কলম্বাসের আমেরিকা অভিযান: ১৪৯২ সালে ভারত খুঁজতে আটলান্টিক পাড়ি
সিরিজ: আবিষ্কারের যুগ: সমুদ্র অভিযান ও নতুন বিশ্বের সন্ধান
১৪৯২ সালের আটলান্টিক যাত্রা যুক্ত করেছিল দুই জগৎকে, সূচনা করেছিল উপনিবেশ বিস্তারেরও।
বার্তোলোমেউ দিয়াশ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দেখিয়েছিলেন, পূর্বের সমুদ্রে পৌঁছানোর পথ রয়েছে। কিন্তু সেই পথ ধরে ভারত পর্যন্ত যাত্রার প্রস্তুতি যখন পর্তুগালে চলছিল, অন্য একটি পরিকল্পনা পশ্চিম ইউরোপের রাজদরবারগুলোতে ঘুরছিল: আফ্রিকাকে ঘিরে এত দীর্ঘ পথ না গিয়ে সরাসরি পশ্চিমে যাত্রা করলে কেমন হয়? এই প্রস্তাবের প্রবক্তা ছিলেন জেনোয়ার নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস। তাঁর ধারণা, আটলান্টিক পেরোলেই এশিয়ার দ্বীপ ও সমৃদ্ধ বাজারে পৌঁছানো যাবে। মাঝখানে যে বিশাল জনবসতিপূর্ণ ভূখণ্ড রয়েছে, তা তাঁর হিসাবে ছিল না।
কলম্বাসের পরিকল্পনাকে পৃথিবী গোল প্রমাণের অভিযান বলা ভুল। শিক্ষিত ইউরোপীয়দের অনেকেই তখন পৃথিবীর গোলাকার আকৃতি সম্পর্কে জানতেন। বিরোধ ছিল মূলত পৃথিবীর আয়তন এবং পশ্চিমমুখী সমুদ্রযাত্রার দূরত্ব নিয়ে। কলম্বাস বিভিন্ন ভৌগোলিক ধারণা ও পরিমাপ এমনভাবে গ্রহণ করেছিলেন, যাতে ইউরোপ থেকে পূর্ব এশিয়ার দূরত্ব বাস্তবের তুলনায় অনেক কম মনে হয়। তাঁর সাহসের সঙ্গে তাই একটি গুরুতর ভুল হিসাবও জড়িয়ে ছিল।
সমস্যাটি শুধু পৃথিবী ছোট ধরে নেওয়ায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি এশিয়ার পূর্ব-পশ্চিম বিস্তারও অতিরঞ্জিত করেছিলেন। ফলে জাপান ও এশিয়ার পূর্ব উপকূল তাঁর কল্পনায় ইউরোপের অনেক কাছে চলে আসে। এখানে ‘ইন্ডিজ’ বলতে শুধু বর্তমান ভারত বোঝাত না; ইউরোপীয় ব্যবহারে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারত। কলম্বাসের লক্ষ্য ছিল এই সম্পদসমৃদ্ধ পূর্বদেশে বাণিজ্যপথ খোলা, কোনো অজানা মহাদেশে পৌঁছানো নয়।
পর্তুগালের রাজদরবার তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। এরপর কাস্তিলের রানি ইসাবেলা ও আরাগনের রাজা ফার্দিনান্দের কাছে তিনি সমর্থন চান। দীর্ঘ আলোচনা ও অপেক্ষার পর ১৪৯২ সালে গ্রানাদা জয়ের পরবর্তী পরিস্থিতিতে উদ্যোগটি অনুমোদন পায়। আইবেরিয়ায় মুসলিম শাসনের শেষ রাজ্যটির পতনের পর রাজদম্পতির সামনে নতুন মর্যাদা, বাণিজ্য ও ধর্মীয় সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। পর্তুগালের সঙ্গে সামুদ্রিক প্রতিযোগিতাও পশ্চিমমুখী পরিকল্পনাকে আকর্ষণীয় করে।
১৪৯২ সালের এপ্রিলে সম্পাদিত সান্তা ফের চুক্তিতে কলম্বাসের সম্ভাব্য পদমর্যাদা ও লাভের অংশ নির্ধারিত হয়। অভিযানে সফল হলে তিনি সমুদ্রের অ্যাডমিরাল এবং অর্জিত ভূখণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্তৃত্ব পাবেন। এই ব্যবস্থা দেখায়, যাত্রাটি কেবল ভৌগোলিক অনুসন্ধান ছিল না; শুরু থেকেই এর সঙ্গে ভবিষ্যৎ শাসন ও সম্পদ আহরণের প্রত্যাশা যুক্ত ছিল। রানির গয়না বিক্রি করে পুরো অভিযান চালানোর জনপ্রিয় গল্প ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে অতিসরল করে।
