বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

রোমান পুরাণের উৎপত্তি: ইতালীয় বিশ্বাস ও গ্রিক প্রভাবে দেবদেবীর জগৎ

সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি

রোমান পুরাণের উৎপত্তি: ইতালীয় বিশ্বাস ও গ্রিক প্রভাবে দেবদেবীর জগৎ
প্রাচীন ইতালির বিশ্বাস থেকে রোমান দেবজগতের উত্থান।

রোমের জন্মের গল্প বলতে গেলে সাধারণত চোখের সামনে আসে একটি নেকড়ে, দুই যমজ শিশু এবং টাইবার নদীর তীর। কিন্তু সেই বিখ্যাত কিংবদন্তির পেছনে ছিল আরও পুরোনো এক বিশ্বাসের জগৎ। সেখানে কৃষক বৃষ্টির অপেক্ষায় দেবতার কাছে প্রার্থনা করত, পরিবার চুলার আগুনকে পবিত্র মনে করত এবং শাসকেরা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে আকাশের লক্ষণ পরীক্ষা করত। রোমান পুরাণ কোনো একদিনে লেখা সম্পূর্ণ কাহিনিসংগ্রহ ছিল না; বহু জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, আচার ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তার বিকাশ ঘটেছিল। এই দীর্ঘ পরিবর্তন বুঝলেই বোঝা যায়, রোমানরা নিজেদের নগর, দেবতা ও ভবিষ্যৎকে কীভাবে একই গল্পের মধ্যে যুক্ত করেছিল।

রোম গড়ে উঠেছিল মধ্য ইতালির লাতিয়াম অঞ্চলে, যেখানে লাতিনভাষী জনগোষ্ঠীর বসতি ছিল। আশপাশে বাস করত সাবাইনসহ অন্যান্য ইতালীয় জনগোষ্ঠী; উত্তরে ছিল সমৃদ্ধ এত্রুস্কান নগরসভ্যতা। দক্ষিণ ইতালি ও সিসিলিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গ্রিক উপনিবেশ। টাইবার নদীর পারাপার এবং বাণিজ্যপথের অবস্থানের কারণে রোম এসব সমাজের সংস্পর্শে আসে। ফলে তার ধর্মীয় সংস্কৃতির ভিত্তি ছিল স্থানীয় হলেও তা কখনো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল না। বসতি সম্প্রসারণ, মানুষের যাতায়াত এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে নতুন দেবতা ও উপাসনাপদ্ধতি পরিচিত হতে থাকে।

প্রাথমিক ইতালীয় বিশ্বাসের কেন্দ্রে ছিল দৈনন্দিন জীবনের অনিশ্চয়তা। ফসল জন্মাবে কি না, গবাদিপশু সুস্থ থাকবে কি না, প্রসব নিরাপদ হবে কি না—এসব প্রশ্নের সঙ্গে ধর্ম গভীরভাবে যুক্ত ছিল। বন, ঝরনা, সীমানা, দরজা ও কৃষিকাজের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে বিশেষ দৈবক্ষমতার সম্পর্ক কল্পনা করা হতো। পরবর্তী রোমান লেখকদের বিবরণে বহু নির্দিষ্ট কাজের অধিষ্ঠাত্রী শক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে সেসব তালিকাকে আদিযুগের ধর্মের হুবহু প্রতিচ্ছবি ভাবা ঠিক নয়। প্রাচীন বিশ্বাস সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এসেছে অনেক পরের সাহিত্য, আচারসংক্রান্ত বিবরণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে।

এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা হলো নুমেন। শব্দটি দেবতার কার্যকর ইচ্ছা, উপস্থিতি বা ক্ষমতা বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। কোনো স্থানে বা ঘটনায় মানুষ দৈবশক্তির কার্যকারিতা অনুভব করতে পারত। কিন্তু প্রথমে রোমানদের সব দেবতা নিছক নামহীন শক্তি ছিল, পরে গ্রিকরা এসে তাদের মানুষের চেহারা দিয়েছিল—এমন সরল ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। দৈবক্ষমতার অনুভূতি, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন দেবতা এবং নির্দিষ্ট আচার দীর্ঘদিন পাশাপাশি বিদ্যমান ছিল। রোমান ধর্মের বিকাশ ছিল বহুস্তরীয়; একটি ধারণা এসে আগের সব বিশ্বাসকে সরিয়ে দেয়নি।

গৃহজীবনে এই ধর্মের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রকাশ ঘটত। পরিবারের চুলার আগুন, খাদ্যের ভান্ডার এবং পূর্বপুরুষের স্মৃতি ছিল পবিত্রতার অংশ। ভেস্তা চুলা ও পবিত্র আগুনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পেনাতেস পরিবারের খাদ্যভান্ডার ও জীবিকার রক্ষক হিসেবে পূজিত হতো। লারেস গৃহ, স্থান ও সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের রক্ষাকারী দেবশক্তি হিসেবে পরিচিত ছিল। পরিবারপ্রধানের জেনিয়াসও উপাসনার বিষয় হয়ে ওঠে। ছোট নিবেদন, প্রার্থনা ও পারিবারিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেবতার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা হতো। এই গৃহপূজা দেখায়, রোমান ধর্মের ভিত্তি শুধু বিশাল মন্দিরে ছিল না।

স্থানীয় দেবতাদের মধ্যে জানুসের অবস্থান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রবেশপথ, সূচনা ও পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; তাঁর দুই মুখের পরিচিত প্রতীক দুই দিকে দেখার ধারণা প্রকাশ করে। টার্মিনুস ছিলেন সীমানাচিহ্নের দেবতা, যার গুরুত্ব জমির অধিকার ও সামাজিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পর্কিত। মার্সের পরিচয় যুদ্ধের দেবতা হিসেবে বিখ্যাত হলেও তাঁর উপাসনায় কৃষিজমি ও জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার দিকও ছিল। শস্যক্ষেত্রকে ঘিরে শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠানে তাঁর কাছে প্রার্থনা করা হতো। এসব দেবতা বুঝিয়ে দেয়, রোমান সমাজে কৃষি, ভূসম্পত্তি ও সামরিক নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

রোমের প্রতিবেশী সাবাইন জনগোষ্ঠীর প্রভাবও প্রাচীন ঐতিহ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। রোমান কাহিনিতে সাবাইনদের সঙ্গে সংঘাত ও মিলনের বিবরণ আছে; কুইরিনুস এবং কিছু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাবাইন সম্পর্কও তুলে ধরা হয়েছে। তবে কোনো দেবতা ঠিক কোন জনগোষ্ঠী থেকে এসেছে, তা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না। পরবর্তী লেখকেরা রোমের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যাখ্যা করতে উৎসকাহিনি ব্যবহার করেছেন। ফলে এসব বিবরণ একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং নিজেদের অতীত বোঝানোর প্রচেষ্টা। এগুলো মূল্যবান হলেও সরাসরি ঘটনাপঞ্জি হিসেবে পড়লে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

এত্রুস্কানদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান। তাদের নগরসংস্কৃতি, মন্দিরনির্মাণ এবং দৈবলক্ষণ ব্যাখ্যার পদ্ধতি রোমান ধর্মে গভীর ছাপ ফেলেছিল। বিশেষজ্ঞ পুরোহিতেরা বজ্রপাত ও বলিদান করা পশুর অন্ত্র, বিশেষত যকৃৎ পরীক্ষা করে দেবতার সংকেত বোঝার চেষ্টা করতেন। এই অন্ত্রপরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন হারুসপেক্স নামে পরিচিত বিশেষজ্ঞেরা। রোমানরা সংকটের সময় এত্রুস্কান ধর্মীয় জ্ঞানের সাহায্য নিত। আকাশের লক্ষণ ব্যাখ্যার অন্যান্য রোমান পদ্ধতির সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকলেও সব ধরনের ভবিষ্যদ্বাণীকে একই আচার বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

মন্দিরের স্থাপত্য ও দেবমূর্তির ক্ষেত্রেও এত্রুস্কান অবদান ছিল। ক্যাপিটোলাইন পাহাড়ের বৃহস্পতি, জুনো ও মিনার্ভার যৌথ উপাসনা রোমের রাষ্ট্রধর্মের প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়। এর প্রতিষ্ঠার পরিবেশে এত্রুস্কান সাংস্কৃতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বৃহস্পতি আকাশ, বজ্র এবং শপথের কর্তৃত্বের সঙ্গে যুক্ত; জুনোর উপাসনায় নারীজীবন, বিবাহ ও রাষ্ট্ররক্ষার বিভিন্ন দিক ছিল; মিনার্ভা কারুশিল্প ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। ক্যাপিটোলাইন দেবত্রয় রোমের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও দৈবঅনুমোদনকে একটি কেন্দ্রীয় উপাসনাস্থলে যুক্ত করেছিল।

গ্রিক প্রভাব পৌঁছেছিল একাধিক পথে। দক্ষিণ ইতালির গ্রিক বসতি, বণিক, শিল্পকর্ম ও উপাসনাকেন্দ্রের মাধ্যমে রোমানরা গ্রিক দেবকাহিনি জানতে পারে। পরে গ্রিকভাষী অঞ্চলে রোমের সামরিক সম্প্রসারণ সেই পরিচয় আরও গভীর করে। গ্রিক পুরাণে দেবতাদের জন্ম, আত্মীয়তা, প্রেম, বিরোধ ও বীরদের অভিযানের বিস্তৃত কাহিনি ছিল। রোমানরা এসব গল্প গ্রহণ করে নিজেদের দেবজগতের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়। ফলে স্থানীয় দেবতার পরিচয়ের ওপর নতুন কাহিনি যুক্ত হয়; শিল্পে দেবতাদের রূপও আরও স্পষ্ট ও পরিচিত হয়ে ওঠে।

