বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সেন্ট হেলেনায় নেপোলিয়ন: নির্বাসন, মৃত্যু ও ইউরোপে তার দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার

সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন

সেন্ট হেলেনায় নেপোলিয়ন: নির্বাসন, মৃত্যু ও ইউরোপে তার দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার
সেন্ট হেলেনায় জীবন শেষ হলেও আইন, রাষ্ট্র ও যুদ্ধের ইতিহাসে রয়ে যান নেপোলিয়ন।

ওয়াটারলুর পরাজয় ও দ্বিতীয় সিংহাসনত্যাগের পর নেপোলিয়নের সামনে আর কোনো সেনাবাহিনী নিয়ে ক্ষমতায় ফেরার বাস্তব পথ খোলা ছিল না। তিনি আটলান্টিক উপকূলে গিয়ে আমেরিকায় চলে যাওয়ার সম্ভাবনা খুঁজেছিলেন, কিন্তু ব্রিটিশ নৌঅবরোধ সেই যাত্রা কঠিন করে তোলে। ১৮১৫ সালের ১৫ জুলাই তিনি ক্যাপ্টেন ফ্রেডেরিক মেইটল্যান্ডের জাহাজ বেলেরোফনে ওঠেন। ব্রিটেনে আশ্রয় বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রত্যাশা থাকলেও ব্রিটিশ সরকার তাঁকে স্বাধীনভাবে বসবাসের সুযোগ দিতে রাজি হয়নি। এলবা থেকে প্রত্যাবর্তনের অভিজ্ঞতার পর ইউরোপীয় শক্তিগুলো আর একই ঝুঁকি নিতে চায়নি।

এবার গন্তব্য নির্ধারিত হয় দক্ষিণ আটলান্টিকের সেন্ট হেলেনা। আফ্রিকার উপকূল থেকে বহু দূরের এই দ্বীপকে বেছে নেওয়ার প্রধান কারণ ছিল বিচ্ছিন্নতা এবং ব্রিটিশ নৌনিয়ন্ত্রণ। নর্থাম্বারল্যান্ড জাহাজে দীর্ঘ যাত্রার পর ১৮১৫ সালের অক্টোবরে নেপোলিয়ন সেখানে পৌঁছান। প্রথমে ব্রায়ার্সে সাময়িক অবস্থানের পর ডিসেম্বরে লংউড হাউসে ওঠেন। এলবায় তিনি সীমিত ভূখণ্ডের সার্বভৌম শাসক ছিলেন; সেন্ট হেলেনায় ছিলেন ব্রিটিশ পাহারায় আটক একজন পরাজিত শাসক। এই পার্থক্য তাঁর শেষ জীবনের অভিজ্ঞতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

লংউডের আবহাওয়া, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এবং বাসস্থানের অবস্থা নিয়ে তাঁর সহচরদের অভিযোগ ছিল। হাঁটাচলা, সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের ওপর বিধিনিষেধ নিঃসঙ্গতা বাড়াত। ১৮১৬ সালে গভর্নর হাডসন লো দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়। নিরাপত্তার নিয়ম, চিঠিপত্র পরীক্ষা এবং সম্রাটের মর্যাদা স্বীকারের প্রশ্নে বিরোধ চলতে থাকে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘জেনারেল বোনাপার্ট’ হিসেবে উল্লেখ করত, যা তিনি অপমানজনক মনে করতেন। তবে বন্দিত্বের বর্ণনায় নেপোলিয়নের পক্ষের স্মৃতিকথা ও সরকারি বিবরণের নিজস্ব পক্ষপাতও বিবেচনা করা জরুরি।

তাঁর সঙ্গে ছিলেন বার্ত্রাঁ, মোঁতলোঁ, গুরগো এবং লাস কাসের মতো সহচর, যদিও সবাই শেষ পর্যন্ত দ্বীপে থাকেননি। তাঁদের কাছে নেপোলিয়ন নিজের অভিযান, সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক লক্ষ্য ব্যাখ্যা করতেন। পড়াশোনা, বাগান করা এবং অতীতের যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়। তিনি শুধু স্মৃতি সংরক্ষণ করছিলেন না; ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁকে কীভাবে দেখবে, সেটিও প্রভাবিত করতে চাইছিলেন। পরাজয়ের দায় অন্যদের ওপর দেওয়া এবং নিজের শাসনকে প্রগতিশীল উদ্দেশ্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা এসব বর্ণনায় দেখা যায়।