৩ আগস্ট ১৪৯২ সালে পালোস বন্দর থেকে তিনটি জাহাজ যাত্রা করে: সান্তা মারিয়া, পিন্তা ও নিনিয়া। সান্তা মারিয়া ছিল তুলনামূলক বড় নাও ধরনের জাহাজ; অন্য দুটি ছিল ক্যারাভেল। অভিযানে মার্তিন আলোনসো পিনসোন ও ভিসেন্তে ইয়ানিয়েস পিনসোনের মতো অভিজ্ঞ নাবিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কলম্বাসের নেতৃত্বের পাশাপাশি স্থানীয় নৌদক্ষতা, জাহাজের ব্যবস্থা এবং নাবিক সংগ্রহের সহযোগিতা ছাড়া যাত্রাটি সম্ভব হতো না।
প্রথমে বহর ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে যায়। সেখানে মেরামত ও প্রস্তুতি শেষে সেপ্টেম্বরে প্রকৃত আটলান্টিক অতিক্রম শুরু হয়। উত্তর-পূর্ব আয়নবায়ু পশ্চিমমুখী যাত্রায় সাহায্য করে। কিন্তু পরিচিত উপকূল হারিয়ে যাওয়ার পর প্রতিদিনের অগ্রগতি যতটা আশাব্যঞ্জক, ফেরার অনিশ্চয়তাও ততটাই উদ্বেগের ছিল। খাবার-পানির মজুত সীমিত; সামনে কত দিন সমুদ্র থাকবে, কেউ নিশ্চিত জানতেন না। এই অনিশ্চয়তাই জাহাজের ভেতরে উত্তেজনা বাড়ায়।
অক্টোবরে স্থলের প্রত্যাশা তীব্র হয়। পাখি, ভাসমান গাছপালা এবং অন্যান্য লক্ষণ দেখে নাবিকেরা কাছাকাছি ভূখণ্ডের অনুমান করেন। ১২ অক্টোবর ১৪৯২ সালে বহর বাহামা দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপে পৌঁছায়। স্থানীয়ভাবে দ্বীপটির নাম ছিল গুয়ানাহানি; কলম্বাস নাম দেন সান সালভাদর। ঠিক কোন বর্তমান দ্বীপটি তাঁর প্রথম অবতরণস্থল, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু এটি নিশ্চিত যে তিনি এশিয়ায় নয়, ক্যারিবীয় অঞ্চলে পৌঁছেছিলেন।
সেখানে বসবাস করতেন লুকায়ান তাইনো জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাঁদের সমাজ, বসতি, কৃষি এবং আন্তদ্বীপ যোগাযোগ ছিল। কলম্বাস তাঁদের পরিচয় বুঝতে গিয়েও নিজের এশিয়াসংক্রান্ত ধারণার বাইরে বেরোতে পারেননি। ‘ইন্ডিজে’ পৌঁছানোর বিশ্বাস থেকেই আদিবাসীদের জন্য ‘ইন্ডিয়ান’ নামের ব্যবহার বিস্তার লাভ করে। প্রথম সাক্ষাতের বিবরণে বিনিময় ও কৌতূহল থাকলেও ক্ষমতার অসম সম্পর্কও স্পষ্ট: স্থানীয়দের ধর্মান্তর, শ্রমে ব্যবহার এবং বন্দি করার সম্ভাবনা অভিযাত্রীদের চিন্তায় দ্রুত স্থান পায়।
কলম্বাসের প্রধান অনুসন্ধান ছিল সোনা, মূল্যবান পণ্য এবং এশিয়ার পরিচিত সমৃদ্ধ রাজ্যের সন্ধান। স্থানীয়দের ইঙ্গিত তিনি নিজের প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতেন। অক্টোবরে কিউবায় পৌঁছে সেটিকে এশীয় মূল ভূখণ্ডের অংশ ভাবার সম্ভাবনা খুঁজেছিলেন। পরে হিস্পানিওলা দ্বীপে যান, যেখানে বর্তমানে হাইতি ও ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র অবস্থিত। তিনি যত নতুন তথ্য সংগ্রহ করছিলেন, ততই তা পূর্বনির্ধারিত এশিয়ার মানচিত্রে বসানোর চেষ্টা করছিলেন।
ডিসেম্বরের শেষদিকে হিস্পানিওলার কাছে সান্তা মারিয়া অগভীর জলে আটকে ধ্বংস হয়। উদ্ধার করা কাঠ ব্যবহার করে লা নাভিদাদ নামে একটি ছোট ঘাঁটি গড়া হয় এবং কয়েক ডজন লোক সেখানে থেকে যায়। এই দুর্ঘটনাজনিত বসতিই পরবর্তী স্প্যানিশ উপনিবেশ স্থাপনের প্রাথমিক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয় নেতা গুয়াকানাগারির সহযোগিতা মিললেও ইউরোপীয়দের উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের নিশ্চয়তা দেয়নি।
১৪৯৩ সালের জানুয়ারিতে কলম্বাস ফেরার যাত্রা শুরু করেন। পশ্চিমমুখী যাত্রার পথ হুবহু অনুসরণ না করে উত্তরের অনুকূল বাতাস ধরতে হয়। ঝড়ের মুখে বহর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে; কলম্বাস পর্তুগালেও পৌঁছান। মার্চে স্পেনে ফিরে তিনি অভিযানের সংবাদ দেন। সঙ্গে আনা বস্তু, পাখি এবং আদিবাসী মানুষকে তাঁর সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে প্রদর্শন করা হয়। রাজদরবারের কাছে সম্ভাব্য সম্পদ ও নতুন অধিকার অর্জনের সংবাদ তখন বিশেষ আকর্ষণীয়।
তবে কলম্বাস আমেরিকায় পৌঁছানো প্রথম মানুষ কিংবা প্রথম ইউরোপীয় ছিলেন না। আমেরিকায় বহু সহস্রাব্দ ধরে মানুষের বসবাস ছিল; প্রায় ১০০০ সালের দিকে নর্স অভিযাত্রীরাও উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন। ১৪৯২ সালের বিশেষত্ব ছিল এর পরিণতিতে: এই যাত্রার পর ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে ক্রমবর্ধমান এবং স্থায়ী যোগাযোগ তৈরি হয়। জাহাজ চলাচলের সঙ্গে শুরু হয় সাম্রাজ্যিক দাবি, দখল এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক।
কলম্বাসের দ্বিতীয় যাত্রা থেকেই বৃহত্তর বসতি ও শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য আরও স্পষ্ট হয়। আদিবাসীদের ওপর বাধ্যতামূলক শ্রম, সহিংসতা ও সম্পদ আদায়ের চাপ বাড়ে। পরে ইউরোপীয় রোগজীবাণুর বিস্তার বিপুল জনসংখ্যাগত বিপর্যয় ঘটায়। অন্যদিকে আটলান্টিকের দুই পারে ফসল, প্রাণী ও খাদ্যাভ্যাসের বিনিময় বিশ্বকে বদলে দেয়। এই সংযোগের লাভ ও ক্ষতি সমানভাবে ভাগ হয়নি; আদিবাসী সমাজগুলোকে বহন করতে হয়েছিল বিপর্যয়ের গভীরতম বোঝা।
কলম্বাস জীবনের শেষ পর্যন্ত নিজের অভিযাত্রাকে এশিয়ায় পৌঁছানোর ধারণার সঙ্গেই যুক্ত রেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর ভুল হিসাব এমন ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করে, যার ব্যাপ্তি তিনি বুঝতে পারেননি। পর্তুগাল আফ্রিকা ঘুরে পূর্বদেশে এগোচ্ছিল, আর স্পেন পশ্চিম আটলান্টিকে নতুন ভূখণ্ডের ওপর দাবি তুলছিল। এখন প্রশ্ন শুধু কোথায় জাহাজ পৌঁছেছে তা নয়—সমুদ্রের ওপারের অঞ্চল দাবি করার অধিকার কার? এই প্রতিযোগিতাই দুই রাজশক্তিকে সমঝোতা ও বিশ্বকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করার উদ্যোগের দিকে নিয়ে যাবে।
নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান: বোরোদিনো, মস্কোর আগুন ও গ্র্যান্ড আর্মির ধ্বংস
ওয়াগ্রামের যুদ্ধ ও নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যের শিখর: ১৮০৯–১১ সালের ইউরোপ
পেনিনসুলার যুদ্ধ: স্পেন ও পর্তুগালে কীভাবে দুর্বল হয়েছিল নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য?
পিকিং কনভেনশন ও আফিম যুদ্ধের উত্তরাধিকার: আধুনিক চীন কীভাবে বদলে গেল?
বেইজিং অভিযান ও সামার প্যালেস ধ্বংস: ১৮৬০ সালে চিং সাম্রাজ্যের পরাজয়
ক্যান্টন থেকে তিয়ানজিন: ১৮৫৮ সালের চুক্তি কীভাবে চীনকে আরও উন্মুক্ত করেছিল?