বৃহস্পতির সঙ্গে জিউস, জুনোর সঙ্গে হেরা, মিনার্ভার সঙ্গে অ্যাথেনা এবং ভেনাসের সঙ্গে আফ্রোদিতির সমীকরণ এই প্রক্রিয়ার পরিচিত উদাহরণ। কিন্তু নাম মিলিয়ে দিলেই তাদের সব বৈশিষ্ট্য এক হয়ে যায়নি। ভেনাস রোমে বংশপরিচয় ও রাজনৈতিক দাবির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত হন; মার্স রাষ্ট্রের পিতৃপুরুষসুলভ মর্যাদা পান। অ্যাপোলোর মতো দেবতা আবার গ্রিক নামের কাছাকাছি পরিচয়েই রোমে গৃহীত হন। গ্রিক কাহিনির গ্রহণ রোমান ধর্মকে সমৃদ্ধ করেছিল, তবে স্থানীয় আচার ও সামাজিক ভূমিকা তার স্বতন্ত্র চরিত্র বজায় রেখেছিল।

রোমান দেবকাহিনির সাহিত্যিক বিস্তার ঘটে বিশেষভাবে গ্রিক শিক্ষায় পরিচিত লেখকদের হাতে। কবিতা, নাটক ও ইতিহাসে দেবতাদের গল্প নতুনভাবে সাজানো হয়। ভার্জিলের এনিয়েড ট্রয় থেকে আগত এনিয়াসের যাত্রাকে রোমের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করে। ওভিদের রূপান্তরকাব্য বিভিন্ন গ্রিক ও রোমান কিংবদন্তিকে বৃহৎ সাহিত্যিক কাঠামো দেয়। কিন্তু এসব রচনা রোমের প্রতিষ্ঠার বহু শতাব্দী পরে লেখা। তাই কোনো সাহিত্যিক কাহিনি, কোনো মন্দিরের আচার এবং কোনো পরিবারের বিশ্বাসকে সব সময় একই জিনিস ভাবা যায় না। রোমান ধর্মে উপাসনার গুরুত্ব প্রায়ই গল্পের নির্দিষ্ট সংস্করণের চেয়েও বেশি ছিল।

রাষ্ট্রজীবনে ধর্মের উদ্দেশ্য ছিল দেবতাদের সঙ্গে অনুকূল সম্পর্ক বজায় রাখা। নির্ধারিত দিনে উৎসব, যথাযথ প্রার্থনা, বলিদান ও শপথ এই সম্পর্কের অংশ। পুরোহিতদের বিভিন্ন গোষ্ঠী আচার পরিচালনা এবং লক্ষণ ব্যাখ্যার দায়িত্ব পালন করত। দেবতাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্কের ধারণাকে প্রায়ই পাক্স দেইওরুম বলা হয়। দুর্যোগ বা সামরিক বিপর্যয়ের সময় আচারগত ত্রুটি খোঁজা হতো এবং প্রতিকারমূলক অনুষ্ঠান করা যেত। বিশ্বাস এখানে ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি নাগরিক দায়িত্বও ছিল; নগরের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় শুদ্ধতা একই চিন্তার মধ্যে যুক্ত থাকত।

রোমের বিস্তারের সঙ্গে এই দেবজগত আরও প্রসারিত হয়। বাইরের দেবতার উপাসনা গ্রহণ করা সম্ভব ছিল, যদিও তা প্রায়ই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, পুরোহিতীয় পরামর্শ ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে ঘটত। এই গ্রহণক্ষমতা রোমান ধর্মের একটি শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। প্রাচীন ইতালির কৃষিজীবন, এত্রুস্কান আচার, গ্রিক দেবকাহিনি এবং রোমের নিজস্ব রাষ্ট্রচেতনা মিলে তৈরি করে এমন এক পুরাণজগৎ, যেখানে অতীতের ব্যাখ্যা ভবিষ্যতের দাবিকে সমর্থন করত। সেই জগতের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—রোমের মানুষ কোথা থেকে এসেছে? তার উত্তর খুঁজতে কাহিনি এবার ইতালি ছেড়ে এগিয়ে যায় জ্বলন্ত ট্রয়ের দিকে, যেখানে এক পলাতক বীরের যাত্রার মধ্যে রোমানরা নিজেদের জন্মের পূর্বকথা দেখতে পেয়েছিল।