লাস কাসের সংকলিত সেন্ট হেলেনার স্মৃতিবিবরণ নেপোলিয়নের মৃত্যুর পরে বিশেষ প্রভাব ফেলে। সেখানে তিনি কখনো বিপ্লবের অর্জনের রক্ষক, কখনো যোগ্যতার ভিত্তিতে সমাজ গড়ার নেতা, আবার কখনো ইউরোপীয় ঐক্যের দূরদর্শী প্রবক্তা হিসেবে উপস্থিত হন। বাস্তব শাসনের সংবাদনিয়ন্ত্রণ, পুলিশি নজরদারি ও রাজনৈতিক দমন এই আত্মপ্রতিকৃতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। সেন্ট হেলেনা তাই তাঁর ক্ষমতার সমাধিস্থল হওয়ার পাশাপাশি নেপোলিয়নকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক কিংবদন্তি তৈরির স্থানও হয়ে ওঠে।

শেষ জীবনে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। পেটব্যথা, বমি, ক্ষুধামান্দ্য ও দুর্বলতা বাড়তে থাকে। ১৮২১ সালের ৫ মে, একান্ন বছর বয়সে, লংউডে তাঁর মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তে পাকস্থলীতে গুরুতর ক্ষত ও ক্যানসারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবর্তনের বর্ণনা পাওয়া যায়। পাকস্থলীর ক্যানসারই মৃত্যুর সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা, যদিও রোগের বিস্তারিত প্রকৃতি এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা ও শেষদিকে দেওয়া কিছু ওষুধ তাঁর দুর্বল অবস্থাকে আরও খারাপ করে থাকতে পারে।

নেপোলিয়নকে আর্সেনিক দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল—এই ধারণা পরে জনপ্রিয় হয়। তাঁর বলে চিহ্নিত কিছু চুলের নমুনায় আর্সেনিক পাওয়া গেলেও তা একা হত্যার প্রমাণ নয়। জীবনের আগের পর্যায়ের নমুনাতেও আর্সেনিকের উপস্থিতির কথা জানা যায়; সে সময় পরিবেশ, রং ও বিভিন্ন সামগ্রী থেকেও সংস্পর্শ ঘটতে পারত। তাই পরিকল্পিত বিষপ্রয়োগকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা বলা যায় না। তাঁকে প্রথমে সেন্ট হেলেনায় সমাহিত করা হয়। ১৮৪০ সালে দেহাবশেষ ফ্রান্সে ফিরিয়ে প্যারিসের লে জাঁভালিদে নেওয়া হলে তাঁর স্মৃতিকে ঘিরে জাতীয় আবেগ নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়।

সামরিক ইতিহাসে নেপোলিয়নের প্রধান অবদান কোনো একটি অস্ত্র বা কৌশল আবিষ্কারে সীমাবদ্ধ নয়। বিপ্লবী ফ্রান্সের জনবল, পূর্ববর্তী সামরিক সংস্কার এবং পৃথক সেনাদলব্যবস্থাকে তিনি অসাধারণ দক্ষতায় ব্যবহার করেছিলেন। বিভিন্ন পথে চলেও প্রয়োজনের সময় শক্তি কেন্দ্রীভূত করা, শত্রুর যোগাযোগে আঘাত এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত তাঁর সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অস্টারলিৎস, উলম ও ইয়েনার অভিযান এই দক্ষতার উদাহরণ। তাঁর প্রতিভা ছিল বিদ্যমান সামরিক উপাদানগুলোকে পরিস্থিতি অনুযায়ী কার্যকর সমন্বয়ে আনা।

কিন্তু সেই পদ্ধতির সীমাও ছিল। দীর্ঘ সরবরাহপথ, ঘোড়ার ঘাটতি, দুর্বল তথ্য এবং প্রতিপক্ষের অভিযোজন তাঁর সুবিধা কমিয়ে দেয়। স্পেনে জনগণের প্রতিরোধ নিয়মিত যুদ্ধের সাফল্যকে অকার্যকর করে; রাশিয়ায় দূরত্ব ও ক্ষয় দ্রুত নিষ্পত্তির আশা ভেঙে দেয়। লাইপজিগ ও ওয়াটারলু দেখায়, সহযোগিতা ধরে রাখা প্রতিপক্ষ তাঁর বাহিনীকে পরাজিত করতে পারে। পরবর্তী সামরিক চিন্তায় তাঁর অভিযান ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করা হলেও বাহ্যিক অনুকরণ বিপজ্জনক ছিল। পরিস্থিতি না বুঝে শুধু আক্রমণাত্মক মনোভাব গ্রহণ করলে তাঁর সাফল্য পুনরাবৃত্তি সম্ভব নয়।

