। এদিকে ক্রাওনের ব্যয়বহুল যুদ্ধ এবং লাওঁর ব্যর্থতা তাঁর বাহিনীকে ক্ষয় করে। রেঁসে সাফল্য পেলেও বড় পরিস্থিতি পাল্টায় না। ২০–২১ মার্চ আর্সি-সুর-ওবে সংঘর্ষের পর তিনি পূর্বদিকে গিয়ে মিত্রদের যোগাযোগ ও সরবরাহপথে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। আশা ছিল, পেছনের বিপদ দেখে তারা প্যারিসের দিকে এগোনো বন্ধ করবে।
মিত্ররা এবার সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ করেনি। নেপোলিয়নের পেছনে যাওয়ার পরিবর্তে তারা সরাসরি প্যারিসের দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রাজধানীর প্রতিরক্ষা দুর্বল এবং সম্রাট দূরে—এই পরিস্থিতি তাদের সুযোগ দেয়। ২৫ মার্চ ফের-শঁপনোয়াজে মারমঁ ও মোর্তিয়ের বাহিনী পরাজিত হলে রাজধানীর পথে বাধা আরও কমে যায়। প্যারিস দখল করলে শুধু একটি শহর নয়, সরকারের প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং নেপোলিয়নের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ভিত্তিকেও আঘাত করা সম্ভব ছিল।
৩০ মার্চ প্যারিসের উত্তর ও পূর্ব প্রান্তে তীব্র যুদ্ধ হয়। ফরাসি সৈন্য ও জাতীয় রক্ষীবাহিনী প্রতিরোধ করলেও মিত্রদের সংখ্যা ও চাপের মুখে অবস্থান টেকেনি। জোসেফ বোনাপার্ট রাজধানী ছেড়ে যান; সম্রাজ্ঞী মারি লুইজ ও শিশুপুত্রও আগেই সরে গিয়েছিলেন। মারমঁ আলোচনায় যান এবং রাতে আত্মসমর্পণের ব্যবস্থা হয়। ৩১ মার্চ মিত্রবাহিনী প্যারিসে প্রবেশ করে। নেপোলিয়ন দ্রুত ফিরে এলেও রাজধানী রক্ষায় সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি। তিনি ফন্তেনব্লোতে অবস্থান নিয়ে আবার লড়াইয়ের কথা ভাবেন।
রাজধানীর পতন সামরিক সংকটকে শাসনব্যবস্থার পতনে রূপ দেয়। তালেইরাঁ মিত্র নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিকল্প সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। সিনেট ২ এপ্রিল নেপোলিয়নকে ক্ষমতাচ্যুত ঘোষণা করে। এতদিন তাঁর কর্তৃত্বের অধীনে কাজ করা প্রতিষ্ঠানই এখন সংবিধান লঙ্ঘন ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তোলে। এটি স্বাধীন গণরায়ের সরল প্রকাশ ছিল না; বিদেশি দখল, অভিজাতদের হিসাব এবং যুদ্ধ শেষ করার আকাঙ্ক্ষা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল। তবে স্পষ্ট হয়ে যায়, প্রশাসনিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ আর সম্রাটের জন্য যুদ্ধ চালাতে রাজি নয়।
ফন্তেনব্লোতে নেপোলিয়নের মার্শালরাও নতুন আক্রমণের বিরোধিতা করেন। সৈন্যদের ক্লান্তি, প্যারিসের পরিস্থিতি এবং আরও গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তাঁদের অবস্থান কঠোর করে। ৪ এপ্রিল নেপোলিয়ন প্রথমে পুত্রের পক্ষে, মারি লুইজের তত্ত্বাবধানে শাসনের শর্তে সিংহাসনত্যাগের প্রস্তাব দেন। কিন্তু মিত্ররা সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। একই সময়ে মারমঁর বাহিনীর পৃথক সমঝোতা ও মিত্রনিয়ন্ত্রিত অবস্থানে চলে যাওয়া তাঁর দরকষাকষির শক্তি আরও কমিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত ৬ এপ্রিল তিনি নিজের ও উত্তরাধিকারীদের জন্য নিঃশর্ত সিংহাসনত্যাগ করেন।
নেপোলিয়নের পতন তাই শুধু প্যারিসের সামরিক পরাজয় ছিল না; মিত্রদের ঐক্য, সরকারের পক্ষ পরিবর্তন এবং নিজের সেনাপতিদের সমর্থন হারানো একসঙ্গে কাজ করেছিল। ১১ এপ্রিল ফন্তেনব্লোর চুক্তিতে তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়। তাঁকে সম্রাট উপাধি ধরে রাখতে দেওয়া হয় এবং ভূমধ্যসাগরের এলবা দ্বীপে সার্বভৌম শাসনের অধিকার দেওয়া হয়। বার্ষিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়। এলবা কোনো সাধারণ কারাগার ছিল না, যদিও ইউরোপের রাজনীতি থেকে তাঁকে দূরে রাখাই ছিল ব্যবস্থাটির প্রধান উদ্দেশ্য।
২০ এপ্রিল ফন্তেনব্লোর প্রাসাদে পুরোনো রক্ষীবাহিনীকে বিদায় জানান নেপোলিয়ন। বহু অভিযানের সৈন্যদের সামনে এই বিদায় সাম্রাজ্যের প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। দক্ষিণ ফ্রান্স পেরিয়ে তিনি ব্রিটিশ জাহাজ আনডনটেডে এলবার উদ্দেশে যাত্রা করেন এবং মে মাসের শুরুতে পৌঁছান। সেখানে ছোট রক্ষীবাহিনী রাখার অনুমতি ছিল; তিনি দ্বীপের রাস্তা, খনি ও প্রশাসন নিয়েও কাজ শুরু করেন। অন্যদিকে ফ্রান্সে অষ্টাদশ লুইয়ের অধীনে বুরবোঁ রাজতন্ত্র ফিরে আসে।
এলবায় পৌঁছানোর সময় নেপোলিয়নের ইউরোপীয় সাম্রাজ্য ভেঙে গেছে, কিন্তু তাঁর নাম ও রাজনৈতিক আকর্ষণ মুছে যায়নি। ফ্রান্সের নতুন শাসনব্যবস্থায় পুরোনো সৈন্যদের অসন্তোষ, চাকরি ও মর্যাদার অনিশ্চয়তা এবং বিপ্লবের অর্জন হারানোর আশঙ্কা তৈরি হচ্ছিল। মিত্ররাও তাঁকে এত কাছে রেখে কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিশ্চিত ছিল না। ১৮১৪ সালের নিষ্পত্তি যুদ্ধ থামিয়েছিল, কিন্তু নেপোলিয়নের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা শেষ করেনি। অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই এলবার সীমিত শাসক আবার ফ্রান্সের দিকে যাত্রা করবেন—এবার তাঁর প্রত্যাবর্তন শুরু করবে ইতিহাসের বিখ্যাত ‘শত দিবস’।
বার্তোলোমেউ দিয়াশের অভিযান: ১৪৮৮ সালে উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম
পর্তুগালের সমুদ্র অভিযান: প্রিন্স হেনরি ও আফ্রিকার উপকূল অনুসন্ধান
আবিষ্কারের যুগের সূচনা: ইউরোপীয়রা কেন নতুন সমুদ্রপথ খুঁজেছিল?
নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান: বোরোদিনো, মস্কোর আগুন ও গ্র্যান্ড আর্মির ধ্বংস
ওয়াগ্রামের যুদ্ধ ও নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যের শিখর: ১৮০৯–১১ সালের ইউরোপ