ওয়াটারলুর যুদ্ধ: ওয়েলিংটন ও ব্লুশারের কাছে নেপোলিয়ন কেন পরাজিত হন?
সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন
ওয়েলিংটনের প্রতিরোধ ও ব্লুশারের আগমনে শেষ হয়ে যায় নেপোলিয়নের প্রত্যাবর্তনের আশা।
এলবা থেকে ফিরে প্যারিসে ক্ষমতা পুনর্দখলের পর নেপোলিয়নের সামনে যে সামরিক পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল, তা ১৮১৫ সালের জুনে বেলজিয়ামের পথে শুরু হয়। ইউরোপীয় মিত্রশক্তি তাঁর শাসন মেনে নিতে অস্বীকার করেছে এবং বিভিন্ন সীমান্তে বাহিনী জড়ো করছে। সব প্রতিপক্ষ একত্র হওয়ার আগে আঘাত করাই ছিল তাঁর প্রধান আশা। উত্তরে ওয়েলিংটনের বহুজাতিক বাহিনী এবং ব্লুশারের প্রুশীয় সেনাবাহিনী তুলনামূলক কাছাকাছি অবস্থান করছিল। নেপোলিয়নের পরিকল্পনা ছিল তাদের মাঝখানে ঢুকে পৃথকভাবে পরাজিত করা, যাতে সম্মিলিত সংখ্যাধিক্য কাজে লাগানোর সুযোগ না পায়।
১৫ জুন ফরাসিরা সীমান্ত পেরিয়ে শার্লেরোয়ার কাছে সামব্র নদী অতিক্রম করে। প্রাথমিক অগ্রযাত্রায় নেপোলিয়ন কিছুটা বিস্ময়ের সুবিধা পান। ১৬ জুন লিনিয়েতে তিনি ব্লুশারের বাহিনীকে পরাজিত করেন; একই দিনে মার্শাল নে কাত্র ব্রায় ওয়েলিংটনের সৈন্যদের সঙ্গে লড়েন। কিন্তু ফরাসিরা প্রত্যাশিত পূর্ণ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। দেরলঁর সেনাদল দুই যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে নির্দেশের টানাপোড়েনে ঘুরে বেড়িয়ে কোনোটিতেই নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রুশীয় বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ধ্বংস হয়নি, আর ওয়েলিংটনের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা যায়নি।
ব্লুশার ও তাঁর প্রধান সহকারী গনাইজেনাউ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। প্রুশীয়রা পূর্বদিকে নিজেদের যোগাযোগঘাঁটির দিকে অনেক দূরে সরে যাওয়ার পরিবর্তে উত্তরে ওয়াভরের দিকে যায়। এতে পুনর্গঠন করে ওয়েলিংটনকে সাহায্য করার সম্ভাবনা বজায় থাকে। নেপোলিয়ন মার্শাল গ্রুশিকে প্রায় তেত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে তাদের অনুসরণ করতে পাঠান, কিন্তু ফরাসি নেতৃত্ব রুশ নয়, প্রুশীয় বাহিনীর প্রকৃত অবস্থান ও উদ্দেশ্য যথাসময়ে স্পষ্টভাবে ধরতে পারেনি। লিনিয়ের পরাজয়ের পরও মিত্রদের সহযোগিতা অটুট থাকাই ওয়াটারলুর ফলের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
ওয়েলিংটন কাত্র ব্রা থেকে সরে মোঁ-সাঁ-জঁর উঁচু ভূমিতে অবস্থান নেন। যুদ্ধক্ষেত্রটি ওয়াটারলু গ্রামের দক্ষিণে, বর্তমান বেলজিয়ামে। তাঁর প্রায় আটষট্টি হাজার সৈন্যের বাহিনীতে ব্রিটিশদের পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস, হ্যানোভার, ব্রান্সউইক ও নাসাউয়ের সৈন্য ছিল। নেপোলিয়নের হাতে ছিল প্রায় বাহাত্তর হাজার সৈন্য এবং কামানে সুবিধা। ওয়েলিংটন পাহাড়ের বিপরীত ঢালে বহু সৈন্য রাখেন, যাতে ফরাসি কামানের সরাসরি গোলাবর্ষণ থেকে কিছুটা আড়াল পাওয়া যায়। সামনের খামারবাড়িগুলো প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