আইনের ক্ষেত্রে তাঁর উত্তরাধিকার আরও স্থায়ী। ১৮০৪ সালের দেওয়ানি আইনসংহিতা ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলের আইনি বৈচিত্র্য কমিয়ে সম্পত্তি, চুক্তি ও উত্তরাধিকারের একটি সাধারণ কাঠামো দেয়। বিপ্লবে বিলুপ্ত জন্মগত সুবিধা পুনঃপ্রতিষ্ঠা না করে নাগরিক আইনের একীভূত নীতি গড়ে তোলা ছিল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ইউরোপের বহু অঞ্চল এবং পরে অন্যান্য দেশের আইনপ্রণয়নে এর প্রভাব পড়ে। কোথাও সরাসরি বিধান গ্রহণ করা হয়, কোথাও স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনা হয়। নেপোলিয়নের রাজনৈতিক পতন এই প্রভাব মুছে দিতে পারেনি।

তবে আইনসংহিতার নাগরিক সমতা সর্বজনীন সমঅধিকার ছিল না। বিবাহিত নারীর স্বাধীনতা সীমিত এবং পরিবারের মধ্যে স্বামী ও পিতার কর্তৃত্ব শক্তিশালী ছিল। শ্রমিক-মালিক সম্পর্কেও অসমতা ছিল। তাঁর শাসনে ১৮০২ সালে উপনিবেশে দাসপ্রথা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ বিপ্লবী মুক্তির দাবির গুরুতর বিরোধিতা করে। সাঁ-দোমাঁগে স্বাধীনতা পুনর্দখলের ফরাসি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং হাইতির স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়। নেপোলিয়নের আধুনিকীকরণ মূল্যায়ন করতে হলে তার সুবিধাভোগীদের পাশাপাশি বাদ পড়া ও নিপীড়িত মানুষদেরও দেখতে হয়।

প্রশাসনে প্রিফেক্ট ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ, করসংগ্রহ, লিসে এবং রাষ্ট্রের জন্য দক্ষ কর্মকর্তা তৈরির প্রচেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী হয়। ব্যাংক অব ফ্রান্স ও স্থিতিশীল মুদ্রাব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগত উত্তরাধিকার রেখে যায়। ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে সামন্তীয় বাধা অপসারণ এবং ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসন বিস্তারে ফরাসি শাসন ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে দখলদারি, সৈন্যসংগ্রহ ও যুদ্ধকর বিরোধী জাতীয় অনুভূতি জোরদার করে। জার্মান ও ইতালীয় ভূখণ্ড পুনর্বিন্যাস ভবিষ্যতের পরিবর্তনের পটভূমি তৈরি করলেও পরবর্তী জাতীয় ঐক্য তাঁর সরল পরিকল্পনার ফল ছিল না।

নেপোলিয়নের পতনের পর ভিয়েনার বন্দোবস্ত ইউরোপে শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের চেষ্টা করে। তবু পুরোনো রাজবংশ ফিরলেও সব আইন ও প্রশাসনিক পরিবর্তন ফিরিয়ে নেওয়া যায়নি। তাঁর জীবন বিপ্লবী সুযোগে সামাজিক উত্থান, ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব, রাষ্ট্রগঠন ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের পরস্পরবিরোধী ইতিহাস। তিনি আধুনিক রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করেছিলেন, আবার সেই রাষ্ট্রের শক্তি দিয়ে স্বাধীনতা সংকুচিত ও যুদ্ধ বিস্তৃত করেছিলেন। সেন্ট হেলেনায় তাঁর ব্যক্তিগত যাত্রা শেষ হয়; কিন্তু আইন, সামরিক নেতৃত্ব এবং ক্ষমতার সীমা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো রেখে যান, সেগুলো তাঁর সাম্রাজ্যের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে।