বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

এনিয়াসের কিংবদন্তি: ট্রয় থেকে ইতালিতে রোমের পূর্বপুরুষের অভিযাত্রা

সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি

এনিয়াসের কিংবদন্তি: ট্রয় থেকে ইতালিতে রোমের পূর্বপুরুষের অভিযাত্রা
জ্বলন্ত ট্রয় থেকে রোমের ভবিষ্যতের পথে এনিয়াস।

প্রাচীন ইতালির বিশ্বাস, এত্রুস্কান আচার এবং গ্রিক দেবকাহিনি মিলিয়ে যে রোমান পুরাণের জগৎ গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে একটি প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল—রোমানদের পূর্বপুরুষ কোথা থেকে এসেছিলেন? সেই উত্তর খুঁজতে রোমের গল্প ফিরে যায় ধ্বংসের মুখে দাঁড়ানো ট্রয় নগরে। সেখানে এনিয়াস নামের এক যোদ্ধা পরাজিত নগর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন বৃদ্ধ পিতা, ছোট সন্তান এবং গৃহদেবতাদের নিয়ে। রোমান ঐতিহ্যে তাঁর যাত্রা ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত অতীতকে বহন করে নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণের কাহিনি। রোম তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি; কিন্তু এই উদ্বাস্তু বীরের মধ্যে রোমানরা নিজেদের পৌরাণিক সূচনা দেখতে পেয়েছিল।

এনিয়াস প্রথম থেকেই রোমান সাহিত্যের চরিত্র ছিলেন না। গ্রিক মহাকাব্য ইলিয়াডে তিনি ট্রয়ের পক্ষে যুদ্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ বীর। তাঁর পিতা আনকিসেস এবং মাতা দেবী আফ্রোদিতি, রোমান পরিচয়ে ভেনাস। ইলিয়াডে দেবতা পোসাইডন তাঁকে অ্যাকিলিসের হাত থেকে রক্ষা করেন; তাঁর বংশের ভবিষ্যৎ টিকে থাকার কথাও সেখানে উঠে আসে। তবে ট্রয় থেকে ইতালি পর্যন্ত পূর্ণ অভিযাত্রা সেই কাব্যের বিষয় নয়। বিভিন্ন গ্রিক ও ইতালীয় ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী লেখকেরা তাঁর কাহিনি বিস্তৃত করেন। সবচেয়ে প্রভাবশালী রূপটি আসে ভার্জিলের এনিয়েডে।

ভার্জিল খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর শেষভাগে, অগাস্টাসের শাসনকালে এনিয়েড রচনা করেন। গৃহযুদ্ধের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর রোম তখন নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করছে। এই পরিবেশে এনিয়াসের কাহিনি রোমের অতীত, কর্তব্য এবং সাম্রাজ্যিক ভবিষ্যৎকে একসূত্রে যুক্ত করে। এনিয়েডকে ইতিহাসের সরাসরি বিবরণ হিসেবে পড়া যায় না; এটি পুরোনো কিংবদন্তির ওপর নির্মিত সাহিত্যিক মহাকাব্য। ট্রয়ের পতন, দেবতাদের হস্তক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ রোমের পূর্বাভাস এখানে কবির বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। অন্য প্রাচীন বিবরণে ঘটনাক্রম ও চরিত্রের ভূমিকা কিছুটা ভিন্ন।

এনিয়েডে ট্রয়ের শেষ রাত শুরু হয় কাঠের ঘোড়াকে নগরের ভেতরে নিয়ে আসার বিপর্যয়কর সিদ্ধান্ত থেকে। রাত নামলে লুকিয়ে থাকা গ্রিক যোদ্ধারা বেরিয়ে আসে এবং ফিরে আসা বাহিনী আক্রমণ করে। এনিয়াস স্বপ্নে নিহত হেক্টরকে দেখতে পান; হেক্টর তাঁকে ট্রয়ের পবিত্র সম্পদ নিয়ে নতুন আবাস খুঁজতে বলেন। প্রথমে এনিয়াস যুদ্ধ করে মরতে চান। কিন্তু নগর রক্ষা অসম্ভব হয়ে পড়লে পরিবারের দায়িত্ব সামনে আসে। ভেনাসও তাঁকে বুঝিয়ে দেন, ধ্বংসের পেছনে দেবতাদের সিদ্ধান্ত কাজ করছে। তখন বীরত্বের অর্থ বদলে যায়—বেঁচে থেকে উত্তরাধিকার রক্ষা করাই তাঁর কর্তব্য।

পলায়নের দৃশ্যটি রোমান শিল্প ও সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা পায়। এনিয়াস কাঁধে আনকিসেসকে তোলেন, ছেলে আসকানিয়ুস তাঁর সঙ্গে চলে এবং স্ত্রী ক্রেউসা পেছনে অনুসরণ করেন। বৃদ্ধ আনকিসেস বহন করেন গৃহদেবতাদের পবিত্র প্রতীক। পথে ক্রেউসা হারিয়ে গেলে এনিয়াস বিপজ্জনক নগরে ফিরে তাঁকে খোঁজেন। পরে স্ত্রীর ছায়ামূর্তি জানায়, তাঁর সামনে দীর্ঘ যাত্রা ও নতুন জীবন অপেক্ষা করছে। এই দৃশ্যে তিন প্রজন্ম একসঙ্গে উপস্থিত—পিতা অতীতের স্মৃতি, এনিয়াস বর্তমানের দায়িত্ব এবং সন্তান ভবিষ্যতের ধারাবাহিকতা। ব্যক্তিগত ক্ষতি অভিযাত্রার শুরুতেই স্থায়ী হয়ে যায়।

ট্রয় ত্যাগের পর যাত্রা সরাসরি ইতালির দিকে এগোয় না। থ্রেসে আশ্রয় গড়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয় নিহত ট্রোজান রাজপুত্র পলিডোরাসের ভয়াবহ ঘটনার কারণে। ডেলোসে দেববাণী তাঁদের প্রাচীন মাতৃভূমি খুঁজতে নির্দেশ দেয়। আনকিসেস সেই নির্দেশের অর্থ ক্রিট মনে করেন, কিন্তু সেখানে বসতি স্থাপনের পর মহামারি দেখা দেয়। গৃহদেবতাদের স্বপ্নবার্তা তখন ইতালির দিকে পথ দেখায়। এসব পর্বে দেববাণী পাওয়া এবং তার সঠিক অর্থ বোঝা আলাদা সমস্যা। এনিয়াসের দলকে বারবার ভুল সংশোধন করতে হয়; তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হলেও পথ সহজ নয়।

পরবর্তী যাত্রায় হার্পিদের অভিশাপ, বিপজ্জনক সমুদ্রপথ এবং বিচ্ছিন্ন ট্রোজানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। এপিরাসে এনিয়াস দেখা পান হেলেনুস ও হেক্টরের বিধবা আন্দ্রোমাখের। তাঁদের ছোট্ট বসতি হারানো ট্রয়ের স্মৃতি ধরে রাখে। হেলেনুস ভবিষ্যদ্বাণী ও পথনির্দেশ দেন। পরে সিসিলিতে আনকিসেস মারা যান। পিতাকে হারিয়ে এনিয়াসের ওপর নেতৃত্বের ভার আরও গভীর হয়। এই দীর্ঘ বিচরণে ট্রোজানরা বুঝতে শেখে, পুরোনো নগরের অনুকরণ করে কোথাও থেমে যাওয়া তাদের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। তাদের জন্য অপেক্ষা করছে ভিন্ন ভূমি ও নতুন সামাজিক সম্পর্ক।

ইতালির কাছে পৌঁছানোর প্রচেষ্টায় জুনোর বিরোধিতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ট্রোজানদের প্রতি তাঁর পুরোনো ক্ষোভ এবং ভবিষ্যৎ রোমের হাতে প্রিয় কার্থেজের পরাজয়ের আশঙ্কা কাহিনিতে যুক্ত হয়। তাঁর উদ্যোগে ঝড় উঠলে এনিয়াসের জাহাজগুলো উত্তর আফ্রিকার উপকূলে আশ্রয় নেয়। সেখানে রানি দিদো নতুন কার্থেজ নির্মাণ করছেন। তিনিও সহিংসতার কারণে মাতৃভূমি ছেড়ে আসা শাসক; ফলে ট্রোজান উদ্বাস্তুদের দুর্দশা বুঝতে পারেন। দিদো ও এনিয়াসের সাক্ষাৎ দুটি হারানো জীবনের মধ্যে সাময়িক আশ্রয় তৈরি করে, যদিও তাদের ভবিষ্যৎ একই দিকে এগোয় না।

দিদোর আতিথ্যে এনিয়াস ট্রয়ের পতন ও নিজের বিচরণের গল্প বলেন। দেবতাদের হস্তক্ষেপে তাঁদের সম্পর্ক গভীর হয়। এক ঝড়ের সময় গুহায় আশ্রয় নেওয়ার ঘটনাকে দিদো বিবাহবন্ধন হিসেবে গ্রহণ করেন, কিন্তু সম্পর্কটির অর্থ দুই চরিত্রের কাছে সমান ছিল না। এনিয়াস কার্থেজে অবস্থান করতে থাকলে বৃহস্পতি মারকিউরিকে পাঠিয়ে ইতালির কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দেন। চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দিদোর কাছে বিশ্বাসভঙ্গের মতো লাগে। তিনি আত্মহত্যা করেন এবং বিদায়ী ট্রোজানদের বিরুদ্ধে অভিশাপ উচ্চারণ করেন। কাব্যে সেই অভিশাপ ভবিষ্যতের রোম–কার্থেজ শত্রুতার পৌরাণিক ব্যাখ্যাও হয়ে ওঠে।

দিদোর পরিণতি এনিয়াসের চরিত্রকে সহজ বিজয়ীর ছবি হতে দেয় না। তাঁর প্রধান গুণ পিয়েতাস—দেবতা, পরিবার ও সম্প্রদায়ের প্রতি কর্তব্যবোধ। কিন্তু সেই কর্তব্য পালনে অন্য মানুষের গভীর ক্ষতি ঘটে। ভার্জিল দিদোর যন্ত্রণা এমনভাবে তুলে ধরেন যে পাঠক এনিয়াসের গন্তব্য মেনে নিয়েও তাঁর সিদ্ধান্তের মূল্য অনুভব করেন। পরবর্তী পাতালযাত্রায় এনিয়াস দিদোর ছায়ার কাছে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে চান; দিদো নীরবে মুখ ফিরিয়ে নেন। রোমের ভবিষ্যতের মহিমার পাশে এই ব্যক্তিগত শোক অমীমাংসিত থেকে যায়।

ইতালির কুমাইয়ে পৌঁছে এনিয়াস সিবিলের সাহায্যে পাতাললোকে প্রবেশ করেন। সেখানে পিতা আনকিসেস তাঁকে ভবিষ্যৎ বংশধরদের দেখান; রোমুলুস এবং অগাস্টাসের মতো ব্যক্তিত্ব সেই দৃশ্যে স্থান পায়। এই পর্বে উদ্বাস্তুদের যাত্রা রোমের দীর্ঘ ইতিহাসের পূর্বকথায় রূপ নেয়। পরে লাতিয়ামে রাজা লাতিনুস ট্রোজানদের গ্রহণ করেন এবং কন্যা লাভিনিয়ার সঙ্গে এনিয়াসের বিবাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু রুতুলীয় নেতা টার্নুসসহ স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বীরা বিরোধিতা করে। আশ্রয়ের সন্ধান শেষ পর্যন্ত নতুন যুদ্ধ ডেকে আনে; এনিয়েড শেষ হয় এনিয়াসের হাতে টার্নুস নিহত হওয়ার দৃশ্যে।

তবু এনিয়াস নিজে রোম প্রতিষ্ঠা করেননি। প্রচলিত ঐতিহ্যে তাঁর সঙ্গে লাভিনিয়ুমের প্রতিষ্ঠা যুক্ত; ছেলে আসকানিয়ুস বা ইউলুস পরে আলবা লঙ্গার বংশধারার সূচনা করেন। বহু প্রজন্ম পরে সেই ধারায় আসবেন রেয়া সিলভিয়া এবং তাঁর যমজ সন্তান রোমুলুস ও রেমুস। জুলীয় পরিবারও ইউলুসের মাধ্যমে এনিয়াস ও ভেনাসের সঙ্গে নিজেদের বংশসম্পর্ক দাবি করেছিল। রোমের প্রতিষ্ঠার আগে প্রায়ই প্রজন্মের এই দীর্ঘ ব্যবধান উপেক্ষিত হয়। কিন্তু এনিয়াসের ভূমিকা নগরপ্রতিষ্ঠাতার চেয়ে পৌরাণিক পূর্বপুরুষের—তিনি ট্রয়ের স্মৃতি ও ইতালির ভবিষ্যতের মধ্যে সেতু। সেই সেতু পেরিয়ে গল্প এবার এগিয়ে যাবে আলবা লঙ্গার রাজপরিবারে, যেখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব একদিন দুই অসহায় শিশুকে টাইবার নদীর দিকে ঠেলে দেবে।