১৭ জুনের বৃষ্টিতে জমি ভিজে গিয়েছিল। ১৮ জুন প্রধান আক্রমণ শুরু হতে বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটা হয়। মাটি কিছুটা শুকানোর অপেক্ষা কামান ও চলাচলের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যদিও বিলম্বের সব কারণ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মত এক নয়। এই সময় প্রুশীয়রা ওয়েলিংটনের দিকে এগোচ্ছিল। তবে শুধু বৃষ্টি কিংবা কয়েক ঘণ্টার বিলম্বকে পরাজয়ের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা বলা যায় না। যুদ্ধের সময় ফরাসি আক্রমণের ধরন, নেতৃত্বের যোগাযোগ এবং মিত্রদের প্রতিরোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রথম বড় সংঘর্ষ শুরু হয় মিত্রদের ডান দিকে উগুমোঁর প্রাচীরবেষ্টিত খামারকে কেন্দ্র করে। প্রাথমিকভাবে এই আক্রমণ প্রতিপক্ষের মনোযোগ ও শক্তি টানার উদ্দেশ্য বহন করলেও তা দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল লড়াইয়ে পরিণত হয়। ফরাসিরা বারবার চেষ্টা করেও মূল প্রতিরক্ষাস্থান দখল করতে পারেনি। প্রাচীর, ভবন ও সংকীর্ণ প্রবেশপথ রক্ষাকারীদের সুবিধা দেয়। এখানে বিপুল ফরাসি শক্তি আটকে পড়লেও ওয়েলিংটন নিজের প্রধান অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হন। একটি স্থানীয় আক্রমণ বৃহত্তর পরিকল্পনার তুলনায় অতিরিক্ত সৈন্য গ্রাস করছিল।
দুপুরের পর দেরলঁর পদাতিক বাহিনী মিত্রদের বাম-কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়। কামানের গোলাবর্ষণের পরও ওয়েলিংটনের পদাতিকরা সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পিকটনের সৈন্যদের লড়াই এবং ব্রিটিশ ভারী অশ্বারোহীদের পাল্টা আক্রমণে ফরাসি অগ্রযাত্রা ভেঙে যায়। তবে বিজয়ের উত্তেজনায় অশ্বারোহীরা অনেক দূর এগিয়ে নিজেরাও ফরাসি পাল্টা আক্রমণে ব্যাপক ক্ষতি স্বীকার করে। এই পর্বে উভয় পক্ষের ক্ষতি হলেও নেপোলিয়নের গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণ ব্যর্থ হয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত আদায়ের সুযোগ নষ্ট হয়।
বিকেলে নে বড় অশ্বারোহী আক্রমণ পরিচালনা করেন। মিত্রদের কিছু চলাচলকে ব্যাপক পশ্চাদপসরণের লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া এর একটি কারণ বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু ফরাসি অশ্বারোহীরা পাহাড়ের ওপর উঠে সংগঠিত পদাতিক বর্গের মুখোমুখি হয়। বেয়নেটের সারি ও কাছ থেকে গোলাবর্ষণের বিরুদ্ধে ঘোড়সওয়ারদের সাফল্য সীমিত ছিল। পর্যাপ্ত পদাতিক ও কামানের সমন্বয় ছাড়া বারবার অশ্বারোহী আক্রমণ মূল্যবান শক্তি ক্ষয় করে। মিত্রদের অবস্থান চাপে পড়লেও তাদের প্রধান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভাঙেনি।
এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রের পূর্বদিকে প্রুশীয় বাহিনী উপস্থিত হতে থাকে। বুলোয়ের সেনাদল বিকেলে ফরাসি ডান দিক ও পেছনের দিকে চাপ সৃষ্টি করে। প্লাঁসনোয়া গ্রামের জন্য তীব্র লড়াই হয়। নেপোলিয়ন লোবাউয়ের বাহিনী এবং পরে রক্ষীবাহিনীর অংশ সেখানে পাঠাতে বাধ্য হন। ফলে ওয়েলিংটনের বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য অতিরিক্ত শক্তি কমে যায়। ওয়াটারলু এখন আর দুটি বাহিনীর সরাসরি সংঘর্ষ ছিল না; ফরাসিদের একই সঙ্গে সামনে মিত্র প্রতিরক্ষা এবং পাশে নতুন প্রুশীয় আক্রমণ সামলাতে হচ্ছিল।
গ্রুশি কেন ফিরে এলেন না, তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক আছে। তিনি কামানের শব্দ শুনেও ওয়াভরের দিকে অভিযান চালিয়ে যান এবং সেখানে প্রুশীয় পশ্চাদরক্ষীর সঙ্গে লড়েন। তাঁর নির্দেশের ব্যাখ্যা, অনুসরণের গতি ও সিদ্ধান্ত সমালোচনার বিষয়। কিন্তু তিনি যেকোনো মুহূর্তে ইচ্ছা করলেই পুরো বাহিনী নিয়ে সময়মতো ওয়াটারলুতে পৌঁছে যেতেন—এমন ধারণাও অতিসরল। দূরত্ব, নদী, চলাচলের পথ এবং প্রুশীয় বাধা ছিল। মূল সমস্যা ছিল ফরাসি অভিযান প্রুশীয় প্রধান শক্তিকে ওয়েলিংটনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া থেকে আটকাতে ব্যর্থ হয়েছিল।
সন্ধ্যার দিকে ফরাসিরা লা এ সাঁতের খামার দখল করে। দিনের দীর্ঘ প্রতিরোধের পর জার্মান রক্ষাকারীদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসছিল। এই অবস্থান পাওয়ায় ফরাসিরা মিত্রদের কেন্দ্রের কাছাকাছি কামান বসিয়ে বিপজ্জনক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ওয়েলিংটনের পরিস্থিতি তখন অত্যন্ত সংকটপূর্ণ ছিল। কিন্তু ফরাসিদের কাছেও দ্রুত সুযোগ কাজে লাগানোর মতো অক্ষত বাহিনী সীমিত। প্রুশীয় আক্রমণ তাদের রিজার্ভ টেনে নিচ্ছিল, আর আগের পদাতিক ও অশ্বারোহী আক্রমণে বহু সৈন্য হারিয়ে গেছে।
শেষ বড় প্রচেষ্টায় নেপোলিয়ন ইম্পেরিয়াল গার্ডের কয়েকটি ব্যাটালিয়ন সামনে পাঠান। সন্ধ্যায় তারা মিত্রদের পাহাড়ি প্রতিরক্ষায় ওঠে, কিন্তু ব্রিটিশ ও অন্যান্য মিত্র পদাতিকের গোলাবর্ষণ ও পাল্টা আক্রমণে থেমে যায়। রক্ষীবাহিনীর সব অংশ একই সঙ্গে আক্রমণ করেনি কিংবা সবাই ধ্বংসও হয়নি। তবু নির্বাচিত গার্ডদের পিছু হটার দৃশ্য ফরাসি সৈন্যদের মনোবল ভেঙে দেয়। সামনে প্রতিরোধ ও ডান দিকে প্রুশীয় চাপের মধ্যে স্থানীয় পশ্চাদপসরণ দ্রুত পুরো বাহিনীর বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
ওয়াটারলুতে পরাজয়ের কারণ তাই একজন মার্শালের ভুল, নেপোলিয়নের অসুস্থতা কিংবা আবহাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ওয়েলিংটনের ভূখণ্ড নির্বাচন ও দীর্ঘ প্রতিরোধ, ব্লুশারের সাহায্য করার দৃঢ়তা, প্রুশীয়দের সময়মতো অগ্রযাত্রা এবং ফরাসি নেতৃত্বের অসমন্বিত আক্রমণ একসঙ্গে ফল নির্ধারণ করে। মিত্রদের বিভিন্ন জাতির সৈন্য কঠিন ক্ষতি সহ্য করেও অবস্থান ধরে রেখেছিল। অন্যদিকে নেপোলিয়নের পরিকল্পনার মূল শর্ত—দুই প্রতিপক্ষকে আলাদা রাখা—শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়নি। সামরিক সিদ্ধান্তের ব্যর্থতা এবং প্রতিপক্ষের কার্যকর সহযোগিতা একই ঘটনার দুটি দিক।
রাতের মধ্যে ফরাসি প্রধান বাহিনী দক্ষিণে পিছু হটে। নেপোলিয়ন প্যারিসে ফিরে যুদ্ধ চালানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করলেও রাজনৈতিক সমর্থন আর পাননি। ২২ জুন তাঁকে দ্বিতীয়বার সিংহাসনত্যাগ করতে হয়। ওয়াটারলু ইউরোপের সব ফরাসি সৈন্য ধ্বংস করেনি, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত শাসন টিকিয়ে রাখার শেষ বাস্তব সামরিক সুযোগ ভেঙে দিয়েছিল। এলবা থেকে যে প্রত্যাবর্তন কয়েক সপ্তাহে অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল, তা একটি দিনের সম্মিলিত পরাজয়ে শেষ হয়। এবার নির্বাসনের গন্তব্য হবে ভূমধ্যসাগরের কাছের দ্বীপ নয়, দূর দক্ষিণ আটলান্টিকের সেন্ট হেলেনা—যেখান থেকে আর কোনো প্রত্যাবর্তন ঘটবে না।
বার্তোলোমেউ দিয়াশের অভিযান: ১৪৮৮ সালে উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম
পর্তুগালের সমুদ্র অভিযান: প্রিন্স হেনরি ও আফ্রিকার উপকূল অনুসন্ধান
আবিষ্কারের যুগের সূচনা: ইউরোপীয়রা কেন নতুন সমুদ্রপথ খুঁজেছিল?
লাইপজিগের যুদ্ধ: ‘ব্যাটল অব দ্য নেশনস’-এ যেভাবে ভাঙে নেপোলিয়নের আধিপত্য
নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান: বোরোদিনো, মস্কোর আগুন ও গ্র্যান্ড আর্মির ধ্বংস
ওয়াগ্রামের যুদ্ধ ও নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যের শিখর: ১৮০৯–১১ সালের ইউরোপ